মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

শুদ্ধ চিত্তের এক প্রতিবাদী

প্রকাশিত : ৬ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • রফিকুজ্জামান রণি

পঞ্চাশ এবং ষাটের দশকে গল্পের পথে নিরন্তর হেঁটে সত্তরের দশকে এসে একটু গতিপথ পাল্টিয়েছিলেন কবি সাইয়িদ আতীকুল্লাহ্। ঝুঁকেছেন কবিতার দিকেও। একমাত্র ও জননন্দিত গল্পগ্রন্থ ‘বুধবার রাতে’ প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই তিনি কবিতার বন্দরে স্থায়ীভাবে তাঁর সাহিত্যের জাহাজ নোঙর করতে শুরু করেন। ‘কবিতা লেখা ছাড়া কবি আর কোন কাজ করতে পারেন না। স্বর্গ-মর্ত্যব্যাপী কবির অধিবাস।’ কবি অরুণ মিত্রের এই শাশ্বত বাণীটি কবি সাইয়িদ আতীকুল্লাহ্্র দৃষ্টিতে পড়েছে কিনা আমাদের জানা নেই। গল্পের জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত (১৯৭৪) এই লেখক জীবনের অন্তিম মুহূর্তেগুলোতেও যখন গল্প-উপন্যাসের বলয় ছেড়ে কবিতার সঙ্গে ঘর বাঁধতে শুরু করেছিলেন তখন অরুণ মিত্রের উপরোক্ত কথাটাই যেন জীবন্ত হয়ে চোখের সামনে এসে ধরা দিয়েছে।

অনুবাদের ক্ষেত্রেও সাইয়িদ আতীকুল্লাহ্ ছিলেন সিদ্ধহস্ত এক পরিশ্রমী শিল্পী। তাঁর অনুবাদকর্মও আমাদের মূল্যবান সাহিত্য-সম্পদ। বিশ্বসাহিত্যের প্রবাদপ্রতিম অনেক লেখকের লেখাই তিনি অনুবাদ করেছিলেন।

গল্পকার হিসেবে তাঁকে বলা যায় একজন প্রতীক-নিমগ্ন কলমী-তুলির কারুশিল্পী। পাগল, কবরখোলা, বেশ্যালয়, শেয়াল-কুকুর, বেড়াল, কীটপতঙ্গ, ছাগল-গরু ও গ্রাম-বাংলার পাখপাখালির বেশে আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অগণন জাত-অপজাত উপমা-প্রতীক তাঁর লেখার মধ্যে বিদ্যুত চমকানোর মতো ঝলক দিয়ে ওঠে। তবে তাঁর কবিতায় গতির প্রবাহমানতা একেবারেই সহজবোধ্য বলা না গেলেও দুর্বোধ্য বলার অবকাশ নেই।

আমাদের শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিকাশে বৈপ্লবিক চেতনার উন্মেষ ঘটতে শুরু করেছিল মূলত পঞ্চাশের দশক থেকেই। ওই সময়েরই একজন শক্তিধর লেখক ছিলেন সাইয়িদ আতীকুল্লাহ্। বাঙালী জাতির ঐতিহ্যবহ এবং গৌরবময় অধ্যায় ১৯৫২-এর রক্তশোভিত সেই ২১ ফেব্রুয়ারিতে কবি ছিলেন ২১ বছরের এক টগবগে যুবক। দেশ-জাতি ও ভাষার প্রয়োজনে তাঁকে কারাবরণ করতে হয়েছিল অনেকদিন এবং ১৯৮০ সালে স্বৈরাচারী সরকারের হীন স্বার্থে ব্যবহৃত না হয়ে নিবর্তনমূলক পরিস্থিতিতে উল্টো অবস্থান নিতে গিয়ে প্রতিবাদস্বরূপ রাষ্ট্রায়ত্ত একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের শীর্ষস্তরের পদ থেকেও স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। তারপর বেছে নিয়েছিলেন সাংবাদিকতার মতো অনুসন্ধানী একটি স্বাধীন পেশা।

সাইয়িদ আতীকুল্লাহ্র গুরুত্বপূর্ণ গল্পগুলোই হচ্ছে উত্তমপুরুষে লেখা। তাঁর গদ্যের চমৎকার ও দ্রুত আকর্ষণীয় দিক হলো সংলাপ উপস্থাপনার অতুলনীয় দক্ষতা। তাঁর গল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, সাদামাটা প্রতীকের বিশ্লেষণার্থক ব্যবহার, ইঙ্গিতবহতা, অতি নাটকীয়তাহীন সূচনা ও সরলকথার উপসংহার এবং গল্পের সংক্ষিপ্ত শরীরজুড়ে ব্যঙ্গাত্বক নকশা আঁকা। তাঁর ‘বুধবার রাতে’ গল্পের সরল বর্ণনার ভেতরে দীর্ঘপরিক্রমার আভাস পাওয়া যায়। রিকশা-আরোহী (গল্পের নায়ক) বিরাট ধকল সহ্য করে সাধারণ জনতার সহযোগিতায় পাগলের পাল্লা থেকে মুক্তি পেয়ে তারপর নিরাপদ গন্তব্যে পৌঁছতে ওই মানুষগুলোর কাছেই যখন ঝুঁকিহীন পথের সন্ধান চাইল, উপস্থিত জনতা তাকে যে গলিপথ দেখিয়ে এগিয়ে যাওয়ার অভয় দিয়েছে আবার সে গলিপথ সম্পর্কেই তারাই ভীতুকণ্ঠে বলতে শুরু করেছে,Ñ ‘এ গলি দিয়ে গেলে একটু পরেই বেশ্যাপাড়া। বেশ্যাপাড়া ছাড়ালে কবরখানা।’ গল্পের সামান্য এ বাক্যেটির ভেতরে সরল-সোজা এবং ভয়ঙ্কর সত্যের যে প্রতীকী-ব্যঞ্জনার নির্যাস পাওয়া যায়, তা হলো মানব-জীবন সর্বদাই কণ্টকাকীর্ণ। কতটা বন্ধুর এ পথ সেটা রিকাশা-আরোহীর একের পর এক বাধাবিপত্তি পেরিয়ে এগিয়ে চলার দৃশ্য দেখেই আমরা আঁচ করতে পারি। যদিও ‘প্রহসনের মতো’ গল্পখানার সিনেমাধর্মী বিবরণ তাঁর ‘বুধবার রাতে’ গল্পগ্রন্থের চাঁদের কলঙ্ক ধরা হয় তথা ভাবমূর্তির ক্ষেত্রে কিঞ্চিৎ শ্রীহানি ঘটেছে বলে মন্তব্য করা যায়। কিন্তু অন্যসব গল্পের জাদুস্পর্শ যেন পুরো বইটিকেই পরিণত করেছে কালিমামুক্ত এক উৎকৃষ্ট গল্পসম্ভারে।

আইয়ুব রাজত্বকালের মধ্যেই তাঁর গল্পগ্রন্থ ‘বুধবার রাতে’ লেখা সম্পন্ন হয়েছিল। সে কারণেই বোধকরি, তাঁর গল্পগুলোতে ষাটের দশকের দৃশ্যপটগুলোর উপস্থিতি অতুলনীয়ভাবে চিত্রিত হয়েছে। ষাটের দশকের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটসহ সে সময়ের নানা মাত্রিক ঘটনাপ্রবাহের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বিবরণ তাঁর হরফচিত্রে ভেসে ওঠেছে। হেগেল বলেছিলেন, ‘যে শিল্প সম্পূর্ণ ও সকলের উর্ধে তা হলো কাব্য’।

কথাটির যথার্থতা খুঁজে পাওয়া যায় সাইয়িদ আতীকুল্লাহ্র কবিতার পরিমার্জিত উচ্চারণেÑ

‘‘শুরু করতে না করতেই আমার সর্বনাশ। ডাইনে বাঁয়ে কিলবিল করছে

হাজারো, উজান সন্ত্রাস, বিপজ্জনক বাঁক, হাঙর কুমির

বিষাক্ত চাল ডাল এবং ক্রমাগত বিরুদ্ধাচরণ।

খুইয়ে বসে আছি ভাই চিরদিনের মতো কথাসর্বস্ব যা ছিল। ’’

(কোথায় যাবো, আমাকে ছাড়া অনেক কিছু)

অথবাÑ

‘‘এই শতাব্দীর দুই উজ্জ্বল বীরপুরুষ

নিজ নিজ ঘরে ফেরার পরও হেঁটে বেড়ান কার্পেটের ওপর, হতে পারে

পৃথিবীর এক প্রান্তে অবস্থিত

হাড় জিরজিরে বিশুষ্ক বাংলায়, এঙ্গোলায়

এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিনে, ছাপমারা সমগ্র দক্ষিণ আমেরিকায়

ভাগ্য বিপর্যয়, অনাহার, অকালমৃত্যু ঝাঁকে ঝাঁকে

নেমে এসেছে ব্রেজনেভ বা কিসিঞ্জারের ব্রেকফাস্ট টেবিল থেকে।’’

(আমাকে ছাড়া অনেক কিছু, আমাকে ছাড়া অনেক কিছু)

সাইয়িদ আতীকুল্লাহ্ ছিলেন অসাধারণ নম্র- আর স্পষ্টবাদী একজন চেতনশিল্পী। তিনি ‘পদাবলী পুরস্কারÑ১৯৮৩’তে যখন ভূষিত হয়েছিলেন তখন পদাবলী কর্তৃপক্ষ যে অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছিল, সেখানে একটি প্রামাণ্যপত্র প্রকাশ করা হয়েছিল। প্রামাণ্যপত্রের একাংশে সাইয়িদ আতীকুল্লাহ্ সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, দেখতে ছোটখাটো গড়নের, ছিপছিপে, সদা ছিমছাম, ঈষৎ ভারিক্কি মেজাজের, সংস্কারহীন, চশমা পরিহিত সাইয়িদ আতীকুল্লাহ্কে অন্তত কিছুটা সমীহ করে চলেন না এমন লোকের সংখ্যা সম্ভবত খুব কমই আছে। কিন্তু বাইরের আপাত কঠিন আবরণটুকু ছাড়িয়ে কেউ যদি ভেতরের মহলে প্রবেশাধিকার অর্জন করতে পারেন তা’হলেই টের পাবেন সেখানে কী বিস্ময় তার জন্য অপেক্ষমাণ।’ সাইয়িদ আতীকুল্লাহ্র কোমল এবং উদার দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর কবিতায়। তাঁর কবিতার লিরিকেল স্্েরাত যেন তাঁরই পথে হাঁটতে শিখেছে। কবির ‘আপনাদের প্রশংসা করি’ ও ‘মানুষের চেষ্টার শেষ নেই’ কবিতায় তেমনটিই আঁচ করা যায়Ñ

‘‘দেখেছি তো আরণ্যক কতোকিছু কতোদিন। এবং জানি

বিস্ফোরকপূর্ণ টিলা, গাছগাছালি ও রকমারি অপচয় সত্ত্বেও

পাখিদের মতো আপনাদেরও আছে নিজস্ব অবকাশ

ইচ্ছা অনিচ্ছার বিলাস, দাম্ভিক কূটতর্ক, শিকার এবং

কীটপতঙ্গের স্বয়ংসম্পূর্ণ মৃগায়াভূমি। এমনকি এক আধটা

উপনিবেশ যেমন খুশি হম্বিতম্বি করে লোক হাসাবার।’’

(আপনাদের প্রশংসা করি, আমাকে ছাড়া অনেক কিছু)

কিংবাÑ

‘‘রাতকে দিনের সাথে মেলাতে চাইলে মস্ত বড়ো বেকুব

হবার ঝুঁকি আছে। তবু তো দেখি মানুষের চেষ্টার শেষ নেই।’’

(মানুষের চেষ্টার শেষ নেই, আঁধির যতো শত্রুমিত্র)

সাইয়িদ আতীকুল্লাহ্র রচনা ভা-ার খুব বেশি বড় নয়। নানাবিধ পত্রপত্রিকার লেখাগুলো যোগাড় করেও তাঁর সমগ্র সৃষ্টিকর্ম যদি এক মলাটের ছায়াতলে আনা হয় তাও যে খুব বেশি বড় হবে তেমনটি জোর দিয়ে বলা মুশকিল। ক’খানা কাব্যগ্রন্থ আমাকে ছাড়া অনেক কিছুÑ১৯৭৭, আঁধির যত শত্রুমিত্রÑ১৯৮০, অদম্য পথিকের গানÑ১৯৮২, এই যে তুমুল বৃষ্টিÑ১৯৮৪, সরল চালের খেলাÑ১৯৮৫, যদি কিছু পাইÑ১৯৮৫, শাসন নেই ধমক নেইÑ১৯৮৭, রোজ তোমাকে বেরুতে হয়Ñ১৯৮৭, একই টেবিলে দশজনÑ১৯৮৭, এই যে আমার বৃদ্ধাঙ্গালি, দ্যাখো, দ্যাখোÑ১৯৮৯, চেয়ে দেখি কত কিছুÑ১৯৯৪ এবং একমাত্র গল্পগ্রন্থ ‘বুধবার রাতে’Ñ১৯৭৩ তাঁর সাহিত্যের শক্তি। তবুও তিনি ছিলেন দেশ-বরণ্য গুরুত্বপূর্ণ লেখকদের একজন। তবে বেশকিছু অনুবাদকর্ম থাকলেও আজ অব্দি তাঁর উপন্যাসগ্রন্থ কিংবা প্রবন্ধগ্রন্থের হদিশ পাওয়া যায় নি। কিন্তু তাঁর কবিতার গভীরতা যেন সে দুঃখ গোছাতে সক্ষম হয়েছে। কারণ ক্ষুদ্রদেহের কবিতাগুলোর গন্ধরস এবং নিগূঢ়-রহস্যময়তার ব্যাপ্তি যেন এক একটি উপন্যাস কিংবা প্রবন্ধগ্রন্থের চেয়েও দীর্ঘদেহী এবং চিন্তাবাহী। তাঁর কবিতার দীর্ঘশ্বাস বড় ভয়ঙ্কর ও বিষযুক্ত!

‘‘যদি সে তার ফুটোফাটা খুব পুরোনো ভাতের থালাটিকে

মুছবার জন্যে ধারেকাছে কোনো কিছুই খুঁজে না পায় এবং

ক্ষেপে গিয়ে অবশেষে একদিন সরল মনে হাত বাড়ায়

রঙচঙে এক জাতীয় পতাকার দিকে, যদি সে হয় আপন দেশে

ভীষণ বৈরী এক বিদেশী? তখন আপনি কি করবেন?’’

(বলুন দেখি কি করবেন, আমি ছাড়া অনেক কিছু)

এবংÑ

‘‘বৃষ্টিধারা নেই তার কোনো গানে

নেই তার প্রাণে

তার বাড়ির ভেতরে

কিংবা বাহিরে

কোনো গাছেতেই

মোটা সরু বৃষ্টির কোনো ফোঁটা নেই।’’

(বৃষ্টি দিনরাত, চেয়ে দেখি কতো কিছু)

‘সাইয়িদ আতীকুল্লাহ্র কবিতা নিñবি ও নিñন্দ।’ এমন বাক্য একসময় অনেক বোদ্ধা সমালোচকও ব্যবহার করতে দেখা গেছে। কিন্তু তাঁর অসংখ্য কবিতায় সে দায়মুক্তির দৃশ্য আমরা দেখতে পাচ্ছি। ‘তোমরা আমার পিঠ থেকে নামো’ কবিতাটিসহ এ রকম অসংখ্য কবিতার ভেতরে প্রবেশ করলেই দেখা যায় তাঁর বর্ণনার ছবি কি চমৎকার এবং বহুলাংশে অন্ত্যমিলহীন ছন্দ-স্রোতের অভিনবত্ব। তাঁর কবিতায় অন্ত্যমিলের ব্যবহার নেই বললেই চলে। তারপরও যেন একেবারেই ‘নেই’ শব্দটি বলার ফুরসত পাওয়া দুষ্কর। তাঁর কবিতায় দুঃসময়ের হালচিত্র অসাধারণ সরল ছন্দে নেচে ওঠতে দেখা যায়Ñ

“জরা, মরা, খরা,

কলেরা, গোক্ষুরা

দুর্ভিক্ষ ও মহামারী

তোমরা আমার পিঠ থেকে নামো

নামো শিগগির, নামো, নামো, নামো

ঘরপোড়ানো ভীষণ আগুন

ফসল পোড়ানো রোদ

দেশ ভাসানি বানের জলে

লোক মারবার বারুদ

তোমরা আমার পিঠ থেকে নামো

নামো শিগগির, নামো, নামো, নামো ’’

(তোমরা আমার পিঠ থেকে নামো, শাসন নেই ধমক নেই)

সাইয়িদ আতীকুল্লাহ্ ছিলেন অত্যন্ত শ্রমশুদ্ধ একজন শক্তিমান লেখক এবং পঠনপ্রিয় সাদামাটা মানুষ। ৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে টাঙ্গাইলে মাটিতে জন্ম নেয়া এই কবি ১৪ নবেম্বর, ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে পুত্রের বাসায় পৃথিবীর সঙ্গে চিরদিনের মতো সম্পর্কচ্ছেদ করেছেন।

প্রকাশিত : ৬ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

০৬/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: