আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

মানুষের রাজনীতি করুন

প্রকাশিত : ১০ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • রাহাত খান

বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট এক মাসেরও বেশি সময় ধরে দেশে অবরোধ ও হরতাল দিয়ে চলেছে। অবরোধ আরোপ করা আছে প্রতিদিন। আর হরতাল প্রতিদিন না হলেও বলতে গেলে প্রায় প্রতিদিনই। ২০ দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এক বিবৃতিতে সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন একটা যৌক্তিক স্তরে না পৌঁছা পর্যন্ত আন্দোলন চলছে, চলবে!

আগে উল্লেখ করে নিই, ২০ দলীয় জোটের ডাকে অবরোধ বা হরতাল কিছুই হচ্ছে না। প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ তথা ১৪ দলের প্রতি সমর্থন যতটা বেশি তারচেয়ে অনেক বেশি ব্যবসা-বাণিজ্য এবং বিভিন্ন কাজ-কর্মের প্রায় বাধ্যবাধকতার কারণে ২০ দলীয় জোটের দেয়া অবরোধ ও হরতালে দেশের মানুষ যোগ দেয় না। ২০ দলীয় জোট যতই দাবি করুক- সত্য হচ্ছে অবরোধ হয় না, হরতাল হয় না। মানুষ বরং ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত হচ্ছে ‘রাজনীতি’কে পেট্রোলবোমা ছুড়ে মারা এবং প্রতিদিন নিরীহ দরিদ্র বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সাধারণ কর্মজীবীদের পুড়িয়ে মারার সমর্থক হিসেবে প্রতিপন্ন করার চেষ্টায়! বিএনপির কাছে মানুষ পুড়িয়ে মারাটাই হচ্ছে রাজনীতি।

রাজনীতির এমন দুর্ভাগ্য আর কখনও ইতোপূর্বে দেখা যায়নি। কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্য পেট্রোলবোমার এই জঘন্যতম ‘রাজনীতি’কে রাজনৈতিক চাল হিসেবে মেনে নিয়ে ১৪ দল এবং ২০ দলের মধ্যে একটা সংলাপের ব্যবস্থা করতে চাইছেন দেশের কয়েকজন বিশিষ্ট (!) নাগরিক। তাঁরা যাবেন দু’পক্ষের মধ্যে সংলাপ অনুষ্ঠানে অনুরোধ জানাতে মহামান্য রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদের কাছে। দেশের দুঃসময়ে ২৫ নাগরিক যে একটা উদ্যোগ নিচ্ছেন সে জন্য তাঁদের নিন্দা তো করা যায় না। বরং নিশ্চেষ্ট থাকার বদলে তাঁরা একটা উদ্যোগ যে নিচ্ছেন, তা অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে।

তাঁদের উদ্যোগের প্রশংসা করি। তবে তাঁদের প্রথমে গিয়ে দেখা করা উচিত যাঁরা ‘শান্তিপূর্ণ সহিংস কার্যক্রম’ চালাচ্ছেন তাঁদের সঙ্গে। বেগম জিয়াকে গিয়ে বলা উচিত নাশকতা-সহিংসতার সঙ্গে রাজনীতি আর না। বিএনপি-জামায়াত সেই অপরাধ করে চলছে দিনের পর দিন। মানুষকে পুড়িয়ে মারছে। অর্থনীতির উন্নয়নপ্রবাহ ধ্বংসের চেষ্টা করছে। মানুষ মারার নাম তো রাজনীতি নয়।

২৫ নাগরিকের উচিত ২০ দলীয় জোটের নেতা খালেদা জিয়ার কাছে যাওয়া এবং রাজনীতি ও সম্ভাব্য সংলাপের স্বার্থে আগে গ্যাসে পুড়িয়ে মানুষ মারা বন্ধ করা। এভাবে মানুষ পুড়িয়ে সরকারের পতন ঘটানো যায় না। কিংবা সরকারকে সংলাপে বসতে বাধ্য করার চাপ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। ২৫ বিশিষ্ট নাগরিক তো অসভ্য সমাজের প্রতিনিধি নন। তাঁরা দু’একজন ছাড়া সবাই অবশ্য রাজনীতিতে ছ্যাঁক খাওয়া। তাঁরা পেট্রোলবোমার সাফল্য তথা নিরীহ মানুষকে পুড়িয়ে মারার বীভৎসতাকে রাজনৈতিক চাপ হিসেবে গণ্য করতে পারেন না। সেটা হবে সমাজ ও রাজনীতির জন্য একটা খারাপ দৃষ্টান্ত।

হ্যাঁ, গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে সংলাপতো অবশ্যই। সে বিষয়ে আলোচনায় যাওয়ার আগে ২৫ জন ‘বিশিষ্ট’ নাগরিককে জিজ্ঞেস করি- পুত্রশোকে কাতর খালেদাকে সহানুভূতি জানাতে এবং সান্ত¡না দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তো খালেদা জিয়ার অফিসে গিয়েছিলেন, বিএনপি খালেদাকে ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখার একটা সস্তা এবং ন্যক্কারজনক নাটকের অবতারণা তো করলই উপরন্তু প্রধানমন্ত্রী ও খালেদা জিয়ার সাক্ষাত হলে রাজনীতির তাৎক্ষণিক পরিপার্শ্ব নমনীয় হয়ে উঠতে পারত কিনা সেটুকু ভাবার দূরদৃষ্টিও ছিল না বিএনপি-জামায়াতের।

অথবা আমার মতো অনেকেরই ধারণা বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট মুখে যাই বলুক কার্যত কোন রাজনৈতিক সংলাপ চায় না। শেখ হাসিনা তো একাধিকবার একান্তে বসে কথা বলার অনুরোধ জানিয়েছেন খালেদা জিয়াকে। খালেদা জিয়া তার উত্তরে একবার ক্ষমতা ত্যাগের জন্য ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছিলেন। আর একবার হাসিনার করা টেলিফোনে সংলাপে বসার অনুরোধ শুনে ঝগড়া করেছিলেন তিনি, রূঢ় ভাষায় জানিয়েছিলেন- হরতাল চলছে, এখন সংলাপে বসার উপায় নেই!

জ্ঞানপাপীরা ইতিহাস ও সংখ্যাতত্ত্ব ঘেঁটে দেখুন সংলাপ সবক্ষেত্রে এবং সবসময় প্রত্যাখ্যান করেছেন খালেদা জিয়া অথবা লন্ডনে বসবাসকারী তাঁর পুত্র তারেক রহমানই। ৫ জানুয়ারির আগে সব দলের অংশগ্রহণে একটি সর্বদলসম্মত ফর্মুলা তো জাতিসংঘের তারানকো দিতে পেরেছিলেন। ফর্মুলা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন বর্তমানে বিএনপির তো বটেই, ২০ দলেরও সর্বেসর্বা নেতা তারেক রহমান। কাদের পরামর্শে? বলাই বাহুল্য। সবাই তা নিশ্চয়ই আন্দাজ করছেন।

৫ জানুয়ারির আগে আওয়ামী লীগসহ ১৪ দল নির্বাচন প্রশ্নে বেশ কয়েকবার সংলাপের প্রস্তাব দিয়েছে। বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোট সেসব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। একটা বহুদলীয় গণতান্ত্রিক দেশে সংবিধান মোতাবেক নির্দিষ্ট সময় পার হলে নির্বাচন অনুষ্ঠান করতেই হয়। অনেকটা সেভাবেই অনুষ্ঠিত হয়েছে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন। হ্যাঁ, বড় দল বিএনপি অংশগ্রহণ না করায় বেশিরভাগ আসনে একতরফা জয় পেয়েছে আওয়ামী লীগ। বিএনপি এই নির্বাচনকে অবৈধ বলে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে অবৈধ বলার কোন অধিকার বিএনপি বা অন্য কোন দল বা ব্যক্তির নেই। বরং সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন না হওয়ার দায় ও অপরাধ বর্তায় বিএনপি-জামায়াতসহ ২০ দলীয় জোটের ওপর।

বিএনপি-জামায়াত বা প্রায়-অস্তিত্বহীন ১৮ দল যদি মনে করে রাজনীতিতে তারা যা চাইবে তাই দিতে হবে, তাহলে বহুদলীয় গণতন্ত্রে রাজনৈতিক সঙ্কট অনিবার্য হয়ে দেখা দিতে বাধ্য। শুধু বিএনপি-জামায়াতসহ ২০ দলীয় জোট নয়, আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলীয় জোট ও অন্যান্য দলের বেলায়ও একই কথা। কার্যত বাংলাদেশের রাজনীতিতে তেমনটাই ঘটেছে। রাজনীতির নামে আগুনে পুড়িয়ে মানুষ মারা হচ্ছে। এটা রাজনীতি নয়, অপরাজনীতিও নয়, স্রেফ বর্বরতা।

বাংলাদেশের এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবী, সুশীল এমনকি এক শ্রেণীর মিডিয়া কখনও কখনও রাজনীতিতে বড় উদ্ভট ভূমিকা গ্রহণ করে। দোষত্রুটি, অপরাধ, এমনকি ক্ষমার অযোগ্য রাজনৈতিক আচরণ করলেও বিরোধী দল বিশেষ করে বিএনপিকে তারা ভারি স্নেহ-মমতায় একটু বকে দেয়। এর বেশি কিছু নয়। কিন্তু রাজনৈতিক শাসন বা সমালোচনা করা বলতে যা বুঝায় তার কিছুমাত্র পাওয়া যায় না সুশীল ও এক শ্রেণীর মিডিয়া থেকে। যেন বিএনপি শাসনের উর্ধে। ধরা যাক, হাসিনার বদলে খালেদা যদি সোস্যাল ভিজিটে বা অন্য কারণে হাসিনার বাসায় বা অফিসে যেতেন, কি রোয়াবটাই উড়ত ওই শ্রেণীর মিডিয়া ও সুশীলদের মধ্যে! বছরের অর্ধেক সময় খালেদা বন্দনায় কেটে যেত- এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। ঐ ধরনের ব্যক্তি, সুশীল ও মিডিয়া গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাজনীতি গঠনের বদলে স্বৈরাচার, আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ের দালাল এবং তিন মাসের প্রাপ্তি যোগ প্রত্যাশীদের ক্ষমতায় আসারই পথ করে দিচ্ছেন বলে অনেকের ধারণা। ধারণাটা খুব অমূলকও বলা যায় না।

তা নইলে কেন পেট্রোলবোমা ছুড়ে মানুষ মারছে বিএনপি-জামায়াত! ২৫ জন ‘বিশিষ্ট’ নাগরিক এ সবের তীব্র নিন্দা না করে, পুড়িয়ে মানুষ না মারতে খালেদা জিয়াকে অনুরোধ জানাতে তাঁর কাছে না গিয়ে বঙ্গভবনে যাচ্ছেন কেন? মানুষ মারাটাকে রাজনৈতিক চাপ হিসেবে বৈধতা দিতে? রাজনৈতিক উপকরণ হিসেবে পেট্রোলবোমাকে শুদ্ধতা দিতে?

সংলাপ অবশ্যই হতে হবে। দেশের যা কিছু রাজনৈতিক সঙ্কট তা সব মত ও পথের রাজনীতিকদেরই এক সঙ্গে বসে মীমাংসা করতে হবে। তবে তার আগে মানুষ পুড়িয়ে মারার কুৎসিত কাজ-কর্ম বন্ধ হবে না কেন? কেন আমাদের ছেলেমেয়েদের পরীক্ষার সময় ইচ্ছে করে এই অনৈতিক হরতাল? ধিক ২০ দলীয় জোটের রাজনীতি! মানুষ নয়, রাজনীতিবিদ নয়; এরা একাত্তরে বর্বর পাকিস্তানী সৈন্যের বর্বর আচরণের নমুনাই দেখাচ্ছে।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক

প্রকাশিত : ১০ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

১০/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: