মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

একুশের মর্যাদা ও প্রজন্ম

প্রকাশিত : ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • সিরাজুল এহসান

সেতু, কমল আর রাজু ভিন্ন ভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লেও তাদের বন্ধুত্ব গভীর। এবারের শীতে দল বেঁধে কক্সবাজার বেড়াতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত তাদের আগেই ছিল। সমস্যা হয়ে দাঁড়াল রাজনৈতিক সহিংস কর্মসূচী। কিভাবে যাওয়া যায় সে সিদ্ধান্ত নেয়ার দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়া হয় সেতুর ওপর। অনেক ভেবেচিন্তে সেতু সিদ্ধান্ত নিল ঢাকা থেকে ওরা রেলপথে যাবে। অন্তত অনেকটাই হবে নিরাপদ। ফেসবুকের ইনবক্সে বাংলায় লিখে জানিয়ে দিল সেই সিদ্ধান্তের কথা। এদের মধ্যে কমল আবার বানানের ব্যাপারে বেশ খুঁতখুঁতে। কমলাপুর রেল স্টেশনের বানানে ধরল এক ভুল। স্টেশন বানান সেতু লিখেছে ষ্টেশন। ‘টু’-এর সঙ্গে ‘ষ’ হবে না, হবে ‘স’। এ নিয়ে বন্ধুত্বের দাবিতে বলল, দোস্ত বাংলা ভাষার বানান একটু শুদ্ধ করে লেখার চেষ্টা কর। ভাষার মাস চলছে, ভাষার ব্যাপারে একটু সতর্কতা দাবি করে।

ঘটনা-২

সোহেল অনেকক্ষণ ধরে মোবাইলে চেষ্টা করছে রাজিবকে ধরার জন্য। কিন্তু রাজিব ফোন ধরছে না। একটু বিরক্তই হলো। জরুরী আলাপ আছে। বিরক্ত হলেও মনটা প্রসন্ন হলো ওয়েলকাম টিউনটি শুনে। ফোন করলেই শুনতে পাচ্ছে সমবেত ও সুরেলা কণ্ঠে। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি...’ অমর এই গানটি। যতবার বাজছে ততবারই শুনতে ইচ্ছে করছে। গানটি শোনার লোভে আবার ফোন করে সোহেল। এ গানটা শুনলে ও যেন কেমন হয়ে যায়। দেহ ও মনে জাগে এক অন্যরকম শিহরণ। ভাষা শহীদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধায় নত হয়ে আসে মাথা।

ঘটনা-৩

সাবিরা গত বছর ফেব্রুয়ারি মাসে গ্রামের বাড়ি গিয়ে বেশ লজ্জায় পড়ে গিয়েছিল। একুশে ফেব্রুয়ারির রাতে চাচা ও চাচাত বোনদের সঙ্গে জেলা শহরের শহীদ মিনারে পুষ্পমাল্য যখন দিতে গেল তখন ব্যাপারটি ওর কাছে যেন কেমন লেগেছিল। কোন উৎসব মনে করেই ওদের সঙ্গে গিয়েছিল। কিন্তু পরে বুঝল এটা উৎসব নয় শোকের স্মৃতি এর সঙ্গে জড়িত। চাচাত বোন ওর ছোট, পড়ে ক্লাস নাইনে। সাবিরা পড়ে ইংলিশ মিডিয়ামে ক্লাস টেনে। ভাষা আন্দোলন, ভাষা শহীদ এসব ব্যাপার ওর কাছে তেমন স্পষ্ট নয়। লজ্জা পেয়ে পরে জেনেছে। এবারের একুশের বইমেলা থেকে কিনবে এ ব্যাপারে কিছু বই। এরই মধ্যে বাংলা লেখাপড়া, চর্চা সে বাড়িয়ে দিয়েছে। চেষ্টা করছে বাংলা ভাষায় প্রকাশিত বইয়ের মাধ্যমে আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে।

ঘটনা তিনটি আপাতদৃষ্টিতে কাল্পনিক হলেও আমাদের দেশে এমনটা ঘটছে অহরহ। এ সমাজেরই দৃষ্টান্ত তিনটি ঘটনা। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর পার হচ্ছে প্রায় ৭টি প্রজন্ম। এই সাত প্রজন্মের প্রতিটি ক্ষেত্রেই তথ্য-বিজ্ঞান-প্রযুক্তির প্রভাব পড়েছে গভীরভাবে। বিজ্ঞান-প্রযুক্তির দিন দিন সমৃদ্ধি ও পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ভাষা-সংস্কৃতির ওপরও প্রভাব পড়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। দ্রুত ঢুকে পড়ছে বাংলায় অনেক বিদেশী শব্দ। এটাকে নেতিবাচক হিসেবে না নেয়াই ভাল। এসব বিদেশী শব্দ অতীতে ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে। বাংলাভাষার শব্দ ভা-ার এগুলো সমৃদ্ধ করছে। সাধারণত এগুলো প্রবেশ করে তরুণ প্রজন্মের হাত ধরে। কেননা বিজ্ঞান-প্রযুক্তির কল্যাণে ভাষা প্রবেশের বাহন হিসেবে কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ট্যাব, মোবাইল, স্মার্টফোন বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে তরুণ প্রজন্মের মাধ্যমে। অনেকে বলে থাকেন ডিজিটাল প্রজন্ম। এই ডিজিটাল প্রজন্ম আমাদের সমাজ বাস্তবতায় একটি অগ্রগামী প্রজন্ম। মুহূর্তেই চলে আসে পৃথিবী তার হাতের মুঠোয়। বিভিন্ন দেশ, নানা সংস্কৃতি তার মনে প্রভাব বিস্তার করে। যে কারণে এ প্রজন্মকে নিয়ে অগ্রজ প্রজন্ম একটু দ্বিধা ও শঙ্কায় ভোগেন। এ দ্বিধা ও শঙ্কা অমূলক। কেননা এ প্রজন্মের কিছু কর্মকা- আশান্বিত করে। তবে তা সার্বিক চিত্র নয়।

এই কিছুদিন আগে দেখা গেল ঢাকার রাজপথে গলিতে একদল তরুণ বাংলা বানানের শুদ্ধি অভিযানে নেমেছেন। এই ভাষা আন্দোলনের মাসে এই চমৎকার কাজটি নিঃসন্দেহে অভিনন্দনযোগ্য। মাতৃভাষার প্রতি প্রেম, দায়বদ্ধতা প্রকাশ পেয়েছে। বার্তা জানিয়ে দিয়েছে তরুণদের। রক্তের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত এ মাতৃভাষার বানান অন্তত শুদ্ধ হোকÑ এমন ধারণা নিয়ে তাঁরা নেমেছেন মাঠে; এ এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। বাংলার লেখা রাস্তার সাইনবোর্ড, প্ল্যাকার্ড, ব্যানার ইত্যাদিতে ভুল বানান শুদ্ধ করার আপাতত চেষ্টার মাধ্যমে তারা দেখিয়ে দিয়েছেনÑ এ তরুণ প্রজন্ম শুধু মোবাইল বা কম্পিউটারে নেটওয়ার্কে মজে থাকেন না তাদের আছে দেশ-সমাজ-মাতৃভাষার প্রতি দায়বদ্ধতা।

মহান একুশের বইমেলা চলছে বাংলা একাডেমিতে। সেখানে তরুণদের প্রাধান্য। তরুণরা বাংলা বই কিনছেন। বাংলা বই পড়ছেন। তাঁরা বাংলায় লিখছেন এমনকি প্রকাশও করছেন। এখন ইন্টারনেটেও বইয়ের সংখ্যা কম নয়। ডাউনলোড করলেই বই হাতের মুঠোয়। ইন্টারনেটে বই পড়া যায় অনেকটা বিনামূল্যে। তারপরও দেখা যাচ্ছে বইমেলায় তারুণ্যের ভিড়। তারুণ্য লাইন ধরে কিনছে প্রিয় লেখকের বই এবং বেশিরভাগই বাংলায় লেখা।

আর ক’দিন পরই মহান ভাষা আন্দোলনের সেই রক্তস্নাত দিন একুশে ফেব্রুয়ারি। শহীদ দিবস আসার আগেই ভাষা আন্দোলনকে ঘিরে রচিত অমর কিছু গান, দেশপ্রেমের গান ওয়েলকাম টিউন হিসেবে যেমন ব্যবহার করছে তরুণরা আবার তেমনি ডাউনলোড করে শুনছে। কেউ কেউ আবার তা পাঠাচ্ছে বন্ধু কিংবা পরিজনের কাছে। এই যে লেনদেন তা তার আপন ইতিহাস-সংস্কৃতির প্রতি কি ভালবাসার নিদর্শন নয়? এটা কি তরুণ প্রজন্মের শুধুই ফ্যাশন? না তা মোটেও নয়। তারা মনে করতে চায়Ñ তাদের এক মহান অতীত আছে, আছে গর্বিত অর্জন। পৃথিবীর বুকে এক বিরল সম্মান ও অর্জনÑ ভাষার জন্য তাঁদের পূর্ব পুরুষ লড়াই করেছেন। করেছেন কারাবরণ। রাজপথে নিজের রক্ত দিয়ে রঞ্জিত করে সর্বোচ্চ ত্যাগের মহিমা দেখিয়েছেন। আজ এই দিনটিই সারা বিশ্বে পালিত হয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। সেই দিনটির নেপথ্য ইতিহাস এ জাতির গর্বিত অধ্যায়।

শুধু এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তরুণ প্রজন্ম বাংলা একাডেমির মেলায় নিজের পরিধেয় বস্ত্রে উৎকীর্ণ ভাষা আন্দোলন নিয়ে লেখা অমর পঙ্ক্তিমালার মাধ্যমে দেখাচ্ছে ভালবাসা। কেউবা মুখে শহীদ মিনারের ছবি এঁকে, বাংলা বর্ণমালা লিখে দেখাচ্ছে ও দেখাবে প্রিয় মাতৃভাষার প্রতি হৃদয়ের টান। এরই মধ্যে শহীদ মিনার, বাংলা বর্ণমালা ইত্যাদি মোবাইল, স্মার্টফোন বা কম্পিউটারের স্ক্রিনে প্রদর্শনের জন্য করেছেন ডাউনলোড। তারুণ্যের জন্য এ বাস্তবতা আশান্বিত করে বৈকি। তবে তারুণ্যের কাছে প্রত্যাশাÑ মহান একুশের চেতনা-সংস্কৃতি বহিরঙ্গে নয়; ধারণ করা জরুরী অন্তরে।

প্রকাশিত : ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

১৭/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: