আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বোমাবাজি ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন ॥ বন্ধ হচ্ছে ৯৮ হাজার ২৮৩ মোবাইল ব্যাংক এ্যাকা

প্রকাশিত : ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • এ বিষয়ে বিটিআরসি, মোবাইল অপারেটর ও বাণিজ্যিক ব্যাংককে নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক

রহিম শেখ ॥ মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বোমাবাজি ও সন্ত্রাসে অর্থায়নসহ নানা অভিযোগে বন্ধ করা হচ্ছে ৯৮ হাজার ২৮৩ মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব। অর্ধেকের বেশি এমন হিসাব রয়েছে, যেগুলোর পূর্ণাঙ্গ তথ্য বা কেওয়াইসি নেই। এর মধ্যে ৭০ হাজারের বেশি হিসাব রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান বিকাশের। ডাচ বাংলা মোবাইল ব্যাংকিং ও ইসলামী ব্যাংকের এম ক্যাশের হিসাব রয়েছে ২৮ হাজার। ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সন্দেহজনক এসব হিসাব চিহ্নিত করে তা বন্ধ করতে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি), মোবাইল অপারেটর ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে চিঠি দিয়েছে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর সন্দেহজনক গ্রাহকদের গত ছয় মাসের লেনদেন তদন্ত করে ব্যাংকগুলোকে জানাতে বলেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

সম্প্রতিক সারাদেশে বোমাবাজি, নাশকতা ও জঙ্গী অর্থায়নে ব্যাংকের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে। রাজধানী ঢাকা বা দেশের এক স্থান থেকে অন্যস্থানে টাকা পাঠিয়ে ভাড়াটিয়া ঠিক করে তাদের মাধ্যমে বিদ্যমান পেট্রোলবোমা সন্ত্রাস চালানো হচ্ছে। আর এ সব সন্ত্রাসী কার্যকলাপ চালানো হচ্ছে মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবের মাধ্যমে। যেসব এলাকায় নাশকতা চালানো হচ্ছে সেসব এলাকায় মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেন খুব বেশি বেড়েছে। সম্প্রতি বিভিন্ন দেশ থেকে ২৩ মোবাইল ব্যাংকিং এ্যাকাউন্টের মাধ্যমে মুক্তিপণ বাবদ ২১ লাখ ৫২ হাজার টাকার লেনদেনের প্রমাণ পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অবৈধ লেনদেন ও বিদেশ থেকে হু-ি ব্যবসায়ীদের মাধ্যমেও নিয়মিত টাকা আসার অভিযোগ উঠেছে মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতোমধ্যে সন্দেহজনক ৯৮ হাজার ২৮৩টি মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব চিহ্নিত করে তা বন্ধ করতে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি), মোবাইল অপারেটর ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে চিঠি দিয়েছে। এর মধ্যে ৭০ হাজারের বেশি হিসাব রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিকাশের। ডাচ বাংলা মোবাইল ব্যাংকিং ও ইসলামী ব্যাংকের এম ক্যাশের হিসাব রয়েছে ২৮ হাজার। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের তথ্য মতে, অর্ধেকের বেশি হিসাব রয়েছে, যেগুলোর প্রেরক বা প্রাপকের কোন তথ্য বা কেওয়াইসি সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা কোম্পানির কাছে নেই। এদিকে মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবে লেনদেনের পরিমাণ, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্তৃপক্ষের রাজনৈতিক অবস্থান ইত্যাদি বিবেচনায় নিয়ে কঠোর ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

জানা গেছে, মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবে টাকা পাঠাতে প্রেরক ও প্রাপকের কোন তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা কোম্পানির কাছে থাকে না। শুধু এজেন্টদের সংশ্লিষ্ট সিম কার্ডে টাকার পরিমাণ, প্রেরকের নাম বা প্রাপকের মোবাইল নম্বর- এ ধরনের তথ্য থাকে। এক্ষেত্রে কেউ ভুয়া তথ্য প্রেরণ করলেও ধরার কোন উপায় নেই। কেননা, মোবাইল অপারেটর কোম্পানির সংযোগসহ একটি সিম, দুই কপি ছবি ও ছবি সম্বলিত যে কোন ধরনের পরিচয়ের মাধ্যমে গ্রাহক পর্যায়ে হিসাব খোলা হচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে একাধিক সিম ও পরিচয়পত্রের মাধ্যমে একাধিক হিসাব খুলে অর্থ আত্মসাতের ঘটনাও ঘটেছে । এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে এজেন্টের এ্যাকাউন্ট হ্যাক করে, সিম রিপ্লেস করেও প্রতারণা হচ্ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশে ১১ কোটি মোবাইল সিম ব্যবহারকারীর মধ্যে ৯০ লাখ সিম যথাযথ নিবন্ধিত নয়। এতে বলা হয়, ভুয়া ছবি ও জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে এসব সিম রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর নীলক্ষেত, ফার্মগেটসহ বিভিন্ন স্থানে ভুয়া ছবি ব্যবহার করে ৩০Ñ৫০ টাকায় ভোটার আইডি কার্ড তৈরি করা হয়। আর সস্তায় সিম কিনে সহজেই মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব খুলছেন অনেকেই।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেম ডিপার্টমেন্টের একজন কর্মকর্তা এ প্রসঙ্গে জনকণ্ঠকে জানান, মোবাইল ব্যাংকিংয়ে ২০১৪ সাল শেষে গ্রাহক সংখ্যা আড়াই কোটি পেরিয়েছে। এর মধ্যে ভুয়া হিসাবের সংখ্যা খুব বেশি নয় বলে তিনি দাবি করেন। প্রাথমিক অবস্থায় সন্দেহজনক ১ লাখ মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৯৮ হাজার ২৮৩ হিসাব বন্ধ করতে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি), মোবাইল অপারেটর ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে চিঠি দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশিত কেওয়াইসি ফরম যথাযথভাবে পূরণ না করেও অনেকেই এজেন্ট হচ্ছেন। এটিও এক ধরনের প্রতারণা। গ্রাহকের পূর্ণাঙ্গ তথ্য বা কেওয়াইসি ছাড়া হিসাব স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হবে বলে তিনি জানান। জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মাহফুজুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, সন্ত্রাসে অর্থায়ন ও মানি লন্ডারিংয়ের বিষয়ে সোচ্চার রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ বিষয়ে ‘মানি লন্ডারিং এ্যান্ড টেররিস্ট ফাইন্যান্সিং রিস্ক এ্যাসেসমেন্ট গাইডলাইন্স ফর ব্যাংকিং সেক্টর’ শীর্ষক একটি নীতিমালাও জারি করা হয়েছে। তিনি বলেন, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে মুক্তিপণ আদায়, জঙ্গী অর্থায়ন কিংবা হু-ি ব্যবসার প্রমাণ পাওয়া গেলে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে। এক্ষেত্রে কোন ছাড় দেয়া হবে না বলে তিনি জানান।

সম্প্রতি সরকারী ও বেসরকারী ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জরুরী এক বৈঠকেও মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব ব্যবহারে ব্যাংক ও এজেন্টগুলোকে সতর্ক থাকতে নির্দেশনা দেয়া হয়। সারাদেশে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বোমাবাজি ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন বৃদ্ধি পাওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে এ বিষয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কোন এ্যাকাউন্টে অস্বাভাবিক অর্থ লেনদেন হলে সন্দেহজনক তালিকা খতিয়ে দেখা হবে। বৈঠকে বলা হয়, মোবাইল ব্যাংকে হিসাব খোলার ক্ষেত্রে অবশ্যই গ্রাহকের পরিচয় জানতে হবে বা তার কেওয়াইসি পরিপূর্ণভাবে রাখতে হবে। কেওয়াইসি ছাড়া কোন লেনদেন করা যাবে না। বৈঠকে ব্যাংকের এমডিদের সতর্ক করে দিয়ে বলা হয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে মাঝে মধ্যে এসব বিষয় পরিদর্শন করে দেখা হবে। কোন অনিয়ম পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

গত ৫ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অর্থ মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে এসে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকে ব্যাংকের মাধ্যমে যাতে কোন জঙ্গী বা সন্ত্রাসী কর্মকা-ের অর্থ লেনদেন হতে না পারে সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য ব্যাংকগুলোর এমডিদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়ার কথা বলেছিলেন। তার আলোকে অর্থ মন্ত্রণালয় ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের সঙ্গে আলাদাভাবে বৈঠক করে এসব নির্দেশনা দিয়েছে। এর আগে তফসিলি ব্যাংক ও মোবাইল হিসাব পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানকে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা সম্বলিত একটি চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে বলা হয়েছে, সম্প্রতি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সন্ত্রাসে অর্থায়ন বৃদ্ধি পাওয়ার বিভিন্ন অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। বিভিন্ন সময় মোবাইল ব্যাংকিং এ্যাকাউন্টে অস্বাভাবিক অর্থ লেনদেনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। যেসব এ্যাকাউন্টে অস্বাভাবিক অর্থ লেনদেন হয় তাদের এ্যাকাউন্ট সন্দেহজনক তালিকায় নিয়ে যাচাই করে দেখতে হবে। নতুন মোবাইল এ্যাকাউন্ট খুলতে গ্রাহকের যাবতীয় তথ্য নিশ্চিত হতে সব ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে। এছাড়া ব্যাংকগুলো নিজস্ব কাঠামোর মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ অর্থ লেনদেন ঠেকাতে আগামী ৩১ মার্চের মধ্যে মানি লন্ডারিং ইউনিট গঠন করতে হবে। এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গবর্নর আবু হেনা মোহাঃ রাজী হাসান জনকণ্ঠকে বলেন, কয়েকটি সংস্থা থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে তথ্য এসেছে, সহিংসতায় অর্থায়ন হচ্ছে ব্যাংকের মাধ্যমে। যেসব এলাকায় বেশি নাশকতা হচ্ছে সেসব এলাকার ৬ মাসের লেনদেনের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এছাড়া নিবন্ধনহীন মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবের মাধ্যমে যাতে অর্থ লেনদেন না হয় এজন্য ব্যাংকগুলোকে কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, জঙ্গী অর্থায়ন বন্ধে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেও কঠোরভাবে ব্যাংকের লেনদেন পর্যবেক্ষণ করবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে ২৮ তফসিলি বাণিজ্যিক ব্যাংক মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ে ২০১৪ সাল শেষে গ্রাহক সংখ্যা আড়াই কোটি পেরিয়েছে। ২০১০ সালে চালু হওয়া মোবাইল ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক দ্রুতই বাড়ছে। এর আগে ২০১৩ সালের নবেম্বরে এর গ্রাহক সংখ্যা এক কোটি অতিক্রম করে। আর গত বছরের মার্চে গ্রাহক দেড় কোটি ছাড়িয়েছিল। গত সেপ্টেম্বরে তা দুই কোটি ছাড়ানোর পর ডিসেম্বরে আরও বেড়ে ২ কোটি ৫২ লাখ হয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বর মাসে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে প্রায় ২৫ লাখ লেনদেনের বিপরীতে ১০ হাজার ৪৮৩ কোটি টাকা উত্তোলন ও জমা হয়। এতে দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৪৯ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য মতে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে প্রতিদিন দেশে লেনদেন হচ্ছে ৩শ’ ৫০ কোটি টাকার মতো। যার মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান বিকাশের গ্রাহক সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।

প্রকাশিত : ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

১৯/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



ব্রেকিং নিউজ: