মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বিএনপি কলকাঠি নাড়ছে, নাশকতায় মাঠে চরমপন্থীরা

প্রকাশিত : ৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • সরেজমিন বরিশাল

রাজন ভট্টাচার্য/খোকন আহম্মেদ হীরা ॥ নদীবেষ্টিত বরিশালসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলের শান্তিপ্রিয় মানুষগুলো এখন আর স্বস্তিতে নেই। বিএনপি-জামায়াত জোটের চলমান অবরোধ ও হরতালে এ অঞ্চলের সড়ক ও নৌপথ সন্ধ্যার পর পুরোপুরি অরক্ষিত। চোরাগোপ্তা পেট্রোলবোমা হামলায় ইতোমধ্যে বরিশালে তিনজনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুর করা হয়েছে অর্ধশতাধিক যানবাহনসহ যাত্রীবাহী লঞ্চ।

অবরোধকারীদের হামলা থেকে রেহাই পায়নি জেলার সহকারী পুলিশ সুপারের গাড়ি থেকে শুরু করে রোগীবাহী এ্যাম্বুলেন্সও। টানা অবরোধ শুরুর পর পরই এখানকার বিএনপির নীতিনির্ধারকরা আত্মগোপনে থেকেই কর্মসূচী অব্যাহত রাখার কলকাঠি নাড়ছেন। তৃণমূল নেতাকর্মীদের সাড়া না পেয়ে বিএনপি নেতারা আন্দোলনের মাঠে যোগ করেছে নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থীদের (সর্বহারা)। যে কারণে বরিশালসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলে চরমপন্থীদের রাতের নাশকতা ক্রমেই বেড়ে চলেছে।

পলাতক বিএনপি নেতারা ॥ গোয়েন্দা সূত্রমতে, চোরাগোপ্তা হামলার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিএনপির গা-ঢাকা দেয়া একাধিক নেতা নাশকতাকারীদের মদদ দিচ্ছে। ফলে অবরোধের সহিংসতা ক্রমেই ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করছে। ইতোমধ্যে পুলিশ পেট্রোলবোমাসহ নাশকতার সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহে নামেমাত্র বিএনপির নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করলেও প্রকৃত নাশকতাকারীরা রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, চলমান অবরোধ ও হরতাল কর্মসূচী পালনে গোটা দক্ষিণাঞ্চলের চিত্র ভিন্ন। এখানে দিনের আলোয় হরতাল ও অবরোধের পক্ষে মিছিল-সমাবেশ, পিকেটিং কিংবা ২০ দলের নেতাকর্মীদের দেখা যায় না। জেলার দশ উপজেলায় বিএনপির দলীয় কার্যালয়গুলোও বন্ধ। প্রকৃত বিএনপির নেতাকর্মীরা চলমান হরতাল ও অবরোধের ঘোরবিরোধিতা করছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির একাধিক শীর্ষ নেতা জানান, সম্প্রতি অনুষ্ঠিতব্য বিশ্ব এজতেমা ও এসএসসি পরীক্ষার সময় অবরোধ ও হরতাল কর্মসূচী প্রত্যাহার না করে দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া চরম ভুল করেছেন। যে কারণে বিনা অপরাধে পুলিশের গ্রেফতার বাণিজ্যে সেই ভুলের মাসুল দিতে হচ্ছে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের।

রাতের অন্ধকারে নাশকতা ॥ সন্ধ্যার পর পরই ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের জেলার তিনটি পয়েন্টে পুলিশ চেকপোস্ট বাসানো হয়েছে। নিরাপদে যানবাহন পৌঁছে দেয়াসহ পুরো মহাসড়কে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের পাহারাও আছে। এরপরও চোরাগোপ্তা হামলা বন্ধ হচ্ছে না। নদী ও সড়কপথে একের পর এক পেট্রোলবোমা হামলা, গাড়ি ভাংচুর, যানবাহন ও লঞ্চে অগ্নিসংযোগে বরিশালে তিনজনের প্রাণহানির ঘটনার পর গোটা দক্ষিণাঞ্চলে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। পুলিশ পেট্রোলবোমা হামলার বিষয়গুলো ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করছে।

সূত্রমতে, গোটা দক্ষিণাঞ্চলের মধ্যে এখন সবচেয়ে বেশি নাশকতামূলক কর্মকা- ঘটছে বরিশালের গৌরনদীতে। এখানে থানা ও হাইওয়ে থানা পুলিশের অনেকটাই রহস্যজনক গা-ছাড়া ভাবের কারণে নাশকতাকারীরা ক্রমেই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক বরিশাল বাস মালিক সমিতির একাধিক সদস্য জানান, দিনের বেলায় বরিশালের অভ্যন্তরীণ রুটগুলোতে বাস চলাচল করলেও সন্ধ্যার পর পরই নাশকতার আশঙ্কায় সকল বাস চলাচল বন্ধ থাকে। ইতোমধ্যে অবরোধকারীরা ছোট-বড় প্রায় ২৫ থেকে ৩০টি গাড়ি ভাংচুর করেছে। আর এতে আহত হয়েছে কমপক্ষে অর্ধশত ব্যক্তি।

জেলায় সর্বশেষ গত ২ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে বারোটার দিকে গৌরনদীর টরকীর নবীনগর এলাকায় লবণবোঝাই ট্রাকে পেট্রোলবোমা নিক্ষেপ করে অবরোধকারীরা। এতে ঘটনাস্থলেই ট্রাকের চালক নুর হোসেন (৩৫) ও হেলপার জাফর রাঢ়ী (২০) নিহত হয়। একইদিন গৌরনদীর বাদুরতলা গ্রামের দিনমজুর হাবিব ফকিরের পরিত্যক্ত ঘর থেকে একই গ্রামের রহমান চৌকিদারের পুত্র ছাত্রদল ক্যাডার বেল্লাল চৌকিদারকে বের হতে দেখে বাড়ির লোকজনের সন্দেহ হয়। পরবর্তীতে ওইঘরে তল্লাশি চালিয়ে চারটি পেট্রোলবোমা উদ্ধার পুলিশ। এদিকে ৩০ জানুয়ারি রাতে আড়িয়াল খাঁ গৌরনদীর পালরদী নদীর হোসনাবাদ নামক এলাকায় ঢাকাগামী এম.ভি মানসী-২ নামের একটি যাত্রীবাহী লঞ্চে পেট্রোলবোমা নিক্ষেপ করে অবরোধকারীরা। ২০ জানুয়ারি রাত পৌনে নয়টার দিকে বরিশাল নৌ-বন্দরের টার্মিনালে বরিশাল-ঢাকা নৌরুটে দু’টি যাত্রীবাহী লঞ্চের কেবিনে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। একইদিন রাতে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন দপদপিয়া জিরো পয়েন্ট এলাকায় ঢাকা থেকে কুয়াকাটাগামী আব্দুল্লাহ পরিবহনের যাত্রীবাহী বাসে পেট্রোলবোমা নিক্ষেপ করে অবরোধকারীরা। এতে ৫ যাত্রী দগ্ধ হয়। এর আগে একইস্থানে গত ১৩ জানুয়ারি রাতে সাকুরা পরিবহনের একটি বাসে অবরোধকারীরা পেট্রোলবোমা নিক্ষেপ করে বাসটি সম্পূর্ণ ভস্মীভূত করে।

১৮ জানুয়ারি ভোরে উজিরপুরের সানুহার নামক এলাকায় চলন্ত ট্রাকে পেট্রোলবোমা নিক্ষেপ করে অবরোধকারীরা। এতে ঘটনাস্থলেই অগ্নিদগ্ধ হয়ে নিহত হন ট্রাকের হেলপার সোহাগ হাওলাদার (১৮) ও গুরুতর আহত হন চালক রিপন শেখ। এ ঘটনার পর উজিরপুর মডেল থানার ওসি মোঃ নুরুল ইসলাম-পিপিএম জরুরী আইনশৃঙ্খলাবিষয়ক সভা করে পেট্রোলবোমা হামলা কিংবা পিকেটারদের ধরিয়ে দিতে পারলে তার ব্যক্তিগত তহবিল থেকে পুরস্কার ঘোষণা করেন। এ ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা পরেই যাত্রীবাহী বাসে হামলাকারী এক পিকেটারকে আটক করে গণধোলাই দিয়ে পুলিশের কাছে সোপর্দ করে জনতা।

গত ১৫ জানুয়ারি মধ্যরাতে নগরীর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালসংলগ্ন এলাকায় পার্কিং করে রাখা ঈগল পরিবহনের একটি বাসে আগুন ধরিয়ে দেয় অবরোধকারীরা।

সক্রিয় সর্বহারাগ্রুপ ॥ গোয়েন্দা সূত্রমতে, চরমপন্থী অধ্যুষিত বাবুগঞ্জ, আগরপুর, উজিরপুর ও সরিকলের একাধিক সর্বহারা সদস্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে গৌরনদীর বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করছে। সুযোগ বুঝে তারা মহাসড়কে নাশকতামূলক কর্মকা- ঘটিয়ে প্রশাসনকে মহাসড়ক পাহারায় ব্যস্ত রেখে আবার রাতের আঁধারে চুরি-ডাকাতি করে বেড়াচ্ছে। স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, খুলনার খুনী এরশাদ সিকদারের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত ও গৌরনদী পৌরসভার বিএনপি দলীয় সাবেক এক কাউন্সিলরের উপস্থিতিতে ইতোমধ্যে তার গেরাকুল গ্রামের বাড়িতে একাধিক অপরিচিত ব্যক্তিদের নিয়ে রাতের আঁধারে গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই বৈঠকের পরেই গৌরনদীতে নাশকতামূলক কর্মকা-ের পাশাপাশি চুরি-ডাকাতির ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। উপজেলা আ’লীগের প্রভাবশালী এক নেতা নাশকতার মূল পরিকল্পনাকারী সাবেক ওই কাউন্সিলরের নিকট আত্মীয় হওয়ার সুবাধে সে রয়ে গেছে প্রশাসনের ধরাছোঁয়ার বাইরে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাবুগঞ্জ উপজেলার কেদারপুর ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় আকস্মিকভাবে নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থী (সর্বহারা) সদস্যদের আনাগোনা বৃদ্ধি পেয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগে জানা গেছে, কেদারপুর গ্রামের চিহ্নিত সর্বহারা দলের সক্রিয় সদস্য আমির হোসেন তার সহযোগী সালাম মৃধা, নুর আলম, মাসুম মৃধা ও ব্রাহ্মণদিয়া গ্রামের গণি বেপারির পুত্র ইউনুস বেপারিসহ তাদের সহযোগীরা গত কয়েকদিন থেকে রাতের আঁধারে গোপন বৈঠক অব্যাহত রেখেছে। ক্রমেই নাশকতা বৃদ্ধি ও সর্বহারাদের সংগঠিত হওয়ার ব্যাপারে জেলা পুলিশ সুপার একেএম এহসান উল্লাহ জানান, যে কোন ধরনের নাশকতা কিংবা সর্বহারা সদস্যদের গ্রেফতারের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যে একাধিক নাশকতাকারীকে গ্রেফতার করে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়েছে। অন্যদের শনাক্ত করার জন্য মাঠ পর্যায়ে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য কাজ করছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

প্রকাশিত : ৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

০৭/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: