মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

অদ্ভুত দাঁড়কাক ॥ কোয়ান্টাম ফিকশনের অগ্রপথিক উইলসন হ্যারিস

প্রকাশিত : ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • আরিফুর সবুজ

সাহিত্যের অতি আধুনিক ধারা কোয়ান্টাম ফিকশন। এ ধারায় দ্বান্দ্বিক বিশ্বচরাচর এবং বাস্তবতার অপূর্ব সমন্বয় ঘটানো হয়। কোয়ান্টাম তত্ত্বে যেমন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অণুর ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করা হয় বস্তু, মানুষ এবং বিশ্বকে তেমনি এ ধারার সাহিত্যে অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়গুলোকে বিশ্লেষণ করা হয়, দেখানো হয় ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, ঘাত-প্রতিঘাত। প্রতিটি চরিত্রের চিত্রণ এমনভাবে করা হয় যে সহজেই আমরা প্রকৃত ঘটনার সঙ্গে তার যোগসূত্র খুঁজে পাই। সাহিত্যের এ ধারায় বাতুল বলে অবহেলা করা হয় না কোন কিছুকেই। সবকিছুরই গ্রহণযোগ্যতা আছে, বাস্তবতা আছে। সবকিছুর মাঝেই সম্ভাব্যতা খুঁজে দেখা হয় সাহিত্যের এ ধারায়। বিশ্লেষণ করে দেখা হয় মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। নিত্যদিনকার মানব কল্পনাÑ অনুমানের সঙ্গে বাস্তবতার সমন্বয় ঘটিয়ে এ ধারার গল্প উপন্যাসকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। কোয়ান্টাম ফিকশনের কথা বললেই স্বভাবতই কল্পবিজ্ঞানের কথা মনে হতে পারে। কিন্তু এ ধারায় বিজ্ঞানের সংযোগ আসতেও পারে আবার নাও পারে। এখানে মূল বিষয় বিজ্ঞান নয়। মূল হলো দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ। আধুনিক মানুষের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের সঙ্গে তাদের কল্পনার যোগসূত্রের মধ্যে দিয়ে ধারার গল্প উপন্যাসকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সাহিত্যের অতি আধুনিক এ ধারায় অতিপ্রাকৃতিক বিষয়ের মাঝেও বাস্তবতার সন্ধান করা হয়। সাহিত্যের এ ধারার এক অগ্রপথিক হলেন স্যার থিওডোর উইলসন হ্যারিস। গায়নার কীর্তিমান এক সাহিত্যিক।

পরীক্ষণধর্মী সাহিত্যে রচনার ক্ষেত্রে তাঁকে অনন্য প্রতিভাধর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিমূর্ত আর রূপকধর্মী লেখায় জুড়ি মেলা ভার তাঁর। তাঁর স্বকীয়তা একইসঙ্গে একই গল্প বা উপন্যাসে বিভিন্ন ধারার মেলবন্ধন সৃষ্টির অপূর্ব ক্ষমতা। জাদুবাস্তবতা, পরাবাস্তবতা, রহস্য, কল্পনা আর রূপকের অভূতপূর্ব সম্মিলনে অনবদ্য সব সাহিত্যে রচনায় বিশেষ পারঙ্গম তিনি। তাঁর একটি লেখার মাঝেই পাঠক আস্বাদন করতে পারেন বিভিন্ন সাহিত্যে ধারার রস। লেখালেখির বিভিন্ন প্যাটার্ন তথা স্টাইলের উপর পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়ে উপন্যাস আর প্রবন্ধে সৃষ্টি করেছেন বৈচিত্র্যতা। পাঠককে দিয়েছেন ভিন্নধর্মী স্বাদ।

বিশ্বজুড়ে তিনি পরিচিত কীর্তিমান উপন্যাসিক হিসেবে অথচ সাহিত্যজগতে আবির্ভাব ঘটেছিল তাঁর কবিতার হাত ধরে। কিন্তু কবিতায় তিনি থিতু হতে পারেননি। উপন্যাস আর প্রবন্ধে বৈচিত্র্যতা সৃষ্টি করে নিজেকে দাঁড় করিয়েছেন মহান সাহিত্যিকদের কাতারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ইংরেজী সাহিত্যের অন্যতম বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর বিবেচনা করা হয় তাঁকে। ঔপনেবেশিকতার শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে রীতিমত সংগ্রাম করে গেছেন তিনি। কলম ধরেছেন দাসত্বের বিরুদ্ধে। সোচ্চার হয়েছেন অনভিপ্রেত শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে। বাস্তবতাকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করে মানুষকে জানিয়েছেন জীবনের কঠিনতর বাস্তবতা। এজন্য অনেক সময় প্রতীকধর্মীতার আশ্রয় নিয়েছেন তিনি। কোয়ান্টাম ফিকশনের মাধ্যমে দ্বান্দ্বিক বিশ্বের বৈপরীত্য, দ্বৈততার সঙ্গে পরাবাস্তবতার সংযোগ ঘটিয়ে, জাদুবাস্তবতার সঙ্গে রহস্যময়তার মেলবন্ধন ঘটিয়ে কিংবা পৌরাণিকতার সঙ্গে আধুনিকতাকে মিশিয়ে তিনি বাস্তব জীবনকে অতি বাস্তবে চিত্রণ করে দেখিয়েছেন।

এছাড়া তিনি নিজ দেশ গায়নাকে তাঁর লেখায় প্রাধান্য দিয়েছেন। গায়নার ঐশ্বর্যম-িত ঐতিহ্য-সংস্কৃতির জন্য তিনি গর্বিত। তিনি জীবনভর চেয়েছেন গায়নাকে সারা বিশ্বের কাছে পরিচিত করে তুলতে। আর তাই লেখনীতে গায়নার ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রকৃতি ও মানুষের জীবনধারা ইত্যাদি তুলে এনেছেন। তাঁর লেখায় ক্রস কালচারালিজমের প্রভাব দেখা যায়। এর কারণ গায়নার প্রাচীন ঐতিহ্যর সঙ্গে ব্রিটিশ সংস্কৃতির মিলেমিশে একাকার হয়ে যাওয়া। হ্যারিস মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন ক্রস কালচারালিজমের প্রভাবে তাঁর দেশের মানুষের মন মানসিকতার পরিবর্তন। আর সে বিষয়টিকেই নিয়ে এনেছেন তাঁর অনেক লেখাতেই।

সমালোচকরা প্রায়শই হ্যারিসের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হন তাঁর সাহিত্য রচনায় থিমের বৈচিত্র্যতা সৃষ্টির জন্য। তিনি ঔপনেবেশিকতায় বন্দী মানুষের জীবনসংগ্রামকে এমন বাস্তবসম্মতভাবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন যে, পাঠক সহজেই তাঁর লেখার মধ্য দিয়েই যেন শুনতে পায় শোষিত মানুষের কান্না। মুক্তির আর্তি। সত্য প্রকাশের নির্ভীক সৈনিক হ্যারিস। গায়নাবাসীর ওপর কিভাবে দৈত্যের মতো কৃপাণ চালিয়েছে শাসকগোষ্ঠী, তা তিনি নির্ভীক চিত্তে লেখনীতে নিয়ে এসেছেন। তবে তাঁর বর্ণনাধর্মী লেখাগুলো অত্যন্ত জটিলও তীর্যক এই সমালোচনা সমালোচকরা প্রায়শই করে থাকেন। এটা সত্যি। তাঁর রূপকধর্মী কিন্তু এটাই তাঁর লেখার স্বকীয়তা। তিনি বাস্তবতা, পরাবাস্তবতা, জাদুবাস্তুবতা ইত্যকার সাহিত্যিক টার্মগুলোকে অবলীলায় সাহিত্যেসৃষ্টিতে ব্যবহার করেছেন। রহস্যময়তা, পৌরাণিকতার সঙ্গে আধুনিকতার অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়ে সৃষ্টি করেছেন অসাধারণ সব সাহিত্যে।

খ্যাতিমান এই সাহিত্যিকের জন্ম নিউ আমস্টারডমে (ব্রিটিশ গায়না নামে পরিচিত) ১৯২১ সালে। তাঁর বাবা ছিলেন বীমা কোম্পানির একজন এজেন্ট। শৈশব-কৈশোর কেটেছে গায়নার রাজধানী জর্জটাউনে। এখানকার কুইন’স কলেজে লেখাপড়া করেন তিনি। ভূমি জরিপ ও ভূতত্ত্বের ওপর লেখাপড়া করেন। এরপর পেশা হিসেবে বেছে নেন সার্ভেয়ারের কাজ। এই কাজে তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন সাভানা ও রেইন ফরেস্টে যা পরবর্তীতে তাঁর অনেক বইয়ের বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়। ১৯৪৫ সালে তিনি বিয়ে করেন সিসিলে ক্যারেউকে। সে বছর থেকেই শুরু করেন লেখালেখি। ১৯৪৫ সাল থেকে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত হ্যারিস ‘কায়েক ওভার অল’ লিটেরেরি ম্যাগাজিনে বিভিন্ন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ লিখে গেছেন। এবং এর মধ্যে দিয়েই গায়নার বুদ্ধিজীবী মহলের একজনে পরিণত হয়েছেন। হ্যারিস গায়না ছেড়ে ইংল্যান্ডে আসেন ১৯৫৯ সালে। দেশ ছাড়ার আগ পর্যন্ত তাঁর তিনটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছিল। তখনও তিনি কোন উপন্যাস লেখেননি। ইংল্যান্ডে আসলে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় স্কটিশ সাহিত্যিক মার্গারেট বার্নেসের সঙ্গে। মার্গারেটকে বিয়ের পর তিনি কবিতার পরিবর্তে উপন্যাস লেখায় মনোনিবেশ করেন। বিভিন্ন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে গেস্ট লেকচারার হিসেবে কাজের ফাঁকে ফাঁকে লিখে চলেন অসাধারণ সব সাহিত্যকর্ম।

১৯৬০ সালে প্রকাশ করেন তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘প্যালেস অফ দ্য পিকক’। এটি তাঁর ‘দ্য গায়না কোয়ার্টেট’ সিরিজের প্রথম বই। এরপর একে একে লেখেন দ্য ফার জার্নি অব আওদিন (১৯৬১), দ্য হোল আর্মোর (১৯৬২), দ্য সিক্রেট লেডার (১৯৬৩) বইটি। ‘প্যালেস অফ দ্য পিকক’ বইতে আমরা দেখি নিষ্ঠুর ডোনির অত্যাচারের হাত থেকে পরিত্রাণ পেতে তাঁর খামারের শ্রমিকরা পালিয়ে যায়। ‘দ্য ফার জার্নি অব আওদিনে’ দেখি আওদিন নামের এক চাকর তার মনিবের মেয়ে বেটিকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করতে পালিয়ে নিয়ে যায়। এবং তাদের মাঝে জন্মানো প্রেম ভালোবাসার ফসল দু’সন্তানের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায় বইটির কাহিনী। ‘দ্য হোল আর্মর’ বইতে দেখি মাগদা নামক এক বেশ্যার ছেলে ক্রিস্টোকে খুনের দায়ে পালিয়ে বেড়াতে। ‘দ্য সিক্রেট লেডার’ বইটির কাহিনী রাসেল ফেনউইককে নিয়ে আবর্তিত হয়। তিনি সার্ভে কাজে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে গিয়ে সেখানকার সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামে জড়িয়ে পড়ে চাকরি এবং জীবনকে যেভাবে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছিলেন, সেটাই বইটিতে বিধৃত হয়েছে।

‘দ্য আই অব দ্য স্কেয়ারক্রো’ বইটি ডায়েরিধর্মী যেখানে স্মৃতিকথা হাতড়ানোর মধ্যে দিয়ে গায়না, জর্জটাউন এবং আমাজোনিয়ান রেইনফরেস্টের বিভিন্ন দিক উপস্থাপন করা হয়েছে। তাঁর ওয়েটিং রুম উপন্যাসটিও ডায়েরিধর্মী। এতে সুসান ফরেস্টাল নামক এক অন্ধ নারীর করুণ জীবন কাহিনী তাঁর ডায়েরির মধ্যে দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে। ‘টুমাটুমারি’ বইটিতে প্রডুন্সের মানসিক বিশৃঙ্খলার বর্ণনার মধ্যে তিনি মানুষের স্বপ্ন, সচেতনতা ও মানসিক বৈকল্যর নানাদিক তুলে ধরেছেন। তাঁর একটি বিখ্যাত সিরিজ ‘কার্নিভাল ট্রিলজি’। এই সিরিজের বই কার্নিভাল (১৯৮৫), দ্য ইনফিনাইট রিহার্সেল ( ১৯৮৭), দ্য ফোর ব্যাংকস অব দ্য রিভার স্পেস (১৯৯০)। এই বইগুলোতে কোয়ান্টাম ফিকশন ধারার অনুসরণ করা হয়েছে। এই সিরিজের বইগুলোকে অনেকে হোমারের ওডিসি’র সঙ্গে তুলনা করেন।

উইলসন হ্যারিসের উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলো হলো প্যালেস অফ দ্য পিকক (১৯৬০), দ্য ফার জার্নি অফ আওদিন (১৯৬১), দ্য হোল আর্মর ( ১৯৬২), দ্য সিক্রেট লেডার (১৯৬৩), হার্টল্যান্ড (১৯৬৪), দ্য আই অব দ্য স্কেয়ারক্রো (১৯৬৫), দ্য ওয়েটিং রুম (১৯৬৬), টুমাটুমারি (১৯৬৭), অ্যাসেন্ট টু ওমাই (১৯৬৮), দ্য সিøপারস অব রোরাইমা (১৯৬৯), দ্য এজ অব দ্য রেইনমেকারস (১৯৭১), ব্ল্যাক মার্সডেন: এ ট্যাবুলারাসা কমেডি (১৯৭২), কম্পেনিয়নস অব দ্য ডে এ্যান্ড নাইট (১৯৭৫), জেনেসিস অব দ্য ক্লাউনস (১৯৭৭), দ্য ট্রি অব দ্য সান (১৯৭৮), দ্য অ্যাঞ্জেল অ্যাট দ্য গেট (১৯৮২), কার্নিভাল (১৯৮৫), দি ইনফিনাইট রিহার্সেল (১৯৮৭), দ্য ফোর ব্যাংকস অব দ্য রিভার স্পেস (১৯৯০), রিসারকেশন অ্যাট সোরো হিল (১৯৯৩), জোনসটাউন (১৯৯৬), দ্য ডার্ক জেস্টার (২০০১), দ্য মাস্ক অব দ্য বেগার (২০০৩), দ্য গোস্ট অব মেমোরি (২০০৬)। তাঁর ছোট গল্পের বইয়ের মধ্যে কানাইমা (১৯৬৪) এবং কবিতার বইয়ের মধ্যে ফেটিশ (১৯৫১), দ্য ওয়েল এ্যান্ড দ্য ল্যান্ড (১৯৫২) এবং ইটারনিটি টু সিজন (১৯৫৪) উল্লেখযোগ্য। এছাড়া তিনি অনেক নন ফিকশন বইও লিখেছেন যেগুলোতে গায়নার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সমাজ বাস্তবতাকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

উইলসন হ্যারিস সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টইন্ডিজ, ইউনিভার্সিটি অব লেইজসহ বিভিন্ন নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডিগ্রী লাভ করেছেন। এছাড়া গায়না লিটারেরি প্রাইজ, অ্যানিসফিল্ড উল্ফ বুক এ্যাওয়ার্ডসহ আরও বিভিন্ন পুরস্কার অর্জন করেছেন। তবে সর্বোচ্চ স্বীকৃতি হিসেবে ২০১০ সালে রানী এলিজাবেথের কাছ থেকে লাভ করেন নাইট উপাধি। এখন তাঁর বয়স চুরানব্বই বছর। শারীরিক দুর্বলতায় এখন তিনি লিখতে পারছেন না। কিন্তু যা লিখেছেন, যা সৃষ্টি করেছেন, তার জন্য চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন তিনি বিশ্ববাসীর কাছে। বিশেষ করে কোয়ান্টাম ফিকশনের জন্য।

প্রকাশিত : ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

১৩/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: