কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

হারানো সূত্রের সন্ধানে শোয়াইব জিবরান

প্রকাশিত : ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

কমলকুমার মজুমদার (১৯১৪-১৯৭৯) কাজ করেছেন নানা বিষয় নিয়ে। বাংলার লোকশিল্প, চারু ও কারুকলা, সঙ্গীত, চলচ্চিত্র, জনগণনা, নৃত্য, মঞ্চনাটক, সাহিত্য নিয়ে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই রেখেছেন নিজস্ব চিন্তার মুদ্রাছাপ। ফলে প্রতিটি ক্ষেত্র, বিশেষত তাঁর সাহিত্যের করণকৌশল নিয়ে তৈরি হয়েছে তুমুল বিতর্ক। কমলকুমার হয়ে উঠেছেন বাংলা সাহিত্যে বিতর্কে কণ্টকাকীর্ণ, নির্মাণে নিঃসঙ্গ একটি নাম।

বিতর্কের সূচনা হয়েছিল তাঁর একেবারে প্রথম দিকের রচনা জল গল্পটি প্রকাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই। গল্পের একটি অমোঘ বাক্য ‘ফজল হয় ভাল লোক’ এর হয় ক্রিয়াপদের ব্যবহারকে কেন্দ্র করে সাহিত্যমহল দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিলেন। এর একভাগে ছিলেন তৎকালের তরুণ কবি লিটলম্যাগকর্মীবৃন্দ আর অন্যভাগে ছিলেন প্রথাগত লেখকরা। সে ধারা আজও চলমান। একপক্ষ তাঁকে দুর্বোধ্য, তান্ত্রিক, ব্যর্থ মধ্যবিত্ত বিদ্রোহী, পুরানপুরুষ বলে প্রত্যাখ্যান করে চলেছেন আর অপর পক্ষ তাঁকে গ্রহণ করেছেন লেখকদের লেখক হিসেবে। সন্দীপন ঘোষণা করেছেনÑ ‘যে কমলকুমার বুঝে না, কলকাতা তাঁকে শিক্ষিত মনে করে না।’ বলাবাহুল্য সাধারণ পাঠক যোগ দিয়েছেন প্রথম পক্ষেরই সঙ্গে। অবশ্য তাতে তাদের দোষ দিয়ে লাভ নেই যদি একটি উপন্যাস লিখিত হয় একটি মাত্র বাক্যে দাঁড়ি কমাহীনভাবে, বা এমন একটি দীর্ঘ উপন্যাস রচিত হয় যার কাহিনী নেই এমনটি কোন চরিত্রের নামনিশানা পর্যন্ত নেই। আর একটি উপন্যাসের এক একটি বাক্য রচিত হয় ১১টি সংযোজক অব্যয় পদ দিয়ে, অপরিচিত বাক্যরীতি দিয়ে!

কমলকুমার এক চিঠিতে লিখেছিলেন, পাঠককে আমরা ইউনিয়ন ভোটার ভাবি না। পাঠকের মুখের দিকে তাকাইয়া লিখিবার বাসনা আমাদের নাই। তিনি তাঁর রচনার জন্য মাত্র ১৯ জন পাঠক চেয়েছিলেন। প্রথম উপন্যাস প্রকাশের পর ঠাট্টা করে বলেছিলেন, বিক্রি হয়েছে ২৮ কপি, অবলা পাঠক ফেরত দিয়ে গেছেন ২৯ কপি। হ্যাঁ তিনি সাহিত্যের একেবারে ভেতর মহলের একটি বিরাট পাঠক সমাজ পেয়েছেন সত্য, যারা মূলত লেখক বা কবি কিন্তু বৃহৎতর সাধারণ পাঠক সমাজ থেকে রয়ে গেছেন দূরে।

কমলকুমার মজুমদারের রচনার বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ তাঁর রচনা দুর্বোধ্য। তাঁর করণকৌশলটি অচেনা, স্বসৃষ্ট। তাহলে কমলকুমার কী কোন অজানা ভাষায়, আমাদের অচেনা কোন বিষয় নিয়ে লিখেছিলেন?

কমলকুমারের ‘পিঞ্জরে বসিয়া শুক’ উপন্যাসে পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত কলকাতার বাবু সমাজ চেঞ্জারে যান রিখিয়ায়। সেখানে তাদের সামনে এসে দাঁড়ায় খাঁচায় তিতির পাখি হাতে আদিবাসী বালক সুঘরাই। বালক যেমন খাঁচার পাখির তেমনি আধুনিক বাবুরা বালকটির ভাষা বোঝার চেষ্টা করেন। তাঁরা দু’পক্ষই ব্যর্থ হন। আধুনিক বাবুরা তখন আদিবাসী বালকটিকে নাম দেন ‘মিসিং লিংক’। কমলকুমারও কি তেমনি কোন ‘মিসিং লিংক’, অর্ধমনস্ক, বিছানায় কাত হয়ে শুয়ে তাঁর ভাষায় ‘খুকু গদ্যে’ লেখা ষাট পৃষ্ঠার উপন্যাস পড়া আধুনিক পাঠকদের কাছে?

কমলকুমার মজুমদারের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ তাঁর ব্যবহৃত ভাষারীতি। অধিকাংশ সমালোচকদের কাছে তাঁর এ ভাষাকে স্বসৃষ্ট মনে হয়েছে। কেউ কেউ এমনকি বলেছেন এটি ভাষার এনার্কি। কিন্তু কমলকুমার বলছেনÑ এ ভাষা আমাদের আগে ছিল। আমাদের তন্ত্র-মন্ত্রে, চিঠিপত্রে, দলিলে দস্তাবেজে, কবিতায়। তাই বীরেন্দ্রনাথ রক্ষিত কমলকুমার মজুমদারের ভাষার আলোচনার শিরোনাম দিয়েছেনÑ ‘যে ভাষা ভুলিয়া গিয়াছি’। আধুনিক পাঠকরা যে ‘খুকুগদ্যে’ অভ্যস্ত তা মূলত ঔপনিবেশিক শাসনামলে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে তৈরি করা কৃত্রিম গদ্য। যার সঙ্গে বাংলা আদি গদ্যের বা ভাষার যোগ বেশ ক্ষীণ। ফলে সে গদ্যে অভ্যস্ত আধুনিক পাঠকদের কাছে একবাক্যে লেখা সুহাসিনীর পমেটম উপন্যাসের ভাষাকে অচেনা মনে হয়। অথচ, বাংলা গদ্যে এমন বিরাম চিহ্নের ব্যবহার আদিতে ছিল না। ১৫৫৫ সালে আসাম রাজ বর্ধমানের রাজাকে যে পত্র লিখেছেন তা এক বাক্যেই সমাপ্ত হয়েছে। দলিলপত্রের গদ্য এক বাক্যেও লিখিত ছিল। এমনকী মাত্র এক দাঁড়ি দুই দাঁড়ি দিয়ে লেখা পুরো মহাকাব্যকে এক সময় বাঙালী অনাধুনিক পাঠকের বুঝতে অসুবিধা হয়নি। অবশ্য কমলকুমারের রচনার দুর্বোধ্যতার একমাত্র কারণ তাঁর ভাষা নয়। যাঁরা এ অভিযোগটি করেন তাঁরা মূলত ভাষাকে বিষয় থেকে আলাদা করে দেখে থাকেন। কমলকুমারের রচনার ভাষা ও বিষয় অঙ্গা-অঙ্গিভাবে জড়িত।

ব্যতিক্রমবাদে কমলকুমারের অধিকাংশ রচনা মোটিফধর্মী, উপজীব্য বিষয় তত্ত্বদর্শন। যেমন সুহাসিনী পমেটম উপন্যাসের বিষয় সৌন্দর্যদর্শন, অন্তর্জলী যাত্রা উপন্যাসটি দাঁড়িযেছে গীতার একটি বাণীকে কেন্দ্র করে কিংবা গোলাপসুন্দরীর আধেয় জন্মান্তরবাদ। আর কথাসাহিত্যে যেমনটি সমসাময়িক জীবনের সমাজবাস্তবতার রূপায়ণ হিসেবে পাঠক ভাবতে অভ্যস্ত, তার উপন্যাস তা থেকে বহুদূর। তাঁর অধিকাংশ রচনার পটভূমি অতীতকাল। ইতিহাস ও অতীতকাল নিয়ে বঙ্কিম চন্দ্রর উপন্যাস রচনা করেছিলেন কিন্তু তাঁর রচনার উদ্দেশ্য অতীতকালের ঘটনার বর্ণনা নয়, বরং তত্ত্ব ও গভীরতলশায়ী সত্যে উপনীত হওয়া। তাঁর অধিকাংশ উপন্যাসের বা কথাসাহিত্যের চরিত্রগুলো আমাদের বাঙালী মধ্যবিত্ত পাঠকের প্রায় অচেনা আদিবাসী সাঁওতাল, সমাজের ব্রাত্য প্রান্তিক শ্রেণী। এবং সেখানেও তাঁর উদ্দেশ্য থাকে তাদের সাধারণ সমস্যা বা বিষয় নয়, বরং সে রিক্ত জীবনকে কেন্দ্র করে মহৎতর কোন ব্যঞ্জনায় উপনীত হওয়া। আর তা ফুটিয়ে তুলতে তিনি যে বহুতল বিশিষ্ট কাঠামো গড়ে তোলেন তাতে থাকে নানা রূপক প্রতীকের, অন্যান্য করণকৌশলের নানা অনুষঙ্গের ব্যবহার ফলে তা অনেক সময় সাধারণ পাঠকের বোধের জগতকে ছাড়িয়ে যায়। যেমন, গোলাপসুন্দরী উপন্যাসের বিলাসের অনুভূতির বর্ণনা দিয়ে লিখেছেনÑ ‘কাংড়া কলমের অভিসারিকা দর্শনে মানুষের যেরূপ একা বোধ হয়, ধৈবতের গাম্ভীর্যের রাজ্যে যেরূপ একাকী বোধ করে, সেইরূপ এই ক্ষেত্রে বিলাসকে পকেটস্থ এই খসখস শব্দ যাহা অন্ধকারকে নাম ধরিয়া ডাকেÑ বড় একা করিয়াছিল।... নিশ্চয়ই সেখানে গাঢ় অন্ধকার। ভগবানকে ধন্যবাদ অন্ধকারের রেখা নাই।’- সুদূর পাঞ্জাবের দুর্গনগরী কাংড়ার শিল্পরীতিতে আঁকা অভিসারিকা চিত্রের অনুষঙ্গ যেমন এখানে ব্যবহৃত হয়েছে তেমনি ব্যবহার করা হয়েছে সঙ্গীতের রাগ প্রসঙ্গ আর চিত্রকলার রং ও রেখার অনুষঙ্গ। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় অন্তর্জলী যাত্রা উপন্যাসের পাঠ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছিলেন, ‘এই উপন্যাসটি পড়ে বিস্ময়ে হতবাক হয়েছিলুম বলা যায়। এ রকম কোন রচনা আমরা বাংলা ভাষায় এর আগে পড়িনি। প্রথমে বেশ শক্ত লেগেছিল এক একটি বাক্য, খুবই দীর্ঘ, বার বার পড়েও সঠিক অর্থ বোঝা যায় না। কিন্তু শব্দ ব্যবহারের অপূর্ব ব্যঞ্জনায় এটা ঠিকই বুঝতুম যে অসাধারণ কিছু আস্বাদন করছি। ফৈয়াজ খানের তালগুলোর সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ছন্দ ও কারিকুরি আমরা যেমন বুঝতে পারি না কিন্তু অনুভব করতে পারি যে মহৎ শিল্পীকে শ্রবণ করছি।.. আমরা তখন কাংড়া জয়েসে দীক্ষিত হয়েছি, তবু বুঝেছিলুম কমলকুমারের রচনার জাত ওদের চেয়েও আলাদা।’

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো দীক্ষিত পাঠক যেখানে হোঁচট খেয়েছেন সেখানে সাধারণ পাঠকের কাছে কমলকুমারের রচনা কিছুটা দুরূহবোধ হওয়াই স্বাভাবিক। একথা সত্য যে কমলকুমারের রচনা পাঠের জন্য পাঠককেও একটি নির্দিষ্ট বোধের নির্দিষ্টস্তরে উপনীত হতে হয়। কমলকুমারের রচনার পরতে পরতে জাড়িয়ে আছে আমাদের হাজার বৎসরের ইতিহাস ঐতিহ্য, জাতীসত্তার সংস্কৃতি ও ভাষার বীজ- যা রক্ষিতের ভাষায় ‘আমরা ভুলিয়া গিয়াছি।’

শুরুর দিকে যেমনটি উল্লেখ করছিলাম, যে আদিবাসী বালকটিকে আধুনিক বাবুরা চিহ্নিত করেছিলেন ‘মিসিং লিংক’ এক দীর্ঘ কুয়াশাপূর্ণ উপন্যাস পাঠ শেষে আমরা অনুভব করি উপন্যাসটির সেই আসলে প্রধান চরিত্রÑ তাঁকে নিয়েই উপন্যাসটির আয়োজন। বেটে, ঠোঁটমোটা, আর্যদের কাছে কিছিরমিছির ভাষায় কথা বলা একটি রুদ্ধভাষা জাতিসত্তার প্রতীক। কমলকুমার কি এই প্রান্তিক, অশিক্ষিত চরিত্রগুলোর ভেতর দিয়ে, সুহাসিনীর পমেটম উপন্যাসের দাড়ি, কমাহীন দীর্ঘ একটি মাত্র বাক্যের ভেতর দিয়ে কোন হারানো সূত্রের সন্ধান দেন এই আমাদেরÑ ঔপনিবেশিকতাজাত আধুনিক বাবু পাঠকদের? আমরা তাতে তাঁর সবকিছু ধরতে হয়ত ব্যর্থ হই যখন নিজেই ভুলেছি নিজের ভাষা, বংশ লতিকা, ভূমি পরিচয়।

প্রকাশিত : ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

১৩/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: