মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

রুশ সাহিত্যের তিন দিকপাল

প্রকাশিত : ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • জাহেদ সরওয়ার

রুশ সাহিত্যে আলেকজান্দার পুশকিন, ফিওদর দস্তইয়েভস্কি ও বরিস পাস্তারনাকের মধ্যে কিছু অলিখিত মিল আছে, যেমন তারা তিনজনেই ফেব্রুয়ারি মাসের সঙ্গে জড়িত। পুশকিন ও দস্তইয়েভস্কি যথাক্রমে দশ ও নয় ফেব্রুয়ারি প্রয়াত হয়েছেন। আবার বরিস পাস্তারনাকের জন্ম হয় দশ ফেব্রুয়ারি। এই তিন কালজয়ী সাহিত্যিকেরই জীবন কেটেছে ক্ষমতা কাঠামোর রুদ্ধশ্বাস বিরোধিতায়। যাঁর যাঁর আমলের সরকারের রক্তচক্ষু বিদ্ধ করেছে তাঁদের জীবন। তবু অদম্য সৃজনশীলতা তাদের নিজেদের পথ খুঁজে নিতে বাধ্য করেছে। তিনজনেরই সাহিত্যের প্রতি প্রতিশ্রুতিশীলতা বিশ্বজনীন। জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত, বারবার মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া, স্বজাতির হাতে নিগৃহীত হওয়ার পরও তাঁরা তিনজনই রুশ সাহিত্যের অগ্রগামী দিকপাল। রুশ সাহিত্যের কথা বললেই অনেকের সঙ্গে এই তিনজনকে অবশ্যই স্মরণ করতে হবে।

এক

আলেকজান্দার পুশকিন একই সঙ্গে সফল কবি ও গদ্যকার। তিনি মূলত আমলা ছিলেন। তৎতকালীন রুশ সম্রাট প্রথম আলেকজান্দারের আমলে পররাষ্ট্র দফতরে কর্মরত ছিলেন। কিন্তু তবুও প্রতিভা যার মজ্জায়, সেই সময়ের উচ্চবিত্তের সমাজ নিয়ে ‘মুক্ত শীর্ষক ওড’ নামক ব্যঙ্গ কবিতা লেখার দায়ে তিনি প্রথম নির্বাসিত হন রাশিয়ার দক্ষিণ অঞ্চলে, অবশ্যই সম্রাট প্রথম আলেকজান্দারের সিদ্ধান্তে। এই নির্বাসনকালেই তাঁর প্রথম দুটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এই নির্বাসন যেন তাঁকে আর পিছু ছাড়েনি। এই নির্বাসনকালই ছিল পুশকিনের সবচেয়ে সৃষ্টিশীল সময়। তিনি কখনোই নিবেদিত সরকারী কর্মকর্তা ছিলেন না। কারণ শাসন ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত বিষয়াশয়ের সমালোচক ছিলেন তিনি। গতানুগতিকতার বিরুদ্ধেই কবিতার যাত্রা। সবসময় রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা পুলিশের নজর ছিল তাঁর প্রতি। তাঁর এক চিঠি খুলে পড়ে গোয়েন্দা দল অভিযোগ করেন, তিনি নাস্তিকতার চর্চা করছেন। তাঁকে কর্মচ্যুত করা হয়। এবার তাকে নির্বাসন দেয়া হয় মায়ের গ্রামের জমিদারিতে।

কিন্তু রাষ্ট্রীয় নজরদারি সেখানেও তাঁকে দুর্দ- শান্তি দেয়নি। সেখানে থাকাকালীন তাঁকে নিজের আত্মজীবনীর খসড়া পুড়িয়ে ফেলতে হয়। তিনি আসলে রাষ্ট্রের পরিবর্তন চাচ্ছিলেন। যাই হোক তাঁর জীবনটাই আসলে সাহিত্যজগতে বাগ্ময় হয়ে আছে তাঁর স্ত্রীর পাণিপ্রার্থীর সঙ্গে দ্বন্দ্বযুদ্ধে। তিনি বাধ্য হয়ে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করেছিলেন হল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত হেককেনেরের দত্তক পুত্র দান্তেসকে। এখন অনেক গবেষকই বলেন যে, এই দান্তেসকে তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছিলেন তৎকালীন রাশিয়ার সরকার। এই উচ্চবংশীয় যুবক তার স্ত্রী নাতালিয়াকে সবসময় অনুসরণ করতেন। বহুবার বহুভাবে বারণ করা সত্ত্বেও এই নাছোড়বান্দা প্রেমিককে তিনি দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করেছিলেন। ফলশ্রুতিতে গুলি লেগেছিল পুশকিনের বুকে। ভয়াবহ আহত হয়েছিলেন তিনি। এবং এর দু’দিন পর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

এই লম্পট দান্তেসের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ তিনি জারের কাছে করলেও শোনেও না শোনার ভান করেছিলেন কর্তৃপক্ষ। হয়ত ভেবেছিলেন ভালই হয়েছে রাষ্ট্রবিরোধী পুশকিনকে এবার শাসানো গেল। নিয়ত সৃজনশীল পুশকিন বীরের মতো জীবন দিলেন। পুশকিন সম্পর্কে গোগল বলেছিলেন, পুশকিনের নাম উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে রুশ জাতীয় কবির চেহারা ভেসে উঠে। সত্যিকার অর্থেই অনেক মহাপ্রতিভাধর রুশ সাহিত্যিকরা তার দীপ্তি ম্লান করতে পারেননি কখনও। তাঁর কবিতা ও গদ্য সমানভাবেই পঠিত হয় এখনও বিশ্বে।

দুই

রুশ সাহিত্যের সবচেয়ে প্রতিভাবান লেখক হিসেবে ধরা হয় ফিওদর দস্তইয়েভস্কিকে। শুধু রুশ সাহিত্য নয় পৃথিবীর আধুনিক কথাসাহিত্য বলতে আমরা যা বুঝি তাতে দস্তইয়েভস্কির প্রভাব বিশাল। এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যারা কথাসাহিত্য চর্চা করেন তাদের অধিকাংশই দস্তইয়েভস্কির এই ঋণ স্বীকার করেছেন তাঁদের লেখায়। যেই অমৃত তিনি বিশ্ববাসীকে দিয়ে গেছেন তার সাহিত্য রচনার ভেতর দিয়ে তার ঋণ কখনও শোধ হওয়ার নয়। সেই জীবনটা মোটেও মসৃণ ছিল না। জীবনের অনেক হলাহল পানতে করতে হয়েছিল দস্তইয়েভস্কিকেও। নিদারুণ অর্থকষ্টের জীবনের সঙ্গে মদ্যপ উগ্র পিতার শাসন ছিল তার শৈশব কৈশোরের নিত্যসঙ্গী। তিনি মানসিকভাবে ভারসাম্যহীনতার দোলাচলে বাস করতেন। হয়ে উঠেছিলেন মৃগীরোগী। এই মূর্ছারোগের প্রকোপ সারাজীবন সহ্য করতে হয়েছিল তাকে। শারীরিক ও মানসিক ভগ্নদশা সমগ্র সত্তাকে গ্রাস করেছিল দস্তইয়েভস্কির। এমনই এক মূর্ছারোগী তাঁর ‘ইডিয়ট’ উপন্যাসের নায়ক প্রিন্স মিসকিন।

মাঝে মাঝে সুখের দেখা পেলেও একটি দৈত্য তাড়িত জীবন তাঁকে কখনোই পিছু ছাড়েনি। কোনো কাজে কোনো সংসারে তিনি থিতু হতে পারেননি। একটা লেখকের জীবন কাটাতে চেয়েছিলেন তিনি। শত লাঞ্ছনার ভেতরও আসলে তাই যাপন করেছেন তিনি। ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে পাস করার পর সরকারী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে চাকরি হয়েছিল দস্তইয়েভস্কির। পরে তিনি এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন, লেখক বলে মনে হতো নিজেকে, মাইনে করা ইঞ্জিনিয়ারের জীবন মেনে নিতে পারছিলাম না। এরপর চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে পুরোপুরি সাহিত্যে মনোনিবেশ করেন তিনি। এরপর প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর প্রথম রচনা ‘অভাজন’ বা গরিবলোক। এই উপন্যাস প্রকাশিত হওয়ার পর তিনি ব্যাপক প্রশংসা পান সমালোচকদের কাছে। একজন শক্তিশালী লেখককে যেন অনুভব করতে পারে রাশিয়ার সাহিত্যজগত। দস্তইয়েভস্কির পর উপন্যাস আসলে নতুন দিশা খুঁজে নেয়। রুশ সাহিত্য আর আগের মতো থাকেনি। পুশকিন গোগল বা তলস্তয়েরও প্রায় চরিত্র কিন্তু উচ্চবংশীয় তরুণেরা। অবশ্য পুশকিন আর গোগলের কিছু কিছু গল্পে এই নিরীহ গরিব কেরানিদের দেখা মিল ছিল। যেমন দস্তইয়েভস্কি তাঁর প্রথম রচনার পেছনে পুশকিনের পোস্টমাস্টার আর গোগলের ওভারকোটের ঋণ স্বীকার করেন। এরপর তিনি আর কিছুরই তোয়াক্কা করেননি। একের পর এক কালজয়ী লেখা লিখেছেন। তাঁর বহুল পঠিত উপন্যাসগুলোর মধ্যে আছে অপরাধ ও শাস্তি, কারামাজভ ভাইয়েরা, শাদারাত, বঞ্চিতলাঞ্ছিত, ইডিয়ট, জুয়াড়িসহ আরও অনেক কালজয়ী উপন্যাস। তিনি যেমন মানবতাবাদী, পরিবর্তনকামী লেখক ছিলেন তেমনি জীবনেও এসব মানতেন। তার ক্ষেত্রে জীবন ও লেখা একাকার হয়ে গেছে। সাহিত্যে নাম করার সঙ্গে সঙ্গে তিনি পরিবর্তনকামী রাজনৈতিক কর্মীদের সংস্পর্শে আসেন। তৎতকালীন জার বিরোধী শাসনতন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্ডারগ্রাইন্ড রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হন তিনি। বিপ্লবীদের পাঠচক্রের সদস্য হন তিনি। এতে রাষ্ট্রের গোয়েন্দাদের নজরে আসতে হয় তাঁকে। সংগঠনের আরও একুশ সদস্যের সঙ্গে দস্তইয়েভস্কি গ্রেফতার হন। জারের কারাগারে আট মাস তাদের বন্দী করে রাখা হয়। আট মাস পরে বিচারে অন্যদের সঙ্গে তাঁর মৃত্যুদ- হয়।

তাঁদের নিয়ে যাওয়া হয় বধ্যভূমিতে। ফায়ারিং স্কোয়াড মঞ্চে। কয়েক সারি করে দাঁড় করানো হয় তাঁদের। দস্তইয়েভস্কি ছিলেন দ্বিতীয় সারিতে। প্রথম সারির কয়েকজনকে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত করা হয়। সাইরেন বেজে উঠে। তাঁদের মুখে কালো মুখোশ পরিয়ে দেয়া হয়। তাঁদের পেছনে বন্দুক নিয়ে তৈরি সেনারা। হুকুমের সঙ্গে সঙ্গেই ফায়ার ওপেন করবেন। সেই মুহূর্তেই অশ্বারোহী হাজির। তার হাতে নতুন আদেশ। মৃত্যুদ- মওকুফ করেছেন জার। কিন্তু মৃত্যু থেকে ফিরে আসা বা কিছুদূরে দাঁড়িয়ে মৃত্যুকে দেখা হয়ে যায় দস্তইয়েভস্কির। মৃত্যুদ- রহিত করে তাকে চার বছরের জন্য নির্বাসনে পাঠানো হয় সাইবেরিয়ায়। এই অভিজ্ঞতা দস্তইয়েভস্কির পরবর্তী সমস্ত রচনায় তাঁর জীবন সম্পর্কে কৌতূহল বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে তার সর্বশেষ উপন্যাস কারামাজোভ ভাইয়েরায় এই অদম্য স্পৃহা লক্ষণীয়। এছাড়াও অনেক ছোটবড় গল্প লিখেছেন তিনি।

তিন

নানা বিষয়ে আগ্রহ থাকলেও জীবনে ঠিক কী হতে চান তাই ঠিক করতে পারেননি বরিস পাস্তারনাক। বাবার মতো আঁকিয়ে হতে চেষ্টা করেছিলেন শেষে তাও হওয়া হলো না। পড়েছিলেন দর্শন শেষ করা হলো না। হয়ত অনেক ব্যর্থতাই কবি করে তুলে একজনকে। পাস্তারনাকের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। পাস্তারনাক মূলত নিরঙ্কুশ কবি। তবে তাঁকে বিখ্যাত করেছে ডাক্তার জিভাগো উপন্যাসটা। এটার জন্যই তাঁকে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়। তাঁর কবিতা সম্পর্কে সোভিয়েত কবি সাহিত্যিক সমালোচকরা অভিযোগ করতে তিনি ব্যক্তিগত কবিতা লিখেন। সমাজ বিচ্ছিন্ন। অসামাজিক। পাস্তারনাক ছিলেন একজন খাঁটি কবির চরিত্র। তাঁর স্বভাব ঠিক সোভিয়েত সমাজ বাস্তবতার সঙ্গে মানানসই ছিল না। আবার তিনি মাতৃভূমি ছেড়ে কোথাও যাননি। অনেক কবি লেখকরাই তখন মাতৃভূমি ত্যাগ করেছিল। ইভান বুনিন, সলোঝিনিতসিনসহ আরও অনেকে। তাঁর সমসাময়িকদের মধ্যে এসেনিন, মায়াকভস্কি, মারিয়াত সভেত তাইয়েভা, পিলনিয়াক, জামিয়ান্তিনসহ অনেকেই বেছে নিয়েছিলেন আত্মহত্যার পথ। কিন্তু পাস্তারনাক কোথাও যাননি, আত্মহত্যাও করেননি। সত্তর বছর বেঁচেছিলেন। তিনি সোভিয়েত আমলে খুব বেশি সুযোগ না পেলেও নিরন্তর সাহিত্য চর্চায় মগ্ন থেকেছেন। বহুভাষী পাস্তারনাক নিয়মিত অনুবাদ করেছেন সেক্সপিয়র, গ্যাতে, শিলার, ভেরলেন, শেলিসহ অনেক পাশ্চাত্য কবিদের অনুবাদ করে দিনাতি পার করছিলেন।

তাঁর লেখা সোভিয়েত সাহিত্য পত্রিকাদিতে যেমন ছাপা হচ্ছিল না তেমনি তিনি যুগের ভারে লিখতেও পারছিলেন না। তাই সচল থাকার জন্য ক্রমাগত অনুবাদ করে যাচ্ছিলেন। ডক্তর জিভাগো লিখে তিনি সোভিয়েতে কোথাও ছাপতে পারেননি। ডক্তর জিভাগো বিদেশেই প্রথম প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জিতে নেয় নোবেল পুরস্কার। অবশ্য তখন সোভিয়েত বিরোধী পুঁজিবাদীরা বিভিন্নভাবেই সোভিয়েতকে নাজেহাল করার প্রক্রিয়া হিসেবেই পাস্তারনাককে পুরস্কৃত করেছিলেন বলে অনেকেই ধারণা করেন। হয়ত এর সত্যতাও আছে খানিকটা। না হলে দস্তইয়েভস্কি তলস্তয়দের মতো সাহিত্যের গ্র্যান্ড মাস্টারদের পুরস্কৃত করা হয় না। যে ক’জন রাশিয়ানকে সাহিত্যে পুরস্কার দিয়েছে তাঁরা সকলেই কোনো না কোনোভাবে সোভিয়েতবিরোধী যেমন পাস্তারনাম, বুনিন ও সলোঝিনিতসিন কেবল মিখাইল শালোখভ ছিলেন সবসময় সোভিয়েত পন্থী। তবুও পাস্তারনাকের কবিতা এখনও পঠিত হয় সারাবিশ্বে। তিনি লাস্ট সামার বলে আরও একটি উপন্যাস লিখেছিলেন।

প্রকাশিত : ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

১৩/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: