মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

পাহাড়ের রানী মুসৌরী

প্রকাশিত : ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • ফরিদুজ্জামান

দুন এক্সপ্রেস ধুঁকতে ধুঁকতে দেরাদুনে যখন প্লাটফর্ম পেল, তখন আমাদের মালপত্র নিয়ে নামার এনার্জিটুকুও আর অবশিষ্ট নেই। ট্রেন প্রায় ১০ ঘণ্টা লেট করেছে। সকাল ৮টার জায়গায় আমরা সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় সূর্য ডোবা প্রায় অন্ধকারে নতুন অভিজ্ঞতার খোঁজে এখানে এসে পৌঁছলাম। ট্রেনে আলাপ হয়েছিল আমাদের থেকে সিনিয়র এক ভদ্রলোকের সঙ্গে, আমাদের কম্পার্টমেন্টেই ছিলেন, উনি অলরেডি কোথাও কাজ করছেন, যদি চান্স পান, তাহলে সেটা ছেড়ে ইন্ডিয়ান ওয়েল এ্যান্ড গ্যাস কর্পোরেশন (ওএনজিসি)-এ জয়েন করবেন, তাই ইন্টারভিউ দিতে এসেছেন। উনি কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার যার পূর্বপুরুষের বাড়ি ছিল নাকি আমাদের বিক্রমপুরে। বাংলাদেশী জানতেই আমার প্রতি অতি উৎসাহী হয়ে বিক্রমপুরের পূর্বপুরুষের গল্প করতে লাগলেন। ডিসেম্বরের সন্ধ্যায় আমরা দেরাদুনে। ঠা-ায় আমাদের অবস্থা খারাপ। সমতলের লোক যখনই ঠা-া জায়গায় যায়, অনেক লেপ, কম্বল, আর সোয়েটার নিয়ে যায় সঙ্গে করে। কিন্তু আমরা তেমন কিছু আনিনি, কারণ দেরাদুনের ওএনজিসি অফিস এবং ইউনিভার্সিটি অব পেট্রোলিয়াম এ্যান্ড এনার্জি স্টাডিজে দু’দিন, দু-চারদিন রাস্তায়, একদিন দেরাদুনে, পরদিন ইউনিভার্সিটি অব পেট্রোলিয়াম এ্যান্ড এনার্জি স্টাডিজে ভিজিট সেরে পরদিন সন্ধ্যার ট্রেনে কলকাতার কল্যাণীস্থ কলেজে ফেরার জন্য বসতে হবে। ট্রেনে ঠা-ার জন্য কম্বল, দেরাদুনের জন্য ফুল সোয়েটার। এসবের কিছুই কিন্তু দেরাদুনের ঠা-াকে বশ করতে পারছিল না।

ছয়জনের একটা দল আমরা ট্রেন থেকে নেমে, বিক্রমে চেপে ভিক্টোরিয়া লজে এসে সেঁধোলাম। কম পয়সায় থাকার জায়গা, তবে গরম পানির সুবিধা আছে। খাওয়া-দাওয়া বাইরে বেরিয়ে পাঞ্জাবী বা বেংগলি হোটেলে। জায়গাটা স্টেশন রোডের ওপরেই। রাস্তার ওপরে হাতে ঠেলা দু’চাকার ঠেলা টাইপের গাড়িতে মুরগি, মাছ ভাজা হচ্ছে। ডিমের ডবল অমলেট আর পাউরুটি সেঁকা হচ্ছে। গাড়ির নিচে একটা কাপড়ের থলের মতো রয়েছে, চাইলে সেখান থেকে ছোট ছোট পাইটের চৌকো চৌকো কাচের শিশি বেরোচ্ছে। আমাদের সঙ্গে শহীদুল্লাহ বলে একজন আমাদের ঢাকারই ছেলে, সে ইন্সট্যান্ট ডিসিশান নিয়ে নিল, ওর রাতের মিলের। মামলেট-ব্রেড-পাইট। ঠাণ্ডা বাগে আনার মোক্ষম দাওয়াই। আমার শেষেরটা চলবে না, তাই সে জায়গায় চায়ের সঙ্গে সিগারেট। এখানে মানে উত্তর ভারতে, মোটামুটি সব জায়গায়, রাতের খাবার পরে ভাল করে দুধ দিয়ে এক গ্লাস চা খাওয়ার বেশ চল আছে। আমি সেটাকেই পছন্দ করলাম। তখন শরীর রোগা ফ্যাকাসে হলেও, ভেতরে কোন অসুখ ছিল না। রাতে চা খেলে ঘুম আসতে দেরি হবে, এমন কোন টেনশনও ছিল না। তাই কোন অসুবিধা ছিল না। লজের প্রায় না দেখা বাথরুমে ঠাণ্ডা গরম জল মিশিয়ে গায়ে ঢালতেই, সারা শরীর করে কেঁপে উঠল। গরম জল যথেষ্ট গরম আর নেই, বালতি করে নিচে থেকে আনা। যাই হোক, তাতেই জগন্নাথ দেবের স্নান যাত্রা সমাপন করে, লজের ছাদে বসে সকলে মিলে চা খাওয়া হলো।

সবাই নানা ধরনের আলোচনা করছে, আমার কেমন অদ্ভুত লাগছিল। মধ্যবিত্ত বাড়ির ঢাকার ছেলে আমি, কলকাতার কল্যাণীস্থ জেআইএস কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ানিরং-এর থেকে একটা স্টাডি ট্যুরে অংশ নিতে আজ ভারতের তৈলনগরী দেরাদুনে এসেছি। পড়াশোনার বদৌলতে এতদূর আসা তো গেছে, কিন্তু স্টাডি ট্যুর সফল হবে কি? স্টাডি ট্যুরের বিষয়াবলী সম্পর্কে অনেকের কাছ থেকেই খবর নেয়া হয়েছে। এর আগের বছরে কেমন হয়েছিল, তার একটা হালকা আভাস আমাদের দেয়া হয়েছিল, যারা আমাদের কলেজের সিনিয়র তাদের কাছ থেকে। আমরা মনে মনে তৈরি ছিলাম, আসা যাওয়ার ভাড়াটা নিয়ে ফেরত ট্রেনে বসার জন্য। শিক্ষকরা বলে দিয়েছিলেন, ভাল করে অংশ নিতে, যাতে একটা মজার অভিজ্ঞতা হয়। তাই আমাদের মধ্যে ইন জেনারেল স্টাডি নিয়ে খুব একটা দম বন্ধ করা চাপ ছিল না। বরং এখানে আসার কিছুক্ষণের মধ্যেই দু-একজন অতি উৎসাহী খবর নিয়ে এলো, বিকেলে কখন মুসৌরীর জন্য বাস ছাড়ে। যেহেতু একসঙ্গে আসা হয়েছে, তাই সবাইকে মুসৌরী যেতে হবে, কোন অজুহাত চলবে না। আমার টিকিট একদম দিনের হিসেবে কাটা, শিক্ষকই কেটে দিয়েছেন, তা আমি নষ্ট হতে দিতে পারি না। আমাকে তো ফিরতেই হবে। আর এখন টিকিট ফেরত দিলে পরের দিনের রিজার্ভেশন কোথায় পাব? বাকি পাঁচজন আমার এসব টিপিক্যাল বাঙালী মেন্টালিটিকে সিগারেটের ধোঁয়ার মতো উড়িয়ে দিয়ে বললেন, সকলে বিনা রিজার্ভেশনে যাব, কুছ পরোয়া নেহি। এতদূরে এসে মুসৌরী না দেখার কোন মানেই হয় না। আর মুসৌরী যাবার খরচ তো স্টাডি ট্যুরের হাত খরচ থেকে সঙ্কুলান হয়ে যাবে।

ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের স্কলারশিপের কল্যাণে ২২ সপ্তাহ যাবত ভারতের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছি। সেসব ছিল মাপাজোকা তারিখ দিনের এ্যাডুকেশনাল ট্যুর। ওঠ ছুড়ি, তোর বিয়ে গোছের নয়। কলেজে খবরইবা দেব কী করে? যেদিন পৌঁছানোর কথা সেদিন কলকাতায় না পৌঁছালে কলেজের লোকগুলো দুশ্চিন্তার আর অন্ত থাকবে না। আর যে কারণে পৌঁছাতে পারব না, তারও তো কোন আগাম পারমিশন নেয়া নেই! আমার কিছু ভাল লাগছিল না। আমার ক্লাসে এক বন্ধুকে আমার দিকে টানবার চেষ্টা করেও কোন লাভ হলো না। ঘর ছাড়া গরু এখন সবুজ দেখেই হাঁটবে, এটা ঠিক হয়ে গেছে। ভাল হোক মন্দ হোক, আমরা সকলে যাচ্ছি মুসৌরী ব্যাস। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরে লজটাকে অতটা অপরিষ্কার লাগল না। বরং লজের সঙ্গে লাগোয়া লজের মালিকের করা হনুমান মন্দিরটি বেশ ভাল লাগল। সুন্দর করে মোছা, চকচকে সব পূজার বাসনাদি, তাজা ফুল, অনেক ফুলই চিনতে পারলাম না। মনটা বিনা কারণেই শান্ত আর ভাল হয়ে গেল। একে একে স্নান করে ইস্ত্রি করা জামা-কাপড় পরে ৯টার মধ্যে সবাই তৈরি হয়ে গেলাম তেল ভবন যাবার জন্য। আমাদের ট্যুরের মেইন স্থাপনা ওখানেই হবে। রাস্তায় কচুরী, জিলাপি আর দুধ খাওয়া হলো। খুব ভাল টেস্ট, পার হেড আমার যতদূর মনে পড়ছে ১০ রুপি করে পড়েছিল।

২০১৪ সালের ডিসেম্বর, আমরা উত্তরখণ্ডের প্রধান শহর দেরাদুনে। যেখানে ইন্ডিয়ান কেন্দ্রীয় সরকারের অনেক সরকারী অফিস আছে, মিলিটারি এ্যাকাডেমি আছে, শুনলাম-আত্মসমর্পণের পরে অরোরাকে দেয়া পিস্তলটিও দেরাদুনের মিলিটারি এ্যাকাডেমিতে আছে। এফআরআই আছে, ওয়াডিয়া ইন্সটিটিউট অব হিমালয়ান জিওলজি-এর বিশাল ক্যাম্পাস আছে। আর আছে বিখ্যাত ঘণ্টাঘর, পল্টন বাজার মার্কেট, পাথর বাঁধানো উঁচু-নিচু রাস্তা। সকালে দেরাদুনকে অন্যরূপে দেখে বেশ ভাল লাগল। আলো আর অন্ধকার দেখার চোখ বদলে দেয়, আর সেইসঙ্গে বদলে যায় ভাল লাগার স্কেল। তিনজন করে গতকালের মতো বিক্রম ভাড়া করে আমরা তেলভবনের উদ্দেশে যাত্রা করলাম। তেলভবন পরিদর্শন করে অনেক কিছুই জানতে পারলাম। ভারতবর্ষের পাঁচটা জনপ্রিয় হিল স্টেশনের নাম বলতে হলে একটা নাম অবশ্যই হবে মুসৌরী (গঁংংড়ৎরব)। গাড়োয়াল হিমালয়ে প্রায় ৬৫০০ ফিট উচ্চতার এক সুন্দর পাহাড়ি শহর মুসৌরী যাচ্ছি ভেবেই বুকের ছাতি যেন দ্বিগুণ হয়ে গেল।

সাধারণ মানুষের কাছে মুসৌরী পরিচিত পাহাড়ের রানী নামে। বাঙালীরা মুসৌরী উচ্চারণ করলেও স্থানীয় উচ্চারণে জায়গাটার নাম মুসুরী। মুসৌরীর জনপ্রিয়তার অন্যতম প্রধান কারণ হলো ভারতের রাজধানী দিল্লী থেকে এর নৈকট্য, মাত্র ২৯০ কিলোমিটার। সরাসরি বাস যোগাযোগ আছে দিল্লী এবং মুসৌরীর মধ্যে। দিল্লীর প্রচ- গরম থেকে বাঁচতে অনেকেই উইক-এ্যান্ড-ট্যুরে ছুটে যান মুসৌরী। ব্রিটিশ ভারতেও এমনটি ঘটত। রাস্তায় অনেক শ্বেতাঙ্গ লোক দেখে চমকে উঠেছি। এদের অনেকেই নাকি পার্টিশনের পরে বিলেতে ফেরত না যাওয়া আদমীর বংশধর। জানলাম দেরাদুনের বন উন্নয়ন সংস্থা বিশ্ববিখ্যাত। উত্তরখ-ের রাজধানী দেরাদুন থেকে মুসৌরীর দূরত্ব ৩৫ কিলোমিটার। দেরাদুন থেকে ট্যাক্সিতে ঘণ্টা দেড়েকে পৌঁছে গেলাম মুসৌরীতে। দেখলাম- গোটা মুসৌরী শহরটাই ছবির মতো সুন্দর। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে কাটানো যায় মুসৌরীর ম্যালে। ম্যালের গায়েই গানহিল টপ, মুসৌরীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অংশ। ম্যাল থেকে রোপওয়ে আছে গানহিল টপে যাবার, পায়ে হেঁটেও ওঠা যায়। ইংরেজ আমলে এখান থেকে কামান দাগা হতো, তাই এ রকম নাম। গানহিল টপের ওপর থেকে দৃশ্যমান সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো একের পর এক হিমালয়ের পর্বতমালা।

গানহিল টপকে ঘিরে একদিকের রাস্তাটার নাম ম্যাল অন্যদিকের রাস্তাটার নাম ক্যামেল ব্যাক রোড। ক্যামেল ব্যাক রোডের এক প্রান্তে কুলরিবাজার অন্য প্রান্তে লাইব্রেরিবাজার। পাইন, দেওদারে ঢাকা এই রাস্তায় হেঁটে বেড়ানোই এক অনন্য অভিজ্ঞতা। মুসৌরীর সর্বোচ্চ অংশ হলো লালটিব্বা, মুসৌরী বাসস্ট্যান্ড থেকে দূরত্ব প্রায় পাঁচ কিলোমিটার। গেলাম- পায়ে হেঁটে। দলের দুজন গেল ঘোড়ায় চড়ে। লালটিব্বা থেকে হিমালয়ের বরফ ঢাকা চুড়োগুলোর দৃশ্য দেখে অভিভূত হয়ে গেলাম। মুসৌরীর আশে পাশে বেশ কয়েকটা জলপ্রপাত আছে, তার মধ্যে যেটা সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করেছিল তা হলো- কেম্পটি জলপ্রপাত। যমুনোত্রী যাবার রাস্তার ধারে মুসৌরী থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে কেম্পটি জলপ্রপাত। মুসৌরী থেকে গাড়িতে করে পৌঁছালাম। কয়েকশ সিঁড়ি ভাঙতে কষ্টের বিষয়টি ভুলেই গিয়েছিলাম।

গোসল সারলাম কেম্পটির বরফ ঠাণ্ডা পানিতে। গোসল করার জন্য জামা-কাপড়ও ভাড়া করে নিয়েছিলাম কেম্পটিতে। এছাড়াও মুসৌরী থেকে দেরাদুন রোডে প্রায় ৭ কিলোমিটার এগিয়ে বালতা বলে একটা জায়গা পেরিয়ে পায়ে হেঁটে ভাট্টা ফল্স দেখলাম। গাইডের কাছে শুনলাম-হরিদ্বার (দূরত্ব ৮৬ কি.মি.) বা হৃষীকেশ (দূরত্ব ৭৭ কি.মি.) থেকেও অনেকে দিনে দিনে বেড়িয়ে যান মুসৌরি। ড্রাইভার কাম গাইড জানাল- হিলস্টেশনে রাত্রিযাপন না করলে আসল আনন্দটা পাওয়া যায় না। তাই ঠিক করলাম-আধারাত পর্যন্ত হিলস্টেশনে রাত্রিযাপন করব। যে ভাবনা সেই কাজ- রাত্রে মুসৌরীর ম্যাল থেকে দুন ভ্যালির অসাধারণ দৃশ্য দেখে বিস্ময় প্রকাশ করার ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তাই শরৎচন্দ্রের কাছ থেকে ধার নেয়া ভাষায় বলে চলছি- ভগবান এ চোখ দুটি তুমি দিয়েছিলে, আজ তার স্বার্থক করলে। পরদিন সকালে ইউনিভার্সিটি অব পেট্রোলিয়াম এ্যান্ড এনার্জি স্টাডিজে যাওয়ার তাড়ায় রাতে ভাল ঘুম হতে হবে। তাই রাতেই দেরাদুনে এসে ভিক্টোরিয়া লজে এসে রাত্রিযাপন করলাম।

প্রকাশিত : ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

১৩/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: