আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

অর্থনীতিতে অশনিসঙ্কেত স্বপ্ন লুটাচ্ছে মাটিতে

প্রকাশিত : ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • আরিফুর সবুজ

স্বপ্ন পূরণে খুব বেশি দূরে ছিলাম না। মাত্র বছর সাতেক। এরমধ্যেই পৌঁছে যেতাম মধ্যম আয়ের দেশে! গর্বে বুক ভরে উঠত নির্ঘাত। হাসি ফুটত সর্বসাধারণের। কিন্তু দুর্ভাগ্য, হয়েও যেন হয়ে উঠছে না। স্বপ্ন লুটিয়ে পড়ছে মাটিতে। অধরাই যেন থেকে যাবে স্বপ্ন। কারণ একটাই, নোংরা রাজনীতির হোলিখেলা। রঙের বদলে রক্ত নিয়ে খেলা। ভালই চলছে খেলা। আমরা যেন মন্দিরের ঘণ্টা। রাজনীতিবিদরা তাদের খেয়াল খুশিমতো বাজিয়ে যাচ্ছে। আগুনে দগ্ধ হয়ে আমরাও শুরু করে দিয়েছে মরণনৃত্য। যেখানে জীবন পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে, দেশ পুড়ে নরককু- হয়ে যাচ্ছে, সেখানে অর্থনীতি যে মরণকান্না কাঁদবে, সেটাই স্বাভাবিক। কাঁদছেও তাই।

টানা একচল্লিশ দিনের অবরোধে পুরো দেশের অর্থনীতির চাকা শুধু থমকেই যায়নি, পঙ্গুও হয়ে যাচ্ছে। অবরোধের সঙ্গে হরতাল যোগ হয়ে অর্থনীতি আজ প্রায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। প্রতিটি সেক্টরেই ধস নেমেছে। দেশের প্রতিটি মানুষকেই অর্থনৈতিক দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। ছোট-বড় সবধরনের ব্যবসায়ীকে লোকসানের ঘানি টানতে হচ্ছে। অনেক ব্যবসায় জ্বলেছে লালবাতি। হুহু করে বেড়ে গেছে বেকারের সংখ্যা। জিনিসপত্রের দাম ছুঁয়েছে আকাশ। সব মিলিয়ে প্রতিটি মানুষের জীবন আজ গভীর সঙ্কটে। পেট্রোলবোমার আঘাতে পুড়ে মরছে অনেকেই। কিংবা দগ্ধ হয়ে চিরতরের জন্য বরণ করে নিচ্ছে পঙ্গুত্ব। এখনও যাদের পেট্রোলবোমার আঘাত স্পর্শ করেনি, তাদেরও রেহাই মেলেনি। বাজারের আগুনে তাদের জীবন দগ্ধ হচ্ছে অহর্নিশ। আমরা যেন বাস করছি এক অরাজক দেশে। ঘোর অমানিশা নেমেছে আজ জাতির ললাটে যেন।

প্রতিদিনের হরতাল অবরোধে সবখাত মিলিয়ে ক্ষতি হচ্ছে দুই হাজার কোটি টাকারও বেশি। জিডিপির হিসেবে দৈনিক জিডিপির ক্ষতির পরিমাণ ২.৬৯৭% প্রায়। এত বিপুল ক্ষয়-ক্ষতি উন্নয়নশীল এই দেশটির জন্য খুবই শঙ্কার। এক পা এগোলেও দু’পা পিছিয়ে যাচ্ছি আমরা, হরতাল অবরোধের মতো ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপে। ১৯৯০ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত হরতাল অবরোধের কারণে ক্ষতি হয়েছিল প্রায় ৮০ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এই হিসাব ধরে দেখা যায়, গড়ে প্রতিবছর ৮ হাজার ৩৩ কোটি টাকার লোকসান হয়। কিন্তু টানা একচল্লিশ দিনের ধ্বংসাত্মক হরতালে ক্ষতি এ যাবতকালের সর্বরেকর্ডই ভেঙ্গে গেছে। আর এতে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে আমাদের স্বপ্ন। আলোয় উদ্ভাসিত মধুর স্বপ্ন। মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন!

পরিবহন খাতে নিকশ অন্ধকার নেমে এসেছে। ইতোমধ্যে সহস্রাধিক গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, ভাংচুর করা হয়েছে। দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল প্রায় থমকে গিয়েছিল। যদিও এখন অনেকটা স্বাভাবিক। সারাদেশে বাস-ট্রাক-কাভার্ডভ্যান আছে লাখ তিনেক। স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন আড়াই লাখের মতো চলাচল করে থাকে। গড়ে গাড়ি প্রতি আট থেকে দশ হাজার টাকা আয় হয়। সেই হিসেবে দৈনিক এই খাতে দুশ’ কোটি টাকার বেশি লোকসান গুনতে হচ্ছে পরিবহন মালিকদের। মালিক ছাড়াও এই খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত আছে ৫০ লক্ষাধিক শ্রমিক। এখন নিরঙ্কুশ বেকার। কর্মহীন সময়ক্ষেপণ করতে হচ্ছে তাদের। জীবন থমকে গেছে। যেসব ড্রাইভার-হেলপার জীবন ঝুঁকি নিয়ে গাড়ি নিয়ে বের হচ্ছেন পেট চালানোর দায়ে, তাদের অনেককেই বরণ করে নিতে হচ্ছে করুণ পরিণতি। জীবনের মূল্য হিসেবযোগ্য নয়। এ ব্যতীত অন্য সবকিছু মিলিয়ে প্রতিদিন এ খাতে তিনশ’ কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হচ্ছে। ইতোমধ্যে এই খাতে ক্ষতির পরিমাণ ১২৩০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

কৃষি খাতের অবস্থাও নাজুক। কৃষকরা ফসল বিক্রি করতে পারছেন না পরিবহন সঙ্কটের কারণে। এতে নষ্ট হচ্ছে পণ্য। না হলে এত কম দামে পণ্য বিক্রি করছেন যে, তাদের সারের পয়সাই উঠছে না। কেউ কেউ ঝুঁকি নিয়ে ট্রাকে করে ঢাকায় পাঠাতে গিয়ে দ্বিগুণের বেশি ভাড়া গুনতে হচ্ছে। তবু পরিবহন পাওয়া যাচ্ছে না। কৃষকের মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকা ছাড়া যেন আর কোন উপায় নেই। এই খাতে প্রতিদিনকার ক্ষতির পরিমাণ ২৮৮ কোটি টাকা। ইতোমধ্যে এ খাতে ক্ষতির পরিমাণ ১১৮০৮ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। কৃষির সঙ্গে সঙ্গে পোল্ট্রি খাতের অবস্থাও ভয়াবহ। বাজারে মুরগি কম। অল্প যা কিছু স্থানীয় ভিত্তিতে বাজারে সরবরাহ হচ্ছে, তার দাম অত্যন্ত চড়া। এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত মালিক শ্রমিক, ব্যবসায়ী সবাইকেই লোকসান গুনতে হচ্ছে। পোল্ট্রি খাতে প্রতিদিন ক্ষতি হচ্ছে ১৮ কোটি টাকার মতো। ইতোমধ্যে ৭৩৮ কোটি টাকার মতো ক্ষতি হয়ে গেছে এই শিল্পে।

পোশাক শিল্পের অবস্থা এমনিতেই বিগত কয়েকমাস জুড়ে ভাল ছিল না। তারমধ্যে হরতাল-অবরোধ যেন মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা দিয়ে যাচ্ছে। বাতিল হয়ে যাচ্ছে রফতানি আদেশ। পণ্য রফতানি না হলেও চালু রাখতে হচ্ছে কারখানা। এতে গচ্চা দিতে হচ্ছে প্রচুর পরিমাণ অর্থ। হরতাল অবরোধে প্রতিদিন এ খাতে প্রায় ৮৪২ কোটি টাকার মতো ক্ষতি হচ্ছে। ইতোমধ্যে ৩৪৫২২ কোটি টাকার ক্ষতি হয়ে গেছে অর্থনীতির প্রধান চালিকা শক্তির এই খাতটিতে।

আবাসন খাতের অবস্থা খুবই বেগতিক। রিয়েলস্টেট কোম্পানিগুলো জমি, ফ্ল্যাট বিক্রি করতে পারছে না। ক্রেতা নেই। কেনার আগ্রহ থাকলেও ক্রেতারা জমি বা ফ্ল্যাট দেখতে যেতে পারছেন না, কেনা তো দূরের ব্যাপার। এ খাতের সঙ্গে প্রায় ২৬ লাখ শ্রমিক যুক্ত। এরাও এখন কর্মহীন হয়ে পড়েছে। এ খাতে প্রতিদিন ক্ষতি হচ্ছে ২৫০ কোটি টাকার মতো। ইতোমধ্যে ১০২৫০ কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়ে গেছে এই খাতটিতে। পর্যটন কেন্দ্রগুলো পর্যটকশূন্য। প্রতিটি কেন্দ্রে একই দশা। ফলে হোটেল মোটেল ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে এ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল ব্যবসায়ীর অর্থভা-ারও শূন্য হয়ে পড়েছে। পর্যটন খাতে দৈনিক ক্ষতির পরিমাণ কমপক্ষে ২১০ কোটি টাকা। ইতোমধ্যে ৮৬১০ কোটি টাকার লোকসান হয়েছে এ খাতে।

চামড়া খাতকে করুণ পরিণতি বরণ করে নিতে হচ্ছে। চামড়াজাত পণ্য রফতানির আদেশ বাতিল হয়ে যাচ্ছে। অবরোধের কারণে এই শিল্পকে ইতোমধ্যে পাঁচশ কোটি টাকার বেশি লোকসান গুনতে হয়েছে। চিংড়ি শিল্পেও ব্যাপক ধস নেমেছে। ইতোমধ্যে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার হিমায়িত চিংড়ি রফতানি আটকে আছে। প্রতিদিনই চিংড়ি খাতে প্রায় ৮ থেকে ১০ কোটি টাকার লোকসান গুনতে হচ্ছে ঘের ব্যবসায়ীদের। এছাড়া এই খাতটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের কর্মহীন দিন গুজরান করতে হচ্ছে।

হরতাল-অবরোধের কোপের হাত থেকে রক্ষা পাননি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও। দেশে প্রায় ২৩ লাখের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী রয়েছেন। এরা তাদের দোকান-পাটই খুলতে পারেননি। অনেকের পণ্য নষ্ট হয়ে গেছে। কেউ কেউ দোকান খুললেও ক্রেতার অভাবে মাছি মারতে হচ্ছে। বরং পরিচালনা ব্যয় গচ্চা দিতে হচ্ছে। পুঁজিহারা হচ্ছেন অনেক ব্যবসায়ী। পাইকারি বাজার শপিংমল, শোরুম ও মাঝারি দোকান খাতে প্রতিদিন ক্ষতি হচ্ছে ১৫০ কোটি টাকা। ইতোমধ্যে এ খাতে ৬১৫০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়ে গেছে। শেয়ারবাজারের অবস্থাও ভাল নয়। পুঁজি হারাচ্ছেন বড় ছোট সব বিনিয়োগকারী।

বীমা কোম্পানিগুলো ইতোমধ্যে পাঁচশ কোটি টাকার বেশি লোকসান দিয়েছে। সিরামিক খাতে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা, প্লাস্টিক খাতে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা, আমদানি পণ্য খাতে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা, উৎপাদন খাতে প্রায় ৪০০০ কোটি টাকার মতো লোকসান গুনতে হয়েছে। এছাড়া স্থলবন্দর ও সেতুর টোল আদায়ের দৈনিক রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে ৩৩ কোটি টাকা। সে হিসেবে ইতোমধ্যে ১৩৫৩ কোটি টাকার মতো রাজস্ব হারিয়েছে সরকার। অবরোধ-হরতালের জেরে জিনিসপত্রের দাম রকেটবেগে মহাকাশ ছুঁয়েছে। বাজারে রীতিমতো দাবানল তৈরি হয়েছে। ডিসেম্বর মাসে যেখানে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ, সেখানে জানুয়ারি মাসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। সাধারণ মানুষের জীবন হয়ে উঠেছে যন্ত্রণাদায়ক।

অবরোধ হরতাল এডিপি বাস্তবায়নকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে। এমনিতেই গত জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এডিপির মাত্র ২৮ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে। বিদ্যমান অবস্থা চলতে থাকলে এর কতটুকু আদৌতে বাস্তবায়ন করা যাবে, তা নিয়ে রীতিমতো সংশয় রয়ে গেছে। বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে নিয়ে যেতে হলে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন। ধাপে ধাপে সেই লক্ষ্যমাত্রার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল দেশ। চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি নির্ধারণ করা হয়েছিল সাত দশমিক তিন শতাংশ। কিন্তু সেই আশায় গুঁড়েবালি হতে যাচ্ছে। সাড়ে ৫ থেকে ৬ এর কাছাকাছি প্রবৃদ্ধি হতে পারে বলে অর্থনীতিবিদরা শঙ্কা প্রকাশ করছেন।

হরতাল অবরোধে অর্থনীতির ক্ষতির ফিরিস্তি দিয়ে শেষ করা যাবে না। দেশের অর্থনীতি প্রায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। যদিও রাজনীতিবিদদের হাবভাবে মনে হয়, এ বিষয়ে তাদের কোন মাথাব্যথা নেই। তাদের চিত্তে আছে শুধু ক্ষমতার লোভ, ক্ষমতার মসনদ। তাদের স্বপ্ন কেবল ক্ষমতার অধিকারী হওয়া বা ক্ষমতাকে জিইয়ে রাখা। যাক দেশ রসাতলে, তাতে তাদের কী! দেশ পুড়ে ছারখার হলেও কিছু যায় আসে না তাদের। ক্ষমতার মধু খেতে পারলেই হলো। ক্ষমতাবান আর বিত্তবান হতে পারলে আর কিছু চাই না তাদের। এটাই সত্য। তাদের কামড়াকামড়ি,কাঁদা ছোড়াছুড়ি, নির্দয়হীনতা দেখে একথাটি আরো সত্য হয়ে ধরা দেয়। আজকের নরকতুল্য পরিস্থিতির জন্য কোন একক রাজনৈতিক দল দায়ী নয়। সবাইকে এর দায়ভার নিতে হবে। প্রতিটি রাজনৈতিক দলই কম-বেশি এর জন্য দায়ী। কেউই পারবে না এড়িয়ে যেতে এ দায়। সুশীল সমাজ,বিদেশী মাতব্বর থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ সবাই হরতাল-অবরোধ বন্ধের আহ্বান করেছে বারবার। কিন্তু তা ব্যর্থ হয়েছে। অনেকে সংলাপের আহ্বান করেছেন পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য। তাও ব্যর্থ হয়েছে। হবেই তো। রাজনীতিবিদরা তো শুধু নিজেদের আখের দেখছেন, দেশ ও দেশের মানুষকে দেখছেন না। তাইতো রক্তের হলিখেলা থামাচ্ছেন না তারা। দেয়ালে পিঠ ঠেকার আগ পর্যন্ত তারা এমনটিই চালিয়ে যাবেন। দেশবাসীর জীবন ধ্বংস হবে, অর্থনীতি ধ্বংস হবে। জনগণ কেবল চেয়ে চেয়ে দেখবে, এখন যেমন দেখছে। এই জগদ্দল অবস্থা থেকে মুক্তির উপায় কী,কে জানে?

প্রকাশিত : ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

১৫/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: