আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ছুটির দিনে প্রাণের মেলায় জনস্রোত

প্রকাশিত : ৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

মোরসালিন মিজান ॥ অনেক বড় জায়গা এখন। বাংলা একাডেমি চত্বরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানের বিশাল পরিসর। কেউ কেউ আশঙ্কা করছিলেন, অতো পাঠক হবে না। মেলা ফাঁকা মনে হতে পারে। আর হরতাল অবরোধের কথা তো বলাই বাহুল্য। রাজনীতির নামে হত্যা সন্ত্রাস মেলায় কী প্রভাব ফেলে তা নিয়ে ভেতরে ভেতরে দুশ্চিন্তা চলছিল। সবাই অপেক্ষা করেছিলেন শুক্রবারের জন্য। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে মেলা পুরোপুরি জমে উঠবে বলে আশাপ্রকাশ করেছিলেন অভিজ্ঞ প্রকাশকরা এবং তাই হয়েছে। মেলা শুরুর পর প্রথম শুক্রবারটি দারুণ কাজে লাগিয়েছেন বইপ্রেমী মানুষ। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে মেলায় প্রবেশ করেছেন তাঁরা। টিএসসি ও দোয়েল চত্বর থেকে মেলার প্রবেশ পথ পর্যন্ত জায়গাটুকু ছিল লোকে লোকারণ্য। ধীরে ধীরে লাইন এগিয়েছে। তবে ছোট হয়নি। বরং দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়েছে। মেলার দুই ভেন্যু যেন উপচে পড়ছিল। সরব এ উপস্থিতি দেখে মনেই হয়নি, অবরোধ নামের রাজনীতি এখন চালু আছে। হরতাল অবরোধ পেট্রোলবোমার ভয় পেছনে ফেলে মেলায় এসেছিলেন বিভিন্ন বয়সী মানুষ।

বাংলা একাডেমির ঘোষণা অনুযায়ী শুক্রবার ছিল শিশু প্রহর। শিশুদের জন্য বিশেষ এই আয়োজনের শুরু হয় বেলা ১১টায়। চলে বেলা ২টা পর্যন্ত। পুরোটা সময় ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের কলকাকলিতে মুখরিত ছিল বাংলা একাডেমি চত্বর। সকাল ৮টার পর থেকেই বাবা মা ও অভিভাবকদের হাত ধরে মেলা প্রাঙ্গণে আসতে শুরু করে তারা। প্রথমেই ছিল চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। আয়োজনটির উদ্বোধন করবেন বরেণ্য শিল্পী হাশেম খান। ক বিভাগে ২৮৫ জন নিজেদের মনের মতো ছবি আঁকে। খ বিভাগের ২০৪ জন আঁকে শহিদ মিনার। গ বিভাগের বিষয় ছিল বাংলা একাডেমি। অংশ নেয় ১৭৪ জন প্রতিযোগী। নজরুল মঞ্চের চার পাশে শিশুদের বইয়ের পসরা সাজিয়েছিলেন প্রকাশকরা। স্টল ঘুরে ঘুরে পছন্দের বই কিনেছে তারা। ঝিঙেফুল, ঘাসফড়িং, শিশু ঘর, টইটুম্বুর, সিসিমপুর, বইপোকা, চলন্তিকা বই ঘর, ছোটদের মেলা, শিশু রাজ্য, ওয়ার্ল্ড অব চিলড্রেনস বুক, কিশোর ভূবনসহ বেশ কিছু প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সামনে ছিল ক্ষুদে পাঠকের উপচে পড়া ভিড়। বাবার হাত ধরে এদিন মেলায় এসেছিল ইমা। ক্লাস টু পড়ুয়া শিক্ষার্থী জানালো, তার ভূতের বই খুব পছন্দ। ভূতের বই কিনতে মেলায় এসেছে। কয়েকটা ভূতের নামও মুখস্ত বলে দিল সে! অরণ্য নামের আরেক কিশোরের হাত ভর্তি সায়েন্স ফিকশন। মুহম্মদ জাফর ইকবালের একাধিক বই। কার পছন্দে এসব বই কেনা? জানতে চাইলে ক্ষুদে পাঠক বাবা আশরাফ হোসেনের মুখের দিকে তাকালেন। আশরাফ জানালেন, তিনি নিজেই পছন্দ করে বই কিনে দিয়েছেন। বাচ্চার আগ্রহ অনুমান করেই বইগুলো কেনা বলে জানান তিনি। বিকেলে অবশ্য সব বয়সী পাঠক ভিড় করেছিলেন একাডেমি চত্বরে। লোক সমাগম এত ছিল যে, এই অংশটিকেই মনে হয়েছে আস্ত একটি মেলা!

সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানের বিশাল পরিসরও এদিন ভরে ওঠেছিল। প্রায় প্রতিটি স্টলের সামনে ছিল পাঠকের উপস্থিতি। মাঝখানের যে বিশাল খোলা জায়গা, সেটিও কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। দেখে মনে হয়েছে, প্রকৃতই শুরু হয়ে গেছে বাঙালীর প্রাণের মেলা। এদিন বই দেখার পাশাপাশি চলেছে কেনাকাটাও। উৎস প্রকাশনের স্বত্বাধিকারী মোস্তফা সেলিম জনকণ্ঠকে বলেন, সত্যি বলতে আমরা এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করেছিলাম। আমাদের সে আশা পূরণ হয়েছে। বাংলা একাডেমির মেলা প্রাণ ফিরে পেয়েছে। মেলা শুরুর পর এদিন সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে বলে জানান তিনি।

২৯০ নতুন বই ॥ শুক্রবার হওয়ায় মেলায় বইও এসেছে অনেক বেশি। বাংলা একাডেমির তথ্য অনুযায়ী, অমর একুশে গ্রন্থমেলার ষষ্ঠ দিন নতুন বই এসেছে ২৯০। নজরুল মঞ্চে ৩১ নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়।

মেলা মঞ্চের আয়োজন ॥ বিকেলে গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘রজনীকান্ত সেন : বাঙালির অন্তরের গীত রচয়িতা’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক নূরুল আনোয়ার। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন অধ্যাপক আজিজুর রহমান ও অধ্যাপক শিখা আরেফীন। সভাপতিত্ব করেন জামিল চৌধুরী। প্রাবন্ধিক বলেন, ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের আগে পরে রবীন্দ্রনাথের সমসাময়িক রজনীকান্ত সেন সারা বাংলাদেশের সংগীতপিপাসু মানুষের অন্তর স্পর্শ করেছিলেন। তাঁর রচিত ভক্তিমূলক এবং দেশপ্রেমের গানের কোন তুলনা হয় না। তিনি বলেন, সহজ সরল ভাষায় দেশপ্রেমের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ প্রস্ফুটিত করা, বিশেষ করে বাণী ও সুরের যুগ্ম মিলনের সংগীতরীতিতে বাংলাগান বাঁধা এক সুকঠিন কাজ। যে কোন কলা সৃষ্টিতে বিশেষ দক্ষতা এবং গভীর অন্তর্দৃষ্টি না থাকলে সুন্দর, সরল ও স্বাভাবিক সৃষ্টি হয় না। রজনীকান্ত তাঁর সুগভীর রসবোধ থেকে এই সুন্দর সংগীত সৃষ্টি করেছেন, যা আজ ‘কান্তগীতি’ বলে পরিচিত। সে জন্যই সংগীতমনস্ক মানুষের কাছে রজনীকান্তের গান এত জনপ্রিয়। আলোচকদ্বয় বলেন, সার্ধশত জন্মবর্ষে রজনীকান্ত সেনকে স্মরণ করে বাংলা একাডেমি সংগীতপিপাসু মানুষের কৃতজ্ঞতাভাজন হয়েছে। এই অনন্য সংগীতগুণীর জীবন ও কর্ম নিয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলেও মত দেন তাঁরা। সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক জামিল চৌধুরী বলেন, রজনীকান্ত সেন ছিলেন বাঙালীর স্বর্ণযুগের স্বর্ণসন্তান। তিনি শুধু সংগীত জগতেই বিচরণ করেননি তাঁর চিন্তার সুক্ষ্মতাও এক স্মরণীয় বিষয়। কারণ তিনি বলেছেন অর্থের কাছে পরমার্থ যখন গৌন হয়ে পড়ে তখন সত্যিই দুর্যোগের সময় ঘনিয়ে আসে। বাংলাদেশে রজনীকান্তের গানের প্রসারে ছায়ানট, আনন্দধ্বনি এবং প্রয়াত ওয়াহিদুল হকের অবদান কখনও ভুলবার নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পর্বে অনিক বোসের পরিচালনায় নৃত্য সংগঠন ‘স্পন্দন’-এর শিল্পীরা নৃত্য পরিবেশন করেন। সংগীত পরিবেশন করেন কণ্ঠশিল্পী শাহীন সামাদ, ফেরদৌস আরা, সালাহউদ্দীন আহমদ, সুজিত মোস্তফা, এ. কে. এম. শহীদ কবীর পলাশ, মোঃ মফিজুর রহমান, ফারহানা ফেরদৌসী তানিয়া এবং প্রিয়াংকা গোপ।

প্রকাশিত : ৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

০৭/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: