কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

সিলেট হাসপাতালের ঘটনায় কেউ দায়ী হলে কঠোর ব্যবস্থা

প্রকাশিত : ১২ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • তদন্ত শুরু

স্টাফ রিপোর্টার, সিলেট ॥ সিলেটের ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চব্বিশ ঘণ্টায় ১০ শিশুসহ ৩২ রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত কাজ শুরু করেছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গঠিত দু’টি তদন্ত কমিটির সদস্যরা। বুধবার বেলা ১২টায় মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মোশাররফ হোসেনের নেতৃত্বে স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক (হাসপাতাল ও নার্সিং) সামিউল ইসলাম সাদী ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের শিশু বিশেষজ্ঞ ডাঃ আবির হোসেন রাব্বি এই তদন্ত কাজ শুরু করেন। মারা যাওয়া ১০ শিশুসহ বাকি ২২ রোগীর কাগজপত্র ও ব্যবস্থাপত্র দেখেছেন তাঁরা। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গঠিত কমিটিও তদন্ত কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এর আগে মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত দল হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুস সবুর মিয়ার সঙ্গে বৈঠক করেন। বেলা ১টার দিকে তাঁরা হাসপাতালের ২১, ২২ ও ২৩নং শিশু ওয়ার্ড পরিদর্শন করেন।

পরিদর্শন শেষে বেলা দুইটায় তদন্ত দলের সদস্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের শিশু বিশেষজ্ঞ ডাঃ আবির হোসেন রাব্বি বলেন, ২৪ ঘণ্টায় ১০ শিশুসহ ৩২ জনের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে দেখেছি। যেসব রোগী মারা গেছেন, তাদের কাগজপত্র ও ব্যবস্থাপত্র দেখেছি আমরা। এগুলোতে কোন ধরনের অস্বাভাবিকতা আছে কিনা তা খতিয়ে দেখছি। তিনি জানান, এসব মৃত্যুর ঘটনায় কোন অস্বাভাবিকতা থাকলে এবং এ জন্য কেউ দায়ী প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হবে।

প্রাথমিকভাবে কোন ধরনের অস্বাভাবিকতা পাওয়া গেছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে ডাঃ আবির বলেন, ‘তদন্ত চূড়ান্তভাবে শেষ হওয়ার পরই এ বিষয়টি নিয়ে কথা বলা যাবে। তার আগে কিছু বলা সম্ভব নয়।

এদিকে ওসমানী হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুস সবুর মিয়া জানিয়েছেন, হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ইসমাঈল পাটোয়ারীর নেতৃত্বে ওসমানী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গঠিত তদন্ত দলও কাজ শুরু করেছে। এই তদন্ত দলে আরও রয়েছেন হাসপাতালের শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মনজ্জির আলী, আবাসিক চিকিৎসক রঞ্জন কুমার রায়, সার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান দেওয়ান আলী হাসান চৌধুরী, গাইনি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক দিলীপ কুমার ভৌমিক ও শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মসিহ উদ্দিন চৌধুরী।

এদিকে, স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডাঃ দীন মোহাম্মদ নূরুল হক বুধবার জনকণ্ঠকে জানান, তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করেছে। তদন্তের সময় মৃত রোগীদের চিকিৎসার সার্বিক দিক ছাড়াও হাসপাতালের পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। স্বল্প সময়ে এত সংখ্যক রোগী মৃত্যুর ঘটনাটি খুব গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদফতর। চিকিৎসায় অবহেলাসহ অস্বাভাবিক কারণে মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান মহাপরিচালক।

এদিকে, দেশের সরকারী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রোগী মৃত্যুর চিত্র অনুযায়ী দেখা গেছে, বেশ কিছু হাসপাতালে দিনে অনেক রোগী মৃত্যুর রেকর্ড রয়েছে। তবে ওই সব ঘটনা অনেকটা সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের রোগী সংখ্যার ওপর নির্ভর করছে। যে হাসপাতালে রোগী সংখ্যা যত কম, ওই হাসপাতালে রোগী মৃত্যু সংখ্যাও অনেক কম। তবে রোগীর মৃত্যু সংখ্যা বেশি-কম হওয়ার বিষয়টি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের কারও হাতে নেই বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হেলথ বুলেটিন-২০১৪ অনুযায়ী ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এক বছরে ৮৮৬৬ রোগীর মৃত্যু ঘটেছে। অর্থাৎ দিনে গড়ে ২৪.২৯ জন মারা গেছে। কিন্তু গত দু’দিনে ঢাকা মেডিক্যালে বার্ষিক গড় হিসেবের প্রায় দ্বিগুণ রোগী মারা গেছে। এই হাসপাতালে বুধবার বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন ৩৮ রোগী মারা গেছে। গত মঙ্গলবার মারা গেছে ৪০ জন। এভাবে হেলথ বুলেটিন অনুযায়ী এক বছরে সিলেটের এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বছরে মৃত রোগীর সংখ্যা ৪৩১৮ জন, যা প্রতিদিন প্রায় ১২ জন। তাদের মধ্যে স্ট্রোকে ৯.৩৬ ভাগ, সেপটিসিমিয়ায় ৮.৫৭ ভাগ, ইনজুরির কারণে ২.৮৭ ভাগ, দুর্ঘটনার কারণে ২.৬২ ভাগ, নিউমোনিয়ায় ১.৬৭ ভাগ, এবং ভাইরালের কারণে শিশুমৃত্যু ১.৫৫ ভাগ রোগীর মৃত্যু ঘটে। এক বছরে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মোট মৃত রোগীর সংখ্যা ৫১৮৫ জন (দিনে গড়ে ১৪.১৫ জন), দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১৪৪৮ জন (দিনে গড়ে ৩.৯৭ জন), শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ২৮৮১ জন (দিনে গড়ে ৭.৮৯ জন), ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৭৬৭৫ জন (দিনে গড়ে ২১ জন), স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১৯৫৫ জন (দিনে গড়ে ৫.৩৬ জন), ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১৭৮৩ জন (দিনে গড়ে ৪.৯ জন), শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৬৯১ জন (দিনে গড়ে ১.৮৯ জন), কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১৬৭৮ জন (দিনে গড়ে ৪.৫৯ জন), চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৭৫০৮ জন (দিনে গড়ে ২০.৫৭ জন) এবং শেরেবাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৩২৭০ জন (দিনে গড়ে ৮.৯৬ জন)।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, একটি হাসপাতালে দৈনিক কত রোগী মারা যাবে তা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। রোগীমৃত্যুর পেছনে অনেক কারণ কাজ করে। দেশের প্রতিটি সরকারী হাসপাতালেই নির্ধারিত রোগীশয্যার দু’ থেকে তিনগুণ রোগী চিকিৎসাধীন থাকে। এতে ইচ্ছে ও আন্তরিকতা থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা বজায় রাখা সম্ভব হয়ে ওঠে না। আর অনেক রোগীর আগমন ঘটে অবস্থার শেষ পর্যায়ে। হাসপাতালে আনার কিছুক্ষণ পরই অনেক রোগীকে মৃত ঘোষণা করতে হয়। এই অবস্থায় রোগীর চিকিৎসাসেবা দেয়ার সুযোগ না পেয়েও ওই রোগীর মৃত্যু হওয়ার দায়ভার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকেই বহন করতে হয়। আইসিসিইউতে রাখা রোগীদের শতকরা ৭০ ভাগই মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে থাকে। তাই আইসিইউ রোগীদের অধিকাংশের মৃত্যু ঘটে। আর শিশুদের অসুস্থ হওয়ার বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর বিষয়। কথা বলতে না পারায় অনেক সময় চিকিৎসকদের পূর্ব অভিজ্ঞতা, শিশুদের শারীরিক উপসর্গ এবং মেডিক্যাল পরীক্ষার ওপর নির্ভর করেই শিশুদের চিকিৎসা চালাতে হয়। চিকিৎসাসেবা দেয়ার ক্ষেত্রে চিকিৎসক ও নার্সরা কখনও রোগীদের অশুভ কিছু কামনা করেন না। এছাড়াও রোগের প্রকার, ধরন ও দেশের চিকিৎসাসেবার সামর্থ্যরে ওপরও রোগী মৃত্যুর হ্রাস-বৃদ্ধি নির্ভর করতে পারে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।

প্রসঙ্গত, সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চব্বিশ ঘণ্টায় ১০ শিশুসহ ৩২ রোগীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। সোমবার রাত সাড়ে ১০টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ছয়টার মধ্যে তারা মারা যায়। হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার অবহেলায় শিশুরা মারা গেছে বলে অভিযোগ করেছেন তাদের স্বজনরা। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগী ও তাঁদের অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। সিঙ্গাপুরে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে থাকা অবস্থায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম সিলেট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ঘটনা শোনেন। তাৎক্ষণিকভাবে তিনি স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী, স্বাস্থ্য সচিব এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালককে ফোন করে ঘটনার বিস্তারিত অবহিত হন। এ সময় তিনি হাসপাতালে চিকিৎসায় কোন অবহেলা চিহ্নিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের নির্দেশে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। কমিটিকে সরেজমিনে পরিদর্শন করে সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেয়ার জন্য বলা হয়েছে।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডাঃ দীন মোহাম্মদ নূরুল হক মৃত ৩২ জনের পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। এতে দেখা যায়, জন্মকালীন শ্বাসরোধের কারণে ৪, মায়ের অপুষ্টির কারণে ৩, পরিপাকতন্ত্রের জটিলতায় ১ নবজাতক, ডায়রিয়া ও ব্রঙ্কোনিউমোনিয়ায় ২ শিশু মারা যায়। সিলেটের একটি গ্রামের মারামারির ঘটনায় ৫ জন মারা যায়। স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে ৪ জন, হার্ট এ্যাটাকে ৩ জন, কার্ডিয়াক ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ২ জন, ফুসফুসের রোগ ও যক্ষ্মায় ১, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের জটিলতায় ১, অজ্ঞাত বিষক্রিয়ায় ১, এ্যানসেফেলাইটিস-এ ১ এবং সড়ক দুর্ঘটনায় ৪ জনের মৃত্যু হয়

প্রকাশিত : ১২ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

১২/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: