আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বাংলাদেশের উন্নয়ন স্বপ্ন ও বাস্তবতা

প্রকাশিত : ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • ড. মো. মোয়াজ্জেম হোসেন খান

দেশের উন্নয়ন বিষয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে, বর্তমানে হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হবে। উন্নয়ন যে এখানে হয়নি তাও বলছি না। উন্নয়ন অবশ্যই হয়েছে, তবে কাক্সিক্ষত মাত্রায় হয়নি। টেকসই উন্নয়ন বলতে যা বোঝায়, তা হয়নি। প্রধান খাদ্যশস্য ধানের কথাই ধরা যাক। ১৯৭২ সালের প্রায় এক কোটি টনের জায়গায় ২০১৩ সালে এর উৎপাদন চালের আকারে ৩.৫৫ কোটি টনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। নগরায়নের হার ১৯৭২ সালের কম-বেশি ১৫%-এর স্থলে বর্তমানে গিয়ে ঠেকেছে প্রায় ৪০%-এ। সড়কের দৈর্ঘ্য স্বাধীনতা পরবর্তী ৮-১০ হাজার কিলোমিটারের স্থলে বর্তমানে প্রায় ৩.৫০ লাখ কিলোমিটারে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।

অন্যদিকে সারা বছর নাব্য পানিপথের দৈর্ঘ্য ২৪ হাজার কিলোমিটার থেকে হ্রাস পেয়ে এখন মাত্র ৩.৫০ হাজার কিলোমিটারে গিয়ে ঠেকেছে। রেলের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। এর দৈর্ঘ্য ১৯৭২-এর তুলনায় হ্রাস পেয়েছিল। ১৯৯৬-২০০১, ২০০৯-২০১৪ এবং বর্তমানের মহাজোট সরকারের আমলে তা সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে, যা কাক্সিক্ষত অবস্থা থেকে অনেক অনেক নিচে আছে। অপর দিকে মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে কৃষির অংশ ১৯৭২ সালের প্রায় ৪৯.০% থেকে হ্রাস পেয়ে বর্তমানে ২০.০% এ গিয়ে ঠেকেছে। কৃষির অবদান কমলেও শিল্পের অবদান কিন্তু সে তুলনায় বৃদ্ধি পায়নি। ১৯৭২-এর ১২.০% এর স্থলে শিল্পের অবদান বর্তমানে মাত্র ২০.০%-এর মতো। তার মানে বৃদ্ধি পেয়েছে আসলে সেবা খাতসমূহের অবদান।

ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও সবে সিঙ্গেল ডিজিট অতিক্রম করেছে (২০১৩, ১১.০%-এর মতো)। অথচ ভারতে এটা ১৮.০%-এর মতো, এমনকি পাকিস্তানেও তা ১৪.০%। পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে নব্য উদারবাদিতার নামে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ আমাদের সামরিক শাসকদের দিয়ে এদেশে বাজার অর্থনীতি চালুর ব্যবস্থা করে, যা বিগত শতাব্দীর আশি ও নব্বইয়ের দশকে কখনও কাঠামোগত সংস্কার, কখনও বাজার উদারীকরণ ও বিরাষ্ট্রীয়করণের নামে আমাদের দেশীয় গোটা অর্থনীতিকে তছনছ করে দেয়।

ঢালাও বেসরকারীকরণ ও তথাকথিত বেসরকারী খাতের বিকাশের নামে জিয়া ও এরশাদের সামরিক শাসনামল এবং বেগম জিয়ার তথাকথিত গণতান্ত্রিক আমলে দেশে মূলত ব্যাপক লুণ্ঠনযজ্ঞ চলেছে। লুণ্ঠনের ক্ষেত্র ছিল মূলত সরকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ : বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন; বাংলাদেশ বিমান, বাংলাদেশ রেলওয়ে; বাংলাদেশ আভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্পোরেশন, সরকারী ব্যাংকসমূহ, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন, বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশন, বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশন, বাংলাদেশ শিপিং ও ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশন, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস কর্পোরেশন ইত্যাদি। এ লুণ্ঠন প্রক্রিয়ায় এদেশে বিদেশী সাহায্যেরও প্রায় ৭৫.০% এরা বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় আত্মসাৎ করেছে।

পাকিস্তান আমলের ২২ পরিবারের স্থলে ২২ হাজার ধনী পরিবারের সৃষ্টি হয়েছে। লাখো গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য। অথচ আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের আকাক্সক্ষা ছিল একটি সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। আর সে জন্য গোটা পাকি আমলের বৈষম্য-নিপীড়নবিরোধী আন্দোলনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যসমূহেকে ধারণ করে ১৯৭২ সালের সংবিধানে রাষ্ট্রের ৪টি মূলনীতি বা লক্ষ্য বিধিবদ্ধ করা হয় : বাঙালী জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র। বাঙালী জাতীয়তাবাদের মানেই হচ্ছে : বাংলা আমােেদর ভাষা, বাঙালীয়ানা আমাদের সংস্কৃতি, বাঙালী আমাদের পরিচয়। এ জাতীয়তাবাদ আমাদের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে একতাবদ্ধ করেছিল। পাকি নব্য-উপনিবেশবাদীদের বিরুদ্ধে ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা আন্দোলনে আমাদের প্রেরণা জুগিয়েছিল। এ জাতীয়তাবাদ অতীতে আমাদের যেমন একতাবদ্ধ রেখেছে, বর্তমানেও তেমনি রেখে চলেছে এবং ভবিষ্যতেও রাখবে। আর সে কারণেই রাষ্ট্র পরিচালনায় এটা হচ্ছে প্রথম মৌলনীতি।

ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার। অর্থাৎ সকল ধর্মাবলম্বী মানুষ তাদের স্ব স্ব ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করবে। এক ধর্মাবলম্বী মানুষ অন্য ধর্মাবলম্বী মানুষকে তার ধর্ম পালনে কোন রকম বাধা বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারবে না। দেশের সকল আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। এটি হচ্ছে রাষ্ট্র পরিচালনার তৃতীয় নীতি। আমাদের চতুর্থ এবং সর্বশেষ লক্ষ্য বা নীতি হচ্ছে সমাজতন্ত্র। অন্যভাবে বললে, আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনার চূড়ান্ত লক্ষ্য শোষণমুক্ত এক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে সমাজের প্রত্যেকটি মানুষের/সদস্যের ৬টি মৌলিক অধিকার খাদ্য- বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান প্রতিষ্ঠিত হবে পরিপূর্ণভাবে। বৈষম্য-শোষণ-বঞ্চনাহীন এক সমাজব্যবস্থার নিশ্চয়তা একমাত্র সমাজতন্ত্রই দিতে পারে। আর তা প্রতিষ্ঠিত হবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়।

বলা হচ্ছে, ১৯৭২-এর সংবিধান পুনর্¯’াপিত হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনায় আমরা এর তেমন প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছি না। আমাদের দেশে এ যাবত ছয়টি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, দুটি পিআরএসপি, একটি দ্বিবার্ষিক ও একটি বার্ষিক পরিকল্পনা রচিত ও বাস্তবায়িত হয়েছে বা হচ্ছে। এর মধ্যে একমাত্র জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আমলে রচিত প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা রচনার ক্ষেত্রে মোটামুটিভাবে জাতীয় চার নীতিকে বিবেচনায় নেয়া হয়েছিল। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে, বঙ্গবন্ধু এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে যেতে পারেননি নৃশংস হত্যার শিকার হয়ে। অতঃপর সাম্রাজ্যবাদী চক্রের পরামর্শে সামরিক শাসক জিয়া এদেশে সংবিধানের চার লক্ষ্যকে ভূলুণ্ঠিত করে পুঁজিবাদী বাজার অর্থনীতির নামে প্রবৃদ্ধিতত্ত্ব বাস্তবায়ন শুরু করে। আর এক সামরিক শাসক এরশাদ একে চরমে পৌঁছে দেয়।

এ কথা সকলেরই জানা যে, প্রবৃদ্ধি তত্ত্বের মূল কথা হচ্ছে, প্রবৃদ্ধি হলে তার ফসল চুইয়ে গিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ঘটাবে। বাস্তবে কি তা হয়? মোটেও না। আমাদের সবারই হয়ত মনে আছে যে, ১৯৯০-এ যখন সামরিক শাসক এরশাদের পতন হয়, তখন দেশের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গিয়েছিল। ভূমিহীনতা সর্বকালের রেকর্ড ভঙ্গ করেছিল। উন্নয়ন বাজেটের বিদেশী সাহায্য নির্ভরতা ৯৮.০% উঠেছিল। আমদানিনির্ভরতা সর্বকালের রেকর্ড ভেঙ্গে ছিল। সরকারী খাতের প্রতিষ্ঠানসমূহকে একেবারে পঙ্গু করে দেয়া হয়েছিল। পরিকল্পনার নামে যা করেছিল দুই সামরিক শাসক, তাকে বাহাস বললে খুব কমই বলা হবে। কারণ, ওই সময়ের পরিকল্পনা আসলে গণবিরোধী তথা সংবিধান বিরোধী ছিল।

১৯৯১-এর তথাকথিত গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসে আরও এক ডিগ্রী এগিয়ে গিয়ে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব ব্যাংক ও আইএমএফের পরামর্শে পরিকল্পনাকে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেন। ঘূর্ণায়মান পরিকল্পনা, বাজেট সংস্কার, মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বাজেট ইত্যাদি নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলশ্রুতিতে দেশে উৎপাদনহীনতাসহ এক মহাদুর্যোগপূর্ণ অবস্থার সৃষ্টি হয়। ১৯৯৬-এ শেখ হাসিনা এসে আবার পরিকল্পনা ফিরিয়ে আনেন। তবে তা পুরোপুরি সংবিধানের লক্ষ্যের আলোকে রচিত হয়নি। তবুও সরকারী খাতকে কিছুটা চাঙ্গা করাসহ বণ্টন-পুনর্বণ্টনমূলক বেশ কিছু কর্মসূচী গ্রহণ করায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় কিছুটা উন্নতি আসে এবং দেশ ২০০০ সাল নাগাদ খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে সক্ষম হয়।

২০০১ এ খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসে পুনরায় সাম্রাজ্যবাদীদের পরামর্শে আবার পরিকল্পনা বাদ দিয়ে পিআরএসপি করে, যা বিশ্ব ব্যাংকের বোর্ড সভায় ওয়াশিংটনে পাস হয় এবং খালেদা জিয়ার সরকার বাস্তবায়ন করে। ১ম পিআরএসপি ব্যর্থ হওয়া সত্ত্বেও ২য় পিআরএসপি চাপিয়ে দেয়া হয় আমাদের ওপর। ২০০৬ সাল নাগাদ আবার দেশ এক মহাসংকটে পড়ে। খালেদা সরকারের নির্মম পতন দেখে দেশবাসী। আসে মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দিনের অনির্ধারিত তথাকথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার।

২০০৮-এ ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনার সরকার পুনরায় পরিকল্পনায় যায়। রচিত হয় ৬ষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, যার মেয়াদ শেষ হবে ২০১৫ সালে। দেশ আবার খাদ্যসহ অনেক কিছুতেই স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পথে অথবা অর্জন করেছে। বর্তমান সরকার ইতোমধ্যেই সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা রচনার কাজে হাত দিয়েছে। ২০০০ সালে জাতিসংঘ ঘোষিত সহস্রাব্দ লক্ষ্যের ৮টির মধ্যে বেশির ভাগই আমাদের দেশ ইতোমধ্যেই অর্জন করে ফেলেছে অথবা অর্জন করার কাছাকাছি রয়েছে। আশা করা যায়, ২০১৫ সাল নাগাদ সবই অর্জিত হবে।

প্রকাশিত : ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

১৫/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: