আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

পাহাড়কন্যা সিজুক ডাকে ওই...

প্রকাশিত : ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • মো. জাভেদ-বিন-এ-হাকিম

এ্যাডভেঞ্চার প্রিয় দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ সব সময় একটু ব্যতিক্রমধর্মী ভ্রমণ করতে পছন্দ করে। ওই সমস্ত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে ভ্রমণের তালিকায় প্রথমস্থানে রাখে- যে সব জায়গায় সাধারণত সবার পদচারণা কিংবা নাম জানা থাকে না। এবার ঠিক তেমনি দেশের রাঙ্গামাটি জেলার দুর্গম ও গহীন পাহাড় অরণ্য পেরিয়ে গিয়েছিলাম সৌন্দর্যের রানী সিজুক জলপ্রপাতে। আগের দিন রাতে রওনা দিয়ে পরের দিন সকাল সাতটায় দীঘিনালা পৌঁছাই। দীঘিনালা গেস্ট হাউসে সাফসুতর হতে হতেই চান্দের গাড়ি ও গাইড এসে হাজির। ওদের সঙ্গে আগে থেকেই আলোচনা থাকায় দর-দাম নিয়ে সময় খুব একটা নষ্ট হয়নি। সকাল ৮টার মধ্যেই রাঙ্গামাটির নন্দরাম গ্রামের উদ্দেশে বের হয়ে যাই। পার্বত্য জেলার পিচঢালা পাহাড়ী পথে লক্কড়ঝক্কড় চান্দের গাড়ির ছাদে চড়ার যে আনন্দ তা লিখে বোঝানো সম্ভব না। কখনও গভীর গিরিখাদ, কখনও গগনচুম্বি বৃক্ষের গভীর অরণ্য কখনও বা আবার ঢেউ খেলানো সারি সারি পাহাড় পেছনে ফেলে ‘দে-ছুট’ ভ্রমণ সংঘের দামাল বন্ধুদের নিয়ে জীপ এগিয়ে যায়। পাহাড়ী পথের বাঁক খুবই রোমাঞ্চকর। যতদূর চোখ যায় শুধু মেঘের ভেলা, ঘন সবুজ পাহাড়ে আছড়ে পড়ে যেন আপন মনে লুটোপুটি খায়।

বেশ কয়েকটি আর্মি চেকপোস্ট পার হয়ে ঘণ্টখানেকের মধ্যেই নন্দরাম গ্রামে এসে হাজির হই। বাজার থেকে আরও দুজন গাইড নিয়ে এবার সুশৃঙ্খলভাবে ট্র্যাকিং শুরু। এতটা সময় যে পাহাড় সারি ছিল দৃষ্টির সীমানায়, সেই দিগন্ত ছোঁয়া পাহাড়ের উপর দিয়ে হাঁটছি। চারপাশে চমৎকার আর দীর্ঘদিন মনে রাখার মতো সব প্রাকৃতিক দৃশ্য! কখনও উপরে কখনও নিচে, কখনও বা আবার ঝুম ঘরে কিংবা আকাশছোঁয়া গাছের ছায়ায় বসে খানিকটা সময় বিশ্রাম নিয়ে দে-ছুট বাহিনী সিজুক পানে এগিয়ে যায়। দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় মোস্তাকের চাটনির মতো চুটকি আর ঝুমের ফরমালিনমুক্ত মারফাÑবাঙ্গী দেহ-মনের শক্তি জুগিয়েছে। প্রায় আড়াই ঘণ্টা হাঁটার পর সিজুক জলপ্রপাতের প্রথমটার দেখা পাই। বাহ্! কী সুন্দর! বিশাল বিশাল গাছের নিচে পাহাড়ের ফাঁক গলে অবিরাম পানির ধারা বইছে। চারপাশ নৈঃশব্দ্য। ঝর্ণার রিমঝিম শব্দে বন্ধুরা উদ্বেলিত। সবাই গা ভিজাতে চায়, আমি বারণ করি, কারণ আমাদের জন্য রয়েছে প্রকৃতির আরেক বিস্ময়।

আরও প্রায় এক ঘণ্টা হাইকিং-ট্র্যাকিং করার পর সিজুক ঝর্ণা হতে সৃষ্ট ঝিরির দেখা পাই। আশ্বর্য! অন্যান্য ঝিরি পথের চেয়ে এই পথটা যেন খুব বেশি রোমাঞ্চকর। লতা-গুল্ম পানিতে আছড়ে পড়েছে। প্রয়োজনীয় রসদ কাঁধে-মাথায় নিয়ে নেমে পড়ি অজানা ঘোলা জলে। পানির নিচে কর্দমাক্ত, হাঁটু-কোমর পানিতে কোথাওবা পা প্রায় ১০-১৫ ইঞ্চি পর্যন্ত দেবে যায়। ভয় পাই পুরো দেহ না আবার দেবে যায়! তবে সঙ্গে মোতাহের থাকায় সাহস হারাই না। ঝিরির পানিকে অজপাড়া গাঁয়ের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া খাল ভেবে নতুন বন্ধু তারা আনন্দে মেতে উঠে আর প্যাচপ্যাচে কাদায় জসিমের পা আটকে যাওয়ার পর ওঁঁর সাভাইরা নৃত্য শাহরুখ-দিপীকার লুঙ্গি ড্যান্সকেও হার মানায়। প্রায় ত্রিশ মিনিট হাঁটার পর সিজুক জলপ্রপাতের দেখা পাই।

ওয়াও! সিজুক সত্যিই তুমি রূপের পসরা সাজিয়ে রেখেছ এই গহীন বন-জঙ্গল ঘেরা পাহাড়ে! প্রায় সত্তর ফিট উপর থেকে অবারিত পানির ধারা গড়িয়ে পড়ছে পাহাড়ের পাদদেশে। ঝর্ণার পানির প্রবল চাপে চমৎকার বেসিন সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে সাঁতার কাটলেও মন ভরবে না, সে এক অপার্থিব সুখ। সুনসান নীরবতা খানখান করে দিয়েছে ঝর্ণার রিমঝিম শব্দ। শিকারি জোঁক পালিয়েছিল আমাদের উদ্দীপনার কাছে হার মেনে। আনন্দের জোয়ারে নির্ভয়ে, কাঁধের বোঁচকা রেখে সবাই নেমে যাই অবগাহনে। দীর্ঘক্ষণ জলকেলিতে মেতে থাকি। এরই মধ্যে ‘দে-ছুটের’ নতুন বন্ধু ফারুক মিয়া নুডলস রেধে মহাকাব্য রচনা করে ফেলেছেন। গভীর জঙ্গলে মায়াবী প্রকৃতি দিয়ে ঘেরা ঝর্ণার পাশে কলাপাতায় করে নুডলস খাওয়া আহ্! কী পরম স্বাদ, মনে থাকবে বহুদিন। এবার ফেরার পালা শুধু উপর দিকেই উঠতে হবে। বার বার ফিরে তাকাই আর আপন মনে বিড়বিড় করে বলি প্রকৃতি তুমি কত সুন্দর করে সাজিয়েছ আমাদের দেশটাকে। ‘দে-ছুট’ ভ্রমণ সংঘকে সিজুক ভ্রমণে বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করার জন্য শুভাকাক্সক্ষীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।

যোগাযোগ

সিজুক ঝর্ণার অবস্থান রাঙ্গামাটি জেলায় হলেও খাগড়াছড়ি দিয়ে যাতায়াত সুবিধা বেশি। ঢাকা থেকে বিভিন্ন পরিবহনের বাস খাগড়াছড়ি যায়, তবে শান্তি পরিবহনে দীঘিনালা পর্যন্ত যেতে পারবেন। থাকার মতো বেশ কয়েকটি আবাসিক হোটেল আছে। এগুলোর মধ্যে দীঘিনালা গেস্ট হাউস তুলনামূলক মান ভাল। দীঘিনালা হতে নন্দরাম চাঁদের গাড়ি রিজার্ভ যাওয়া-আসা ভাড়া নেবে তিন হাজার থেকে তিন হাজার ২শ’ টাকা পর্যন্ত। গেস্ট হাউস রুম ভাড়া ক্যাপল বেড ৬শ’ টাকা, গাইড বাবদ খরচ হবে এক হাজার ৫শ’ থেকে দুই হাজার টাকা। ঢাকা থেকে ননএসি পরিবহনে দীঘিনালা পর্যন্ত ভাড়া ৫শ’ ৮০ টাকা।

টিপস

সিজুক জলপ্রপাতে এখনও পর্যটকদের পদচারণা খুব বেশি হয়নি সুতরাং ভ্রমণকালীন দলবদ্ধ থাকুন। পর্যাপ্ত পরিমাণ শুকনো খাবার, পানি, টর্চ, মশা ও জোঁক প্রতিরোধের ক্রিম এবং শক্ত লাঠি রাখুন। আদিবাসীদের সঙ্গে বিনয়ের সঙ্গে কথা বলুন। দশ নম্বর আর্মি ক্যাম্পে নাম-ঠিকানা খাতায় লিখার সময় গাইডের সঙ্গে কথা বলে নিন। প্রয়োজনে দায়িত্বরত আর্মিদের সঙ্গে গাইডকে দিয়ে কথা সেরে নিন।

ছবি : দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ

প্রকাশিত : ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

১৩/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: