মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

হঠাৎ বদলিতে ছন্দপতন!

প্রকাশিত : ৯ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
হঠাৎ বদলিতে ছন্দপতন!
  • সিরাজুল এহসান

বরগুনা শহরের সোহেল খন্দকার-রিনা পারভিন দম্পতি। জেলা শহরেই স্থায়ী বসবাস। মোটামুটি সচ্ছল পরিবার। শহরেই ছোটখাট একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে সোহেল সাহেবের। শিক্ষিত পরিবারে উচ্চ শিক্ষিত রিনা বউ হয়ে আসার পর বসে থাকেননি। পিতা ও শ্বশুরকুলের চেষ্টায় একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি জুটে যায় তার। ছয় বছরের দাম্পত্য জীবনে চার বছরের পুত্র সন্তান রয়েছে তাদের। সংসারে সুখের পাপিয়া গান শোনায় সর্বক্ষণ। সংসার জীবনে শান্তির ছন্দপতন ঘটেনি। চাকরিজীবী হলেও রিনা ঘরে আদর্শ গৃহিণী। প্রতিদিন সকালে উঠে নাস্তা তৈরি থেকে শুরু করে সন্তান শ্বশুর-শাশুড়ির দেখভাল করে, স্বামীর খোঁজ-খবর নিয়েই তবে তিনি ছোটেন কর্মস্থলে। অফিস কাছে বলেই সুবিধাটা বেশি। দুপুরে খাবার সময় বাসায় এসেই খেয়ে যাওয়া যায়। এমন আয়েশ আর স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যে হঠাৎই ছন্দপতন। বদলির চিঠি এসেছে তার। নিজ জেলার কোনো উপজেলায় নয়, বেশ দূরের পথ বরিশালে। যেখানে প্রতিদিন যাতায়াত সম্ভব নয়। থাকতে হবে ওই শহরেই। এখন উপায়?

পর্যবেক্ষণ-২

কবির আহমেদের ভোর বেলা উঠে দ্রুত নিজে তৈরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছোট সন্তান রিতুকেও তৈরি হওয়ার তাগিদ দিতে হয়। অন্যদিকে স্ত্রী শায়লারও ফুসরত নেই। সবার নাস্তা বানিয়ে নিজেরও অফিসে যাওয়ার নিতে হয় প্রস্তুতি। শায়লার অফিস একটু দেরিতে। স্থানীয় একটি স্কুলে বিকালের শিফটের শিক্ষক তিনি। কবির সাহেব কাজ করেন এনজিওতে। রাজধানীর বাড্ডা এলাকায় ভাড়া বাড়িতে থাকেন। সকালে নিজে অফিসে যাওয়ার পথে ছোট সন্তানকে স্কুলে পৌঁছে দেন। বড় ছেলে পড়ছে অনার্সে। এখন আর তাকে আগের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছে দেওয়ার ঝক্কি ঝামেলা নেই। গুলশানের অফিস থেকে যানজট আর ঝক্কি পেরিয়ে বাসায় ফিরতে ফিরতে কমপক্ষে রাত আটটা। বলা নেই কওয়া নেই হুট করেই পেলেন তিনি খুলনার আঞ্চলিক অফিসে যোগদানের অফিস আদেশ। এককথায় বদলি। ঢাকার বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে ছকে বাঁধা জীবনের গতিতে এ যেন হোঁচট খাওয়া।

সংসার হলো নিস্তরঙ্গ জলের মতো। নিটোলও থাকতে হয়। হঠাৎ করেই যদি এর মধ্যে ঢিল পড়ে তা হলে তাতে দেখা দেবে ঢেউ, নিটোলও যে থাকবে না তা কি বলার অপেক্ষা রাখে? এই ঢেউ ইতিবাচক নয়, নেতিবাচক। যে ঢেউ আর্থিক ও মানসিকভাবে করে আঘাত। সংসারের সাজানো গোছানো দৈনন্দিন কর্মকা-ের রুটিনে পড়ে ছেদ। কিন্তু এ পরিস্থিতিতে সংরের কর্তা ও কর্ত্রী স্বামী-স্ত্রীর আসলে করণীয় কী? সংসারের রুটিন রক্ষায়, অপার্থিব বা অপত্য স্নেহ-ভালোবাসা রক্ষার্থে কি অফিসের আদেশ উপেক্ষা করবে? চাকরি বিসর্জন দিতে হবে?

বর্তমান আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে একজন স্বামী বা স্ত্রীর একার আয়ে সংসার চালানো খুবই কঠিনÑ এ বাস্তবতাকে আগে গুরুত্ব দিন। সংসার যদি হয় একান্নবতী তা হলে আপনাকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে অর্থের উৎসের দিকে। তবে এ ক্ষেত্রে বদলির বিষয়টা সহজেই নিতে পারেন এ কারণে যে অন্তত স্ত্রী বা সন্তানের নিরাপত্তা, আদর, ভালোবাসার অভাব হবে না। সংসারের অন্যদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা করুন; তাদের কাছে আপনার সহযোগিতা ও প্রত্যাশার কথা পুনর্ব্যক্ত করুন। স্বামীর বদলিতে স্ত্রী কর্মজীবী হলে সাধারণত স্ত্রীর চাকরি ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। এহেন পরিস্থিতিতে স্ত্রীরা কখনো এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেবেন না। এতে নিজের ব্যক্তিত্ব যেমন খর্ব হয় তেমনি আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশিঅনিশ্চয়তার মুখে পড়ে ভবিষ্যৎ।

মনে রাখা দরকার, চাকরি এখন সোনার হরিণ। কর্মক্ষেত্রে বদলি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কর্মজীবী স্বামী-স্ত্রীর হঠাৎ কেউ দূরে বদলি হলে প্রথম প্রথম দৈনন্দিন কষ্ট হয়তো বাড়ে। বিরহ হওয়াটা স্বাভাবিক। দুজন দুজনকে এ সময় বেশি মিস করে। এতে প্রকারন্তরে ভালোবাসা হয় আরও গভীর। কে কার জন্য কতটা অভাব বোধ করে তার বহিঃপ্রকাশও ঘটে এ সাময়িক দূরত্বে। সন্তান বা অন্য স্বজনের জন্য মন আকুলি বিকুলি হয়তো করে। দুই দশক আগের চেয়ে বর্তমানের বাস্তবতা ভিন্ন। চিঠি বা টেলিগ্রামের জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষার প্রহর শেষ। এখন পৃথিবীর যে কোনো প্রান্ত থেকে সেকেন্ডেই কথা বলা, ই-মেইল বা চ্যাট করা, স্কাই পে-ভিডিও কলের মাধ্যমে সরাসরি দেখা-বলা একেবারেই সাধারণ ব্যাপার। শুধু শারীরিক অনুপস্থিতিটাই সমস্যা। প্রযুক্তির এ সুযোগ ব্যবহার করে কর্ম ও সংসার জীবনের এমন পরিস্থিতিতে আবেগীয় বিষয়গুলো সামাল দিয়ে মুখ্য বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হবে বুদ্ধিমানের কাজ। সংসারের কাজ হয়তো ভাগাভাগি করে নেওয়া হতো। এখন একটু বাড়তি চাপ পড়বে নিজের ওপরে। সন্তানের বেলায় মাকেই প্রাধান্য দিন। থাকতে দিন মায়ের কাছে। স্ত্রীর বদলি হলে স্বামীকেও সহজভাবে নিতে হবে মেনে।

বাস্তবতাকে মেনে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। মনে রাখা দরকার, বদলির কারণে যে কোনো একজনের হঠাৎ দূরত্ব স্থায়ী নয়; একেবারেই সাময়িক। এ বাস্তবতায় নিজের দায়িত্বও একটু বাড়ে। নারী-পুরুষ উভয়কেই সন্তানের শুধু মা বা বাবা নন এ সময় পালন করতে হয় একক অভিভাবকের। এখানে বৃদ্ধি পায় এক অপার্থিব অপত্য স্নেহ-ভালোবাসার ফল্গুধারা।

ছবি : আরিফ আহমেদ

প্রতীকী মডেল : আনিসুর রহমান মিলন ও পপি

প্রকাশিত : ৯ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

০৯/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: