মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

পুতুল নাচ ॥ অনাদরে হারিয়ে যাচ্ছে

প্রকাশিত : ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • সমুদ্র হক, বগুড়া থেকে ॥ পুতুল নাচে মানুষ জীবনের প্রতিফলন দেখতে পায়

বিশেষ ধরনের এই পুতুল বানানো হয় শোলা ও হালকা কাঠি দিয়ে। গ্রামে নদী ও বিলের ধার থেকে শোলা সংগ্রহ করা হয়। শোলা দিয়ে নানা কিছু বানোনোর কারিগর আছে। এই কারিগররাই বানায় বড় ছোট মাঝারি নানা আকৃতির পুতুল। এই পুতুল সাধারণত চার ধরনের। তবে বেশি হতে পারে। তা অবস্থা বুঝে। তারের পুতুল, লাঠি পুতুল, ছায়া পুতুল ও বেণী পুতুল। এসব পুতুলকে গল্পের বর্ণনা অনুযায়ী পোশাক অলঙ্কার টোপর পাগড়ী পরিয়ে সূক্ষ্ম তার, সুতা ও চিকন কাঠির শৈলীতে নাচানো হয় মঞ্চে। এর সঙ্গে আকাশ ডাঙা ও জলের পশু পাখিসহ নানা কিছু শোলা দিয়ে বানিয়ে রাখা হয়। গল্পের প্রয়োজনে এগুলো মঞ্চে আসে। মঞ্চের একধারে বাদ্যযন্ত্র নিয়ে বসে বাদকরা। আরেকধারে সংলাপ ও গান পরিবেশনের জন্য বসে কণ্ঠশিল্পীরা। মধ্যের মূল মঞ্চে কালো কাপড়ে ঘেরা বিশেষ ধরনের মঞ্চ। এখানেই নাচানো হয় পুতুল যার নাম পুতুল নাচ। মূলত পুতুল নাচ কোন এক কাহিনীর বর্ণনায় মঞ্চে পরিবেশিত হয়। যাত্রাপালা বিশেষ ঢঙে টানা সংলাপ অট্টহাসির অভিনয় নৈপুণ্যে ফুটিয়ে তোলা হয়। পুতুল নাচ যাত্রার মতো কিছুটা কাছাকাছি সংলাপে নেপথ্যের বর্ণনায় মঞ্চে অভিনয়ের মতো করে নাচানো হয় পুতুলদের। ওপর থেকে সূক্ষ্ম সুতা দিয়ে পুতুল নাচানোর টেকনিক সম্পূর্ণ আলাদা। এজন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ নিতে হয়। গল্পের সংলাপ ও গানের সঙ্গে পুতুলের নাচানাচির মিল না থাকলে তা পুতুল নাচ হয় না। জাদু শিল্পীরা মিষ্টি কথায় হিপনোটাইজ শৈলীতে মোহবিষ্ট করে মঞ্চে যা প্রদর্শন করে তাই দেখে দর্শকরা। পুতুল নাচের নেপথ্যের শৈলীরা গল্পের বর্ণনার সঙ্গে এমনভাবে পুতুলদের নাচায় মনে হবে পুতুল অভিনয় করছে। পুতুল নাচ প্রদর্শনের এই মোহজাল সৃষ্টি সম্পূর্ণই টিমওয়ার্ক। টিমের কোন এক অংশ ভুল করলে বা খসে পড়লে পুরো দায় গিয়ে বর্তায় পুতুল নাচের ওপর। দর্শক আনন্দ পাওয়ার বদলে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। এই পুতুল নাচ বাংলার শিকড়ের সংস্কৃতি। লোকজ বা লোক সংস্কৃতির অন্যতম ধারক। শৈল্পিক পুতুল নাচে মানুষ তার জীবনের প্রতিফলন দেখতে পায়। যেখান থেকে এসেছে প্রবাদের সেই কথা, মানুষ পুতুল ছাড়া আর কী। ওপর থেকে একজন কাঠি দিয়ে নাচাচ্ছেন, মানুষ নাচছে জীবনের নানা প্রয়োজনে ঘাত-প্রতিঘাত সব কিছু মাথায় নিয়ে। এক তথ্যে বলা হয়েছে, পুতুল নাচের জন্ম বঙ্গীয় ব দ্বীপের এই দেশে। বহু যুগ আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক জমিদার কৌতূহলী হয়ে পুতুল বানিয়ে নাচের প্রচলন করেছিলেন। তারপর মানুষ বিনোদনের একটি মাত্রা খুঁজে পায়। ওই সময়ে সিনেমা (চলচ্চিত্র) এতটা প্রসার লাভ করেনি। নির্বাক চলচ্চিত্র দেখতো মানুষ। গ্রাম বাংলায় বিনোদন বলতে ছিল যাত্রাপালা। যাত্রায় খরচ অনেক। খরচ কমাতে পুতুল নাচের কারিগররা প্রথম দিকে মৃৎ শিল্পী বা কুমোরদের কাছে গিয়ে পুতুল বানিয়ে নিত। মাটির পুতুলকে কাপড় পরিয়ে সাজিয়ে সুতার শৈলীতে নাচানো হতো। মাটির পুতুলকে নাচানো ছিল অত্যধিক কঠিন কাজ। যখন দেখা গেল দর্শক এই শিল্পটি আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করেছে তখন পুতুল নাচকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য হালকা কিছু খোঁজা হলো। মিলল শোলা, কাশ ও বেত। শিল্পীরা পেয়ে গেল ইতিহাস সৃষ্টির উপকরণ। তা হলো পুতুল নাচ। লোকজ সংস্কৃতির গবেষকগণ বলেন, নাচ হলো মানুষের আবেগ প্রকাশের প্রাচীনতম বাহন। ভাষা সৃষ্টির আগে আদিম মানুষ নাচের মাধ্যমে ভাবের আদান প্রদান করত। পুতুল নাচ আমাদের বাস্তব জীবনেরই প্রতিফলন। নাট্যতাত্ত্বিক গর্ডন ক্রেইম বলেছেন, পুতুল নাচ নাটকের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটিনিকায় বলা হযেছে ‘পাপেট ক্যান প্রোভাইড এ ডিগ্রী অব এ্যাবস্ট্রেট্রেন এ্যান্ড স্টাইলিসেসন আনএ্যটেইনেবল বাই হিউমেন এ্যাক্টরস’। নাট্যতাত্ত্বিকদের এত বড় উদাহারণ থাকার পরও দেশে পুতুল নাচ লোকশিল্পের মাধ্যমে বেশি দূর এগোয়নি। উল্টো ধ্রপদী শিল্পের এই বাহনকে দিনে দিনে কলুষিত করে পুতুল নাচের আড়ালে অশ্লীল নাচ পরিবেশন করতে দেখা যায় বিভিন্ন মেলায়। বিংশ শতকের মধ্যভাগের পর আধুনিক শিল্পকলা হিসাবে পুতুল নাচ স্বীকৃতি পায়, তবে তা বাস্তবের চেয়ে কাগজে। কিছুদিন টেলিভিশনে পুতুল নাচের পৃষ্ঠপোষকতা চোখে পড়ে। তাও থমকে গেছে। শিল্পকলা একাডেমি কোন রকমে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে এই শিল্পকে। কোন গতি নেই। লোকজের অন্যতম এই ধারকটি পারিবারিকভাবে অথবা নিতান্ত ব্যক্তিগত আগ্রহের ফলে দেশজুড়ে গোটা ত্রিশেক দলে টিকে আছে। সাতক্ষীরা কুষ্টিয়া মানিকগঞ্জ ব্রাহ্মণবাড়িয়া কুড়িগ্রাম দিনাজপুর বাগেরহাটের কয়েকটি দল শিল্পকলা একাডেমিতে মাঝেমধ্যে পুতুল নাচ পরিবেশন করে। কুড়িগ্রামের দাতা হরিশচন্দ্র পালা ইতোমধ্যে নাম কুড়িযেছে। বাগেরহাটের বাবুইপাড়ার কয়েকজন পুতুল নাচের প্রদর্শনী করে এগিয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একজন জানালেন পর্দার আড়ালে যিনি পুতুল নাচান তাঁকে ৩ থেকে ৬টি সুতা ব্যবহার করতে হয়। পুতুলের কথোপকথনকে হৃদয়গ্রাহী করতে তালপাতার বাঁশি ব্যবহার করে কথা বলা হয়। পুতুল নাচের একটি দৃশ্য এমনÑ অন্ধকার মঞ্চে সামান্য আলোয় একটি পুতুল আরেক পুতুলের গলে মালা পড়িয়ে দিচ্ছে। কিছুপর আরেক পুতুল নাচছে সঙ্গীতের তালে। এরপর সংলাপ ও গ্রাম বাংলার পটভূমিতে নানা দৃশ্য সাজনো। পুতুল নাচ দেখে মনে হবে, সত্যিই পুতুলগুলো কথা বলছে। এবাবে নানা গল্পে পুতুল নাচ প্রদর্শিত হয়। লোকজন পরিবার নিয়ে এই নাচ দেখে আনন্দ পায়। ছোটদের কাছে কার্টুনের চেয়ে পুতুল নাচ বেশ মজার। এই পুতুল নাচকে মাটির কাছাকাছি পৌঁছে দেয়ার সময় এখনই।

প্রকাশিত : ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

১৪/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: