রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ভ্যা ন গ গ ॥ আ ম পা তা র টু কি টা কি

প্রকাশিত : ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • জায়েদ ফরিদ

গ্রামের উঠানে শুকনো আম পাতা দিয়ে রান্না করছে গৃহবধূ। ধোঁয়ায় চোখ জ্বলছে, গা হাত-পা চুলকাচ্ছে তার। রাঁধুনী ভাবেন, আগুনের পাশে স্বাভাবিক তিন প্রক্রিয়া তো চলতেই থাকে, এগুনো-পেছানো আর চুলকানো। কিন্তু আমপাতা, আমের লাকড়ি চুলোয় দেওয়ার পরে মাত্রাটা যেন অনেক বেড়ে যায়। ব্যাপারটা আমরা খুব একটা পাত্তা দিই না। সব দোষ আগুনের ওপর চাপিয়ে দিয়ে বহুকাল কাটিয়েছি। কিন্তু ব্যাপারটা একটু ভিন্ন বটে। আমের বোঁটার কষ ঠোঁটে-থুঁতনিতে লেগে গেলে চুলকোতে থাকে। তিনদিন পর্যন্ত এর প্রভাব থাকে, কখনও কখনও ফোস্কাও পড়ে যায়। এর পেছনেও আছে একই কারণ।

আম পাতার ভেতরে থাকে এক ধরনের উদ্বায়ী তেল উরুশিয়ল। আগুনে পুড়ে ধোঁয়ার সঙ্গে এটা চলে যায় ফুসফুসে, সেখান থেকে মিশে যায় রক্তে। এরপর শরীরের যে কোন জায়গায় চুলকাতে থাকে, লাল হয়ে যায়, কখনও ফুলে ওঠে চাকা চাকা হয়। এমন কি যে ছেলে মায়ের আঁচলে মুখ মোছে, তারও একই দশা হতে পারে। এই উরুশিয়ল আমের পাতা বা খড়িতে শুধু নয়, আমের ভেতরেও থাকে। তবে আমের ভেতরে যা থাকে তা খুব সামান্য পরিমাণ, এত সামান্য যে যিনি উরুশিয়ল সেন্সিটিভিটি তিনিও খেতে পারেন ফলটি, কিন্তু খোসা ছড়িয়ে দিতে হবে অন্য কাউকে।

ছেলেবেলা থেকে যারা আম্র-পরিবেশে বসবাস করেন উরুশিয়লের বিরুদ্ধে তাদের বেশ খানিকটা প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠে। বন-বাগানে খেলতে গিয়ে, পিকনিক করতে গিয়ে, অনেকেই শিকার হন আকর্ষণীয় লালপাতা পয়জন আইভির। বিশেষ করে বাচ্চারা এই আইভির পাতা দেখে প্রলুব্ধ হয়ে অজান্তে মেখে নেয় সারা গায়ে, যা মালী আর কাঠুরিয়াদের তেমন ক্ষতি করতে পারে না। হাওয়াই দ্বীপের ল্যান্ডস্কেপিংয়ে খুব সাবধানে বহুল আলোচিত পয়জন আইভি, পয়জন ওক বা সুমাক গাছকে এড়িয়ে গেছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। কিন্তু আমের ভেতরে এর প্রচ- উপস্থিতি তাদের নাস্তানাবুদ করেছে। প্রতি বছর আম পাকার মৌসুমে এই বিষের শিকার হচ্ছেন অনেকেই।

নগরে বসবাসকারীদের সঙ্গে আমের সম্পর্ক থাকলেও আমবাগানের নেই। জরিপে দেখা গেছে শহুরেদের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা ৫০ শতাংশের কম নয়।

উরুশিয়ল শব্দটির মধ্যে বাংলা গন্ধ আছে। আমার পরিচিত একজন ল্যাব টেকনিশিয়ান তো আরেকটু আত্তীকরণ করে এর নাম দিয়েছিলেন উরুশিয়ল। এই শব্দটি তার মাথায় আসার একটি কারণও ছিল। তার কাছে যে পেশেন্ট এসেছিলেন তার দুই উরুতে ছিল উরুশিয়লের ভয়াবহ আক্রমণ। শীতকালে আইলার ওপর আমের খড়ির অঙ্গারে আগুন তাপাতে গিয়েই তার এ দশা। যা হোক, শব্দটি বাংলা-বাংলা মনে হলেও আদতে জাপানী। কারণ বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে জাপানীরাই ল্যাকার গাছ থেকে প্রথম আবিষ্কার করেছে এই বিষাক্ত হলুদ রসায়ন।

এই রসায়ন বিশ্বের সামান্য যে কয়েকটি গাছে পাওয়া যায় তার মধ্যে আছে পয়জন আইভি, পয়জন ওক ও সুমাক। আম গাছ ছাড়া উল্লিখিত সবই বিদেশি। বন-বাগানে খেলতে গিয়ে, পিকনিক করতে গিয়ে অনেকেই শিকার হন আকর্ষণীয় লালপাতা পয়জন আইভির। বিশেষ করে শিশুরা এই পাতার রং দেখে মুগ্ধ হয়ে মেখে নেয় সারা গায়ে। হাওয়াই দ্বীপের ল্যান্ডস্ক্যাপিংয়ে বিশেষজ্ঞরা এই পয়জন আইভি, পয়জন ওক ও সুমাককে এড়িয়ে গেছেন। কিন্তু আমের ভেতর এর প্রচণ্ড উপস্থিতি তাদের নাস্তানাবুদ করেছে। প্রতিবছর আম পাকার মৌসুমে এই বিষক্রিয়ার শিকার হচ্ছেন অনেকেই।

তাহলে এখন দেখা যাক এই উরুশিয়ল সমস্যার জন্য কি কোন সমাধান রয়েছে কিনা। তবে সমাধানটা অন্তত এমন হওয়া উচিত যে, যা দেশীয় প্রযুক্তিতেই সম্ভব। এমনকি হাতের কাছেই পাওয়া যাবে। এ দিয়ে ধুতে পারলে আরও ভাল। উরুশিয়ল সম্পূর্ণ দেহের ভেতর ঢুকতে সময় লাগে প্রায় ১৫ মনিটি। আর এর প্রভাব থাকতে পারে ৩ দিন বা তারও অধিক। অতএব শরীরের কোথাও আমের কষ লাগলে বা আমপাতার সংস্পর্শ নিবিড় হলে সঙ্গে সঙ্গে ধুয়ে ফেলতে হবে জায়গাটা। ভিনেগার এবং সামান্য গরম পানি দিয়ে ধুতে পারলে আরও ভাল। এরপর জায়গাটিতে হলুদ অথবা খাইসোডার পেস্ট লাগিয়ে দিতে হবে। গ্রামের মানুষকে ব্যবহার করতে দেখেছি তিসি বা মসিনার তেল, যা শহরে দুর্লভ। ঐ তেল লাগানোর সঙ্গে সঙ্গে চুলকানি বন্ধ হয়ে শীতল একটা অনুভূতি এনে দেয়।

আমাদের দেশে অনেকে ঘরে হোমিওপ্যাথি প্র্যাক্টিস করেন, যার ফল প্রতিবেশীরাও কম বেশি পেয়ে থাকেন। এই ওষুধের বাক্সে পাওয়া যেতে পারে রাস টক্স [জযঁং ঞড়ীরপড়ফবহফৎড়হ-চড়রংড়হ ঙধশ-ওাু] নামে একটি ওষুধ, যা তৈরি হয় পয়জন আইভি থেকে। এর কয়েকটি বড়ি জলে গুলে লাগালে খুব উপকার হয়। প্রকৃতিতে এমন কিছু ক্ষেত্রে আমরা অ্যান্টিডট দেখতে পাই, যেমন চুত্রাপাতার চুলকানি নিরাময়ে তার পাতাবাঁটার প্রয়োগ, বৃশ্চিকের হুলের ব্যথা নিরসনে হুল কেটে ফেলে দেহের পেস্ট লাগানো ইত্যাদি।

ভিনসেন্ট ভ্যানগগ ছিলেন পৃথিবীর একজন অনন্য চিত্রকর। চিত্র নির্মাণের স্টাইলে তিনি ছিলেন পোস্ট এক্সপ্রেশানিস্ট। তার প্রিয় রং ছিল হলুদ যা তিনি অন্য শিল্পীদের মতো মিশ্রিতভাবে ব্যবহার না করে প্রথাবিরোধী অকৃত্রিম আদি রঙেই ব্যবহার করেছেন। এঁকেছেন অসংখ্য সূর্যমুখীর ছবি। এই ফুল তার এত প্রিয় ছিল যে মৃত্যুর পর তাঁর সম্মানার্থে কবরের পাশে সূর্যমুখী ফুল লাগানো হয়েছিল। প্রকৃতিকে প্রাণ দিয়ে ভালবাসতেন ভ্যানগগ। তার শেষ ছবিগুলো ছিল শস্যক্ষেত আর গাছের শিকড় ও কাণ্ড নিয়ে অঙ্কিত।

সমসাময়িককালে ভারতের রবি বর্মাও ছিলেন একজন অসাধারণ শিল্পী। শাড়ি পরিহিত নারী এবং রামায়ণ ও মহাভারতের কাহিনী অবলম্বনে ছবি এঁকে সারা পৃথিবীতে তিনি খ্যাতি অর্জন করেছিলেন ঊনবিংশ শতকের শেষ দিকে। ভারতীয় রীতিনীতির সঙ্গে ইউরোপীয় চিত্রাঙ্কন রীতির এক অপূর্ব মিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন তার চিত্রকর্মে।

এই দুই শিল্পীই ব্যবহার করেছেন এক অস্বচ্ছ কিন্তু আলোকভেদ্য হলুদ রং, যা তদানীন্তন সাধারণ হলুদ রং থেকে ছিল অনেক উজ্জ্বল ও ভাস্বর। ইন্ডিয়ান ইয়েলো নামে অভিহিত এই অদ্ভুত রং কোথা থেকে পাওয়া যেত এ নিয়ে সারা বিশ্বে এখনও রয়েছে রহস্য ও মতভেদ। কেউ ভেবেছেন এ রং তৈরি হয়েছে উট, মহিষ ইত্যাদি প্রাণীর হলুদ মূত্রপাথর থেকে, কেউ ভেবেছেন এগুলো তৈরি হতো গবসবপুষড়হ ঃরহপঃড়ৎরঁস নামক উদ্ভিদের পাতার রস থেকে। কিন্তু কলকাতার টি এন মুখার্জীর একটি চিঠির সূত্র থেকে পাওয়া যায় এক আজব কাহিনী যা তিনি লিখেছিলেন বিখ্যাত চরমসবহঃ ঈড়সঢ়বহফরঁস-এর এর লেখক নিকোলাস কে।

মুখার্জী বলেছেন, তিনি নিজে দেখেছিলেন কিভাবে এই ইন্ডিয়ান ইয়েলো তৈরি হয়েছে উত্তর বিহারের নিকট মুঙ্গেরের একটি গ্রামে। সেখানে গরুকে খাওয়ানো হতো প্রচুর আমপাতা আর পানি। কখনও কখনও একটু ভিন্ন খাবার গরুকে দেয়া হতো কেবল প্রাণে বেঁচে থাকার জন্য। পাতিলে সংগ্রহ করা হতো গো-মূত্র। তারপর সেটাকে জ্বাল দিয়ে ঘন করে রাখলে নিচে থিতানি পড়ত। এই থিতানো পদার্থ রোদে বা আগুনে শুকিয়ে এক ধরনের গোলাকার মণ্ড তৈরি হতো যা বিক্রি হতো ইউরোপের বাজারে। সেখানে এই মণ্ডকে রিফাইন করে তৈরি হতো জলরং ও তেলরঙে ব্যবহার উপযোগী হলুদ এক উপাদান। ডাচসহ তৎকালীন ইউরোপের অনেক শিল্পীই এই রং ব্যবহার করেছেন। উপমহাদেশের বরেণ্য শিল্পী রবি বর্মাও ছিলেন ব্যবহারকারীদের অন্যতম, যা তার ভাস্বর চিত্রকর্ম থেকেই অনুমিত। আমের পাতায় বিষাক্ত উরুশিয়ল থাকার কারণে নিশ্চয়ই উৎপাদনের হাতিয়ার গরুগুলো অসুস্থ হয়ে জীবন হারিয়েছে। এক সময় ধর্মীয় অনুভূতির কারণে এবং ব্রিটিশদের ঈৎঁবষঃু ঃড় ধহরসধষং আইনের আওতায় এই অমানবিক উপায়ে রং উৎপাদন পদ্ধতি বাতিল ঘোষণা করা হয় ১৯০৮ সালে। অনুমান করা হয়, প্রাচীন পারস্য থেকে শুরু হলেও এটা পরে ভারত ও চীনে এসে স্থায়ীভাবে উৎপাদিত হয়েছে।

আমের পাতা থেকে এই রঙের উৎপাদন নিয়ে নানা মতবিরোধ রয়েছে, অনেকে অনুসন্ধানও করেছেন। গবেষকদের মধ্যে আছেন ঈড়ষড়ৎ: অ ঘধঃঁৎধষ ঐরংঃড়ৎু ড়ভ চধষবঃঃব এর লেখক ঠরপঃড়ৎরধ এবং রসায়নবিদ জন স্টেনহাউস। দু-তিনশো বছরের পুরনো ইতিহাস ঘেঁটে এসব ঘটনার যথার্থতা যাচাই করা অদ্যাবধিও কারও পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠেনি। কেউ কেউ এসব ঘটনা তুচ্ছ বলে উড়িয়ে দিলেও এর স্বপক্ষেও মতবাদ রয়েছে অনেকের।

লেখক : প্রাবন্ধিক

প্রকাশিত : ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

১৩/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: