আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ভাষা আন্দোলনভিত্তিক চলচ্চিত্র ছয় দশকেও অধরা

প্রকাশিত : ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

পৃথিবীর আর কোন জাতিকেই নিজের ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বুকের তাজা রক্ত রাজপথে ঢেলে দিতে হয়নি। অথচ এই গৌরবের ইতিহাস আমাদের রূপালী পর্দায় খুব একটা উঠে আসেনি। মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র কিছুটা হয়েছে। তবে সেটাও মান এবং গুনের বিচারে আশাব্যঞ্জক নয়। ১৯৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তানে বসে অত্যন্ত কৌশলে পাকিস্তানীদের নিপীড়নের চিত্র রূপক আকারে বলেছেন জহির রায়হান। ‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্রে একটি পরিবারের গল্প বলেছেন নির্মাতা। এই চলচ্চিত্রে তিনি নিয়ে এসেছিলেন বাহান্নর ভাষা আন্দোলনকে। সেই পরিবারের বড় বোনটি আসলে যে, স্বৈরাচারী পাকিস্তানী শাসকদের রূপক চরিত্র সেটি কারো বুঝতে অসুবিধা হয়নি। অন্যদিকে পরিবারের অন্যান্য স্বাধীনতাকামী সদস্যরা যে বাংলাদেশের মুক্তিকামী সাধারণ জনতার প্রতীকী চরিত্র সেটাও বুঝতে কারও বাকি থাকেনি। বিষয়টা পাকিস্তানীরা ধরতে পারলে ও তাদের কিছুই করার করার ছিল না। কারণ নির্মাতা জহির রায়হান পুরো কাজটি করেছিলেন অত্যন্ত কৌশলে। তাঁকে শুটিং স্পট থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ক্যান্টনমেন্টে। তবে উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। ভাষা অন্দোলনকে কেন্দ্র করে আরেকটি পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছিল বরেণ্য নির্মাতা শহীদুল ইসলাম খোকনের হাত ধরে। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক আহমেদ ছফার ‘ওংকার’ উপন্যাস অবলম্বনে তিনি নির্মাণ করেন চলচ্চিত্র ‘বাঙলা’। হুমায়ুন ফরিদী, মাহফুজ আহমেদ আর শাবনূর অভিনীত এই চলচ্চিত্র দর্শক মহলে প্রশংসা কুড়ায়। ‘বাঙলা’ চলচ্চিত্রের শেষ দৃশ্যে একজন বোবা মেয়ের মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে একটি শব্দ ‘বাঙলা’। অবশ্য এই দুটি চলচ্চিত্র বাদে আর কোন চলচ্চিত্রে আমাদের ভাষার লড়াইয়ের ইতিহাস উঠে আসেনি। জানা যায়, জহির রায়হান ১৯৬৫ সালে ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। জহির রায়হানের কাহিনী অবলম্বনে বরেণ্য শিল্পী মুর্তজা বশীর চলচ্চিত্রটির চিত্রনাট্য রচনা করেছিলেন। তবে পাকিস্তানী সরকার সেই চলচ্চিত্র নির্মাণের অনুমতি দেয়নি। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই নির্মাতা জহির রায়হানের রহস্যময় অন্তর্ধানের কারণে এই চলচ্চিত্র আর কোনদিন আলোর মুখ দেখেনি। পরিচালক শহীদুল ইসলাম খোকন বলেন, ‘বাঙলা’ নির্মাণ করেছিলাম আহমেদ ছফার বিখ্যাত উপন্যাস নিয়ে। আশা ছিল এই ছবি দিয়ে পরিচালক হিসেবে আমি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাব। কিন্তু অবাক করার মতো বিষয় ‘বাঙলা‘ চলচ্চিত্রটি একটি শাখাতেও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায়নি। আসলে ভাষা আন্দোলন নিয়ে কাজ করার মতো প্রযোজক নেই। সব প্রযোজকই তার লগ্নিকৃত অর্থ ফেরত চান। এই কারণেই দেশের জন্য, নতুন প্রজন্মের জন্য কোন সিনেমা হচ্ছে না।’ তবে ছোট পর্দায় একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে বেশকিছু ভালো কাজ হয়েছে। মূলত রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাবেই নির্মিত হচ্ছে নানা ভাষা আন্দোলননির্ভর চলচ্চিত্র। অথচ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বীজ রোপিত হয়েছিল সেই ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে।

আরেক বরেণ্য নির্মাতা নাসির উদ্দিন ইউসুফ বলেন, ‘ভাষা আন্দোলন নিয়ে ছয় দশকে কোন চলচ্চিত্র নির্মিত হয়নি এটাই সত্যিই দুঃখজনক। এটা নানান কারণেই হয়ে ওঠেনি। আমার কাছে মনে হয় বাঙালীর ইতিহাস ধারণ করার ক্ষমতা খুব কম। আমাদের ভাষা আন্দোলন নিয়ে যেমন চলচ্চিত্র নির্মিত হয়নি তেমনি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ও খুব বেশি মানসম্মত চলচ্চিত্র নির্মিত হয়নি। চলচ্চিত্র একটি বড় ক্যানভাস। অনেক কিছু সাজিয়ে নিয়ে তারপর কাজটা করতে হয়। ইতিহাসনির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণে পড়াশোনাটাও জরুরী। ফলে সব নির্মাতার পক্ষেই ইতিহাসনির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণ সম্ভব নয়। সাহিত্যে ও ভাষা আন্দোলন উপেক্ষিতই থেকে গিয়েছে। ’

আরেক নির্মাতা অনিমেষ আইচ বলেন, ‘জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’ কিংবা কিছু চলচ্চিত্রে ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে কিছুটা টাচ থাকলেও পূর্ণাঙ্গভাবে ভাষা আন্দোলন নিয়ে কোন সিনেমা নির্মিত হয়নি। তবে এই সময়ের অনেক তরুণ নির্মাতাই এই বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে চান। কিন্তু এই ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণে অনেক বড় বাজেটের প্রয়োজন। প্রযোজকরা কিন্তু খুব একটা আগ্রহী নন। এই ধরনের ইতিহাসনির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণে রাষ্ট্রকেই এগিয়ে আসতে হবে। তরুণদের মধ্যে অনেকেই আছেন যাদের মধ্যে কেউ না কেউ ভাষা আন্দোলনের এই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস নিয়ে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ হবেন।’

তবে সাহিত্যে আমাদের ভাষা আন্দোলন যত বেশি উঠে আসবে, ততো বেশি সেই সব গল্প নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ সম্ভবপর হবে। তবে রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য ছাড়া এই ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণ আসলেই বেশ কঠিন ব্যাপার। আমাদের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে এই সব ইতিহাসনির্ভর চলচ্চিত্র হতে পারে একটি বড় সিঁড়ি। ভবিষ্যতে আমাদের মহান ভাষা আন্দোলন নিয়ে নতুন নতুন মানসমৃদ্ধ চলচ্চিত্র নির্মিত হবে এমনটাই প্রত্যাশা সবার।

প্রকাশিত : ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

১৯/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: