আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ভারতের মুকুট ধরে রাখার লড়াই

প্রকাশিত : ১১ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • জাহিদুল আলম জয়

সময়ের দূরত্বটা খুব বেশি নয়। একটা সময় ছিল বিশ্বকাপ ক্রিকেট মানেই অস্ট্রেলিয়ার একচ্ছত্র রাজত্ব। ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপ থেকে অজেয় অস্ট্রেলিয়াকে ২০১১ আসরে মাটিতে নামায় ভারত ও পাকিস্তান। চার বছর আগে এশিয়ায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বে সর্বপ্রথম অস্ট্রেলিয়ার অপরাজেয় থাকার গৌরবময় রেকর্ডের দম্ভচূর্ণ করে ১৯৯২ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়নরা। এরপর কোয়ার্টার ফাইনালের লড়াইয়ে ভারতের কাছে হেরে ব্যর্থতার ষোলকলা পূর্ণ করে দেশে ফিরে যান পন্টিং, ক্লার্ক, হাসি, লিরা। বিশ্বকাপের মহারাজাদের পতনের পর ক্রিকেটবিশ্ব পেয়েছে নতুন অধিপতি। চার বছর আগে ১০ম বিশ্বকাপের ফাইনালে শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে ক্রিকেটের রাজত্ব নিজেদের করে নেয় মহেন্দ্র সিং ধোনির ভারত। গত চার বছর তাই বিশ্ব ক্রিকেটের সেরার মুকুট শচীন, গাম্ভীর, যুবরাজ, রায়না, কোহলিদের দেশের।

চার বছর পর আবারও দোয়ারে উপস্থিত বিশ্বকাপ ক্রিকেট। এবারের আয়োজক অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড। উপমহাদেশের দলগুলোর জন্য বরাবরই এই কন্ডিশন অগ্নিপরীক্ষার। বেশিরভাগ সময়ই দেখা গেছে নিজেদের সীমানা ছাড়িয়ে অন্য জায়গায় মুখ থুবড়ে পড়েছে এ অঞ্চলের দেশগুলোর শ্রেষ্ঠত্ব। কঠিন এই সত্য সামনে রেখেই এবার অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে বিশ্বসেরার মুকুট ধরে রাখার মিশনে গেছে ভারত। কথায় আছে ‘মুকুট পড়ার চেয়ে ধরে রাখা কঠিন’। ধোনির নেতৃত্বে ভারতীয় দল এবার সেই মিশনেই ময়দানি যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার অপেক্ষায়।

ভারতীয় ক্রিকেট দলের ক্ষেত্রে একটি অপ্রিয় কথা সবারই জানা। ‘দেশে বাঘ আর বিদেশে বিড়াল’। এ প্রমাণ দেশটি অসংখ্যবার রেখেছে। অনেকেই বলে থাকেন, গতবার স্বাগতিক না হলে বিশ্বকাপ জিততে পারত না সুনীল গাভাস্কার, কপিল দেব, আজহার উদ্দিন, সৌরভ গাঙ্গুলীদের উত্তরসূরিরা! এবার তাই বিশ্বকে দেখিয়ে দেয়ার পালা ধোনি, কোহলি, জাদেজা, রাহানে, রোহিতদের। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের পারফর্মেন্স দেখে হতাশ দেশটির ভক্ত-সমর্থকরা। বিশেষ করে বিশ্বকাপের আগে আয়োজক অস্ট্রেলিয়ায় ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজে জঘন্য পারফর্মেন্স প্রদর্শন করেছে দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। চার ম্যাচের একটিতেও জয় পায়নি বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা!

বিশ্বকাপের ‘ড্রেস রিহার্সেল’ খ্যাত এই আসরের পারফর্মেন্স মূলযজ্ঞেও প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন ক্রিকেট সংশ্লিষ্টরা। তবে এসব ভুলে বিশ্বকাপের রঙিন মঞ্চে নিজেদের সেরাটা ঢেলে দেয়ার পণ করেছে ভারতীয় দল। দলটির চৌকষ অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি জানিয়েছেন, একটি লক্ষ্যেই খেলবে ভারত। তা হলো শিরোপা জয়।

২০১১ বিশ্বকাপের পর দেশের মাটিতে প্রায় শতভাগ সাফল্য পেয়েছে ভারত। ঠিক তার উল্টোটি বিদেশের মাঠে। ২০১৪ সালের পরিসংখ্যান বলছে, ওয়ানডেতে মোট ১২টি ম্যাচ হেরেছে ভারত। এর মধ্যে বিদেশে হার ৭টিতে। তবে একটি সুখকর তৃপ্তি থেকেও আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হতে পারে এশিয়ার অন্যতম সেরা ক্রিকেট খেলিয়ে দেশটি। তা হচ্ছে আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জয়। ২০১৩ সালের জুনে অনুষ্ঠিত আসরে স্বাগতিক ইংল্যান্ডকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় ভারত। যা বিদেশের মাটিতে ভারতের ইতিহাসের অন্যতম সেরা সাফল্য। দেড় বছর আগের ওই সাফল্যকে এবারের বিশ্বকাপে টনিক হিসেবে নিতে চায় ১৯৮৩ ও ২০১১ আসরের চ্যাম্পিয়নরা। নেতা হিসেবে মহেন্দ্র সিং ধোনির মতো তুখোড় ক্রিকেটার থাকার কারণেও অনেকে ভারতের মুকুট ধরে রাখার বিষয়ে আশাবাদী। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জয় করার মধ্য দিয়ে ধোনি একমাত্র অধিনায়ক হিসেবে আইসিসির সব আসরে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কৃতিত্ব দেখান।

ত্রিদেশীয় সিরিজে ভাল না করা ভারতকে ভাবাচ্ছে ইনজুরিও। দলের অন্যতম তিন সেরা তারকা রোহিত শর্মা, রবীন্দ্র জাদেজা ও ইশান্ত শর্মা আছেন চোটজনিত সমস্যায়। এ তিনজন বিশ্বকাপে পূর্ণ ফিটনেস ফিরে পাবেন কিনা তা নিয়ে সংশয় আছে। আগের আসরের সেরা খেলোয়াড় যুবরাজ সিংও নেই এবারের ভারতীয় দলে। এমন অবস্থার মধ্যে বিশ্বকাপ ও চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুখস্মৃতি নিয়ে শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখার মিশনে নামছেন ধোনি বাহিনী।

গত আসরের কোয়ার্টারে অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর পর থেকেই মূলত ভারত বিশ্বকাপ জয়ের রসদ পেয়ে যায়। যার প্রমাণ মেলে সেমিতে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান ও ফাইনালে শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের মধ্য দিয়ে। ১৯৮৩ সালে প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের পর আধুনিক যুগে এটি ভারতের সেরা সাফল্য। ২০০৩ সালে সৌরভ গাঙ্গুলীর নেতৃত্বে ফাইনালে পৌঁছলেও সেবার অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল ভারতের। এরপর ২০০৭ সালে ক্যারিবীয় আসরে তো আরও বেহাল দশা হয় রাহুল দ্রাবিড়ের দলের। বাংলাদেশের কাছে হারের জের ধরে প্রথম পর্বেই বিদায়ঘণ্টা বাজে এশিয়ার ক্রিকেট পরাশক্তিদের। তবে ওই বছরেই অনুষ্ঠিত টি২০ বিশ্বকাপের মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়ায় ভারতীয় ক্রিকেট দল। এর মূল রূপকার মহেন্দ্র সিং ধোনি। ক্যারিবীয় আসরে ভারত ব্যর্থ হওয়ার পর রাহুল দ্রাবিড়ের স্থলাভিষিক্ত করা হয় ধোনিকে। কাপ্তান হিসেবে যে ধোনি অত্যন্ত প্রতিভাবান সেটা সর্বপ্রথম বলেছিলেন গ্রেগ চ্যাপেল। সৌরভ গাঙ্গুলীর সঙ্গে তিক্ত সম্পর্ক নিয়ে বিতর্কের ঝড় তোলা চ্যাপেল ২০০৫ সালে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডকে চিঠি দিয়ে ধোনিকে ভবিষ্যতে অধিনায়ক হিসেবে পরিচর্যার পরামর্শ দিয়েছিলেন। চ্যাপেলের কথার হয়ত গুরুত্ব দিয়েছিল বিসিসিআই। আর তাই দুই বছরের মাথাতেই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী যুবরাজসহ সিনিয়র ক্রিকেটারদের টপকে ভারতের অধিনায়ক বনে যান ধোনি। দায়িত্ব পাওয়ার শুরু থেকেই ভারতীয় দলকে সাফল্যে মুড়িয়েছেন দৃঢ়চেতা এ ক্রিকেটার। মূলত ২০০৭ সালের টি২০ বিশ্বকাপ থেকেই ধোনি ও ভারতের ক্রিকেটের নতুন জোয়ার সৃষ্টি হয়। যার ধারাবাহিকতায় ২০১১ বিশ্বকাপ ক্রিকেটের শিরোপা জয় করে ‘টিম ইন্ডিয়া’।

কপিল দেবের হাত ধরে ১৯৮৩ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর থেকেই মূলত ভারতীয় ক্রিকেটের উত্থান শুরু। এরপর থেকে দেশটি ধীরে ধীরে ক্রিকেট পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। মাঝখানে ধারাবাহিক সাফল্যে ছেদ পড়েছিল। অবশেষে চার বছর আগে শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে দীর্ঘ ২৮ বছর পর বিশ্বকাপ ক্রিকেটের শিরোপা জয় করে ভারত। এবার বিশ্বের অন্যতম জনবহুল দেশটির রাজত্ব ধরে রাখার লড়াই।

প্রকাশিত : ১১ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

১১/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: