কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

এভাবে আন্দোলন হয় না

প্রকাশিত : ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • এম. নজরুল ইসলাম

চলমান সহিংসতায় বিএনপির সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ করা হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এক বিবৃতিতেও এই অভিযোগকে ‘বিশ্বাসযোগ্য’ বলা হয়েছে। দেশে বর্তমানে যে সহিংস নাশকতা চলছে এর শুরু বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের অবরোধ কর্মসূচী শুরুর পর থেকে। অনেকের এমনও ধারণা, ২০ দলীয় জোটের অবরোধ কর্মসূচীর সুযোগ নিয়ে একটি চিহ্নিত গোষ্ঠীও নাশকতায় মদদ যোগাচ্ছে এবং তাদের রয়েছে অন্য এজেন্ডা। কারও কারও মতে, আন্দোলনের নামে বিএনপি আসলে অন্যদের হাতে এই কর্মসূচী লিজ দিয়েছে। সন্ত্রাস-নাশকতা তুলে দিয়েছে একটি চিহ্নিত গোষ্ঠীর হাতে, যে গোষ্ঠীটি দেশের অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চায়। বিলম্বিত করতে চায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। তাতে বিএনপির যে ষোলো আনা সায় আছে তা নিশ্চয়ই বলার অপেক্ষা রাখে না।

বাংলাদেশে হরতাল-অবরোধে নাশকতায় প্রাণহানিতে উদ্বেগ জানিয়েছে জাতিসংঘ। সম্প্রতি নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দফতরে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টেফান ডুজারিক এ উদ্বেগের কথা জানান। পেট্রোলবোমা ছুড়ে সাধারণ ও নিরপরাধ মানুষ পুড়িয়ে মারাকে মর্মান্তিক ও বর্বর বলে অভিহিত করে বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত। বলেছেন, এ ধরনের সহিংসতা কারও জন্য মঙ্গল বয়ে আনতে পারে না। যেকোন ধরনের সহিংসতার বিরুদ্ধে তাদের অবস্থানের কথাও উল্লেখ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এর আগে কানাডার হাইকমিশনার বলেছেন, চলমান রাজনৈতিক সহিংসতায় দেশ ও দেশের জনগণ চরম মূল্য দিচ্ছে।

প্রায় দেড় মাস ধরে চলছে টানা অবরোধ এবং থেমে থেমে হরতাল। আর সেই হরতাল সফল করতে গিয়ে চালানো হচ্ছে পেট্রোলবোমা ও ককটেল হামলাসহ নানা রকম সহিংসতা। বিদ্যালয় ভবনও বাদ যায়নি এসব হামলা থেকে। স্বাভাবিক কারণেই অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা ভীত-সন্ত্রস্ত। ফলে ক্লাস, পরীক্ষাসহ শিক্ষাঙ্গনের যাবতীয় কাজকর্ম তথা পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাই প্রায় মুখথুবড়ে পড়েছে। বছরের শুরুতে শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দিয়ে রেকর্ড সৃষ্টি করেছে বাংলাদেশ। নতুন বই হাতে পেয়ে বরাবরের মতো এবারও শিশুরা যতটা আনন্দিত হয়েছিল, এখন ততটাই হতাশ স্কুলে ক্লাস না হওয়ায়।

সংঘর্ষ-সহিংসতায় প্রাণ হারানো মানুষের স্বজনদের আহাজারি আর হাসপাতালগুলোর বার্ন ইউনিটজুড়ে পোড়া মানুষের আকুতিও টলাতে পারছে না বিএনপি-জামায়াত জোটকে। গত ৪৫ দিনে বিএনপি-জামায়াত জোটের সহিংসতায় প্রাণ গেছে ৮৯ জনের। পেট্রোলবোমা আর গাড়িতে আগুন দেয়ার ঘটনায় পুড়ে দেশের হাসপাতালগুলোর বার্ন ইউনিটে ভর্তি রয়েছে সোয়া শ’রও বেশি মানুষ। গাড়ি ভাংচুর-অগ্নিসংযোগ আর অন্যান্য নাশকতায় পুরো দেশ আতঙ্কপুরীতে পরিণত হয়েছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্রের বার্ন ইউনিটে পোড়া মানুষের আহাজারি যেন প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে উঠছে। পোড়া মানুষদের মর্মান্তিক দৃশ্য দেখে সম্প্রতি বার্ন ইউনিট পরিদর্শনে এসে কেঁদে ফেলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও।

দেশের একটি মহল মনে করে, এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে একটি কার্যকর সংলাপ অনুষ্ঠান জরুরী। তবে ইতোমধ্যেই সরকারের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে সহিংসতার পথ পরিহার না করলে বিএনপির সঙ্গে কোন ধরনের আলোচনা হবে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে দৃঢ়তার সঙ্গেই বলেছেন, এদের সঙ্গে সংলাপ হবে না। যারা আগুনে পুড়িয়ে মানুষ মারছে, তাদের সঙ্গে সংলাপে বসতে যাওয়া তো সন্ত্রাসের কাছে নতিস্বীকার করা। জনমানুষের ম্যান্ডেট নিয়ে সরকার পরিচালনা করছেন, তিনি কেন অনৈতিক দাবির কাছে নতিস্বীকার করবেন। স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে সন্ত্রাসের পথ পরিহার করার দাবিটি। ভাড়াটে দিয়ে সন্ত্রাস-নাশকতা করছে বিএনপি, এ অভিযোগ এখন সর্বজনস্বীকৃত। কাজেই বিএনপিকে আগে কৃতকর্মের জন্য জনগণের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে। সন্ত্রাস-নাশকতার পথ থেকে সরে আসতে হবে। এর পর বোধহয় সরকার ভেবে দেখতে পারে সংলাপ হবে কিনা।

অন্যদিকে সরকারের পতন না হওয়া পর্যন্ত অবরোধ-হরতাল কর্মসূচী চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে এই সহিংস নাশকতা থেকে পরিত্রাণের পথ কি? অনেকেই মনে করছেন, সেই সংলাপই হতে পারে সমঝোতার প্রকৃষ্ট উপায়। কিন্তু প্রশ্ন উঠতে পারে, কী বিষয়ে সংলাপ হবে? আন্দোলনকারী পক্ষ নিজেদের অবস্থানে অনড়, একটুও ছাড় দেয়ার পক্ষপাতী নয়, তখন সংলাপের সুফল আশা করা বাতুলতা। আর এটাও তো সত্যি যে, সহিংস আন্দোলন আর সংলাপ এক সঙ্গে কিছুতেই চলতে পারে না। সম্প্রতি এক গোলটেবিল বৈঠকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন চেয়ারম্যান মিজানুর রহমানও বলেছেন, চলমান সঙ্কট থেকে উত্তরণে সবার আগে সহিংসতার জন্য দায়ীদের দোষ স্বীকার করা জরুরী। এটিই সংলাপের পথ উন্মুক্ত করবে। বর্তমান পরিস্থিতিকে দুটি অধ্যায়ে ভাগ করে তিনি বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সবার আগে একটি প্রশ্ন চলে আসে। তা হলো বাংলাদেশ কোন্্ পথে যাবে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পথে নাকি পঁচাত্তর পরবর্তী বাংলাদেশের পথে। আমাদের দেশের রাজনীতিতে যখন কোন সঙ্কট দেখা দেয়, তখন একদল মানুষকে আমরা দেখি বাহ্যত ন্যায়ের কথা বলে এগিয়ে আসতে। দেশে তাদের একটা নাম আছে, ‘সুশীল’। এই ‘সুশীল’গণ কোন মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে এগিয়ে আসেন তা একটু খোলসা করে বুঝে নেয়া দরকার। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, রাজনীতি খারাপ, রাজনীতিবিদ মানেই খারাপ, এই রকম একটা ধারণা সৃষ্টি করার চেষ্টা সুশীলরা বরাবর করছে। সুশীলরা নিজেদের অরাজনৈতিক পরিচয় তুলে ধরতে আগ্রহী। বৃহত্তর অর্থে সেটা কী দাঁড়াচ্ছে, রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কেউ যুক্ত থাকলে তিনি গ্রহণযোগ্য নন। তাই তো? প্রশ্ন হচ্ছে রাজনীতির প্রতি ‘সুশীল’দের এই বিরূপ অপপ্রচার কেন? আমরা তো আমাদের জীবন থেকে রাজনীতিকে বাদ দিতে পারি না। একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই যুদ্ধ করে মানুষ বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছে। অথচ সুশীলগণ রাজনীতিকে মানুষের কাছে ভুলভাবে ব্যাখ্যা দিচ্ছে। এখন কেউ যদি বলে রাজনীতির বিরুদ্ধে এটি সুশীলদের একটি ষড়যন্ত্র, তাহলে কি ভুল বলা হবে?

কিন্তু তারপরও বলতে হয়, এ ধরনের নাশকতা যে দেশের জন্য কোন মঙ্গল বয়ে আনতে পারে না। গণতন্ত্র, শান্তি ও সুশাসন অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের ভিত্তি। কিন্তু রাজনৈতিক কর্মসূচীর নামে জামায়াত-বিএনপি সৃষ্ট বর্তমান অনৈতিক পরিস্থিতি দেশের শান্তি ও সুশাসনকে বাধাগ্রস্ত করছে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নকে বিঘিœত করছে। দেখা দিচ্ছে বিশৃঙ্খলা। রাজনৈতিকভাবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট কোন ভাল উদাহরণ তৈরি করছে না। আউটসোর্সিং করে সন্ত্রাস করা যায় কিন্তু আন্দোলন যে গড়ে তোলা যায় না দেড় মাসের ঘটনাপ্রবাহে বিএনপি নেতৃত্বের কি এই বোধোদয় হয়েছে?

লেখক : অস্ট্রিয়া প্রবাসী লেখক ও সাংবাদিক

nayrul@gmx.at

প্রকাশিত : ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

১৯/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: