কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

১৯৭১ ॥ গণহত্যা ও নির্যাতন নির্ঘণ্ট গ্রন্থমালা প্রসঙ্গে

প্রকাশিত : ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • মুনতাসীর মামুন

মুক্তিযুদ্ধের প্রধান বৈশিষ্ট্য গণহত্যা-নির্যাতন। একের অধিক মানুষকে হত্যাকেই চিহ্নিত করা হয়েছে গণহত্যা হিসেবে। নির্যাতনের অন্তর্গত শারীরিক নির্যাতন, ধর্ষণ ও দেশত্যাগে বাধ্য করা। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বগাথা সবচেয়ে বেশি আলোচিত এবং তা স্বাভাবিক। কিন্তু, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও কোন একটি দেশে এত অল্প সময়ে এত হত্যাও হয়নি। যদিও আমরা বলি ৩০ লক্ষ শহীদ হয়েছেন কিন্তু মনে হয় সংখ্যাটি তারও বেশি হবে। গণহত্যা, বধ্যভূমি, নির্যাতন মুক্তিযুদ্ধের বয়ানে একেবারে নেই তা নয়, কিন্তু গুরুত্ব ততটা এর ওপর দেয়া হয়নি। যে কারণে মুক্তিযুদ্ধে আত্মত্যাগের ব্যাপারটি আড়ালে পড়ে যায়। কিন্তু ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যে গণহত্যা হয়েছিল তার ওপরই বেশি গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। চলচ্চিত্র, সাহিত্য, শিল্পকলা সব ক্ষেত্রে এখনও সেই গণহত্যার কথা ফিরে আসে। যে কারণে ইউরোপে ফ্যাসিবাদ আর নাজিবাদ জায়গা করে নিতে পারেনি। আমাদের এখানে তা হয়নি দেখে গণহত্যার সংখ্যা নিয়ে এখনও অনেকে প্রশ্ন করার সাহস রাখেন এবং হত্যাকারীদের সমাজ ও রাজনীতিতে এমনভাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়েছে তারা একটি রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। দেশে সামরিকবাদ, জঙ্গীবাদ, মৌলবাদ আবারও শেকড় গেড়েছে।

এ দেশে গণহত্যা-নির্যাতন চালিয়েছে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসর রাজাকার, আল-বদর, শান্তি কমিটির সদস্যরা। জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম, মুসলিম লীগ থেকেই মূলত এসব বাহিনীতে গেছে কর্মীরা। সুখের বিষয়, এসব মানবতা-বিরোধীদের বিচার শুরু হয়েছে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে।

দেশের আনাচে-কানাচে রয়েছে অসংখ্য বধ্যভূমি ও গণকবর। নির্যাতনের শিকার বহু নারী-পুরুষ এখনও রোমহর্ষক স্মৃতি রোমন্থন করেন। সেসব গণহত্যার বৃত্তান্ত, বধ্যভূমি ও গণকবরের কথা, এমন কী নির্যাতনের কথা বিজয়ের গৌরব-ভাষ্যে উপেক্ষিত থেকে গেছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস রচনায়, অনুপুঙ্খ ইতিহাস অনুসন্ধানে এসবের গুরুত্ব অপরিসীম। গণহত্যা, বধ্যভূমি ও নির্যাতনের ইতিহাস সংরক্ষণ এবং এ সংক্রান্ত সংগ্রহশালা তৈরি আমাদের জাতীয় কর্তব্য। এর মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস উঠে আসার পাশাপাশি উত্তরপ্রজন্মের মাঝে মুক্তিসংগ্রামের মর্মবাণী প্রতিভাত হবে। এই তাগিদ থেকে গড়ে উঠেছে ‘১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর’। এই প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য মুক্তিযুদ্ধকালে গণহত্যা, বধ্যভূমি, গণকবর ও নানামুখী নির্যাতনের দুষ্প্রাপ্র্য ও অমূল্য উপকরণ সংগ্রহ এবং জাতির সামনে মুক্তিযুদ্ধের মর্মকথা তুলে ধরা। এর পাশাপাশি একটি অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ, শোষণমুক্ত রাষ্ট্র ও সমাজ নির্মাণের বাণী প্রচার করা এ প্রতিষ্ঠানের আদর্শ।

এরই আলোকে এ যাবতকালে প্রাপ্ত গণহত্যা ও বধ্যভূমির ওপর ক্ষেত্রানুসন্ধানের মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে প্রত্যেকটি গণহত্যার ইতিবৃত্ত তুলে ধরা ‘১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন নির্ঘণ্ট গ্রন্থমালা’র উদ্দেশ্য। প্রত্যেকটি গ্রন্থ লেখকের স্বকীয়তা বজায় রেখেও নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে প্রণীত হবে। এর বিষয়-বিন্যাসের মধ্যে রয়েছে স্থানটির ভৌগোলিক অবস্থান, তৎকালীন অবস্থা, গণহত্যার পটভূমি, গণহত্যা ও নির্যাতনের বিবরণ, শহীদ ও নির্যাতিতদের নাম-পরিচয়, ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীর মৌখিক ভাষ্য, গণহত্যায় জড়িতদের নাম-পরিচয়, বধ্যভূমি সংরক্ষণের প্রয়াস, বর্তমান অবস্থা এবং সার্বিক মূল্যায়ন। প্রতিবেদনধর্মী হলেও পুরো কাজটি গবেষণামূলক।

গ্রন্থে অনেক আলোচিত্র/শিল্পীদের চিত্রকর্মের প্রতিলিপি ব্যবহার করা হয়েছে যা নেয়া হয়েছে অন্তর্জাল ও বিভিন্ন বই থেকে। মুক্তিযুদ্ধের ছবি যেহেতু জনস্বার্থে ব্যবহৃত হয় সে জন্য কখনও কেউ আপত্তি তোলেননি।

এ কাজের স্বাতন্ত্র্য এখানে যে, লেখক গণহত্যা ও বধ্যভূমির স্থলে সরেজমিনে গিয়ে, খোঁজ-খবর নিয়ে, গণহত্যা সংশ্লিষ্টজনের সঙ্গে কথা বলে, পর্যবেক্ষণ করেÑ সেই অশ্রু-শোণিতের দিনগুলোকে অন্তরে অনুভব করে তবেই প্রণয়ন করেছেন এই ভাষ্য। সবার হৃদয় নিংড়ানো কথামালা যেন এখানে মেলে ধরেছে ভয়াল দিনের স্মৃতি। ফলে এর মধ্য দিয়ে যে সেই গণহত্যা ও নির্যাতনের কথা অকৃত্রিমরূপে উঠে এসেছেÑ এ ভরসা আমরা করি।

‘দামেরখ- গণহত্যা’য় বাগেরহাট জেলার সুন্দরবন সন্নিহিত দুর্গম এলাকা মোংলার দামেরখ- গ্রামে সংঘটিত গণহত্যা-নির্যাতনের বৃত্তান্ত তুলে ধরেছেন সত্যজিৎ রায় মজুমদার। লালমাটিয়া, জৈনপুর ও খাজাঞ্চি বাড়ি গণহত্যা পুস্তিকায় সিলেট জেলার দক্ষিণ সুরমা উপজেলার কুচাই ইউনিয়নের লালমাটিয়া ও বরইকান্দি ইউনিয়নের জৈনপুর গ্রাম এবং সিলেট শহরের নয়াসড়কের খাজাঞ্চি বাড়িতে সংঘটিত গণহত্যা-নির্যাতন ও বধ্যভূমির বৃত্তান্ত তুলে ধরেছেন তপন পালিত।

‘মুজাফরাবাদ গণহত্যা’য় চট্টগ্রাম জেলায় পুটিয়া উপজেলার মুজাফরাবাদ গ্রামে সংঘটিত গণহত্যা-নির্যাতনের বৃত্তান্ত তুলে ধরেছেন চৌধুরী শহীদ কাদের। ‘বেলতলী গণহত্যা’য় কুমিল্লা জেলার লাকসাম উপজেলার লাকসাম রেলওয়ে জংশনের নিকটবর্তী বেলতলী সংঘটিত গণহত্যা-নির্যাতনের বৃত্তান্ত তুলে ধরেছেন মামুন সিদ্দিকী। ‘কালিগঞ্জ গণহত্যা’য় নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার কালিগঞ্জে সংঘটিত গণহত্যা-নির্যাতনের বৃত্তান্ত তুলে ধরেছেন আহম্মেদ শরীফ। ‘বিনোদবাড়ি মানকোন গণহত্যা’য় ময়মনসিংহ জেলার মুক্তাগাছা উপজেলার বিনোদবাড়ি মানকোন গ্রামে সংঘটিত গণহত্যা-নির্যাতনের বৃত্তান্ত তুলে ধরেছেন শান্তা পত্রনবিস। ‘বাদামতলা গণহত্যা’য় খুলনা জেলার বটিয়াঘাটা উপজেলার বাদামতলা বাজার এলাকায় পলায়নপর মানুষদের ওপর সংঘটিত গণহত্যা-নির্যাতনের বৃত্তান্ত তুলে ধরেছেন গৌরাঙ্গ নন্দী। ‘গোলাহাট গণহত্যা’য় নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর পৌরসভার গোলাহাটে যে গণহত্যা-নির্যাতন সংঘটিত হয় তার বৃত্তান্ত তুলে ধরেছেন আহম্মেদ শরীফ।

‘পাহাড়তলী গণহত্যা’য় চট্টগ্রাম শহরের খুলশী থানার সন্নিকটে পাহাড়তলীতে সংঘটিত গণহত্যা-নির্যাতনের বৃত্তান্ত তুলে ধরেছেন চৌধুরী শহীদ কাদের। ‘কাঠিরা গণহত্যা’য় বরিশাল আগৈলঝাড়া উপজেলার গৈলা ইউনিয়নের কাঠিরা গ্রামে সংঘটিত গণহত্যা-নির্যাতনের বৃত্তান্ত তুলে ধরেছেন হিমু অধিকারী। আমাদের এই প্রয়াসে যুক্ত হওয়ার জন্যে তাঁকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।

মুক্তিযুদ্ধের গণহত্যা-নির্যাতন, বধ্যভূমি ও গণকবর সংক্রান্ত বিদ্যাচর্চায় এ গ্রন্থমালা বিশেষ আলো ফেলবে বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস। সকলের সম্মিলিত প্রয়াসের মাধ্যমে শুধু গৌরব নয়, মুক্তিযুদ্ধের বেদনাবিধূর কাহিনী তুলে ধরতে পারলে মুক্তিযুদ্ধের বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস উঠে আসবে। এই বেদনা ও গৌরবের কাহিনী বয়ানের মাধ্যমে মানবতার জয়গান করে সম্প্রীতির সমাজ নির্মাণ আমাদের লক্ষ্য। মুক্তিযুদ্ধের ভাবাদর্শও তো তাই।

প্রকাশিত : ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

১৩/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: