কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

কেজরিওয়ালের বিজয় ॥ রাজনৈতিক ভূমিকম্প

প্রকাশিত : ১২ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • কেবল বিজেপির নয়, কংগ্রেসেরও রক্তক্ষরণ

এক ঐতিহাসিক বিজয়ের মধ্য দিয়ে নরেন্দ্র মোদির ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার এক বছরেরও কম সময় পরে মঙ্গলবার ভারতের রাজধানীতে একটি রাজনৈতিক ভূমিকম্প ঘটে গেছে। মোদির ক্ষমতাসীন দল দুর্নীতিবিরোধী এক নিরলস সংগ্রামী ব্যক্তির নেতৃত্বাধীন এক নবীন রাজনৈতিক দলের কাছে দিল্লী বিধানসভা নির্বাচনে শোচনীয়ভাবে হার মেনেছে। খবর নিউইয়র্ক টাইমস ও হাফপোস্টের।

গত মে মাসে লোকসভায় ভারতীয় জনতা পার্টির নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর দিল্লীর নির্বাচনের এই ফলাফল মোদির জন্য প্রথমবার বড় ধরনের পরাজয় বয়ে এনেছে। ওই নির্বাচনে মোদির দল ৩০ বছরের মধ্যে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল। দলটি সে সময় দিল্লীতে লোকসভার ৭টি আসনের সব কয়টিতে জয়লাভ করে। মাত্র গত ডিসেম্বরে জনমত জরিপে আভাস দেয়া হয় যে, বিজেপি সহজেই দিল্লী নির্বাচনে জয়লাভ করবে। তবে পরপর কয়েকবার বিদেশ সফর সত্ত্বেও মোদির সরকার এখনও লক্ষণীয়ভাবে ভারতীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে পারেনি। দেশে বছরে চাকরির বাজারে প্রবেশ করা প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ লোকের জন্য সরকার খুব সামান্যই কর্মসংস্থান করতে পেরেছে। সর্বশেষ নির্বাচনে প্রথমবার ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ভোটাররা হয়ত ধৈর্য হারিয়ে ফেলছেন।

দিল্লীর নির্বাচনী ফল এক সময়ের প্রভাবশালী দল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস পার্টিকেও গভীর সঙ্কটের মুখোমুখি করেছে। অভিজাত নেহেরু-গান্ধী পরিবারের সন্তান রাহুল গান্ধীর ব্যাপক প্রচারাভিযান সত্ত্বেও ২০১৩ পর্যন্ত ১৫ বছর দিল্লী শাসনকারী দলটি একটি আসন পেতেও ব্যর্থ হয়।

আম আদমি পার্টি (এএপি) বা সাধারণ মানুষের দল দিল্লী বিধানসভার ৭০টি আসনের মধ্যে ৬৭টিতে জয়লাভ করে। আম আদমির নেতা এবং সাবেক কর পরিদর্শক অরবিন্দ কেজরিওয়াল উৎকোচের বিরুদ্ধে প্রচারাভিযান চালিয়ে খ্যাতি অর্জন করেন এবং নগরীর নিম্ন সামাজিক স্তরের একজন রক্ষক হিসেবে নিজেকে নতুন কায়দায় গড়ে তোলেন। এক বছর আগে সংক্ষিপ্ত সময় কেজরিওয়াল দিল্লীর মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু মাত্র ৪৯ দিনের মাথায় তিনি পদত্যাগ করেন। কেজরিওয়ালের বার বার ক্ষমা চাওয়া এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর প্রচার অভিযান, সেই সঙ্গে সুলভে বিদ্যুত সরবরাহ, বিনামূল্যে পানি এবং বেশি করে শিক্ষার সুযোগ দান করে দিল্লীর বিপুলসংখ্যক নিম্নবিত্ত শ্রেণীর জীবনমান উন্নয়নের ৭০ দফা ঘোষণাপত্র গত শনিবার অনুষ্ঠিত রাজধানীর বিস্তৃত অঞ্চলের ভোটারদের মনে জোর অনুরণনের সৃষ্টি করে। মঙ্গলবার টেলিভিশনে এক মন্তব্যে প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার শেখর গুপ্ত বলেন, ‘জীবনমান এখন ধর্ম, বর্ণ ও অঞ্চলের ওপর অগ্রাধিকার পাচ্ছে।’ নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা মোদি চা-বিক্রেতার সন্তান হিসেবে জীবন শুরু করেন। গত বছর নির্বাচনে তাঁর এই পারিবারিক পরিচয়কে জোরেশোরে তুলে ধরাই ছিল অংশত মোদির বিজয়ের কারণ। তবে, মোদিকে সম্প্রতি পিনস্ট্রাই সংবলিত স্যুট পরতে দেখা যায় তা যার মধ্যে স্বর্ণখচিত তার নাম শোভা পাচ্ছে। এই স্যুটের দাম ১৭ হাজার ডলার হবে বলে ধারণা। এর বিপরীতে ‘মাফলার ম্যান’ বলে পরিচিত কেজরিওয়ালের পোশাক সাধারণ মানের এবং উষ্ণ থাকার জন্য তিনি মাথায় বেমানান স্কার্ফ জড়িয়ে রাখেন।

এদিকে, মঙ্গলবার কংগ্রেস দলের সদর দফতর কয়েকজন বিষণœœবদন রিপোর্টার ছাড়া প্রায় ফাঁকা ছিল। দিল্লী নির্বাচনের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক পিসি চাকোকে দফতরে চা পানরত দেখা যায়। চাকো বলেন, ‘বস্তুত আমরা দিল্লীতে কয়েকটি আসন পাব বলে আশা করছিলাম। আমরা আসলেই প্রস্তুত ছিলাম না। আমাদের সাংগঠনিক কাঠামো পূর্ণাঙ্গ ছিল না। দরজার বাইরে অল্প কিছু কংগ্রেস কর্মী দলীয় নেতার বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর ছবি তুলে ধরে ‘প্রিয়াঙ্কাকে আনো; কংগ্রেস বাঁচাও’ সেøাগান দেয়।

এদিকে, বিশ্বজুড়ে সংবাদপত্রগুলো ভারতীয় রাজধানীতে পরিবর্তন আনার কারিগরের ঐতিহাসিক বিজয়কে স্বীকৃতি দিয়ে উচ্ছ্বসিত মন্তব্য করেছে। বার্তাসংস্থা এএফপি বিশ্লেষকদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছে, এই নির্বাচনী ফল প্রধানমন্ত্রীর জন্য একটি ধাক্কাÑ যিনি তাঁর ভূমিধস বিজয়ের পর থেকে ভোটারদের সঙ্গে বর্ধিত মধুর সময় কাটিয়েছেন। এ্যাসোসিয়েটেড প্রেস এএপিকে ‘নতুন অভিনব’ পার্টি বলে আখ্যায়িত করে বলেছে, ‘দলটি প্রধানমন্ত্রী মোদিকে একটি সুস্পষ্ট বার্তা পাঠিয়েছে যে, গত বছর তিনি ক্ষমতায় আসার পর রাজ্যসভার নির্বাচনগুলোতে তার দলের জোরালো বিজয় সত্ত্বেও তিনি অজেয় নন’। সিএনএন বলেছে, ‘এটি মোদির প্রথম ‘রাজনৈতিক রক্তক্ষরণ’ সিএনএনএর রবি আগরওয়াল ও হারমিত সিং লিখেছেন, ‘গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ভারতের রাজধানীতে রসায়ন শব্দটি বেশ চালু ছিল। দরিদ্রতম ব্যক্তি থেকে শুরু করে দেশের বৃহত্তম কোম্পানিগুলোর সিইও পর্যন্ত বিচিত্রশ্রেণীর ভারতীয়দের সঙ্গে তার দৃশ্যমান বন্ধনকে বোঝাতে বিজ্ঞানের ওই শাখাকে প্রায়ই তুলে ধরা হতো। চলতি সপ্তাহে দিল্লীবাসী বিজ্ঞানের একটি অত্যন্ত ভিন্ন ধরনের শাখাকে নিয়ে কথা বলবে। আর এটি হলো পদার্থবিজ্ঞান। হাজার হোক যা ওপরে ওঠে, তাকে অবশ্যই নিচে পড়তে হবে। বিবিসি কেজরিওয়ালকে হঠাৎ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হওয়া পাশের বাড়ির লোক’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। বিবিসি যুক্তি তুলে ধরে যে, বিজেপির প্রচার ছিল মূলত এএপি বিরোধী। অপরদিকে, কেজরিওয়াল এমন এক উদ্যমী প্রচারাভিযান পরিচালনা করেন, যা শ্রমজীবী ও সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণীর ভোটারদের মধ্যে জনপ্রিয় বলে প্রমাণিত হয়েছে। দিল্লীর মোট জনসংখ্যার ৬০ শতাংশ ওই শ্রেণীর।

প্রকাশিত : ১২ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

১২/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: