মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

বিবাহোত্তর দায়বদ্ধতা

প্রকাশিত : ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
বিবাহোত্তর দায়বদ্ধতা

জন্ম মৃত্যু বিয়ে এই তিনটি বিষয় নিয়তির সুতায় বাঁধা এই বদ্ধমূল ধারণার ওপর আমাদের সমাজ ব্যবস্থা। জন্ম এবং সমগ্র জীবনটাই বিয়ে আর মৃত্যুর মধ্যে সীমাবদ্ধ। এর মাঝখানে আছে মাতৃত্ব পিতৃত্ব চরিতার্থের সহজাত বাসনা। পশ্চাৎমুখী ধ্যান ধারণা ও কুসংস্কারের মধ্যে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে পিছিয়ে রাখার প্রচেষ্টা। নিয়তিনির্ভর জন্ম-মৃত্যু বিয়ে ধারণার পুরো বিষয়টি ভয়ঙ্করভাবে প্রভাবিত ধর্মীয় নিয়ম-নীতি দ্বারা। কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত সামাজিক প্রথা দ্বারা। জন্ম ও মৃত্যু একটি সাধারণ প্রক্রিয়া মাত্র। এ নিয়ে অতি মাত্রায় দুঃখী ও সুখী হওয়ার যেমন কোন কারণ নেই, তেমনি ভয়-ভীতিতে আক্রান্ত হওয়ার কোন যুক্তি নেই।

সাধারণ অর্থে বিয়ে হলো সমাজ স্বীকৃত উপায়ে একত্রে বসবাস করার মাধ্যমে একজন পুরুষ ও একজন নারীর সন্তান উৎপাদন করা ও তার দায়ভার গ্রহণ করা। তবে প্রাপ্ত বয়স্ক নারী ও পুরুষ পারস্পরিক সমঝোতা ও পরিকল্পনার ভিত্তিতে একত্রে বসবাস করে একে অন্যের আশা আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে পারে। সুতরাং বিয়ে নিয়তির কোন লিখন নয়।

নারীদের জন্মের পরপরই তৈরি হতে হয় বিসর্জনের জন্য। যা নির্ধারণ ও নির্দিষ্ট হয়ে যায় বিয়ের পর থেকে। বিদায় জানাতে হয় কল্পনাকে, স্বপ্নকে, কৌতূহলকে। জীবনের সমস্ত সহানুভূূতি ঢেলে দিতে হয় সংসার নামের মহান বেদীতে। ফিকে হয়ে যাওয়া অনুভূতিÑ বুদ্ধি-ভাবনা-চিন্তাকে ভোঁতা করে দেয়। যার ফলে সরে যেতে থাকে মানুষ তার নিজস্ব অবয়ব থেকে নিজের অজান্তে। ভাবনা চিন্তা কৌতূহলের শূন্য জায়গাগুলো দখল করে নেয় জাগতিক মোহ মায়া এবং মৃত্যু পরবর্তী দুশ্চিন্তা ভয়-ভীতি। অনর্থব পথে হেঁটে হেঁটে ভুলে যায় জীবনের আসল অর্থ। বন্ধ হয়ে যায় আত্ম অবলোকনের সমস্ত পথ। মরে যায় সৃজনশীল-উদ্ভাবনী শক্তির সকল বোধ। এভাবেই ভাটিতে পড়ে বিবাহোত্তর নারী পুরুষের জীবন প্রবাহ। জীবন ভরে ওঠে গতানুগতিক এক ঘেয়েমির ক্লান্তিতে। ভালবাসাহীন শীতলতা, চেতনার অবসাদ জাগিয়ে তোলে না জীবনের প্রতি কোন আগ্রহ।

আমাদের সমাজে বিয়ে এক মর্মান্তিক দায়বদ্ধতার নাম, নিয়তিনির্ভর বিশ্বাসের মাসুল। এই বিশ্বাসে নারীরা এগিয়ে। নারীদের একটি বড় অংশের ক্ষেত্রে বিয়ে নিবন্ধনকৃত জীবিকার উৎস। বিবাহোত্তর সতীত্ব প্রশ্নে নারীদের এবং মানবিক প্রশ্নে পুরুষদের দায় মেটাতে হয় বছরের পর বছর ধরে ক্লান্তিকর প্রহর গুনে গুনে। সাংসারিক দায় মেটাতে হয় বিষণœতার বশ্যতায়, ভিতরে ভিতরে চেতনার দায় খুঁজে মুক্তির পথ। তাই বিবাহোত্তর লুকিয়ে-চুড়িয়ে হরহামেশা জড়িয়ে পড়ছে নারী-পুরুষ অপ্রত্যাশিত প্রণয়জনিত গোপন কলহে।

আমাদের এই কুসংস্কারাচ্ছন্ন সংকীর্ণ সমাজে বিবাহ রূপান্তরিত হয় বিবাহজনিত পীড়নে। আমাদের সমাজ বিবাহ বলতে শেখায় শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবন। নিঃসঙ্গতা থেকে মুক্তি। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন, ভিতরে ভিতরে নিঃসঙ্গতার হাহাকার থাকে সারা অনুভূতি জুড়ে। একে অন্যের হয়ে ওঠে না আত্মার অন্তরঙ্গ হয়ে। ঐক্যবদ্ধ নয় আত্মিকভাবে।

জীবন হচ্ছে গবেষণালব্ধ জ্ঞান, যৌবনের জৌলুস, বার্ধক্যের নির্যাস।

বিবাহোত্তর নারী পুরুষ উভয়েরই থাকবে সংযম, সুচিন্তাবোধ, যুক্তি, দর্শন, আদর্শ। যদিও নারী পুরুষ উভয়েরই বাঙালী সমাজ ব্যবস্থায় জীবন যাপন, চলন বলন ভিন্ন। তারপরও জীবনে একটু বাড়তি আনন্দের জন্য কে কী বলল তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে পান করবে, নাচবে, গাইবে, আবৃত্তি করবে, লিখবে। ইচ্ছে হলে মধ্য রাতে এক হাত ধরে দুজনে হাঁটবে। পূর্ণিমার রাত, নক্ষত্রখচিত আকাশ দেখবে। নির্মল সকালে দোয়েলের শিষ, ঝির ঝির বাতাসে শরীর মন জুড়াবে। প্রথম সকালে পুবের আকাশের ঝলমলে আলো দেখে নতুন উদ্যোমে দিন শুরু করবে। পড়ন্ত বিকেলে প্রকৃতির সঙ্গে হতে পারে কথোপকথন। হারিয়ে যাওয়া যায়, অস্তগামী সূর্যের সঙ্গে দূর দীগন্তে। হতে পারে কাল্পনিক ভালবাসার সঙ্গে ভাবের বিনিময়। এতে করে কিছুক্ষণের জন্য হলেও এড়ানো যায় সাংসারিক দায়বদ্ধতার বেড়ি। দাম্পত্য জীবনে নারী পুরুষ হতে পারে সুখী মানুষ।

তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল সমাজ ব্যবস্থা একদিন অসংখ্য গতানুগতিক একঘেয়েমি দায়বদ্ধতার শৃঙ্খল মুক্ত হবে। বদলে যাবে দৃষ্টিভঙ্গি। দৃষ্টিভঙ্গির প্রসারতা যতদূর, জীবন ততদূর। সম্বন্ধ হবে স্বর্গ ও মর্ত্যরে অন্তর্নিহিত বিষয়ের সঙ্গে, জীবনকে উপভোগ করা যাবে প্রতিমুহূর্তে। পৃথিবীর রহস্যময় সৌন্দর্যের দৃষ্টি দিয়ে দেখতে হবে চারদিকের আনন্দ। বুঝতে চেষ্টা করতে হবে আনন্দ ও সৌন্দর্যের মাঝে লুকিয়ে থাকা শেষ আর তখনই জীবন হবে অর্থবহ ও দায়মুক্ত।

দিপ্তী ইসলাম

ছবি : আরিফ আহমেদ, সাকিব

মডেল : অপূর্ব, তিন্নি, সুজিত ও সুমি

প্রকাশিত : ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

১৬/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: