আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

কালের সাক্ষী মধুর ক্যান্টিন

প্রকাশিত : ৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

যাত্রা হলো শুরু

পয়লা জুলাই, ১৯২১। যাত্রা শুরু করে প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। যার উদর থেকে জন্ম নিয়েছেন বিখ্যাত সাহিত্যিক, রাজনৈতিক, বুদ্ধিজীবী ও জাতীয় নেতৃবৃন্দ। যাদের মিলনমেলা বসত মধুর ক্যান্টিনে। আর এ মিলনমেলায় সবার প্রিয় মুখ মধুসূদন দে (প্রিয় মধুদা)। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাক হানাদারদের হাতে শহীদ হন তিনি। তার জন্ম ১৯১৯ সালের ১৯ এপ্রিল। পিতা স্বর্গীয় আদিত্য চন্দ্র দে। মা নিরদা সুন্দরী দে। বাবার হাত ধরে শুরু“ করেন এই ক্যান্টিন পরিচালনার কাজ।

মধুর ক্যান্টিনের পথচলা

আদিত্য চন্দ্র অসুস্থ হয়ে পড়লে পারিবারিক ব্যবসার হাল ধরেন মধুসূদন দে। তখন মধুসূদনের বয়স ১৪ কি ১৫ বছর হবে। সময়টা ১৯৩৪/১৯৩৫ সাল। চল্লিশের দশকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের হাওয়া লাগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এর পরপরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ডাকসুর কার্যক্রম শুরু ও ক্যান্টিন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। সে সময় আনুষ্ঠানিকভাবে ক্যান্টিন পরিচালনার ভার মধুদাকে দেয়া হয়। যদিও ক্যান্টিনটি ডাকসুর তবুও ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, কর্মচারীরা একে ‘মধুর স্টল’ বা মধুর ক্যান্টিন বলে সম্বোধন করতেন। ১৯৬২ সালে বর্তমান কলাভবনের শিক্ষকদের লাউন্স রুমে স্থানান্তরিত করা হয় তা। এখানে চলে প্রায় পাঁচ বছর। তারপর ১৯৬৭ সালে স্থানান্তরিত হয়ে সেটি চলে আসে বর্তমান মধুর ক্যান্টিনে।

নওয়াবের জলসাঘর

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় তৎকালীন নওয়াবদের দান করা জমির ওপর। আর বর্তমানে মধুর ক্যান্টিনটি যেখানে সেই ভবনে একটি জলসাঘর ছিল নওয়াব আমলে। এ ঘরে নবাবরা বাইজি নাচাতেন। সুরা পান করে আর আমোদ-প্রমোদে সময় কাটাতেন এখানে। এ ঘরটির সামনে দু’পাশে দুটি বৃত্তাকার সরু একতলা ঘর আছে। এ ঘর দুটি বাইজিদের সাজঘর ও থাকার ঘর হিসেবে ব্যবহার করা হতো। এই জলসাঘরেই ১৯০৬ সালে প্রতিষ্ঠা লাভ করে মুসলিম লীগ।

রাজনীতির তীর্থস্থান

১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এই বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে সময়ের পথ ধরে ছাত্রছাত্রীদের চিন্তা-চেতনা জাগ্রত হতে থাকে। তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হওয়া শিক্ষা লাভ করেন। অধিকার আদায়ের জন্য নানা দাবি ও আন্দোলন দানা বাঁধতে থাকে। জমে উঠে ছাত্ররাজনীতি। যার কেন্দ্রস্থল হয় আদিত্য ক্যান্টিন ও মধুর ক্যান্টিন। ১৯৫১ সালে পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ প্রতিষ্ঠার সময় মধুর ক্যান্টিনের সঙ্গে পরিচয় ঘটে যুব কর্মীদের। ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষার আন্দোলনের প্রস্তুতির আগে বায়ান্ন সালের ৩০ জানুয়ারি থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মধুর ক্যান্টিনই ছিল ভাষা আন্দোলনের কর্মীদের অঘোষিত ক্যাম্প। বায়ান্ন সালে ছাত্র ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠালগ্নেও একইভাবে ব্যবহৃত হয়েছে এ ক্যান্টিন। এ সময় রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন শহীদ মধুসূদন দে। ৫৪ যুক্তফ্রন্ট, আটান্ন, ষাট, বাষট্টির শিক্ষানীতিবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, ছয়ষট্টির ছয় দফার প্রধান পরিকল্পনা ও পরিচালনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল এ মধুর ক্যান্টিন। ১৯৬৮ এবং ১৯৬৯ সালের গণ-আন্দোলনের সময় সবচেয়ে বেশি কর্মচঞ্চল ছিল এ ক্যান্টিন। রাজনৈতিক সভা আমতলা, বটতলায় অনুষ্ঠিত হতো। কিন্তু শিক্ষার্থীরা যখন পুলিশের বাধার সম্মুখীন হতেন তখন তারা দৌড়ে আশ্রয় নিতেন মধুদার শীতল ছায়ায়।

১৯৭০-এর নির্বাচন পূর্ব রাজনৈতিক কর্মতৎপরতা এবং ১৯৭১-এর মার্চ মাসে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক এলে মূল কর্মকাণ্ড এখানেই অনুষ্ঠিত হয়। ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি ও মধুর ক্যান্টিনের রাজনীতিকে কখনও আলাদা করে দেখেনি তৎকালীন সরকার। ভাষা আন্দোলনের সৈনিক সালাম, বরবত, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শেখ কামালসহ বর্তমান জাতীয় নেতাদের মধ্যে কার পদচারণা পড়েনি! কে মধুদার চায়ের কাপে তৃপ্তির চুমুক দেয়নি এই ক্যান্টিনে এসে! সকলের প্রিয় মধুদা ক্যান্টিন পরিচালনার পাশাপাশি সক্রিয়ভাবে প্রগতিশীল আন্দোলনে জড়িয়ে পরেন। তার সহিষ্ণু ব্যবহার ও সেবার মাধ্যমে সবাইকে যেন আগলে রেখেছিলেন সেসময়। সরকারের চাপে পরে যখন বিভিন্ন ছাত্র নেতারা গা-ঢাকা দিতেন, তখন যোগাযোগ শুধু থাকত মধুদার সঙ্গে। ছোট ছোট চিরকুটের মাধ্যমে খবর দেয়া নেয়া-করতেন তিনি। এছাড়া প্রয়োজনীয় পোস্টার তিনিই লুকিয়ে রাখতেন ক্যান্টিনের বিভিন্ন গোপন জায়গায়। তাই ’৭১-এ পশ্চিম পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীদের কু-নজর ছিল এই ক্যান্টিনের ওপর। সেই সূত্র ধরে ঘাতকরা ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে শাবল দিয়ে ভাঙতে শুরু“করেছিল মধুর ক্যান্টিন। কিন্তু উর্দু বিভাগের এক শিক্ষকের অনুকম্পায় রেহাই পেয়েছিল ঐতিহ্যবাহী এ ক্যান্টিন।

সাহিত্য-সংস্কৃতির আড্ডাস্থল

রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সাহিত্য সংস্কৃতির আসরও কম বসেনি এ রেস্তোরাঁয়। চল্লিশ, পঞ্চাশ, ষাট, সত্তর দশকের বহু সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংগঠনের সূতিকাগার ছিল এটি। কে ক’টা কবিতা লিখেছেন, কে সম্পন্ন করেছে তার লেখা প্রিয় গানটির সুরÑ এসব নিয়ে প্রত্যহ কেটে যেত মধুর সময়। কবি শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, আলী যাকের, আসাদুজ্জামান নূরসহ অসংখ্য গুণীজনের পদচারণায় ধন্য করেছেন প্রিয় মধুদার ক্যান্টিনকে। কবি নির্মলেন্দু গুণের মতো এখনও যারা জীবিত আছেন, তারা সময় পেলেই এখনও ঘুরে যান বিচিত্র মায়ামাখা স্মৃতির এ ফলকটি।

ভয়াল সেই রাত

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোর মতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও পরিণত হয়েছিল এক মৃত্যুপুরীতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সজীব শ্যামল ক্যাম্পাসে ছোপ ছোপ পড়ে ছিল রক্ত আর লাশ। হায়েনার দল আগ থেকেই একটা মোস্টওয়ান্টেদের একটি তালিকা তৈরি করেছিল। সেই তালিকায় ছিলেন মধুদাও। টিএসসি থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের দিকে যেতে প্রধান সড়কের পাশে ৩নং বিল্ডিং-এ থাকতেন মধুদা ও তার পরিবার। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ। সকাল ৮টা। মধুদার কোয়ার্টারের চারপাশে গুলির শব্দ। মধুদাসহ পরিবারের সবাই (বড় মেয়ে বাদে) তখন ছিলেন বাড়িতেই। নরপশুর দল মধুদার বাসা চিনত না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী হরিপ্রসাদ দেখিয়ে দেন বাড়িটি। সেই বাড়িতে গিয়ে নরখাদকরা এক ভয়ানক তাণ্ডবলীলা চালায়। খুনের নেশায় উন্মত্তরা প্রথম গুলি চালায় মধুদার ছেলে সদ্য বিবাহিত রণজিৎ কুমার ও তার স্ত্রী রিনা রানীকে। মধুদার স্ত্রী যোগমায়া দে। তিনিও রক্ষা পাননি সেদিন। আর মধুদাকে নিয়ে যাওয়া হয় জগন্নাথ হলের মাঠে। সেখানেই শহীদ হন মধুদা। জগন্নাথ হলের গণকবরের অসংখ্য মৃত্যের হাড়গোড়ের সঙ্গে মিশে আছেন আমাদের অভিভাবক অতিপ্রিয় মধুসূদন দে (প্রিয় মধুদা)।

মধুদার চা-নাশতা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মিলনমেলা ছিল মধুর ক্যান্টিন। এখানে এসে এক কাপ চা না খেলে কি হয়। রাজনৈতিক নেতা তথা সবার কথা চিন্তা করেই মধু দা তৈরি করতেন ছোট ছোট মিষ্টি। অসাধারণ ছিল যার স্বাদ। শিঙ্গাড়া, সন্দেশ, চা। ব্যস চার আনায় নাশতা কমপ্লিট। এছাড়াও পাওয়া যেত বাটার টোস্ট ডিম অমলেট, কাটলেট প্রভৃতি। সে সময়ের অনেক খাবারই এখনও পাওয়া যায় এখানে। যার স্বাদ আগের মতোই আছে। তবে সময়ের সঙ্গে পাল্টে গেছে খাবারের আয়োজন। সংযোজন হয়েছে অনেক নতুন খাবার। এখন প্রতি কাপ চা পাওয়া যাচ্ছে ৪-৫ টাকা। সিঙ্গারা, পাটিসাপ্টা পিঠা, মিষ্টি ও দুধের ছানা প্রতি পিসের দাম যথাক্রমে ৫, ১৫, ৫ ও ১০ টাকা।

প্রকাশিত : ৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

০৮/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: