রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

শিশুর সৃজনশীলতার বিকাশ

প্রকাশিত : ৬ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • রায়হান ফরাজী

সৃজনশীল মানুষ প্রকৃতির সৃষ্টি প্রতিটি জিনিসের মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি বা রূপ প্রদান করে প্রকৃতির কাছে আমরা কতটা ঋণী তা সাধারণের জন্য সহজবোধ্য করে দেয়। মানুষের এই সৃজনশীলতা তৈরি হয় শিশু বয়স থেকেই। সৃজনশীলতা শিশুর আত্ম-অভিব্যক্তির প্রকাশ ঘটায়। সামাজিক শ্রেণী বিভাগ, অতৃপ্তি বা অন্যায়ের অভিজ্ঞতা না থাকায়, শিশু বয়সের সৃজনশীল কাজগুলো পূর্ণ বয়সে এসে তাদের ঠিক দিকনির্দেশনা দেয়।

মেধা ও সৃজনশীলতা এক নয়, অনেক মেধাবী মানুষ আছে যারা শিক্ষা জীবনে ভীষণভাবে সফল, কিন্তু ব্যক্তি এবং কর্মজীবনে সেইভাবে নয়। অনুরূপভাবে সৃজনশীল মানুষ তা ব্যক্তি ও কর্মজীবনে অনেক বেশি সফল। তাই সৃষ্টিশীল প্রতিটি মানুষ মেধাবী, তারা তাদের মেধার বহুমাত্রিক প্রয়োগের মাধ্যমে যেমনি আত্মতৃপ্ত হয় সেভাবেই মেধার বিকাশ ঘটায়। তাই বলা যায় মেধা বিকাশের স্বার্থে সৃজনশীলতা গুরুত্বপূর্ণ।

আধুনিক বিশ্বে শিশুর বিকাশের ক্ষেত্রে সৃজনশীলতা শিক্ষা দেয়ার জন্য পাঠ্য বইয়ে তা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশেও জোরালোভাবে না হলেও মোটামুটিভাবে তা করা হচ্ছে। দারিদ্র্যপীড়িত পরিবারের শিশুদের প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে সৃজনশীল কর্মকা-ে উৎসাহ প্রদানের ব্যাপারে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। বিজ্ঞজনেরা বলেন, সৃজনশীল কাজ, কাজের পরিবেশ শিশুকে আবেগী স্বাস্থ্যবান করে গড়ে তোলে। যা পূর্ণ বয়সে তাকে সামাজিক দায়িত্ববান হতে সহায়তা করে।

শিশু সৃজনশীলতা কী? পরিবার, সমাজ, প্রকৃতি থেকে শিশু যে বিষয়ে আগ্রহী হয় ও ধারণা সংগ্রহ করে এবং তা নিজের অনুভূতি থেকে চিত্র, গান-কবিতা, মাটির কাজ, রঙের ব্যবহারের মাধ্যমে বা তার দ্বারা সম্ভব সব বস্তু থেকে যে সৃষ্টি আমাদের উপহার দেয়, তাকেই শিশুর সৃজনশীলতা বলে।

সাধারণভাবে আমরা যদি শিশুদের জন্য আমাদের নীতি, অভ্যাস ও প্রয়োগিক দিক থেকে সৃজনশীলতাকে গুরুত্ব দেই, এতে করে নিবিড় সম্পর্ক হবে শিক্ষক ও শিশু শিক্ষার্থীর, অভিভাবক ও সন্তানের এবং এক শিশুর সঙ্গে অন্য শিশুর। ১৯৯৯ সালে এই সংক্রান্ত গবেষণায় ডালবার্জ এমনটিই বলেছেন। স্টেইনটোন রোজারস ১৯৯২ সালে তার প্রবন্ধে লেখেনÑ প্রাপ্ত বয়সেরা যে কোন সমাজিক কাজের ক্ষেত্রে সেই কাজটি শেষ করার পর যে ফল পেয়েছে, সেই একই কাজ শিশুর সৃজনশীলতার কাছে হার মেনেছে। মালাগুজ্জি শিশু বিকাশ নিয়ে কাজ করা বিশ্বময় পরিচিত একজন, তিনি বলেন, ভিন্ন ভাষাভাষি শিশুরা অনায়াসে তাদের ভাববিনিময় করতে পারে নিজের সৃষ্ট বিনিময়ের মাধ্যমে। ফেয়ারক্লুজ ১৯৯৬ সালে শিশুর সৃজনশীলতা, সংস্কৃতি ও ভাষা নিয়ে গবেষণা গ্রন্থে বলেন, অভিভাবক, শিক্ষক খুব সহজে শিশুকে নিজ সংস্কৃতি ও ভাষা বিষয়ে জ্ঞান দিতে পারে যা উক্ত শিশুটি আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করে নিজ সংস্কৃতি, ভাষা নিয়ে আর আগ্রহী হয়। তার জন্য প্রয়োজন শিশুর সৃজনশীল কাজে সুযোগ।

শিশুর জীবনমান বৃদ্ধির জন্য সৃজনশীলতাকে প্রাধান্যর ব্যাপারে কারও কোন দ্বিমত নেই। ধরা যাক একজন শিশু খুব চঞ্চল, দুরন্ত। অভিভাবকের পেরেশানির অন্যতম কারণ এই শিশু। লেখা পড়ায় মন নেই, শুধুই দুষ্টমি, এই হচ্ছে শিশুটির অবস্থা। কোন এক স্কুল শিক্ষক খেয়াল করলেন সেই শিশুটি খুব চমৎকার অঙ্গভঙ্গি করতে পারে, অর্থাৎ দেহ ভঙ্গির মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়কে ফুটিয়ে তুলে। স্কুলের কোন এক অনুষ্ঠানে সেই শিশুটিকে মঞ্চে আমন্ত্রণ জানানো হলো এবং সে তার সৃজনশীলতা উপস্থাপন করল। সবাই মিলে শিশুটিকে বাহবা দিল। শিক্ষক তখন তাকে বললেন- তুমি যদি ভালভাবে লেখাপড়া কর ও দুষ্টমি না করে বাবা মার কথা শোন, তবে একদিন আরও বড় মঞ্চে কাজ করার সুযোগ পাবে। শুধুমাত্র শিশুটির সৃজনশীলতার একটু প্রয়োগে শিশুটি হয়ত পূর্ণ জীবনে বিখ্যাত মূকাভিনেতা হতে পারে।

শিশুকে সৃজনশীল কাজে উদ্বুদ্ধ করতে পারলে যে সুফলগুলো পাওয়া যায়; যোগাযোগে দক্ষতা বৃদ্ধি-নিজের সৃজনশীলতাকে বৃদ্ধি ও নতুন ধারণা লাভের আশায় সৃষ্টিশীল কাজের বিনিময়ে শিশুর যোগাযোগ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। সমস্যা সমাধানের যোগ্যতা অর্জন; বিশেষত শিশু যখন কোন কাজ বা সৃষ্টি শুরু করে আকার, রং, উপাদান, বিষয়বস্তুসহ নানা সমস্যায় পড়ে এবং তা সে নিজের মেধাবলে সমাধান করে। সামাজিক ও আবেগময় দক্ষতা, নতুন কিছু করার আশায় শিশুটি অনেক বেশি সমাজ সচেতন হয়, যা সে তার আবেগ ভাবনায় বিচার করার প্রয়াস পায়।

মেরিয়েন কোল তার চিলড্রেনস আর্ট এ্যাডুকেসন গ্রন্থে বলেন- শিশুর সৃজনশীল কাজ শিশুকে সিদ্ধান্ত প্রহণে দক্ষ করে। কারণ সৃষ্টির বৈচিত্র্যতার জন্য কী করব কী করব না, তা সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। তাছাড়া প্রযুক্তি জ্ঞান ও নতুন আবিষ্কারের ক্ষেত্র তৈরি হয় শিশু সৃজনশীলতার মাধ্যমে। সবচেয়ে বড় যে প্রাপ্তি ঘটে তা হলো শিক্ষা জীবনের সফল্য। কারণ শিশুটি বুঝতে পারে আনন্দের এই প্রাপ্তির প্রদর্শন, প্রয়োগ, অর্জন তার সব কিছু ঘিরে আছে তার স্কুল বা বিদ্যাপীঠ।

আমরা সাধারণ অনেক পথশিশুকে দেখতে পাই যারা বিভিন্ন অন্যায়ে জড়িত। অথচ স্কুলে সেই সব শিশুর সুপ্ত সৃজনশীলতাকে প্রাধান্য দিলে হয়তো বা ওরা অপরাধে জড়াতো না। উচ্চশিক্ষিত না হলেও সৃষ্টিশীল কাজে নিজের মেধার পূর্ণ ব্যবহার করতে পারত। শিশুর জন্য আমাদের বিদ্যালয়গুলোকে আমরা কি পারি না সেভাবে সাজাতে?

প্রকাশিত : ৬ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

০৬/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: