কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

উন্নত সড়ক যোগাযোগ গ্রামের দারিদ্র্য কমিয়েছে

প্রকাশিত : ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
উন্নত সড়ক যোগাযোগ গ্রামের দারিদ্র্য কমিয়েছে
  • অর্থনীতি হয়েছে চাঙ্গা

সমুদ্র হক ॥ গ্রামের উন্নত সড়ক দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে দারিদ্র্যের হার অনেক কমিয়েছে। কৃষি উৎপাদন বেড়ে দ্রুত পণ্য সরবরাহ বেড়েছে। বিদ্যুত ও সোলার প্যানেল পৌঁছে কুটির শিল্পের প্রসার ঘটেছে। বেড়েছে শিক্ষার হার। বিশেষ করে নারীশিক্ষা বেড়ে নারী উন্নয়নের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। উন্নয়নের এই ধারার সঙ্গে তথ্য যোগাযোগ ও প্রযুক্তির (আইসিটি) বিস্তার ঘটে কৃষক পরিবারে জীবনমান বেড়ে গেছে। বেড়েছে সঞ্চয়ের হার। যাদের এক সময় চাষাভুষা বলা হতো তাদের সন্তানরা বিদেশ গিয়ে রেমিটেন্স পাঠিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়িয়েছে। এদিকে গ্রামের নারী গার্মেন্টে কাজ করে পোশাক রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আনছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (বাংলাদেশ ব্যাংক) এক সূত্রে দেশে বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে; যা এ যাবতকালের সর্বোচ্চ।

সূত্র জানায়, বিশ্বব্যাংকের হিসাবে এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে বাংলাদেশে গ্রামীণ উন্নত সড়ক বেশি। গ্রামে প্রতি এক শ’ বর্গকিলোমিটার এলাকায় উন্নত সড়ক ২শ’ ১০ কিলোমিটার। একই আয়তনে পার্শ¦বর্তী দেশ ভারতে এই হার ১শ’ ৩৬ কিলোমিটার। পাকিস্তানে ৩৫ কিলোমিটার ও নেপালে মাত্র ১৪ কিলোমিটার। বাংলাদেশে উপজেলা সড়ক, ইউনিয়ন সড়ক ও গ্রাম সড়ককে চারটি শ্রেণীতে ভাগ করা হয়। বর্তমানে সব মিলিয়ে গ্রামীণ বা পল্লী সড়কের দৈর্ঘ্য ৩ লাখ ১০ হাজার কিলোমিটার। এর বড় একটি অংশই পাকা। বর্তমানে গ্রামীণ সড়ক নির্মাণের প্রতিষ্ঠান স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ (এলজিইডি)। বর্তমানে গ্রামীণ সড়ক উন্নয়নের দুই-তৃতীয়াংশ কাজ করে সরকার। বাকিটা বিদেশী অর্থায়নে।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রামে পাকা সড়ক ও মাটির উন্নত সড়ক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সব ধরনের যন্ত্রযান (বাস, মিনিবাস, ট্রাক, সিএনজি চালিত অটোরিকশা, টেম্পো ব্যাটারি চালিত যান) একেবারে দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে। উপজেলার সঙ্গে জেলা শহরের যোগাযোগ এতটাই নিবিড় হয়েছে যে, কাছাকাছি উপজেলাকে জেলার অংশ বলেই মনে করা হয়। বগুড়ার সারিয়াকান্দি এলাকায় যমুনার ভেতরে অনেক চরেও পাকা সড়ক হয়েছে। আবার জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কের ধারের উপজেলাগুলো সত্তরের দশকের জেলা শহরের মতোই মনে হয়। এসব সড়কের ক্রস পয়েন্টে (ফিডার সড়কের মোড়) বাসস্ট্যান্ড, সিএনজি চালিত অটোরিকশা, ব্যাটারি চালিত যানবাহন থাকায় সেখানে আধুনিক দোকানপাট বসেছে। কোথাও মার্কেট হয়েছে। উপজেলা সদরেও শহরের ডিপার্টমেন্ট স্টোরের মতো দোকানপাট স্থাপিত হয়েছে।

উন্নত সড়ক ব্যবস্থার কারণে কৃষি উপকরণ বিশেষ করে সার- ডিজেল এখন কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছেছে। কৃষক তার উৎপাদিত পণ্য কখনও পাওয়ারটিলারের সঙ্গে ট্রলি এঁটে কখনও মিনিট্রাকে করে দ্রুত নিয়ে যাচ্ছে হাটবাজারে। কৃষি উপকরণের সহজ প্রাপ্তিতে এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) নানা ধরনের ধান উদ্ভাবনে এখন ভরবছর কোন না কোন আবাদ হচ্ছেই। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে সবজি আবাদ বেড়ে বিদেশে রফতানি হচ্ছে। বগুড়া-রংপুর মহাসড়কের ধারে কয়েক কিলোমিটার জুড়ে প্রতিদিন যত কলা ও শাক-সবজি ওঠে তা ট্রাকের পর ট্রাকে চলে যায় পূর্বাঞ্চলের দিকে। নওগাঁ ও বগুড়ার বিভিন্ন হাটবাজারে গড়ে উঠেছে চালের আড়ত। অনেক উন্নত চাল ফ্যাক্টরি স্থাপিত হয়েছে এসব এলাকায়। বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলে বর্তমানে সকল ধরনের আবাদ বেড়ে গিয়ে সেখানে দারিদ্র্য এতটাই কমেছে যে, এখন আর কোন কামলাকিষান, দিনমজুর ওই অঞ্চল থেকে দেশের কোথাও যায় না। বছরকয়েক আগেও বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের বড় পরিচিতি ছিল দারিদ্র্যপীড়িত এলাকা (যা মঙ্গা নামে অধিক পরিচিত)।

এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেখানে গ্রামীণ উন্নত সড়ক ব্যবস্থা আছে সেখানে দারিদ্র্যতার হার ৫৭ ভাগ থেকে ২৪ ভাগে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে এই এলাকাগুলোতে সঞ্চয়ের হার ৩৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৮ শতাংশে ঠেকেছে। গবেষকরা দেখেছেন, পাকা সড়ক ও গ্রাম বিদ্যুতায়িত হওয়ার সঙ্গেই উন্নয়নের বাকি কাজ গ্রামের মানুষ নিজের তাগিদেই করতে থাকে। জীবনমান উন্নত হওয়ার সঙ্গে অবকাঠামো স্থাপনা বিশেষ করে বসতভিটা পাকা হতে থাকে। এই কাজ অনেকটা এগিয়ে দেয় রেমিটেন্স পাঠানো ব্যক্তিরা। রেমিটেন্সে গ্রামের মানুষ প্রথমেই দুইটি কাজ শুরু করেÑপাকা বাড়ি নির্মাণ ও জমি কেনা। এর পর পাকা বাড়ি সাজাতে আসবাবপত্র, রঙ্গিন টিভি, রেফ্রিজারেটর (ফ্রিজ) এমনকি ওভেন পর্যন্ত তারা কেনে। গ্রামে লিক্যুফায়েড পেট্রোলিয়াম (এলপি) গ্যাস সিলিন্ডার পৌঁছে গেছে রান্নাঘরে। সাফল্য এসেছে শিক্ষার বিস্তারেও। উন্নত সড়কের গ্রামগুলোত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা হার শতভাগের কাছাকাছি ঠেকেছে। মেয়ে শিক্ষার হার বেড়ে ড্রপ আউট কমেছে। বাল্যবিয়ের হার কমেছে। বিশেষ করে শিক্ষিত মেয়েদের কম বয়সে বিয়ের কথা হলে তারাই বিয়ে ঠেকিয়ে দেয়। তথ্যপ্রযুক্তির প্রভাব এতই বেশি যে গ্রামের প্রত্যেক মানুষের হাতেই আছে সেলফোন। যে কৃষকের অক্ষরজ্ঞান কম তারাও এখন মোবাইলফোনে নম্বর সেভ করে কথা বলে। শিক্ষিত তরুণ-তরুণী স্মার্ট ফোন, ট্যাব, ল্যাপটপ ব্যবহার করে। এক তথ্যে দেখা যায়, ১৯৯০ সালে গ্রামীণ পাকা সড়ক ছিল মাত্র ৮ হাজার ৬শ’ ৬০ কিলোমিটার। বর্তমানে তা কয়েক শ’ গুণ বেড়েছে।

প্রকাশিত : ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

১৪/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



ব্রেকিং নিউজ: