কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

মেলায় প্রথম বই

প্রকাশিত : ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • অঞ্জন আচার্য

প্রতিটি লেখকের কাছেই তাঁর প্রথম বইয়ের প্রকাশ নিয়ে আসে এক অন্যরকম অনুভূতি। আবেগতাড়িত ভালোবাসা ও অলৌকিক আনন্দ জড়িয়ে থাকে বই প্রকাশের যাবতীয় আয়োজনে। আলোতে উদ্ভাসিত হয় মন। বইমেলাটাকে তখন মনে হয় বড় আপন। মনে হয় যেন, পুরো মেলাটিই আয়োজন করা হয়েছে কেবলই তারই জন্য। অনেকে লিখছেন অনেক দিন ধরেই। কিন্তু বই প্রকাশে উদ্যোগী হননি বলে, দুই মলাটে বন্দী হয়নি সেই লেখাগুলো। এবারেই প্রথম মলাটবন্দী হয়েছে লেখা, এমন কয়েকজন লেখককে নিয়ে সাজানো হয়েছে আজকের আয়োজন।

সুহান রিজওয়ানের প্রথম বইটি এসেছে বইমেলায়। শুদ্ধস্বর প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত তাঁর ‘সাক্ষী ছিল শিরস্ত্রাণ’ নামের ৪৪০ পৃষ্ঠার বৃহৎ কলেবরের উপন্যাসটি ইতোমধ্যেই দারুণ সাড়া ফেলেছে মেলায়। বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের জীবনী অবলম্বনে রচিত এ উপন্যাস লিখতে গিয়ে বিস্তর ইতিহাস ঘাটতে হয়েছে তাঁকে- এমনটাই জানালেন লেখক। বইটির প্রেক্ষাপট সম্পর্কে বলতে গিয়ে সুহান বলেন- ‘এই কাহিনী একটি যুদ্ধের। সেই যুদ্ধের দেয়ালে নানা চলকের লুকোচুরি, দেশপ্রেমের ঢেউ আর বিশ্বাসঘাতকতার চোরাস্রোত, দাবার বোর্ডের ঘুঁটি হয়ে বহু মানুষের হাঁটা চলা।’ কবে থেকে লেখালেখির শুরু?- এমন প্রশ্নের উত্তরে সুহান বক্তব্য- ‘ছোটবেলা থেকে পড়তে ভালো লাগলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠবার আগে লেখালেখি নিয়ে ভাবা হয়নি। অনলাইন লেখক-সমাবেশ ‘সচলায়তন’-এ শখের বশে লেখা শুরু করি বছর সাতেক আগে। তখন থেকেই একটু-আধটু করে নিয়মিত লেখা হয় বিভিন্ন জায়গায়। তবে দুই মলাটের ভেতর কেবল নিজের লেখা জায়গা করে নিয়েছে এই বছরই। এই উপন্যাস লিখতে গিয়ে ইতিহাস নিয়েও আমায় গবেষণা করতে হয়েছে বিস্তর।’ প্রথম বই প্রকাশের অনুভূতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, অনুভূতি ব্যক্ত করা যথেষ্ট কঠিন কাজ। তীব্র শীতে স্টেশনের যাত্রীটি শেষ রাতে ট্রেনে উঠে যেমনটা স্বস্তি বোধ করেন, আমিও তেমনটা স্বস্তি বোধ করছি। আর অপেক্ষা করছি পাঠকের প্রতিক্রিয়ার।’

রাজীব নূর খান লিখেছেন প্রবন্ধের বই ‘বিকল্পহীন রবীন্দ্রনাথ’। প্রথম বই প্রকাশের অনুভূতি সম্বন্ধে জানতে চাইলে রাজীব জানান, সত্যি কথা বলতে কি, রবীন্দ্রনাথের গল্প-কবিতা-উপন্যাস-প্রবন্ধ এবং চিঠি এত গভীরভাবে তন্নতন্ন করে আমি আগে পড়িনি। বইটি লিখতে গিয়ে আমি রবীন্দ্র সান্নিধ্যে ধন্য হয়েছি। মানুষের এমন কোন মানবিক অনুভূতি নেই, যা রবীন্দ্রনাথের লেখায় পাওয়া যায় না। বইটি সম্বন্ধে লেখকের মূল্যায়ন হলো- ‘যারা রবীন্দ্রনাথকে ভালোবাসেন এবং যারা রবীন্দ্রনাথ বিদ্বেষী’- আমার এ বইটি তাদের জন্য। বইটি শেষ করতে আমার পাঁচ বছর সময় লেগেছে।’

রিপনচন্দ্র মল্লিকের প্রথম বই ‘কাঠপরানের দ্রোহ’। দেশ পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত প্রথম গল্পগ্রন্থটি প্রকাশের অনুভূতি জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘এবারের বইমেলা আমার কাছে একটু অন্যরকম। টের পাচ্ছি একটু ভিন্ন রকমের অনুভূতি। আগে যেখানে অন্য লেখকদের বইয়ের খবর পড়তাম, সেখানে এবারের বইমেলায় আমি নিজেই হয়ে উঠছি খবর।’ বইটি সম্বন্ধে রিপন জানান, বইটিতে অন্তর্ভুক্ত প্রতিটি গল্পই মূলত যাপিত সময়ের রেখাচিত্র ও একরাশ মায়াবি দীর্ঘশ্বাসের কথা মলাটবন্দী করা হয়েছে।

চৈতী আহমেদের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘কন্যারা জলজ নয়’। বইটি প্রকাশ করেছে অনুপ্রাণন প্রকাশন। কাব্যগ্রন্থে আত্মম্ভর উচ্চারণে আত্মবোধের সন্ধান দিচ্ছেন একজন নারী। ভূমি স্বরূপা নিজের অস্তিত্বের কথা, চাইলেই অস্বীকার করা যায় না নারীর এমন তৃষ্ণার কথাই উঠে এসেছে কবির মেদমুক্ত কাব্যভাষ্যে। লেখালেখি ও প্রথম বই প্রকাশ সম্বন্ধে চৈতী আহমদ বলেন, ‘লেখালেখি স্কুলজীবন থেকেই। প্রথম বই প্রকাশের অনুভূতি অবশ্যই আনন্দের। একজন কবির প্রথম বই প্রকাশের মতো সাহসী উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য অবশ্যই অনুপ্রাণন প্রকাশন-এর প্রতি কৃতজ্ঞ।’

মিছিল খন্দকারের ভাষ্য একটু অন্যরকম। তাঁর মতে, ‘আসলে কবির জীবন থেকে কবিতাকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। কবির পুরোটা জীবনই তার প্রস্তুতির সময়। আর তাঁর প্রতিটা বই-ই প্রথম বই বলে আমার মনে হয়।’ এবারের বইমেলায় ঐতিহ্য প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর প্রথম বই ‘মেঘ সামান্য হাসো’। কাব্যগ্রন্থটি সম্বন্ধে তিনি বলেন, ‘মানব সভ্যতা ও সাহিত্যের ইতিহাস-ঐতিহ্য জেনে বুঝেই আমার শেকড় ও সময়ের মধ্যে আমার স্বপ্ন ও ভাবনার ঘূর্ণিস্রোতের সারৎসারই লেখায় আনতে চেয়েছি। আর আমার সবসময় মনে হয়, কবিরা গাছের মতো অন্য কবির ছায়ায় বাড়ে না। সেক্ষেত্রে আমি শুধু আমার কথাটা আমার ভঙ্গিতে আমার মতো করে বলতে চেয়েছি।’ প্রথম প্রকাশিত বই সম্বন্ধে মিছিলের বক্তব্য : ‘জীবনের এই পর্যায়ে এসে মনে হয়, আসলে জীবন আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নিচ্ছে। লেখালেখি করাটা আমার জন্য যেন জীবনই নির্ধারণ করে দিয়েছে।’

দ্বিত্ব শুভ্রার প্রথম বই ‘চৌপাহারার গেহ’। জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত এ কাব্যগ্রন্থটি সম্বন্ধে কবির অনুভূতি- ‘ছিলাম কিংকর্তব্যবিমূঢ়, বই হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম, চোখ হলুদাভ ধূসর রঙের মতো নিষ্প্রভ। প্রচ্ছদের ওপর একটি নাম ছিল, সেটি আমার কিনা তা নিতান্ত অনিচ্ছায় ভেবে দেখলাম, আর যখন বুঝলাম আমার হাতে যে বইটি ধরা সেটি আমারই। সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে এলো দীর্ঘশ্বাস। দু’মিনিট পরে ওকে ফিরিয়ে দিলাম বুকস্টলের মরা কাঠের টেবিলে। বইটি নিয়ে আবার ফিরিয়ে দেবার পর যেন আমি দেখতে পাচ্ছিলাম, অক্ষরগুলো আমার জন্য খুব কাঁদছে।’

আনোয়ার কামালের লেখালেখি শুরু আশির দশক থেকে। তবে বই করা হয়নি কখনও। এবারই প্রথম আগের কিছু লেখা ও নতুন কবিতা নিয়ে মলাটবদ্ধ করা হলো তার। প্রকাশিত হলো কবিতাগ্রন্থ ‘নৈঃশব্দ্যের রাত্রিদিন’। জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত এ বইটি সম্বন্ধে লেখকের অনুভূতি : ‘এ যেন অন্যরকম অনুভূতি। মনে হচ্ছে আমি যেন এক অন্য জগতের ভেতর প্রবেশ করলাম। আমার প্রথম সন্তান জন্মগ্রহণ করার পর যেমন আনন্দিত হয়েছিলাম, কবিতার বই বের হওয়ায় ঠিক তেমনি আনন্দিত হয়েছি।’ বইটির বিষয়বস্তু সম্বন্ধে কবি বলেন, ‘আমি আমার কবিতায় প্রেম, দ্রোহ, দুঃখ জাগানিয়া, মাটি আর মানুষ এবং বিপ্লবের কথা বলেছি।’

শৈশব রাজুর লেখালিখির যাত্রা স্কুলজীবন থেকে। ‘সইসুর’ তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ। পূর্বা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত এই কবিতার বইটি সম্বন্ধে রাজু বলেন, ‘প্রথম বই প্রকাশ অবশ্যই অনেক আনন্দের ব্যাপার। আমি মনে করি, যে কোন সৃষ্টি মাত্রই প্রকাশের প্রহরগুণে। সৃষ্টির আনন্দ প্রকাশেই। কাব্যে যা বলছি, যা লিখছি তা আমার একান্ত হৃদয়ের স্খলন মাত্র। বস্তুকে আমি দেখি অনেকটা উল্টো করে। কবিতার সংজ্ঞায় লিখাগুলো কবিতা হয়ে উঠেছে কিনা সে বিচার আমি করতে যাই না। আমি শুধু আমাকে পাঠ করে যাই এক্স-রে প্লেটের মত।’

অহ নওরোজের প্রথম বই ‘নীল নৌকার নারী’। কবি প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত এ কাব্যগ্রন্থটি সম্বন্ধে নওরোজ বলেন- ‘কবিতাগুলোর মধ্যে প্রেম এবং মৃত্যুর ছায়া পাওয়া যাবে। প্রায় সব কবিতাই এই ব্যাপার দুটোকে কেন্দ্র করে লেখা।’ কবে থেকে লিখছেন জানতে চাইলে কবি উত্তর দেন, ‘লেখালেখি করা হয় ছোটবেলা থেকেই। প্রথম দিকে দু-চার লাইন করে লিখতাম। একটু বড় হয়ে যখন ক্লাস নাইনে পড়ি তখন থেকে কবিতাগুলো পূর্ণরূপ পেতে থাকে।’ লেখালেখি ও বই প্রকাশের অনুভূতি নিয়ে তার বক্তব্য, প্রথম বই প্রকাশের অনুভূতিটা মুখে বলে বোঝানটা খুবই দুরূহ। বই বের হওয়ার মুহূর্তটা ছিল আসলেই অন্যরকম। বিশ্বাস করতে পারছিলাম না যে, আমার বইও বইমেলায় বিক্রি হবে।’

বছর চারেক আগে জাতীয় এক দৈনিকে প্রথম কলাম লেখেন তানজীনা ইয়াসমিন। দীর্ঘ বিরতির পর ২০১৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে অন্য এক দৈনিকের বিশেষ সংখ্যায় ফিচার লেখেন তিনি। এভাবেই লেখালেখির শুরু। এরপরের লেখাই তার প্রথম উপন্যাস ‘তোরসা’। লেখালেখি ও প্রথম বই প্রকাশ সম্বন্ধে তানজীনা বলেন, ‘প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার বিভিন্ন অসামঞ্জস্যতায় আলোকের দিকনির্দেশনা দিয়েই লিখেছি উপন্যাসটি। বইটিতে সেনাঅভ্যুত্থানে ফাঁসির দ-প্রাপ্ত কর্মকর্তার পরিবারের সামাজিকভাবে বেঁচে থাকার লড়াই উঠে এসেছে, এসেছে পিতার দেশপ্রেম প্রমাণে মেয়ের অনতিক্রম্য যুদ্ধে নামা।’

প্রকাশিত : ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

১৩/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: