আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

দিল্লী হবে দুর্নীতিমুক্ত! কেজরিওয়ালের স্বপ্ন

প্রকাশিত : ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • আতাউর রহমান রাইহান

অরবিন্দ কেজরিওয়াল মুখ্যমন্ত্রীর শপথ নিয়ে শনিবারের বারবেলায় রামলীলা ময়দানে উপস্থিত জনসমুদ্রকে প্রতিশ্রুতি দিলেন, তিনি ভিআইপি সংস্কৃতি বন্ধ করতে চান। পাঁচ বছরের মধ্যে দিল্লীকে ভারতের প্রথম ঘুষমুক্ত শহর করে তোলা হবে।

দিল্লীর উপরাজ্যপাল নাজিব জং কেজরিওয়াল ছাড়াও শপথবাক্য পাঠ করান আরও ছয় পূর্ণ মন্ত্রীকে। তাঁরা হলেন মনিশ সিসোদিয়া, আসিম আহমেদ খান, গোপাল রাই, জিতেন্দ্র সিং টোমার, সত্যেন্দ্র জৈন ও সন্দীপ কুমার। শপথ নেয়ার পর ভাষণ শেষ করে কেজরিওয়াল সদলে যান রাজঘাটে জাতির জনকের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে। সেখান থেকেই সোজা সচিবালয়। শপথ নেয়ার দিনসহ ২৪ ঘণ্টাই তিনি ও তাঁর মন্ত্রীরা কাজ করবেন, ঘোষণা দিয়েছেন এএপির প্রধান।

ঘুষ-দুর্নীতিমুক্ত দিল্লী গড়তে দুর্নীতিবাজদের কিভাবে পাকড়াও করতে হবে, জনতাকে তাও বুঝিয়ে দিলেন কেজরিওয়াল। বললেন, সরকারী কর্মীরা ঘুষ চাইলে রাজি হয়ে যান। তারপর পকেটে রাখা মোবাইল ফোনটা অন করে কথাবার্তা রেকর্ড করুন এবং সরকারের কাছে পাঠিয়ে দিন। সরকার ঠিক ব্যবস্থা নেবে।

নতুন মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, তিনি নিজের হাতে কোন মন্ত্রণালয় রাখেননি, যাতে শুধু সরকারী কাজে আবদ্ধ না থেকে দলকে আরও বেশি সময় দিতে পারেন। অর্থ, রাজস্ব, শিক্ষা, যোজনার ভার দেয়া হয়েছে উপমুখ্যমন্ত্রী মনিশ সিসোদিয়ার হাতে।

দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন করে রাজনীতির শীর্ষে উঠে আসা কেজরিওয়াল ও তাঁর আম আদমি পার্টির (এএপি) কাছে দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন অবশ্যই একটা স্বপ্ন। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়াও তাঁর প্রাথমিক কাজ। সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে জমায়েতকে উদ্দেশ করে কেজরিওয়াল বলেন, প্রথমবার আমাদের মধ্যে এ নিয়ে একটা ‘রোমান্টিসিজম’ ছিল। কিন্তু এবার আমরা আরও আস্থাবান। দুর্নীতিমুক্ত দিল্লী গড়া সম্ভব বলেই আমরা মনে করি।

বিপুল জয়টা যে তাঁদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ এবং সেই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে না পারলে লোকে ক্ষমা করবে না, কেজরিওয়াল তা প্রথমেই উপলব্ধি করেছিলেন। সেই কারণেই তিনি ফল প্রকাশের দিনই অনুশাসন মানা ও অহঙ্কার না করার তাগিদ দিয়েছিলেন। কেজরিওয়াল বলেন, কংগ্রেস অহঙ্কারী হয়েছিল বলেই মানুষ তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে। লোকসভায় বিপুল জয়ের পর দিল্লীতে বিজেপিও অহঙ্কারী হয়ে পড়ে। তার ফল তারা পেয়েছে। আমরা যেন অহঙ্কারী না হই।

আগেরবারের কথা উল্লেখ করে কেজরিওয়াল বলেন, ২৮টি আসন পেয়ে ভেবেছিলাম সারাদেশই জিতে নেব। সে জন্য চার শ’র বেশি লোকসভা আসনে লড়াই করি। এবং হারি। অহঙ্কারের শাস্তি ঈশ্বর দিয়েছেন। এবার পাঁচ বছর দিল্লীতেই থেকে সাধারণ মানুষের সেবা করব।

সংঘাতের রাজনীতি থেকে সরে সহযোগিতার রাজনীতিকে এএপি আঁকড়ে ধরেছে। প্রসঙ্গটা তুলে কেজরিওয়াল বলেন, কিরণ বেদীকে আমি শ্রদ্ধা করি। পুলিশ ও প্রশাসনে তাঁর অভিজ্ঞতা দীর্ঘদিনের। অজয় মাকেনেরও বিস্তর অভিজ্ঞতা। এঁদের সঙ্গে আলোচনা করেই প্রশাসন চালাব। প্রথাগত রাজনৈতিক সঙ্কীর্ণতা থেকে বেরিয়ে নতুন ধরনের রাজনীতির পথে চলারই ইঙ্গিত দিলেন।

শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং, কেন্দ্রীয় নগর উন্নয়নমন্ত্রী ভেঙ্কাইয়া নাইডুকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও তাঁরা কেউই অন্য কাজ থাকায় হাজির হননি।

এনডিটিভি অনলাইনের প্রতিবেদনে জানানো হয়, গত চার দিন ধরে জ্বরে ভুগছেন কেজরিওয়াল। তিনি বেশ অসুস্থ। শপথ গ্রহণের আনুষ্ঠানিকতা শেষে দায়িত্ব গ্রহণ করতে দিল্লীর সচিবালয়ে যান কেজরিওয়াল।

এদিকে ভোটের আগে প্রচারে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তুলে ধরেছিলেন আর্থিক সংস্কার আর উন্নয়নের কথা। অন্য দিকে বিদ্যুত আর পানির বিলে ব্যাপক ছাড়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে দিল্লীবাসীর স্বার্থ দেখার আশ্বাস দিয়ে একের পর এক জনসভা করে গিয়েছেন কেজরিওয়াল। জিততে পারেনি মোদি। একেবারে ভরাডুবি বললেও কম বলা হবে। হারের কারণ নিয়ে বিজেপিতে যখন চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ, ঠিক তখনই কেজরিওয়ালের জনমোহিনী প্রতিশ্রুতিগুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

দিল্লীতে অপ্রচলিত বিদ্যুত সংক্রান্ত একটি অনুষ্ঠানে তিনি কেজরিওয়ালকে কটাক্ষ করে বলেন, বিদ্যুতের জন্য অন্য রাজ্যের ওপর যাদের নির্ভর করতে হয়, সেসব দল কিভাবে দাম ছাড়ের প্রতিশ্রুতি দেয়, বুঝতে পারি না! মোদির মন্তব্য, ‘যখনই ভোট হয়, রাজনৈতিক দলগুলো বিনা পয়সায় বিদ্যুত দেয়ার কথা বলতে থাকে। এসব নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।

শপথ গ্রহণের পরের দিনেই বিক্ষোভের মুখে পড়লেন দিল্লীর মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। শাহদরা অঞ্চলের ছোটনগর এলাকায় বস্তি উচ্ছেদ নিয়ে রবিবার কেজরিওয়ালের বাড়ির বাইরে বিক্ষোভ দেখান ওই বস্তিরই কিছু মানুষ। অভিযোগ, যে সময় রামলীলা ময়দানে নতুন সরকার শপথ নিচ্ছিল ঠিক সেই সময়ই বস্তি উচ্ছেদ করছিল পুলিশ। তাঁরা আরও বলেছেন, পুলিশ শুধু ঘরদোরই ভাঙ্গেনি তারা গালিগালাজও করেছে। এমনকি পুলিশের বিরুদ্ধে শিশুদের ওপর অত্যাচারের অভিযোগও উঠেছে।

বিজেপির পরাজয়ের নেপথ্যে

কিরণ বেদীর আমদানিই যে বিজেপির বিপর্যয়ের প্রধান কারণ, সেটাই এখনকার চরম সত্য। রাজ্যস্তরের নেতাদের প্রতি আস্থা না রেখে রাজনৈতিক দিক থেকে অজ্ঞাতকুলশীল কিরণকে টেনে আনা ছিল মারাত্মক ভুল। ফল প্রকাশের আগেই হয়ত বিজেপির তা বোধগম্য হয়েছিল। সেদিক থেকে দেখতে গেলে এই বিপর্যয় রাজ্য বিজেপি নেতাদের নিঃশব্দ বিদ্রোহেরই ফল। ৪০ বছর ধরে যাঁরা রাজনীতির মাটি কামড়ে রয়েছেন, তাঁরা কেনই বা এক অরাজনৈতিক অজ্ঞাতকুলশীলকে স্বেচ্ছায় নিজেদের আসন ছেড়ে দেবেন। বিশেষত, তিনি যখন কোন আন্দোলনের মধ্য দিয়েই আসেননি।

পাশাপাশি, ভুল স্বীকার ও ক্ষমা প্রার্থনার মধ্য দিয়ে কেজরিওয়াল আরও একবার সুযোগ পেতে হাতজোড় করে নেমে পড়েছিলেন রাজধানীর আঙিনায়। এক বছর আগের ভোটের প্রচারে তিনি প্রতিপক্ষকে বিঁধেছিলেন যে ঢঙে, অর্থাৎ কংগ্রেস-বিজেপি দুর্নীতিগ্রস্ত। এবারের ভোট-প্রচারে সেই তিনি অনেক বেশি শালীন। কেজরিওয়ালরা এটা বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী। তিনি দিল্লীর মুখ্যমন্ত্রী হবেন না। দিল্লীবাসীর বেছে নিতে হবে অচেনা কিরণ বেদী, অশক্ত অজয় মাকেন অথবা চেনা অরবিন্দ কেজরিওয়ালদের মধ্যে একজনকে। দিল্লীবাসী এবার আর ভুল করেননি। তাঁরা কেজরিওয়ালকে বেছে নিয়েছেন।

যে ৬ শতাংশ ভোট কংগ্রেসের কমেছে, তা জমা পড়েছে আম আদমির ঝুলিতে। দিল্লীতে পিরামিডের নিচের তলার বাসিন্দাদের মধ্যে কংগ্রেসের একটা জায়গা এক বছর আগেও ছিল।

সেই ঝুপড়িবাসী, অটো ও রিকশাচালক, দলিত, ভিন রাজ্যের মানুষজন, মুসলমান, তফসিল, শিল্প-শ্রমিকরা তাঁদের কোল পেতে দিয়েছেন কেজরিওয়ালকে। রাজধানীর গ্রামীণ এলাকাগুলোতেও তিনি থাবা বসিয়েছেন জমি অধিগ্রহণ অর্ডিন্যান্সের দৌলতে। কেজরিওয়াল বোঝাতে পেরেছেন, এটা এক অসম লড়াই। কিন্তু সেই লড়াইয়ে তাঁদের জয়ই প্রথাগত রাজনীতির পরিবর্তন ঘটাতে পারে। মানুষ তাঁর প্রতি আস্থা রেখেছে।

প্রকাশিত : ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

১৮/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: