কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

গণহত্যা ও নির্যাতনের দলিল

প্রকাশিত : ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • আইরীন আহমেদ

গ্রন্থ-১

সৈয়দ মুজতবা আলী বলেছিলেন, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিটি পরিবারের স্মৃতির সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে। প্রত্যেকে যদি শুধু তাঁর অভিজ্ঞতার কথা লেখেন তা হলে মুক্তিযুদ্ধের ‘মহাভারত’ রচিত হবে। সত্যিই তাই। মুক্তিযুদ্ধ বাঙালী জীবনের এক অনিশেষ উপাখ্যান। এ পর্যন্ত এতে অনেক মাত্রা সংযোজিত হলেও বলা যায়, এ উপখ্যান এখনো অলিখিতই রয়ে গেছে। ১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘরের উদ্যোগে দশজন তরুণ গবেষক প্রথম বারের মতো গণহত্যা ও নির্যাতনের যে অনন্য ডকুমেন্টেশন করেছেন তাঁদের একজন সত্যজিৎ রায় মুজমদার। বাগেরহাট জেলার মংলা থানার ‘দামেরখ-’ গ্রাম তার মনোযোগের বিষয়। বস্তুনিষ্ঠ গবেষকের অনুসন্ধানি দৃষ্টি ফেলে তিনি এ গ্রামের গণহত্যার ইতিহাস তুলে এনেছেন। স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় প্রায় তিন শ’ গ্রামবাসীর ওপর আক্রমণের ঘটনা এবং প্রায় পঞ্চাশটি হত্যাকা-ের বর্ণনা দিয়েছেন সত্যজিৎ রায় মজুমদার। বইয়ের পৃষ্ঠা সংখ্যা সত্তর। ‘১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতন নির্ঘণ্ট গ্রন্থমালা’ সিরিজের এটি প্রথম বই।

গ্রন্থ-২

কত রক্ত ঝরেছিল বাঙালীর বুক থেকে? হায়েনা পাকিস্তানী বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসর রক্তখোর রাজাকার আলবদররা বাঙালীর বুক থেকে যে রক্ত গঙ্গা বইয়েছিল, তাতে লাল হয়েছে এদেশের মাটি, ফসলিক্ষেত। আর প্রত্যন্ত জনপদ। রক্তের সেই দাগ শুষে নিয়ে বাংলার শ্যামল মাটি হয়েছে লালমাটিয়া। হ্যাঁ একাত্তরের গণহত্যার পর সিলেট জেলার সাধুকোনা ও বাঘমারা এলাকার নাম বদলে পরিচিত হয় ‘লালমাটিয়া’ নামে। সেদিনের গণহত্যার দুর্ধর্ষ সত্য কাহিনী তুলে এনেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক তপন পালিত। সঙ্গে রয়েছে জৈনপুর ও খাজাঞ্চিবাড়ির গণহত্যার ঘটনা। বইয়ের নাম দিয়েছেন ‘লামাটিয়া, জৈনপুর ও খাজাঞ্চিবাড়ি গণহত্যা।’ এটি সিরিজের দ্বিতীয় বই।

লেখক গণহত্যার পটভূমিতে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের অপারেশন সার্চ লাইটের ঘটনার পরবর্তীতে সিলেট শহরের এ সব জায়গায় যে হত্যাকা- ঘটে তার বর্ণনা তুলে ধরেন। হিন্দুÑমুসলিম, নারীÑপুরুষ নির্বিশেষে সকলকেই যে নির্যাতন ও হত্যা করা হয়েছিল সে চিত্র উঠে এসেছে এ অংশে।

গণহত্যা ও নির্যাতনের বিবরণ দিতে গিয়ে লেখক ২৬ মার্চ থেকে সিলেট শহরে যে পাকিস্তানী নির্যাতন শুরু হয় তার বর্ণনা দেন। এতে প্রত্যক্ষদর্শী লাল মিয়ার বর্ণনায় উঠে এসেছে।

গ্রন্থÑ৩

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক চৌধুরী শহীদ কাদের চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলার খরনা ইউনিয়নের মুজাফরাবাদ গণহত্যা নিয়ে রচনা করেছেন ১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতন নির্ঘণ্ট গ্রন্থমালা-৩।

গ্রন্থটি ৬০ পৃষ্ঠায় সমাপ্ত হয়েছে। এই গ্রন্থে বর্ণনা হয় ১৯৭১ সালের ৩ মে মুজাফরাবাদ গ্রামে পাকবাহিনীর নির্যাতনের ঘটনা। এই ঘটনায় ৩০০ জনের মৃত্যু ও প্রায় ২০০ জন নারী লাঞ্ছিত হন। ভৌগোলিক বিবরণে লেখক মুজাফরাবাদ গ্রামের শিক্ষার হার, মেয়েদের জন্য শিক্ষার উন্নত ও আলাদা ব্যবস্থার বিবরণসহ, ১৯৭১-এর ৩ মে পরবর্তী সময়ে গ্রামটির জরাজীর্ণ অবস্থার চিত্র তুলে ধরেছেন। কেননা এ দিন পাকবাহিনী গানপাউডার ছিটিয়ে সমস্ত গ্রাম পুড়িয়ে দিয়েছিল।

গ্রন্থ-৪

গ্রামের নাম বেলতলী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এখানে বাঙ্কার নির্মিত হয়েছিল। আর রেলওয়ে জংশনের উল্টো দিকে ছিল সিগারেট ফ্যাক্টরি। একাত্তরে পাকবাহিনী একে গণহত্যা ও নির্যাতনের ঘাঁটি বানিয়েছিল। ‘বেলতলী গণহত্যা’য় লেখক মামুন সিদ্দিকী এমনটাই বলেছেন। লেখক মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের গবেষণা কর্মকর্তা।

কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার লাকসাম রেলওয়ে জংশনের কাছে বেলতলী গ্রামের অবস্থান। সাংবাদিক এ্যান্থনী মাসকারেনহাসের একাত্তরে লাকসামের অবস্থা সম্পর্কিত বর্ণনা ও নিজের লেখায় উদ্ধৃত করেছেন মামুন সিদ্দিকী। সিরিজের চতুর্থ বই এটি।

গ্রন্থ-৫

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসলীলা ও মানবিকতার বিপর্যয় ফরাসী দার্শনিক জাঁ পাল সার্ত্রকে প্রতিবাদী করেছিল। তাঁর ওই সময়ের লেখা-লেখি অস্তিত্ববাদী দর্শন ও সাহিত্যের জগতে সাড়া ফেলেছিল। যুদ্ধের ভয়ঙ্কর রূপ দেখেছিলেন তিনি। ওই একই যুদ্ধে ‘জামায়াতে ইসলামী’র তাত্ত্বিক গুরু মওলানা আবু আলা মওদুদী দেখেছিলেন নাৎসি বাহিনীর ‘দেশপ্রেম’ ও ‘আনুগত্য’। এতে হিটলার ও মুসোলিনীর দুর্ধর্ষতায় অনুপ্রাণিত হয়ে দল গঠন করে নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আজ আপনাদের সামনে জার্মানি ও ইতালির দৃষ্টান্ত মজুদ রয়েছে। হিটলার ও মুসোলিনী যে বিরাট শক্তি অর্জন করেছে, সমগ্র বিশ্বে তা স্বীকৃত। কিন্তু এই সফলতার কারণ জানা আছে কি? সেই দুটো বস্তু অর্থাৎ বিশ্বাস ও নির্দেশের প্রতি আনুগত্য। নাজি ও ফ্যাসি দল কখনো এত শক্তি ও সফলতা অর্জন করতে পারত না, যদি না তারা নিজেদের নীতির প্রতি অটল বিশ্বাস রাখত এবং নিজেদের নেতৃবৃন্দের কঠোর অনুগত হতো।’ জামায়াতে ইসলামীকে তিনি ওই কঠোর আনুগত্য বশ করতে পেরেছিলেন বলেই সম্ভবত একাত্তরে তারা এত নির্মম দুর্ধর্ষ ও বিকৃতভাবে হত্যা-নির্যাতন-ধর্ষণ চালিয়েছিল।

নীলফামারী জেলার জলঢাকা উপজেলার কালীগঞ্জে নাৎসি স্টাইলের বর্বরতা নিয়ে সিরিজের পঞ্চম বই ‘কালীগঞ্জ গণহত্যা’। লিখেছেন জাতীয় বিশ্ব বিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক আহম্মেদ শরীফ। ১৯৭১-এর ২৭ এপ্রিল একদিনে তিন শ’টি হত্যাকা- ঘটিয়েছিল রাজাকার বাহিনী। নির্যাতন চালিয়েছিল আরও অসংখ্য নারী-পুরুষের ওপর।

১৯৭১ সালে সাম্প্রদায়িক বিভেদকে কাজে লাগিয়ে এই এলাকায় মুসলমানদের প্রথমে বিভ্রান্তকর চেষ্টা করা হয়। গণহত্যা ও নির্যাতনের বিবরণ অংশে নির্যাতনকারীদের অংশে মোট ৩ জন রাজাকার এবং শহীদদের তালিকায় ৭১ জন শহীদদের নাম পরিচয় ও ৬ জন ভুক্তভোগীদের বিবরণ তুলে ধরে, তবে তালিকাটি পূর্ণাঙ্গ নয়।

গ্রন্থ-৬

ময়মনসিংহ জেলার মুক্তাগাছা উপজেলার বিনোদবাড়ি মানকোন গ্রামের গণহত্যা ও নির্যাতনের বৃত্তান্ত তুলে ধরেছেন গবেষক শান্তা পত্রনবীশ। ১৯৭১ গণহত্যা-নির্যাতন নির্ঘণ্ট গ্রন্থামালার ছয় নম্বর গ্রন্থ এটি। গ্রন্থপ্রণেতা শান্তা পত্রনবীশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের একজন এমফিল গবেষক। মোট ৪৪ পৃষ্ঠার বর্ণনায় গবেষক ১৯৭১ সালের ২ আগস্ট, সোমবার পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ময়মনসিংহ জেলার মুক্তাগাছা উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রামে যে গণহত্যা চালিয়েছিল সেটি তুলে ধরেছেন। পুস্তিকাটির নামকরণ প্রসঙ্গে লেখক তাঁর ভূমিকাতে বলেনÑ গণহত্যার পরিধি বিনোদবাড়ি মানকোন, দড়িকৃষ্ণপুর কাতলসারসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি গ্রামজুড়ে বিস্তৃত থাকলেও যেহেতু বিনোদবাড়ি মানকোন গ্রামটিই ছিল পাকিস্তানী বাহিনীর মূল টার্গেট এবং এখানেই যেহেতু সবচেয়ে বেশি হত্যাযজ্ঞ হয়েছিল তাই ‘বিনোদবাড়ি মানকোন গণহত্যা’ নামেই এই হত্যাযজ্ঞটি পরিচিত এবং প্রচলিত।

গ্রন্থ-৭

দৈনিক কালের কণ্ঠের সাংবাদিক গৌরঙ্গ নন্দী রচিত ১৯৭১ : গণহত্যা নির্যাতন নির্ঘণ্ট গ্রন্থমালা’-৭ এর বিষয়বস্তু খুলনা জেলার বটিয়াঘাট উপজেলার বাদামতলা গ্রামের গণহত্যা। এই গ্রন্থটির মোট পৃষ্ঠা সংখ্যা ৩৬।

একত্তরের ২৫ মার্চের কালরাত্রের ঘটনার ধারাবাহিকতায় ব্যাপী ছড়িয়েপড়া পাকিস্তানীদের ধ্বংসযজ্ঞের একটি খুলনা জেলার বটিয়াঘাটা উপজেলার বাদামতলায় সংঘটিত ১৯৭১-এর ১৯ মে’র গণহত্যা। খুলনার গণহত্যা সম্পর্কে অনেক সময় একাধিক বই রচিত হলেও বাদামতলা গণহত্যার ব্যাপারে মাঠপর্যায়ে সাক্ষাৎকারভিত্তিক বিস্তারিত বিবরণ দেয়ার প্রয়াস করেছেন লেখক গৌরাঙ্গ নন্দী।

গ্রন্থ-৮

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক আহম্মেদ শরীফের রচনায় ১৯৭১ গণহত্যা নির্যাতন নির্ঘণ্ট গ্রন্থমালা ৮-এ স্থান পেয়েছে নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর উপজেলার গোলাহাট গণহত্যা। গ্রন্থটির পৃষ্ঠা সংখ্যা ৩২।

গোলাহাট গণহত্যার পটভূমিতেও পাকবাহিনীর জন্য মূল লক্ষ্যবস্তর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল এই এলাকায় বসবাসরত মারোয়ারি সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষজন। কেননা ১৯৭১-এর পাকবাহিনীর অন্যতম টার্গেটই ছিল ইসলাম ধর্ম ভিন্ন অন্য ধর্মাবলম্বী ব্যক্তিবর্গ। পাকিস্তানী সৈন্যদের তত্ত্বাবধানে শরণার্থী হিসেবে ভারতে পাঠানোর প্রলোভনে ভারত যাওয়ার পথে সৈয়দপুর শহর ও রেলওয়ে স্টেশন থেকে দুই কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত গোলাহাট নামক স্থানে পাকবাহিনীর হাতে এই হিন্দু সম্প্রদায় যে গণহত্যার শিকার হন, তাই গ্রন্থটির মূল উপজীব্য।

গ্রন্থ-৯

চট্টগ্রাম শহরের পাহাড়তলী এলাকার গণহত্যার বৃত্তান্ত তুলে ধরেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক চৌধুরী শহীদ কাদের। এর পৃষ্ঠা সংখ্যা ৫২।

মাস্টার দা সূর্যসেন ও প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের স্মৃতিবিজড়িত পাহাড়তলী এলাকায়, ১৯৭১ সালের ১০ নবেম্বরে, ৪০০ জন লোকের হত্যার ঘটনা ঘটিয়েছিল পাকবাহিনীর ও তাদের দোসররা। পূর্ব পাকিস্তানে অবাঙালীদের একটি বড় অংশ যারা চাকরি করত পাহাড়তলীর রেলওয়েতে, তারাই মূলত এই গণহত্যার সঙ্গে যুক্ত ছিল বলে লেখক বর্ণনা করেছেন।

গ্রন্থ-১০

১৯৭১ গণহত্যা-নির্যাতন নির্ঘণ্ট গ্রন্থমালার সবশেষ পুস্তিকাটি বরিশাল জেলার আগৈলঝাড়া উপজেলার কাঠিয়া গণহত্যাকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে। গ্রন্থপ্রণেতা হিমু অধিকারী একজন বেসরকারী উন্নয়ন কর্মকর্তা। গ্রন্থটির পৃষ্ঠা সংখ্যা ৪০।

লেখক তাঁর নিজের গ্রাম কাঠিরার গণহত্যার নিয়ে পুস্তিকাটি রচনা করেছেন। হত্যাকা-টি সংঘটিত হয় ৩০ মে, ১৯৭১ সালে।

প্রকাশিত : ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

১৩/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: