কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

কবীর চৌধুরীকে সালাম

প্রকাশিত : ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর

কবীর চৌধুরী যা-কিছু ভেবেছেন, যা-কিছু লিখেছেন, সবই সঙ্কীর্ণ চিন্তার বিরোধী। চিন্তা সঙ্কীর্ণ হয় যখন অন্যের ভাবনার স্পেস, চলাফেরার স্পেস রুদ্ধ করে দেয়া হয়। এই অবস্থাটা রেজিমেন্টেসনের। কবীর চৌধুরী রেজিমেন্টেসনের বিপক্ষে সব সময় অবস্থান নিয়েছেন। সাংস্কৃতিক স্পেস নষ্ট হলে মানুষের পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব হয় না। ইতিহাসে কখনো কখনো এই অবস্থা তৈরি হয়। আমাদের দেশে এই অবস্থা কি তৈরি হয়নি? হয়েছে তো। ইংরেজ শাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে এই অবস্থার মুখোমুখি হয়েছি আমরা। পাকিস্তান শাসনের সমগ্র পর্যায়ে এই অবস্থার মুখোমুখি হয়েছি আমরা। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর, সামরিক শাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে এই অবস্থার মুখোমুখি হয়েছি আমরা। এই অবস্থাটা হচ্ছে মুক্তির জন্য লড়াই করা, জ্ঞানের জন্য লড়াই করা, মানুষের সঙ্গে মানুষের প্রতিবন্ধকতা ধ্বংস করার জন্য লড়াই করা, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করা, ব্যক্তি ও সোশ্যাল লিবার্টির জন্য লড়াই করাÑ এ সবকিছুই কবীর চৌধুরীর চিন্তার মধ্যে সক্রিয় ছিল।

যুক্তিশীল মানুষ মুক্ত, যদি তার আচরণ যান্ত্রিক না হয়। কবীর চৌধুরী, সর্ব অর্থে মুক্ত মানুষ ছিলেন। যে-মানুষ মুক্ত নয় সে-মানুষকে সম্মোহিত করে রাখা হয়। মৌলবাদীরা তেমন ধরনের মানুষ, তাদের সম্মোহিত করে রাখা হয়েছে। এই সম্মোহনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন কবীর চৌধুরী। যৌক্তিক ব্যক্তি তিনি খুঁজেছেন, কারণ, যৌক্তিক ব্যক্তির পক্ষে স্বাধীন হওয়া সম্ভব। বাংলাদেশের মানুষ যদি যুক্তিশীল হয়, তাহলে বাংলাদেশের অধিকাংশ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। এই সম্ভাবনা নষ্ট করে চলেছে মৌলবাদীরা।

প্রধান মৌলবাদী দল হচ্ছে জামায়াতে ইসলামী (বিএনপি)। জামায়াতে ইসলামী ও কলোনিয়ালিজমের মধ্যে গভীর সম্পর্ক আছে। জামায়াতীদের কাছে (বিএনপি) বাঙালী মুসলমানরা ভিকটিম, অথচ এই ভিকটিমরা বাংলাদেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাঙালী মুসলমানদের নির্যাতন করা জামায়াতীদের (বিএনপির) রাজনীতি। কবীর চৌধুরী নির্মোহভাবে বুঝেছেন জামায়াতীদের (বিএনপির) জীবন, সংস্কৃতি ও রাজনীতি বাঙালী মুসলমানদের জীবন, সংস্কৃতি ও রাজনীতি থেকে আলাদা। এই আলাদা হওয়ার কারণ জামায়াতীদের জীবন, সংস্কৃতি ও রাজনীতি কলোনিয়ালিজম থেকে বেড়ে উঠেছে। বাঙালীরা পাকিস্তানী কলোনিয়ালিজমে হস্তক্ষেপ করে বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছে, বিপরীতে জামায়াতীরা (বিএনপি) পাকিস্তানী কলোনিয়ালিজমকে সমর্থন করেছে এবং পাকিস্তানী কলোনিয়ালিজমের পক্ষে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও কাজ করে চলেছে। এই কাজের অর্থ ষড়যন্ত্র করা।

কবীর চৌধুরী, এখানেই নৈতিক বোধ ও ব্যক্তিক দায়িত্ববোধের কথা এনেছেন। জামায়াতীরা বাঙালীদের জায়গায় একটি শূন্যতা তৈরি করার চেষ্টা করেছে, শূন্যতা তৈরি হয়েছে ঐতিহ্যিক ধর্মের পতনের পর, এই শূন্যতাকে ভরাতে চেয়েছেন কবীর চৌধুরী সেক্যুলার মতাদর্শ দিয়ে। জামায়াতীরা ধর্মকে রক্তপিপাসু করার দরুন ধর্ম ও রাষ্ট্র এক হয়েছে, এখান থেকে সত্য খুঁজে পাওয়া যায় না, ধর্মের সত্য নষ্ট করেছে পাকিস্তানীরা এবং জামায়াতীরা, এই নষ্টামির কোন প্রতিবিধান নেই। সেক্ষেত্রে কবীর চৌধুরীর মতো ব্যক্তিরা সেক্যুলারিজমের মাধ্যমে এনেছেন সহনশীলতা, বোধগম্যতা ও সুস্থতা, ব্যক্তিদের মধ্যে ও জনসমষ্টির মধ্যে, সেক্যুলারিজমের সত্য এক ধরনের পরিণত বোধ তৈরি করবে, আজ এবং আগামীকালের মধ্যে, আমাদের মধ্যে তৈরি হবে এক ধরনের সতর্ক আশাবাদ, এই আশাবাদ, কম কিংবা বেশি, সর্বত্র সভ্যতাকে আকার দেবে।

এ ক্ষেত্রেই, কবীর চৌধুরী আমাদের দিয়েছেন মানুষের ইতিহাস পাঠ করার, মানুষের স্বভাব বোঝার, মানুষের মৌল প্রয়োজন জানার ম্যাচিওর বোধ। এ সব কিছুই আবার সময়ের মধ্য দিয়ে গভীরভাবে বদলে যায়। এই বদলে যাওয়ার ধরন ও স্বরূপ কবীর চৌধুরী বোঝার চেষ্টা করেছেন। পৃথিবীর সেই অংশটা তিনি বুঝতে চেয়েছেন যেখানে মানুষ বুদ্ধির দিক থেকে ধর্মকে বিশ্বাস করে সত্যকে বুঝতে চায়। এই বুঝতে চাওয়ার মধ্যে নিহিত মানুষের ভাবনা, অনুভূতি, আকাক্সক্ষা, কাজ এবং যন্ত্রণাÑ মানুষের সম্পূর্ণ অংশ। ইতিহাসের এই জায়গাটার মধ্যে কবীর চৌধুরী অংশগ্রহণ করেছেন। সেজন্য, এদিক থেকে কবীর চৌধুরী আমাদের সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি।

মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের আইডিয়া কি হওয়া উচিত, কি হওয়া দরকার, কিভাবে এসব সম্পর্ক বদলে যায় কোন এক চূড়ান্ত মতাদর্শ কিংবা ভিশনের নামে, কবীর চৌধুরী এসব ভাবতে চেয়েছেন। এসব আইডিয়া হচ্ছে এথিকসের অন্তঃসার। এথিক্যাল চিন্তা হচ্ছে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের বিধিবদ্ধ পরীক্ষা-নিরীক্ষা- এসব বিশ্বাসের সঙ্গে জীবন কিভাবে কাটানো যায়, নর ও নারীর সম্পর্ক কিভাবে নির্ধারণ করা যায়, রাষ্ট্র ও সমাজের সম্পর্ক কিভাবে সমতাসম্পন্ন করা যায়Ñ এসব মৌলিক প্রশ্নের যুক্তিশীল জবাব মৌলবাদ ও জঙ্গীবাদের মধ্যে নেই। সেজন্য কবীর চৌধুরী মৌলবাদ ও জঙ্গীবাদ সম্বন্ধে প্রশ্ন তুলেছেন, ভেবেছেন মৌলবাদ ও জঙ্গীবাদ জীবনের মৌল প্রশ্নগুলোর জবাব দিতে সক্ষম নয়। মানবিক ইতিহাস কবীর চৌধুরীর অবস্থানকে বিপুলভাবে সমর্থন করেছে। সেজন্য তাঁকে আমাদের সময়ের ও দেশের একজন অগ্রণী চিন্তাবিদ হিসাবে মান্য করা জরুরী হয়ে পড়েছে।

তাঁর অন্বেষার বিষয় হচ্ছে পৃথিবী সম্বন্ধে অনিঃশেষ বহুত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গি পর্যালোচনা করা। মানুষ সম্বন্ধে এবং মানুষের অবস্থা সম্বন্ধে এক রৈখিক ভাবনা করার তিনি বিরোধী, মৌলবাদীরা যা করে থাকে। তিনি মৌলবাদীদের ও জঙ্গীবাদীদের এক রৈখিক দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, মানুষী অবস্থার স্থিতিশীল ও বিশাল ভিশনের দিকে এককভাবে ও বহুজনের সঙ্গে অগ্রসর হয়েছেন। এখানেই তাঁর অঙ্গীকার।

মৌলবাদ ও জঙ্গীবাদ মানুষের শত্রু। এই শত্রুর স্বরূপ বড়ো জটিল। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ও বিভিন্ন অঞ্চলে মৌলবাদ ও জঙ্গীবাদ হলোকাস্ট তৈরি করে চলেছে, সাধারণ মানুষকে ভিকটিম করে চলেছে। তাঁর এই সাধারণ মানুষ কারা? যারা সামান্য রোজগেরে, ঘরসংসার করে সন্তানসন্তুতির জন্য মৃত্যুর পূর্বে সামান্য বিত্ত রেখে যেতে চায়- তাদেরকে বেঁচে থাকার ব্রত থেকে সরিয়ে এনে মৌলবাদের মধ্যে জঙ্গীবাদের মধ্যে পরস্পরের মধ্যে হিন্দু ও মুসলমান, খ্রিস্টান ও ইহুদি ধারণা ঢুকিয়ে দিয়ে তাদের হাতে তলোয়ার তুলে দিয়েছে। মানুষকে এবস্যুলেট মুসলমান করা, এবস্যুলেট হিন্দু করা, এবস্যুলেট খ্রিস্টান করা, এবস্যুলেট বৌদ্ধ করা, এবস্যুলেট ইহুদি করা মৌলবাদের জঙ্গীবাদের লক্ষ্য। এর ফলে নষ্ট হয় মানবিকতা, মানুষের অধিকার, মানুষের মুক্তির জন্য লড়াই করার কমনফ্রন্ট। মানুষ তখন লড়াই করে মানুষের বিরুদ্ধে। এই লড়াই পাপ। কবীর চৌধুরী এই উপলব্ধি থেকে সেক্যুলারিজম গ্রহণ করেছেন।

মানুষ সেক্যুলার না হলে মানুষ মানুষের ওপর টর্চার করে। এই টর্চার মানবাধিকার বিরোধী। টর্চারের বিরুদ্ধে কবীর ভাই রুখে দাঁড়িয়েছেন। একা এবং সবাইকে নিয়ে লড়াই করেছেন কবীর ভাই, জয়ের দিকে অগ্রসর হয়েছেন একা এবং সবাইকে নিয়ে। জঙ্গীবাদ ও মৌলবাদ মানুষকে খুন করতে শেখায়Ñ এই শেখানো কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না। কবীর ভাই এই শিক্ষাই আমাদের দিয়েছেন।

লেখক : কথাসাহিত্যিক, গবেষক, শিক্ষাবিদ

প্রকাশিত : ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

১৮/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: