কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

আমার বিশ্বাস চলচ্চিত্রের সুদিন আবার আসবে -শবনম

প্রকাশিত : ১২ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

প্রায় সতেরো বছর চলচ্চিত্রপ্রেমী দর্শক আপনাকে খুব মিস করছে। কেন এখন নতুন ছবিতে আপনাকে দেখা যায় না?

পাকিস্তান থেকে নিজ দেশে একেবারে চলে আসি ১৯৯৮ সালে। আমি কিন্তু বাংলাদেশেরই মেয়ে, এটা অনেকেই জানেন না। পাকিস্তানের ছবিতে বেশি কাজ করেছি বলে অনেকেই মনে করেন আমি পাকিস্তানের। আবার আমি কিন্তু বিগত প্রায় ষোল বছর যাবত ঢাকাতেই থাকছি। সেটাও অনেকেই জানেন না। আবার আমি যে এদেশেরই সন্তান তাও অনেকেই জানেন না। ঢাকায় একেবারে চলে আসার পর চলচ্চিত্র নির্মাতা কাজী হায়াত আমাকে একটি ছবির গল্প শোনান। গল্পটি ছিল মাকে ঘিরে মৌলিক একটি গল্প। গল্পটি ভাললাগায় ছবিটিতে আমি কাজ করি। ছবিটির নাম ‘আম্মাজান’। ১৯৯৯ সালে মুক্তি পায় ছবিটি। এরপর কিন্তু আমি আজও ভাল মৌলিক গল্পের কোন ছবি পাইনি। ভাল গল্প পাইনি বলেই শিল্পী হিসেবে আমার দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেই কোন ছবিতে অভিনয় করিনি। তার মানে এই নয় যে, আমি ভাল মৌলিক গল্প পেলে অভিনয় করব না। এখানে একটি কথা বলতে চাই, মান্না আজ নেই। কিন্তু আমার কেন যেন মনে হয় ‘আম্মাজান’ ছবিতে অভিনয়ের জন্যই হয়ত তাঁর জন্ম হয়েছিল। কারণ ছবিটিতে মান্না অসাধারণ অভিনয় করেছিল।

অনেক বছর বিরতি নিয়ে যখন এদেশের চলচ্চিত্রে আবার কাজ শুরু করলেন আম্মাজান ছবিতে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে তখন সেই সময় আর এই সময়ের মধ্যে পার্থক্য বিশেষভাবে চোখে পড়ত কি?

আসলে আমাদের সময়কার কথা তো বলে এখন আর কোন লাভ নেই। বলতেও চাই না। কারণ বললে অনেকে বিশ্বাসও করতে চাইবেন না। তখনে তা সবার মাঝে এক ধরনের আত্মিক একটা সম্পর্ক ছিল, যা ভাবাই যায় না এখন। সবার প্রতি সবার একধরনের শ্রদ্ধাবোধ ছিল, যা এই সময়ে একেবারেই অনুপস্থিত। শূটিং স্পটে দেরি করে আসাটা তো এখন এখানে ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে একটা সত্য কথা না বললেই নয়, আমি যখন আম্মাজান ছবির শূটিং করি, প্রথম দিন সকাল আটটায় আমি স্পটে গিয়ে হাজির হয়েছিলাম। কিন্তু সেদিন মান্না এসেছিল দুপুর দু’টায়। পরে আমার আসার বিষয়টি যখন সে জানতে পারে, তখন খুব অনুশোচনা হয়েছিল তাঁর। এবং এর পরেরদিন থেকে যে সময় বেঁধে দেয়া হতো সেই সময়ের পরে আসতে তাঁকে আমি দেখিনি। আসলে একজন শিল্পীই কিন্তু একটি ইউনিটের অনেক বড় অনুপ্রেরণা। শিল্পীই যদি সঠিক সময়ে স্পটে না আসে, তাহলে কাজ করার অনুপ্রেরণাটা আসবে কোত্থেকে।

চলচ্চিত্রের সঙ্গে আপনার সম্পৃক্ততার কথা একটু জানতে চাই...

চলচ্চিত্রে আসার অনেক আগে থেকেই আমি নাচের সঙ্গে জড়িত ছিলাম। বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে আমি নাচ শিখতাম। এহতেশাম পরিচালিত ‘এদেশ তোমার আমার’ ছবিতে তখন একটি গানে বেশ কয়েকজন নাচের মেয়ের দরকার হয়ে পড়ে। তখন বুলবুল ললিতকলা একাডেমি থেকেই কয়েকজনকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই দলে আমিও ছিলাম। এরপর ‘রাজধানীর বুকে’ ছবিতে আমি একটি একক নৃত্যে অংশগ্রহণ করি। তার পরপরই এহতেশাম আমাকে ও রহমানকে নিয়ে শুরু করেন ‘হারানো দিন’ ছবিটি। এরপর একে একে অনেক ছবিতে কাজ করলাম। এই ‘হারানো দিন’ ছবিটি এখনও বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে আছে। সবচেয়ে ভাললাগার বিষয় হচ্ছে এই ছবিটি এখন দর্শক চাইলেও দেখতে পারেন। কারণ এখন ডিভিডিতেও পাওয়া যায়। আমি নিজেও অবাক হই, এতো আগের ছবি কিভাবে এখনও পাওয়া যায়।

নায়িকা হতে পেরে আপনার কেমন লেগেছিল?

প্রথম দুটি ছবিতে আমি শুধু নাচের দৃশ্যে অংশগ্রহণ করেছিলাম। পরবর্তীতে যখন আমি ‘হারানো দিন’ ছবিতে কাজ করার সুযোগ পাই, তখন সত্যিই ভীষণ খুশি হয়েছিলাম। কারণ নায়িকা হব, এটা স্বপ্নেও কোনদিন ভাবিনি আমি। আমিসহ আমার পরিবারের সবাই তখন খুশি হয়েছিলেন। তবে চলচ্চিত্রের সঙ্গে জড়িত হবার কারণে পরে আর নাচের কোর্সটা আমার আর সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি।

তারপর তো অনেক উর্দু ছবিতে আপনি অভিনয় করেছিলেন, প্রথম দিকে কি উর্দু ছবিতে কাজ করতে অসুবিধা হতো?

অবশ্যই হয়েছিল। কারণ উর্দুতো আমার ভাষা ছিল না। এই ভাষাটিকে আয়ত্ত করার একটা বিষয় ছিল। এফডিসির একজন সাউন্ড রেকর্ডিস্ট ছিলেন মোহসীন। তিনি এবং সুরুর বারা বাংকেভীর সহযোগিতায় আমি উর্দু ভাসা আয়ত্ত করতে পেরেছিলাম। যে কারণে পরে আর তেমন কোন অসুবিধা হয়নি। অনায়াসে কাজ করে গেছি একের পর এক উর্দু ভাষা চলচ্চিত্র। আসলে যে কোন কাজে নিজের ইচ্ছেটা যদি প্রবল থাকে তাহলে তাতে সাফল্য আসবেই বলে আমি মনে করি। আমার ইচ্ছে ছিল উর্দু ভাষাকে আয়ত্তে আনব। তাই পেরেছিলাম।

তখন কোন নায়কের বিপরীতে অভিনয় করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন?

আসলে চলচ্চিত্রে যখন আমার শুরু, তখন তো রহমান ছাড়া আর কোন নায়কই ছিল না। তাই সে সময় যত ছবিতে কাজ করেছি, আমি আর রহমানই ছিলাম জুটি। রোমান্টিক জুটি হিসেবে এখনও আমাদের নাম নানাভাবে স্মরণ করা হয়, এটা ভাললাগার মতোই।

মুক্তিযুদ্ধের সময় আপনি কোথায় ছিলেন, কেমন কাটতো আপনার সময়?

মুক্তিযুদ্ধের সময়তো আমি পাকিস্তানে ছিলাম। কারণ তখন আমি পাকিস্তানের ছবিতে একের পর এক কাজ করছিলাম। তবে এতোটুকু বলতে পারি, ছবিতে কাজ করলেও মানসিকভাবে ভাল ছিলাম না। কারণ পাকিস্তানে থাকলেও আমার পরিবার ছিল ঢাকাতেই। তাই বাবা-মা-বোনের জন্য একটা দুশ্চিন্তা সবসময়ই মনের ভেতর কাজ করত। ভীষণ ভয়ে থাকতাম না জানি কখন কোন দুঃসংবাদ চলে আসে।

পাকিস্তান ভাঙ্গার পরপরই রি-এ্যাকশন কেমন ছিল?

একটি দেশ দু’ভাগ হয়ে যাওয়ায় সেই সময়টা ভাল কাটেনি। রি-এ্যাকশান সত্যিই খুব খারাপ ছিল। কখন কী হয়ে যায় এই ভয়টা সবসময় মনের ভেতর কাজ করত। মনে ভয় নিয়ে তখন ছবির কাজ শান্তিমতো কিংবা মনোযোগ দিয়ে করতে পারতাম না। অন্যমনস্ক হয়ে থাকতাম প্রায়ই।

দেশ স্বাধীন হবার পরপরই তো আর দেশে আসতে পারেননি?

না না, কী করে আসি! কারণ দেশ স্বাধীন হবার পর চলচ্চিত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেক বাঙালীই তখন কোন কিছু না জানিয়ে দেশে চলে এসেছিলেন। ফলে অনেক প্রযোজকই ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিলেন। যে কারণে আমি যখন ভিসার জন্য ‘নো অবজেকসন’ পাবার জন্য আবেদন করি তখন আমাকে আসতে দেয়া হয়নি। কারণ সবাই ভেবেছিল যে আমিও হয়ত আর ফিরে যাব না। তাই দেশ স্বাধীন হবার পরপরই আমি দেশে আসতে পারিনি। দেশ স্বাধীন হয় ১৯৭১ সালে। আমি দেশে আসি ১৯৭৪ সালে।

আপনার স্বামী রবিন ঘোষ এই উপমহাদেশের একজন প্রখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক। তাঁর সঙ্গে পরিচয় এবং বিয়ে সম্বন্ধে জানতে চাচ্ছিলাম...

এহেতশামের ‘হারানো দিন’ ছবির কাজ করতে গিয়েই তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়। রিহার্সেলের সময় দেখা হতো আমাদের। তাছাড়া আমাদের উভয় পরিবারের মধ্যে পারিবারিক বন্ধুত্বপূর্ণ একটা সম্পর্ক ছিল। যে কারণে আমাদের মাঝে সম্বন্ধের একটা সুযোগও তৈরি হয়ে যায়।

ভাললাগা থেকেই উভয় পরিবারের সম্মতিতে ১৯৬৫ সালে আমরা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হই। সেই থেকে আজও দুজন সুখে দুঃখে এক সঙ্গেই বাস করছি। আমাদের একমাত্র ছেলে রনি ঘোষ দেশের বাইরে থাকে।

এখানে কিংবা ওখানে কী উর্দু ভাষাতেই অভিনয় করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন?

নিজের ভাষায় কথা বলার মতো ভাললাগা কী আর অন্য কোন ভাষায় হতে পারে? পারে না। উর্দু ভাষাতে অভিনয় করেছি আসলে প্রফেশনালিজমের কারণে। বাংলা ভাষার ছবিতেই কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতাম। এখানে একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি সবার কাছে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে। আমি পাকিস্তানে যত ছবিতে অভিনয় করেছি, চেষ্টা করেছি সে সব ছবিতে আমার মাধ্যমে আমার বাঙালীয়ানাকে ফুটিয়ে তুলতে। এটা কিন্তু আমি মন থেকেই করতাম। আমি বাঙালীয়ানাকেই ফুটিয়ে তুলতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতাম।

পাকিস্তানের কোন নায়ক আপনার চোখে সেরা?

আসলে পাকিস্তানে আমি অনেক নায়কের বিপরীতেই নায়িকা হিসেবে অভিনয় করেছি। প্রত্যেকেই নিজের অবস্থানে থেকে বেশ ভাল ছিলেন। যেমন বলা যায় রোমান্টিক নায়ক হিসেবে ওয়াহিদ মুরাদ ছিলেন অনন্য। আবার অন্যদিকে মোহাম্মদ আলী এ্যাকশান এবং ড্রামাতে ছিলেন অসাধারণ। তবে নাদিমও একজন অসাধারণ নায়ক। তাঁর সঙ্গেই আমার সবচেয়ে বেশি কাজ করা হয়েছে। তাঁর সঙ্গে পারিবারিক একটা বন্ধুত্ব ছিল আমাদের, কারণ ছবির জগতে কিন্তু আমার এহতেশামের হাত ধরেই আসা। আবার এহতেশামের মেয়ে ফারজানাকেই বিয়ে করেছেন নাদিম। সেই হিসেব পাকিস্তানে আমাদের বন্ধনটা ছিল অন্যরকম।

নাচের পুতুল ছবির বিখ্যাত গানটি দিয়েই শেষ করতে চাচ্ছি..

নাচের পুতুল ছবির ‘আয়নাতে ঐ মুখ দেখবে যখন কপোলের কালো তিল পড়বে চোখে’ গানটি এখনও অনেক শ্রোতা-দর্শকের কাছে অনেক পছন্দের। এই ছবিতে আমার বিপরীতে ছিলেন নায়ক রাজ্জাক। ছবিটির পরিচালক ছিলেন অশোক ঘোষ। শুধু তাই নয়, পরবর্তীতে গাজী মাজহারুল আনোয়ার পরিচালিত ‘সন্ধি’ ছবির একটা চিঠি লিখে দাও তুমি সবারে জানাও, আসামি হয়েছে স্বামী চোখে দেখে যাও’ গানটিও বেশ শ্রোতাপ্রিয়তা পায়। এই গানে লিপসিং করেছিলাম আমি ও রাজ্জাক। নাচের পুতুল সন্ধি ছাড়া ঢাকার সন্দেহ, কারণ, সহধর্মিণী, শর্ত, যোগাযোগ, জুলি, বশিরা, দিলসহ আরও কিছু ছবিতে অভিনয় করি। মূলত পরবর্তী সময়কালে ঢাকার যতগুলো ছবিতেই আমি অভিনয় করেছি, তার সবগুলোই ছিল ব্যবসা সফল।

তখন আমাদের দেশের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রগুলোতে এক ধরনের মানসম্পন্ন বিনোদন ছিল, এখন তা নেই বললেই চলে, আপনি কি বলেন?

এটা সত্য যে, আমাদের সময়ের চলচ্চিত্রে নিটোল একটা বিনোদন থাকত, যা পরিবারের সবাইকে নিয়ে উপভোগ করা যেত। মাঝে তো আমাদের চলচ্চিত্রের অবস্থা একেবারেই নাজুক ছিল। এখন সে অবস্থা থেকে কিছুটা হলেও পরিত্রাণ পাওয়া গেছে। আমার বিশ্বাস চলচ্চিত্রে সুদিন ফিরে আসবেই।

পাকিস্তানের চলচ্চিত্রের সঙ্গে এখনও যোগাযোগ আছে আপনার?

অবশ্যই আছেÑ না থাকার মতো তো কিছু নেই। এইতো গত বছরের শুরুতে পিটিভি আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে আমাকে এবং আমার স্বামী রবিন ঘোষকে লাইফটাইম এ্যাচিভম্যান্ট দেয়া হয়। তাঁরা এখনও আমাকে ছবিতে কাজ করার কথা বলেন। কিন্তু মানসিকভাবে সেখানে কাজ করার আর ইচ্ছে নেই আমার। অন্যদিকে, আমার দেশ থেকে আজও তেমন কোন সম্মাননা ভাগ্যে জোটেনি। না, এ নিয়ে কোন দুঃখবোধ নেই আমার। কারণ যাঁরা বিচারের চূড়ান্ত রায় দেন, তাঁদের চোখে হয়ত আমি সেরা কাজটি করতে পারিনি।

প্রকাশিত : ১২ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

১২/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: