কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বাজল ক্রিকেটের দামামা

প্রকাশিত : ১১ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • শাকিল আহমেদ মিরাজ

ফুটবল সর্বজনিন, রাগবি অভিজাত, মিশ্র ক্রীড়ার অলিম্পিক ঐতিহ্যের ধারক, আর ক্রিকেট? গৌরবময় অনিশ্চয়তার খেলা। সাদা পোশাকের টেস্ট নাকি জাতশ্রেণীর সময় কাটানোর অনুষঙ্গ, আধুনিক ২০টি চানাচুর ভাজা খাওয়ার আনন্দ, ক্রিকেটের আসল স্বাদ তাহলে পঞ্চাশ ওভারেই! অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে বসছে ক্রিকেটের সেই সত্যিকারের রোমাঞ্চ, ওয়ানডে শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই। ১১তম বিশ্বকাপ ক্রিকেট ২০১৫। ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান কিংবদন্তি ক্লাকইভ লয়েডের মতে, ‘পিচে পড়া বল যদি সাঁ সাঁ করে ব্যাটসম্যানের দিকে ছুঁটেই না এল তাহলে ক্রিকেটে মজা কোথায়?’ অস্ট্রেলিয়া হচ্ছে সেই কন্ডিশন। উইলো আর গোলকবাজিতে জমবে লড়াই দ্রুতগতির উইকেটে। ১৪ ফেব্রুয়ারি- ২৯ মার্চ, ১৪ দল, ৪৯ ম্যাচ। ৪৪ দিনব্যাপী শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে রোমাঞ্চ ছড়াতে প্রস্তুত সিডনি, মেলবোর্ন, অকল্যান্ড। প্রস্তুত বিশ্বজুড়ে ক্রিকেটপিপাসু অগনিত মানুষ।

শনিবার ক্রাইস্টচার্চে শ্রীলংঙ্কা-নিউজিল্যান্ড ও মেলবোর্নে অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ড ম্যাচ দিয়ে শুরু ময়দানি লড়াই। ২৯ মার্চ মেলবোর্নেই ফাইনালের মধ্য দিয়ে পর্দা নামবে ৪৪ দিনব্যাপী ক্রিকেট যজ্ঞের। দুই গ্রুপে মোট ১৪টি দল, পুল ‘এ’ ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, শ্রীলঙ্কা, নিউজিল্যান্ড, বাংলাদেশ, আফগানিস্তান ও স্কটল্যান্ড। পুল ‘বি’তে আছে ভারত, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, জিম্বাবুইয়ে, আয়ারল্যান্ড ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। দুই দেশের মোট ১৪টি ভেন্যুতে খেলা অনুষ্ঠিত হবে। গ্রুপ পর্বের ৪২টি, ৪টি কোয়ার্টার ফাইনাল, ২টি সেমিফাইনাল ও ফাইনালসহ মোট ম্যাচ ৪৯টি। ১৪টি ভেন্যু হচ্ছেÑ অস্ট্রেলিয়া-এ্যাডিলেড, ব্রিসবেন, মেলবোর্ন, ক্যানবেরা, হোবার্ট, পার্থ, সিডনি ও নিউজিল্যান্ডের-অকল্যান্ড, ক্রাইস্টচার্চ, ডুনেডিন, হ্যামিল্টন, নেপিয়ার, ওয়েলিংটন ও নেলসন। ক্যানবেরায় ১৮ ফেব্রুয়ারি আফগানিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শুরু হবে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ মিশন।

১৯৭৫ থেকে প্রতি চার বছর পর ওয়ানডে ফরমেটের বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। প্রথম তিন আসরের আয়োজক কুলিন ইংল্যান্ড। ১৯৭৫ ও ১৯৭৯ টানা দুই ট্রফি জিতে বাজিমাত করে সেসময়ের দুর্ধর্ষ ওয়েস্ট ইন্ডিজ। পরের চার আসরেই অবশ্য চার নতুন চ্যাম্পিয়ন পায় ক্রিকেট। ১৯৮৩-এ একই ভেন্যু লর্ডসের তৃতীয় ফাইনাল শেষে ট্রফি উঁচিয়ে ধরে কপিল দেবের ভারত। ১৯৮৭ সালের চতুর্থ আসরের আয়োজক ভারতেরই মাটি থেকে প্রথমবারের মতো শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট ওঠে অস্ট্রেলিয়ার হাতে। হিসেবে না থেকেও ১৯৯২-এ অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে বিজয় কেতন ওড়ায় ইমরান খানের পাকিস্তান! ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় যৌথভাবে আয়োজিত ষষ্ঠ বিশ্বকাপের শিরোপা জয় করে বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে চমক সৃষ্টি করে লঙ্কানরা। জিরো থেকে হিরো বনে যায় অর্জুনা রানাতুঙ্গা বাহিনী। ১৯৯৯ সালে ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড ও হল্যান্ডে অনুষ্ঠিত আসরে ট্রফি পুনরুদ্ধারই কেবল নয়, ২০০৩ (দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুইয়ে, কেনিয়া) ও ২০০৭ উইন্ডিজ বিশ্বকাপ জিতে টানা হ্যাটট্রিক অসিদের! সর্বশেষ ২০১১-এ বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও ভারতের আয়োজনে আটাশ বছর পর ট্রফি ফিরিয়ে আনে ভারত।

বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা, প্যারিসের পত্রিকা অফিসে এবং সিডনির দোকানে সন্ত্রাসী হামলার পর নিরাপত্তা প্রশ্নে বেশ শক্ত অবস্থানে আয়োজক কমিটি। নিরাপদ আয়োজনের চ্যালেঞ্জ মাথায় রেখে আয়োজক কমিটির প্রধান টেরেস ওয়ালস যেমন নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ইস্যুকে গুরুত্ব দিয়েছেন, তেমনি মাঠে খেলোয়াড়দের সংযত রাখতে সচেষ্ট আইসিসি প্রধান ডেভ রিচার্ডসন। ‘বিশ্বকাপের জন্য আমাদের সকল ভেন্যু প্রস্তুত। শ্রীলঙ্কার সঙ্গে ওয়ানডের আগেই ম্যাচ তৈরি হয়ে গেছে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের সঙ্গে করণীয় চূড়ান্ত। সরকারের তরফ থেকে নিশ্চিদ্র নিরাপত্তা দিতে চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।’ বলেন নিউজিল্যান্ডের বিশ্বকাপ আয়োজক কমিটির চেয়ারম্যান টেরেস ওয়ালস। একইসঙ্গে এবার মাঠে খেলোয়াড়দের আচরণ নিয়ে আরও কঠোর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)। সদ্যসমাপ্ত ত্রিদেশীয় সিরিজের ভারতের বিপক্ষে ম্যাচে অসদাচরণের জন্য জরিমানা করা হয় ডেভিড ওয়ার্নারকে, এতে উল্টো ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান অস্ট্রেলিয়ান তারকা! বিশ্বকাপে খেলোয়াড়দের সংযত আচরণ করতে এরই মধ্যে প্রতিটি দেশের বোর্ডের বরাবর কঠোর হুশিয়ারি দিয়ে বার্তা দিয়েছে আইসিসি।

স্বাগতিক, র‌্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বর দল ও সবচেয়ে বেশি ৪ বারের (১৯৮৭, ১৯৯৯, ২০০৩, ২০০৭) শিরোপাধারী হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার দিকে থাকছে বাড়তি দৃষ্টি। ১৯৭৫ ও ১৯৯৬ সালের রানার্সআপ কুলিন অসিরা এ পর্যন্ত দশ বিশ্বকাপের ছয়টিতেই ফাইনালে ওঠে! অবশ্য গতবার উপমহাদেশের কন্ডিশনে মোটেই ভাল করতে পারেনি তারা। এবার ঘরের মাটিতে, পরিচিত বাউন্সি কন্ডিশনে খেলা। তার ওপর মাঝের এই সময়ে নিজেদের বেশ গুছিয়ে নিয়েছে তারা। যার প্রমাণ র‌্যাঙ্কিংয়ের শ্রেষ্ঠত্ব। সাম্প্রতিক সময়ে অসাধারণ ক্রিকেট খেলছেন মিচেল জনসন, স্টিভেন স্মিথ, ডেভিড ওয়ার্নার, রায়ান হ্যারিসরা। বিশ্বকাপের ঠিক আগ মুহূর্তে চিরশত্রু ইংল্যান্ড ও চ্যাম্পিয়ন ভারতকে নাস্তানাবুদ করে ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে ওঠে তারা। যদিও ইনজুরির জন্য নিয়মিত অধিনায়ক মাইকেল ক্লার্ককে নিয়ে রয়েছে ঘোরতর অনিশ্চয়তা। কিন্তু দূর্দান্ত দলীয় নৈপুণ্যে যে ব্যক্তিগত দূর্বলতা জয় করা যায়, অস্ট্রেলিয়ার এই দলটি তারই উদাহরণ। শিরোপা পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি মাঠের বাইরের নৈপুণ্যেও আলো ছড়াতে চায় অসিরা।

এবারের বিশ্বকাপে বিশেষ আকর্ষণ থাকবে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ভারতকে ঘিরে। যদিও সাম্প্রতিক পারফর্মেন্স ও অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের কন্ডিশনে মহেন্দ্র সিং ধোনিদের সাফল্যের পুনরাবৃত্তি নিয়ে বড় রকমের প্রশ্ন থাকছে! আড়াই মাস আগে গিয়েও এখন পর্যন্ত ছন্দহীন ক্রিকেট-মোড়লরা। প্রথমে টেস্ট সিরিজে ২-০তে হারের পর ত্রিদেশীয় ওয়ানডেতে নিজেদের প্রথম দুই ম্যাচে অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের কাছে মাথা নোয়ায় ভারত। যদিও একটি টেস্ট সিরিজের ফল দিয়ে সবকিছু বিচার করা যায় না। ২০১২-২০১৩ মৌসুমে ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট ভরাডুবির পরও আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জয়ের মধ্য দিয়ে ক্রিকেটের সবগুলো বৈষয়িক শিরোপা ঘরে তুলেছি। ওয়ানডেতে র‌্যাঙ্কিংয়ের দ্বিতীয় স্থানে ভারত। সেরা দশের দুই ব্যাটসম্যান বিরাট কোহলি-শিখর ধাওয়ান, বোলিংয়ে ভূবনেশ্বর। তার চেয়ে বড় দলটির অধিনায়ক ‘ক্যাপ্টেনকুল’ ধোনি। যাঁর নেতৃত্বে দীর্ঘ আটাশ বছর পর গতবার শিরোপা পুনরুদ্ধার করে ভারত। শুরুটা হয়েছিল ২০০৭ প্রথম টি২০ বিশ্বকাপে বাজিমাত করে। এরপর একে একে দেশকে আইসিসির সবগুলো ট্রফিই উপহার দিয়েছেন ধোনি। শিরোপা ধরে রাখতে জীবন বাজি রেখে লড়বেন কোহলি, ধাওয়ান, রবিচন্দ্রন আশ্বিনরা।

বাড়ানো হয়েছে পুরস্কারের অর্থ। গতবার দশম বিশ্বকাপের সর্বমোট প্রাইজমানি ছিল ৮০ লাখ ১০ হাজার মার্কিন ডলার। শতকরা ২০ ভাগ বেড়ে এবার তা ১ কোটি মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। শিরোপাজয়ী দল পাবে ৩৭ লাখ ৫০ হাজার, রানার্সআপ ১৭ লাখ ৫০ হাজার, সেমিফাইনালিস্ট চার দল ৬ লাখ ডলার করে। সেমিতে হেরে গেলেও থাকছে ৬০ হাজার ডলার। এছাড়া হার-জিত যাই হোক টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি দলের জন্য রয়েছে নির্ধারিত পরিমান অর্থ পুরস্কার। এবারের আসরে পরিবর্তন এসেছে নিয়ম কানুনে। নকআউট থেকে ফাইনাল পর্যন্ত ‘সুপার ওভার’ থাকছে না। ফাইনালে যদি ফল না হয়, কিংবা ‘টাই’ হয় তবে যুগ্মভাবে দুই দলকেই চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করা হবে! আগে এক্ষেত্রে সুপার ওভারে মিমাংসা হতো। একইভাবে কোয়ার্টার এবং সেমিফাইনালেও সুপার ওভার থাকবে না, সেক্ষেত্রে গ্রুপসেরাদেরই পরবর্তী ধাপে তুলে দেয়া হবে। যদিও শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত পরির্বতন করে সুপার ওভার বহাল রাখা হতে পারে! এ নিয়ে চাপে রয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাআইসিসি। এছাড়া ম্যাচে বহাল থাকবে ডিআরএস (ডিসিশন রিভিউ সিস্টেম)।

প্রকাশিত : ১১ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

১১/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: