কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

হাজার বছরের প্রাচীন বৌদ্ধ নগরী আবিষ্কার

প্রকাশিত : ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
হাজার বছরের প্রাচীন বৌদ্ধ নগরী আবিষ্কার
  • বিক্রমপুরের চিত্র পাল্টে যাচ্ছে

মীর নাসিরউদ্দিন উজ্জ্বল, নাটেশ্বর থেকে ফিরে ॥ মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ি উপজেলার নাটেশ্বরে চীন ও বাংলাদেশের যৌথ খননে পাঁচটি নির্মাণযুগসহ প্রায় এক হাজার বছরের প্রাচীন বৌদ্ধ নগরী আবিষ্কার হয়েছে। সোমবার দুপুরে খননস্থলে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ কথা জানিয়েছেন বিক্রমপুর অঞ্চলে প্রতœতাত্ত্বিক খনন ও গবেষণা প্রকল্পের পরিচালক নূহ-উল-আলম লেনিন। এতে প্রধান অতিথি পররাষ্ট্র উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. গওহর রিজভী এবং বিশেষ অতিথি চীনের রাষ্ট্রদূত মা মিংকিং, জেলা প্রশাসক মোঃ সাইফুল হাসান বাদল, পুলিশ সুপার বিপ্লব বিজয় তালুকদার, প্রকল্পটির গবেষণা পরিচালক ড. সুফি

মোস্তাফিজুর রহমান, চীনের হুনান প্রভেন্সিয়াল ইনস্টিটিউট অব কালচারাল রেলিকস এ্যান্ড আর্কেওলজির অধ্যাপক চাই হুয়াংবো এবং টঙ্গীবাড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার কাজী ওয়াহিদ আলোচনা করেন। এর আগে অতিথিবৃন্দ এবং গবেষকগণ খনন এলাকা ঘুরে দেখেন। এদিকে মাটির নিচের এই সভ্যতা দেখতে মানুষের ভিড় পড়ে গেছে। প্রতিনিয়ত নানা শ্রেণী-পেশার মানুষ এখন ভিড় করছে।

চীন ও বাংলাদেশের যৌথ প্রতœতাত্ত্বিক খননে গত প্রায় দু’মাসে অষ্টকোণাকৃতি স্তূপের বাহু, কোণ এবং অভ্যন্তরীণ অষ্টকোণাকৃতি স্তূপ, চ্যাম্বার ও ম-পসহ নানা কিছু বেরিয়ে এসেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতœতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. সুফি মোস্তাফিজুর রহমান জানান, প্রায় চার মিটার প্রশস্ত সীমানা প্রাচীর বিশিষ্ট দুই জোড়া চর্তুস্তূপের সন্ধান মিলেছে। যা ইতিহাসের একটি অভিনব সংযোজন। তিনি জানান, এখানে আদ্রতা রোদক হিসেবে ভিত্তি দেয়ালে ঝামা ইটের ব্যবহার, চারটি স্তূপের স্থানিক পরিমিতি, বর্গাকৃতি ভারসাম্য, দেয়ালের অপ্রচলিত নজিরবিহীন কাঠামো রয়েছে। যা বাংলাদেশের প্রাচীন উন্নত স্থাপত্যের ইতিহাসের একটি নতুন সংযোজন। ড. সুফি মোস্তাফিজুর রহমান জানান, প্রাচীন ইট নির্মিত দুটি পাকা রাস্তার আবিষ্কার তৎকালীন সড়ক নির্মাণ কৌশল, বসতি পরিকল্পনা ও বিন্যাসের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ইট নির্মিত ২ দশমিক ৭৫ মিটার প্রশস্ত আঁকাবাঁকা একটি বিশেষ দেয়াল দেখিয়ে তিনি বলেন, এটি বিস্ময়কর স্থাপত্যের আভাস দিচ্ছে। ৭ মিটার গভীরতায় পাঁচটি নির্মাণযুগের প্রতœ-নিদর্শন; বিক্রমপুরের দীর্ঘ সময়ব্যাপী এক সমৃদ্ধ সভ্যতার সাক্ষ্য বহন করে। যৌথ প্রতœতাত্ত্বিক এই খনন কাজে চীনের চার জন এবং দেশের ২০ জন গবেষক অংশ। চলতি মাস পর্যন্ত এই খনন শেষে এগুলো ঢেকে রাখা হবে। আগামী নবেম্বর থেকে পুনরায় আবার খনন শুরু হবে। ড. গওহর রিজভী বলেন, মাটির নিচ থেকে যে সম্পদের সন্ধান মিলেছে এতে বিক্রমপুর তথা বাংলাদেশের ইতিহাসে ভিন্ন মাত্রা যুক্ত করবে। বাঙালীর প্রসিদ্ধ ইতিহাস যে কত বেশি সমৃদ্ধ ছিল এগুলো তারই সাক্ষ্য বহন করছে। এতে এই অঞ্চল আরও অনেক অগ্রগতির দিকে ধাবিত হবে। চীনের রাষ্ট্রদূত মা মিংকিং জানান, শেখরের সন্ধানের এই খনন কাজে চীন অংশ নিতে পেরে গর্বিতবোধ করছে। এতে দু’দেশের ভ্রাতৃত্ব আরও বেশি দৃঢ় হবে। প্রাচীন এই সভ্যতা যথাযথভাবে উদঘাটনে চীন পাশে থাকবে। মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোঃ সাইফুল হাসান বাদল বলেছেন, মুন্সীগঞ্জ তথা বিক্রমপুর যে সভ্যতার জনপদ তা ক্রমেই আরও বেশি স্পষ্ট হচ্ছে। তিনি মনে করেন নাটেশ্বর এই পুরাকীর্তির মাধ্যমে এই অঞ্চলের চেহারা পাল্টে যাবে। নাটেশ্বর গ্রামটির প্রায় ১০ একর বিশাল দেলটির খনন শুরু হয়েছে ২০১২ সালে। অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের উদ্যোগ ও ব্যবস্থাপনায় এবং ঐতিহ্য অন্বেষণের গবেষণা পরিচালায় সরকারের অর্থায়নে এই খনন কাজ চলছে। এর আগে তারা সদর উপজেলার রঘুরামপুরে এক বছর আগের বৌদ্ধ বিহার আবিষ্কার করে। এটির পাশে এখন সাইড মিউজিয়াম তৈরির পরিকল্পনা চলছে। নাটেশ্বর গ্রামের প্রবীণ শিক্ষক দিনেশ চন্দ্র ম-ল জানান, এই দেলে দীর্ঘদিন ধরে তারা চাষাবাদ করেছেন। নরেশ চন্দ্র দাস জানান, তাদের পরিবারও সর্বশেষ এই দেশে চাষবাস করেছেন। সেখানে অমূল্য এই সভ্যতা আবিষ্কার হওয়ায় তাঁরাও গর্বিত। প্রতিবেশী নসর উদ্দিন বলেন, আমাদের জমিজমা গেলেও এখানে যে এতবড় কিছু হচ্ছে এতেই আমরা খুশি। স্কুলছাত্রী আমেনা আক্তার এসেছেন এই আবিষ্কার দেখতে। সে জানায়, আমি নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতে পারতাম না এত চমৎকার নির্মাণশৈলী এখানে লুকিয়ে ছিল। চীনের গবেষক মিস্টার লি জানান, মাটির নিচে যতই খনন হচ্ছে। ততই চমৎকৃত হচ্ছি। চমৎকার নির্মাণশৈলী দেখে আমি অভিভূত। পুলিশ সুপার বিপ্লব বিজয় তালুকদার জানান, সদ্য আবিষ্কৃত এই সভ্যতাকে ঘিরে এখানে কৌতূহলী মানুষের ভিড় বাড়ছে। বিদেশী গবেষকগণও এখানে কাজ করছেন। তাই এখানকার নিরাপত্তা নতুন করে সাজানো হবে।

এদিকে প্রায় ৩০ ফুট নিচে কালো সিমেন্টের মতো মাটি পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ এই মাটি পরীক্ষার জন্য মৃত্তাকা বিজ্ঞানীরাও কাজ করছেন। এছাড়া খননস্থলে বড় মাছের কাটা, নানা ধরনের হাড়িসহ নানা কিছু পাওয়া যাচ্ছে। রাস্তার পরেও স্থাপনা পাওয়া যাচ্ছে। সবকিছুই চলছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা। পরীক্ষা শেষে আরও অনেক নিশ্চিত তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।

প্রকাশিত : ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

১৭/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



ব্রেকিং নিউজ: