মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ফিরে আসে নভেরার স্মৃতি

প্রকাশিত : ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • নাজনীন বেগম

নভেরা আহমেদ শুধু একজন ভাস্কর্যশিল্পী ছিলেন না তিনি ছিলেন আধুনিক এক নারী, যার সৌন্দর্য ও প্রতিভা সেই সময় বিচারে অবশ্যই অনন্য পর্যায়ে ছিল। শুধু তাই নয় ভাষা শহীদদের স্মরণে নির্মিত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের হামিদুর রহমানের মূল নকশার সঙ্গে যুক্ত ছিল নভেরা আহমেদের ভাস্কর্য।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত্রে পাকিস্তানী বাহিনী শহীদ মিনার ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেয়। সঙ্গে নিশ্চিন্ত হয়ে যায় নভেরা শিল্পকর্ম দুটি। নভেরা আহমেদ ১৯৭৩ সালে দেশ ত্যাগ করেন একাকিত্ব জীবন-যাপন করছেন। ফেব্রুয়ারি এলেই মনে পড়ে যায় লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা ভাস্কর নভেরা আহমেদের কথা।

নভেরা আহমেদের বাবা সৈয়দ আহমেদ বনবিভাগের কর্মকতা হিসেবে যখন সুন্দরবনে অবস্থান করছিলেন, সেই সময় ১৯৩০ সালে এই ভাস্কর্যশিল্পীর জন্ম। ফার্সি শব্দ নভেরা’র অর্থ নবাগত, বা নতুন জন্ম। নভেরার শৈশব কেটেছে কলকাতায় এবং সেখানে ‘লরেট’্ থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। স্কুল জীবনে তিনি ভাস্কর্য গড়ার দক্ষ হয়ে উঠেন। ১৯৮৭-এর দেশ বিভাগের পর কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজে ভর্তি হন। ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে তিনি লন্ডনে চলে যান। লন্ডনে গিয়ে নভেরা ১৯৫১ সালে ক্যাম্বারওয়েল স্কুল অব আর্টস এ্যান্ড ক্র্যাফটসের ন্যাশনাল ডিপ্লোমা ইন ডিজাইনের মডেলিং ও স্কাল্পচার কোর্সে ভর্তি হয়েছিলেন। ১৯৫৫ সালে কোর্স শেষ করে ডিপ্লোমা ডিগ্রী লাভ করেন। পড়ালেখার পাশাপাশি তিনি বিবিসিতে অনুষ্ঠান করতেন। বিবিসির অনুষ্ঠান পরিচালক ছিলেন নাজির আহমদ। শহীদ মিনারের রূপকার হামিদুর রহমান লন্ডনে পড়তে গেলে ভাই নাজির আহমেদের মাধ্যমে নভেরা আহমেদের সাক্ষাত ও পরে বন্ধুত্ব। নভেরা ছিলেন ভাস্কর আর হামিদুর রহমান ছিলেন অঙ্কনশিল্পী।

দুজনেই ছিলেন শিল্পানুরাগী। লন্ডনে থাকাকালীন সময়ে এই দুই বন্ধু মিলে ইউরোপের বড় বড় জাদুঘরগুলো ঘুরে ঘুরে দেখেছেন। তাঁরা উভয়ে লিয়োনাদ্রো ভেঞ্চির মোনালিসা ছবি দর্শন করতে প্যারিসের ‘লুভ‘ গ্যালারি পরিদর্শন করেন। লেখক হাসনাত আবদুল হাইর লেখা ‘নভেরা’ উপন্যাসে দুই বন্ধুর প্রগাঢ় বন্ধত্ব ও শিল্পানুরাগের বিষয়গুলো প্রকাশ পেয়েছে।

১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকার শহীদ মিনার নির্মাণের জন্য শিল্পীদের কাছে নকশা আহ্বান করলে শিল্পী হামিদুর রাহমান সেই ডাকে সাড়া দিয়ে ঢাকায় আসেন এবং শহীদ মিনারের জন্য এমন একটি নকশা প্রণয়ন করেন যেটাকে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন ‘আমার মায়ের মুখ’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। নির্বাচন ম-লির সিদ্ধান্ত অনুসারে কাজ শুরু করেন হামিদুর রহমান।

কয়েক দিনের মধ্যে শিল্পী উপলব্ধী করেন যে শহীদ মিনারের সঙ্গে ভাস্কর্য স্থান পেলে তা পূর্ণতা পাবে তাই তাঁর উদ্যোগে শিল্পী নভেরা আহমেদ ঢাকায় আসেন এবং শহীদ মিনারের মূল বেদীতে ভাস্কর্য তৈরি করেন। ১৯৬৫ সালের দিকে এই দুই শিল্পী যখন ঢাকায় অবস্থান করছিলেন তখন এদেশে শিল্প অনুরাগী খুব একটা ছিল না। কিন্তু হামিদুর রহমান ও নভেরা আহমেদ ভাষা শহীদদের স্মরণে কিছু একটা করার তাড়নায় জন্মভূমিতে ফিরে আসেন। তখন তাদের সামনে একটি সাধনার কাজ করেছে যে ভাষা শহীদদের স্মরণে নির্মিত মিনারটি এমন হবে যা হবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মিনারগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি। সেভাবেই পরিকল্পনা চলছিল। পরিকল্পনা অনুসারে নভেরার ভাস্কর্য এবং হামিদুর রহমানের ম্যুরাল ও নশকার কাজ সম্পন্ন হয়েছিল। নভেরার ঝঃধঃবফ ডড়সধহ নামে তিনিটি কাজ আছেÑ কোমল ভঙ্গিতে মা দৃষ্টিনত করে রেখেছে কোলের সন্তানের প্রতি। শিল্পীর এই মৃতমূর্তিগুলো সুইারল্যান্ডের জারম্যাটে ম্যাটার হর্ন (মাদার হর্ন) নামে যে পর্বতশৃঙ্গটি আছে তার সঙ্গে তুলনা করা যায়। সেই সুউচ্চ পর্বত আর তার আনত শৃঙ্গের সঙ্গে দেশমাতৃকার তুলনা চলে-সন্তানের প্রতি আশীর্বাদ ও স্নেহ আনত যা অপরাজেয় শৃঙ্গ।

১৯৫৮ সালে সামরিক আইনজারি হলে শহীদ মিনারের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে শহীদ পাক-হানাদার বাহিনী শহীদ মিনার সম্পূর্ণ গুড়িয়ে দেয়। স্বাধীনতার পর যখন আবার শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয় তখন মূল নকশার অনেক কিছু বাদ পড়ে। বাদ পড়ে যায় নভেরা আহমেদের ভাস্কর্য দুটি। শহীদ মিনারের সঙ্গে সম্পৃক্ত ভাস্কর্যশিল্পী নভেরা আহমেদও হারিয়ে যেতে থাকে মিনারটির সম্পৃক্ততার বিষয়টি থেকে। উপরন্তু তিনি ১৯৭৩ সাল থেকে অন্তরালে থাকার কারণে জনগণের হৃদয় থেকে হারিয়ে যান। যদিও ১৯৯৭ সালে সরকার তাঁকে একুশে পদক ভূষিত করেন। এই পুরস্কার প্রদানের কারণ ছিল তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনা। কিন্তু তার পরেও তিনি দেশে ফেরেননি।

১৯৭৩ সাল থেকে তিনি আছেন লোকচক্ষুর অন্তরালে। কোন অভিমানে তিনি এতদিন লোকচক্ষুর অন্তরালে আছেন, সে উত্তর কারো জানা নেই। কোন সরকারের পক্ষ থেকে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়নি। নভেরা আহমেদের দেশে ফিরুক, না ফিরুক তাঁর স্মৃতি আমাদের হৃদয়ের মনিকোঠায় চিরদিন অম্লান থাকবে শহীদ মিনারের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে।

প্রকাশিত : ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

১৩/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: