কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

তারুণ্যের স্বল্প ও মুক্তদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে সম্ভাবনা

প্রকাশিত : ১০ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • অঞ্জন সরকার জিমি

১৯৭১ সাল। বিশ্ব চলচ্চিত্রে ইরানী জাগরণ চলছে। আব্বাস কিয়েরোস্তামি, মহসেন মাখমালবাফ, জাফর পানাহি, মাজেদ মাজেদি, প্রমুখ খ্যাতিমান এশীয় পরিচালকের ভিড়ে ‘লাইফ ইন ফগ’ নামে, একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র দিয়ে প্রাদপ্রদীপের আলোয় আসেন এক কুর্দি তরুণ। নাম বাহমান গোবাদি। এটি ছিল তাঁর নবম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। তথ্যচিত্রটির ব্যাপক সাফল্যই তাঁর শিল্পের ক্ষুধাকে উসকে দেয়। পরবর্তীতে এই পরিচালকের ‘টার্টলস ক্যান ফ্লাই’, হাফ মুন, রাইনোসিজনসহ বেশ কয়েকটি ছবি বিশ্ব-চলচ্চিত্রের শ্রেষ্ঠ প্রতিযোগিতাগুলোতে স্থান করে নেয় এবং পুরস্কৃত হয়।

পৃথিবীর অনেক খ্যাতনামা পরিচালকই স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তাদের শিল্পজীবন শুরু করেছেন। এদের মধ্যে আব্বাস কিয়েরোস্তামি, এমির কুস্তরিকাসহ বিশ্ব চলচ্চিত্রের অনেক রথী-মহারথীরাই আছেন। ছোট ছোট চলচ্চিত্র নির্মাণের মাধ্যমে এঁরা নিজেদের মেধা, শিল্পবোধ, দর্শন, মনন ইত্যাদিকে যেমন ঝালিয়ে নিয়েছেন একদিকে, অন্যদিকে চলচ্চিত্রের বিভিন্ন কারিগরি দিকগুলোর ব্যবহার ও সম্ভাবনা রপ্ত করে নিয়েছেন; যা পরবর্তীতে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নিমার্ণের ক্ষেত্রে তাদের ব্যাপক সহযোগিতা করেছে। এ সকল বিখ্যাত পরিচালকদের প্রায় প্রত্যেকের আত্মজীবনীতে প্রথম জীবনে নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র তাদেরকে চলচ্চিত্র কীভাবে তাদের চলচ্চিত্র নির্মাণে উদ্বুদ্ধ করেছে তার বর্ণনা আছে।

বাংলাদেশে অনেকেই স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গে জড়িত। গত এক দশকে অনেকগুলো শিল্পমানসম্পন্ন স্বল্পদৈর্ঘ্য কাহিনী ও তথ্যচিত্র দেশের বাইরে সুনাম অর্জন করেছে। এগুলোর মধ্যে ইশতিয়াক জিকোর ৭২০ ডিগ্রী এবং তথ্যচিত্রের মধ্যে শাহীন দিল রিয়াজের লোহাখোর, কামার আহমেদ সাইমনের ‘শুনতে কি পাও’।

এদের ধারাবাহিকতায় অনেক তরুণরা স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। প্রতিবছর অসংখ্য স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মিত হচ্ছে বাংলাদেশে। দেশে ও দেশের বাইরে বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হচ্ছে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকারদের নির্মিত স্বল্প ও মুক্তদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। এসব ছোট ছোট ছবিগুলোর অনেকগুলোই আঙ্গিক ও বিষয়ে বিশ্বমানের। বিষয় ও কাহিনীর কাঠামো থেকে শুরু করে দৃশ্য ধারণ, সম্পদনা, শিল্প ও পোশাক নির্দেশনা, এমনকী ভিজ্যুয়াল গ্রাফিক্সেও নতুনত্ব নিয়ে আসছে বাংলাদেশের তরুণরা। তাদের এসব সৃষ্টিকর্মের উপর ভিত্তি করে প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ক্যাটাগরির চলচ্চিত্র উৎসব হচ্ছে।

এলাকাভিত্তিক, বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক, জনরা ও ফরম্যাটভিত্তিক অনেকগুলো চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজিত হচ্ছে প্রতিবছর। প্রতিযোগিতামূলক এসব উৎসবগুলো একদিকে যেমন নির্মাতাদের সৃষ্টির প্রতি দায়িত্বশীল করে তুলছে, অন্যদিকে নতুনদের উৎসাহিত করছে চলচ্চিত্র নির্মাণে এগিয়ে আসতে।

যেসব স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসব বাংলাদেশে আয়োজিত হয় তার মধ্যে ‘আন্তর্জাতিক স্বল্প ও মুক্তদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসব’ সবচেয়ে প্রাচীন এবং কুলীনও বটে। প্রতি দুবছর পরপর অনুষ্ঠিত হওয়া এই চলচ্চিত্র উৎসবটিতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিশ্বমানের সব চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য, এতো সুযোগ-সুবিধা সত্ত্বেও খুবই কম দর্শকই এসব বিশ্বমানের চলচ্চিত্র দেখতে আগ্রহী হয়। সাধারণ দর্শক তো দূরের কথা, যারা নিয়মিত চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত তারাও বলতে গেলে এসব প্রদর্শনীগুলোতে অংশগ্রহণ করে না তেমন। এবার অনুষ্ঠিত হওয়া স্বল্প ও মুক্তদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসবের ৭টি ভেন্যুর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে অবস্থিত ভেন্যুগুলো ছাড়া অন্য ভেন্যুতে দর্শকসংখ্যা ছিল খুবই কম। এতো সুন্দর ব্যবস্থাপনা, এতো প্রচার; কোনকিছুই সাধারণ দর্শকদের আগ্রহী করে তুলতে পারছে না। মজার ব্যাপার হচ্ছে, যেসব নির্মাতার ছবি প্রদর্শিত হয় তারাও বন্ধুবান্ধব নিয়ে এসে নিজের শর্টফিল্মটি দেখেই বেরিয়ে যান হল থেকে। পরবর্তী চলচ্চিত্রটি দেখার কোনও আগ্রহই তাদের থাকে না। সবার ক্ষেত্রে সত্য না হলেও নব্বই শতাংশ ক্ষেত্রে এটাই বাস্তবতা।

শস্যক্ষেতে আগাছা থাকবেই। প্রকৃত চলচ্চিত্র নির্মাতাদের ভিড়ে সস্তা জনপ্রিয়তালোভী অসংখ্য নির্মাতাতে ছেয়ে গেছে চলচ্চিত্রের এই ক্ষেত্রটি। মাখন-বিলাসী এসব নির্মাতাদের টার্গেট টিভি নাটকেই সীমাবদ্ধ। দুয়েকজন টিভি নাটকের গ-ি পেরিয়ে বিজ্ঞাপনচিত্র পর্যন্তও পৌঁছে যেতে পারে। তবে বিজ্ঞাপন নির্মাণের জন্য ভিন্ন এলেম দরকার যা সবাই রপ্ত করে উঠতে পারে না।

এতো অন্ধকারের ভিড়েও চলচ্চিত্র নিয়ে আশাবাদী হওয়ার মতো এখনও অনেক কিছু আছে আমাদের। স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসবগুলোতে প্রদর্শিত হওয়া আমাদের চলচ্চিত্রগুলোই তার প্রমাণ। সীমাবদ্ধতাকে অস্ত্র বানিয়ে অবাক করার মতো অসংখ্য তথ্য ও কাহিনীচিত্র নির্মাণ করে মেধাবী তরুণরা তার স্বাক্ষর রাখছেন।

প্রথাগত শিক্ষা, যথাযোগ্য প্রযুক্তি, সমকালীন রেফারেন্স, কারিগরি সহযোগিতা, কাক্সিক্ষত স্বীকৃতি; কোনকিছুর তোয়াক্কা না করেই শুধুমাত্র সাহস আর শুভবুদ্ধি দিয়েই জয় করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছে তারা। সবেমাত্র আক্রমণ শুরু হয়েছে বলে তার কোন হাওয়া এসে আমাদের গায়ে লাগছে না বটে; কিন্তু নিশ্চিতভাবে বলা যায় আগামী এক দশকের ভেতরে এদের কাঁধেই ভর করে বিশ্ব-চলচ্চিত্রে নিজের দখল নেবে বাংলাদেশ। তখনও হয়তো আমাদের মধ্যবিত্ত শহুরে নাগরিকরা সময় এবং গতির সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে হোঁচট খেয়ে পড়ে থাকবে সস্তা টিভি চ্যানেলগুলোর নোংরা কাদায়, তখন তাদের করুণা করা ছাড়া আর কোন উপায় থাকবে না।

এই মুহূর্তে চলচ্চিত্র শিল্পের এসব মেধাবী তরুণদের জন্য জরুরীভাবে সুষ্ঠু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও কারিগরি সহযোগিতা প্রয়োজন। প্রয়োজন, তাদের স্বীকৃতির যথাযোগ্য ব্যবস্থা করা। সঠিক ও নিরপেক্ষ জুরির মাধ্যমে বাছাই করে সেরা ছবিগুলোকে পৃথিবীর কুলীন চলচ্চিত্র উৎসবগুলোতে রাষ্ট্রীয়ভাবে পাঠানোর ব্যবস্থা করা দরকার। সেইসঙ্গে একটা তথ্যকেন্দ্র বানানো উচিত যেখান থেকে বিভিন্ন সম্মানজনক চলচ্চিত্র উৎসগুলোতে ছবি জমা দেয়ার সঠিক তথ্য ও নিয়মাবলি পাওয়া যায়। যদি রাষ্ট্র এই ব্যবস্থা গ্রহণ করে তবে নিশ্চিতভাবেই বলা যায় ক্রিকেটের পরে বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে স্থান পাইয়ে দিতে আমাদের চলচ্চিত্র ও স্থিরচিত্র শিল্প সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবে।

প্রকাশিত : ১০ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

১০/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: