আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

তাঁতীপাড়ার দিদিমণি

প্রকাশিত : ৬ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • নাজনীন বেগম

শাড়ি নামের ক্যানভাসে নানা ধরনের বৈচিত্র্যের ছাপ দিয়ে যাঁরা একে আজ জনপ্রিয় করেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম টাঙ্গাইল শাড়ি কুটিরের কর্ণধার মুনিরা ইমদাদ। তিনি পেশাদার কোন ডিজাইনার নন বরং বলা যায় একজন সফল প্রোমটার ও ডেভেলপার। তাঁতীদের, নিজের অভিজ্ঞতার ঝুলিতে দিয়েছেন মেধার জোগান আর তাতে তাঁতীরা হয়েছে স্বাবলম্বী। ফলে তাঁতশিল্পের ওপর ভরসা করে যে তাঁতীরা একদিন মুখ থুবড়ে পড়েছিল আজ তাদের মাঝে নতুন প্রাণের স্পন্দন। কিভাবে এই সাফল্য, এর পেছনের ইতিহাস বা কী- সেটাই পাওয়া যায় মুনিরা ইমদাদের উত্তরণের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে।

আজ টাঙ্গাইল শাড়ি কুটিরের যে বিশাল অবস্থা দেখি শুরুতে সেটা এ রকম ছিল না। ছোট এক পরিসরে এর যাত্রা শুরু। সেটা ছিল ১৯৮২ সালের কথা। গুণে ও মানের দিক দিয়ে সত্যিকার অর্থে ভারতীয় শাড়ি ছিল অনেক উন্নত। কিন্তু আমরা বাঙালী, আমাদের আছে মসলিন ও জামদানির ঐতিহ্য। আছে দক্ষ তাঁতীগোষ্ঠী। আমরা ভিন্ন দেশ থেকে আসা শাড়ি কেন পরব। এসব কথা চিন্তা করেই মুনিরা ইমদাদ শাড়ির মান উন্নয়ন ও বাজারজাতের বিষয়টি নিয়ে চিন্তা শুরু করেন। প্রথমে তিনি শাড়ির মান উন্নয়নের জন্য কাজ করেন। সেই সময় তাঁকে প্রেরণা দেন ও সহযোগিতা করেন তৎকালীন বিচিত্রা ও পরবর্তীতে সাপ্তাহিক ২০০০-এর সম্পাদক প্রয়াত শাহাদত চৌধুরী।

মুনিরা ইমদাদ যখন কাজ শুরু করেন তার অনেক আগে থেকেই তাঁতীরা কাজের সন্ধানে দেশান্তরিত হওয়া শুরু করেছিলেন। তিনি টাঙ্গাইলের অসহায় বিধ্বস্ত তাঁতীপাড়ায় গিয়ে দু’জন মহিলার সঙ্গে কথা বলেন। তাঁদের বুঝান কিভাবে মধ্যবিত্তের শাড়ির মার্কেট ধরতে হবে। সেই লক্ষ্যে তিনি তাঁদের দশ হাত শাড়ির পরিবর্তে ১২ হাত শাড়ি তৈরির নির্দেশনা দেন। সে সঙ্গে এই বলে আশ্বস্ত করেন যে তাঁর অর্ডার দেয়া প্রতিটি শাড়ি তিনি কিনে নিবেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অগ্রিম দিয়ে কাজ শুরু করলেন। প্রাথমিকভাবে ভাল ফলাফল পেয়ে গেলেন। এসব ডিজাইন অন্য ঘরানার শাড়ি বা পুরাতন ডিজাইন নতুন আঙ্গিকে রূপান্তরিত করা। ছোটখাটো কারিগরি দক্ষতা দিয়ে তাঁতের শাড়িতে বৈচিত্র্য আসে তখন থেকে। শাড়ির কালার ম্যাচিং এই ধরনের নকশা তাঁতীদের হাতে তুলে দেয়ার মাধ্যমে। এভাবে চলতে থাকে কাজের অগ্রগতি। প্রায় তিন বছর ধরে তাঁতীপাড়ায় অনবরত গিয়ে তিনি গ্রামের তাঁতীদের কাজে উৎসাহ দিয়েছেন, তাদের তৈরি শাড়ি এনে দিয়েছেন শহরের মানুষের হাতের কাছে। কখনও কোন অবাঞ্ছিত ঘটনার সম্মুখীন হননি। গ্রামের মেয়েরা তাঁকে দিদিমণি বলে ডাকতেন, যথেষ্ট সম্মান দেখাতেন। এভাবে আমাদের দেশের তাঁতী পরিবারের মেয়েরা ঘরকন্যার পাশাপাশি তাঁতের কর্মকা-ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ল। তাঁতীপাড়া আবার মুখরিত হতে শুরু করল মাকুর শব্দে। সুতা রঙিন করতে গিয়ে রঞ্জিত হলো নারীদের হাত। সেই রঙের আভা ছড়িয়ে পড়ল শহুরে শাড়ি প্রেমিকদের হাতে। বস্তুত তখন শহরের মানুষ দেশীয় শাড়ির প্রতি আগ্রহ দেখাতে লাগল।

তাঁতশিল্পের উন্নয়নের ক্ষেত্রে মুনিরা ইমদাদ যে কাজটি করেছেন তা হলো তাঁতীদের সাহস যুগিয়েছেন। পদ্মা টেক্সটাইল থেকে অর্ডার দিয়ে সুতা তৈরি করে তা তুলে দিতে শুরু করেন তাঁতিদের হাতে। টাঙ্গাইল শাড়ি কুটিরের অধিকাংশ শাড়ির সুতা তিনি নিজে সরবরাহ করে থাকেন। এতে শাড়ির মান বেড়ে যায়। মিরপুরের তাঁতীরা আগে পলিয়েস্টার ব্যবহার করত। তিনি প্রথমে তাদের সুতা ব্যবহার করতে উৎসাহিত করেন। প্রথমে তারা সুতা ব্যবহার করতে চায়নি। কিন্তু কয়েকজন তাঁর অনুরোধে সুতা ব্যবহার করে খুব ভাল ফল পেয়ে যায়। তার পরে অন্যান্য তাঁতীরা সুতা ব্যবহার করতে শুরু করেন। এমনকি অনেকে জীবজন্তুর ফিগার শাড়িতে করতে চায়নি। এখন এই অবস্থার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। এখন জীব-জন্তু, মাছ-পাখির ফিগারওয়ালা শাড়ি পরছে। বর্তমানে সুতা দিয়ে বিয়ের শাড়ি তৈরি করে একচেটিয়া বাজার করছে তারা। তারা ঝুট দিয়ে শাড়ি তৈরিতেও দক্ষতার পরিচয় দেয়।

মুনিরা ইমদাদ যখন টাঙ্গাইল তাঁতীদের সঙ্গে কাজ করেন তখন তাঁরা জেনারেশন টু জেনারেশন দক্ষ ছিল। তবে অভিজ্ঞতা ক্রমান্বয়ে কমে আসছিল। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে তাঁতীরা বাজার হারায়। সেই বাজার দখল করে বিদেশী শাড়ি। অসহায় অনেক তাঁতী অন্য পেশায় চলে যায় জীবিকার সন্ধানে। সেই সময় মুনিরা ইমদাদ কাজ শুরু করেন। তিনি শাড়ির বাজার অবজার্ভ করেন। তাঁতীদের হাতে বিভিন্ন ধরনের ডিজাইন ও সেইসঙ্গে কালার ম্যাচিং করে নমুনা দেন। তাঁতীরা সেভাবেই তাঁর অর্ডার মতো শাড়ি সরবরাহ করেন। এভাবেই তিনি হয়ে উঠেন একজন দক্ষ প্রমোটা ও সফল উদ্যোক্তা। দেশী শাড়ির বাজার তৈরিতে তাঁর অবদান উপেক্ষা করা যায় না।

তাঁতশিল্পের অবস্থা পর্যালোচনা তিনি করেন ঠিক এভাবে। বর্তমানে বাংলাদেশে তাঁতশিল্পের অবস্থা অনেক ভাল। এই শিল্পের পুনর্জাগরণে মহিলাদের বিরাট ভূমিকা রয়েছে। তাঁতী পরিবারের মহিলারা ঘরকন্যার পাশাপাশি তাঁতের কর্মকা-ের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। আমাদের অর্থনীতিতে গার্মেন্টসের অবদান আমরা জানি। ঢাকা, টাঙ্গাইল, পাবনা, নরসিংদী, কুমিল্লা, রাজশাহীতে কয়েক লাখ তাঁতীর বসবাস। এ ছাড়া সিলেটের আদিবাসী, মনিপুরী, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজাতিদের মাঝে বিভিন্ন রকম তাঁতের প্রচলন আছে। টাঙ্গাইলের তাঁতীরা সুতি, সিল্ক, রো সিল্ক, হাফসিল্ক শাড়ি বুনছে। বিভিন্ন ধরনের শাড়ির থান আমরা টাঙ্গাইলে পাচ্ছি। এছাড়া ভাল কাপড় কটেজ সিস্টেমে উৎপাদিত হয়। পাবনা টাঙ্গাইলের কাছাকাছি হলেও ওদের কাপড়ের শৈল্পিক গুণ আলাদা। দুটি দুই ঘরানার শাড়ি। পাবনায় বেশিরভাগ চিত্তরঞ্জন হুক জ্যাকার্ড ও খটখটি জ্যাকার্ডে তাঁত ব্যবহার হয়। পাবনায় সাধারণ কাপড় ছোট ছোট কারখানার মাধ্যমে তৈরি হয়। এদের উৎপাদনের হার টাঙ্গাইলের তুলনায় অনেক বেশি। তাঁতীদের যদি ভালভাবে কারিগরি ফর্মুলা শিখান যায় এবং টেকনিক্যাল দিকগুলোতে প্রশিক্ষণ দেয়া যায়, তা হলে তারা আরও ভাল কাজ করবে।

তাঁত শিল্পের সঙ্গে মুনিরা ইমদাদ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এর সাফল্যে তিনি নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁর উদ্যোগে তাঁতীরা ভারতের মাদ্রাজসহ অন্যান্য স্থানে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসে অন্যদের দক্ষ করে তুলেছে। এই শিল্পের সমস্যা সম্পর্কে তিনি জানান, প্রধান সমস্যা কাঁচামালের অভাব। এছাড়া কাপড়ে রং করাটাও একটা সমস্যা। যেমন অনেকে রং করতে পারে না। সুতায় রং করার পর সুতা ধোয়ার জন্য যে পানি প্রয়োজন তা পাওয়া যায় না। ফলে সুতার ওপর যে বাড়তি রং থাকে তা শাড়ি তৈরির পর থেকে যায়। ফলে গ্রাহকরা যখন শাড়ি পরে তখন ভাবে শাড়ির রং উঠছে। তাই সুতা যেখানে রং করা হয় সেখানে পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা থাকা উচিত। মিরপুরের তাঁতীদের শহরের বাইরের কাজের সুযোগ করে দেয়া প্রয়োজন, যেখানে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা আছে। তা না হলে দিন দিন পরিবেশ দূষিত হয়ে পড়বে। উন্নত বিশ্বে যেখানে জনবসতি আছে সেখানে রঙের কোন কারখানা নেই। এছাড়া আমাদের দেশের তাঁতীদের কাজের মান উন্নয়নের জন্য বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ দেয়া প্রয়োজন। দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা করা, বিভিন্ন অঞ্চলের তাঁতীদের সংযোগ সাধনার মাধ্যমে তাঁতীদের অভিজ্ঞতা আদান-প্রদান করে এর আরও উন্নয়ন সম্ভব।

২০০০ সালে কোয়ালিটি মেইন্টেইনের জন্য টাঙ্গাইল শাড়ি কুটির আইএসও থেকে আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেট লাভ করে। এছাড়া ভারত থেকেও মুনিরা ইমদাদ পেয়েছেন কিছু পুরস্কার। তিনি বাংলাদেশ জাতীয় কারুশিল্প পরিষদের ট্রেজারার ও প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেছেন। এখন ফ্যাশন রিলেটেড প্রতিটি সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। বর্তমান রাজনৈতিক হিংসাত্মক রাজনীতিতে তিনি অন্যান্য সবার মতো উদ্বিগ্ন। দেশের ফ্যাশন উদ্যোক্তাসহ সব ধরনের শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মালিক-কর্মচারীরা সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমাদের প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এই ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচী থেকে নেতাকর্মীদের পরিহার করতে হবে।

ব্যক্তিগত জীবনে মুনিরা ইমদাদ একজন সফল মা, সার্থক গৃহিণী। তাঁর সাফল্যের মূলেই আছে সততা, নিষ্ঠা, অধ্যাবসায় ও সাধনা। প্রয়াত স্বামী ইমদাদুল হক ছিলেন একজন সফল প্রকৌশলী ও সমাজসেবক। দুই সন্তানের মধ্যে বড় মেয়ে নরমিন মোবাশ্বেরা আমেরিকায় পড়ালেখা শেষ করে চাকরির পাশাপাশি একটি বুটিক করেছেন। ছেলে সরফ্ ইমদাদ আমেরিকা থেকে অর্থনীতিতে গ্র্যাজুয়েশন করে এসে দেশে ব্যবসা করছেন।

প্রকাশিত : ৬ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

০৬/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: