কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

জলবায়ু পরিবর্তন আনবে খাদ্যের বাড়তি বিপর্যয়

প্রকাশিত : ৬ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • এনামুল হক

খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে যারা খুঁতখুঁতে, জলবায়ু পরিবর্তন তাদের জন্য শুভ লক্ষণ বহন করে না। অন্যকথায়, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই শ্রেণীর প্রাণীদের ভোগান্তি আছে। কোন কোন ক্ষেত্রে এরা বিলুপ্তির মুখেও চলে যেতে পারে। কারণ, খাদ্যের ব্যাপারে এত বাছবিচার করা, এত খুঁতখুঁতে স্বভাবের হওয়ার ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে এরা খাপ খাইয়ে নিতে পারে না।

এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ খুঁজতে হলে আমাদের যেতে হবে এন্টার্কটিকায়। কারণ, বিশ্বের ওই জায়গাতেই তাপমাত্রা ও জলবাযুর সবচেয়ে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে চলেছে। অতিমাত্রায় মিল থাকা সত্ত্বেও সেখানকার দুটো প্রাণী এই পরিবর্তনে একেবারেই ভিন্নভাবে সাড়া দিচ্ছে। প্রাণীগুলো হচ্ছে একই গোত্রের দুটো ভিন্ন প্রজাতিÑ চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইন এবং জেন্টু পেঙ্গুইন। চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইনের চিবুকের নিচে থাকে কালো দাগ। অন্যদিকে জেন্টু পেঙ্গুইনকে উজ্জ্বল গোলাপি ঠোঁট দেখে চেনা যায়।

নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, এন্টার্কটিকায় গ্রীষ্মের প্রজনন এলাকায় চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইনের সংখ্যা কমছে এবং অন্যদিকে জেন্টু পেঙ্গুইনের সংখ্যা বাড়ছে। প্রায় একই ধরনের এই দুটি প্রজাতি খাদ্যের জন্য তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা কমাতে কালের প্রভাবে ভিন্ন ভিন্ন কৌশল উদ্ভাবন করেছে। দ্রুত পরিবেশগত পরিবর্তনের সময় তাদের সেই কৌশলের শাখা-প্রশাখাও বিস্তৃত হয়েছে। দেখা গেছে যে, চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইনের তুলনায় জেন্টু পেঙ্গুইনের ডায়েট বা আহার্য বস্তু অধিকতর বৈচিত্র্যময়। তারা এক ধরনের খাবারে আবদ্ধ না থেকে নানা ধরনের খাবার খায়। খাদ্যের ব্যাপারে তাদের মনোভাব নমনীয়। অন্যদিকে চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইন নির্দিষ্ট দু’একটা খাবারেই অভ্যস্ত। খাদ্যের ব্যাপারে তাদের মনোভাব অনমনীয়। এরা প্রধানত ক্রিল নামে এক ধরনের সামুদ্রিক চিংড়ি খেয়ে থাকে। সে জন্য তারা উপকূল থেকে দূরবর্তী সমুদ্রে যেতেও পিছপা হয় না।

খাদ্যের জন্য এই দুই প্রজাতির প্রতিযোগিতার সম্ভাবনা তুঙ্গে ওঠে, যখন তাদের পরস্পরের কাছাকাছি স্থলভাগে প্রজনন করতে দেখা যায়। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হলে তাদের ছানাকে খাওয়ানোর প্রয়োজন দেখা দেয়। এই প্রয়োজনের কারণেই তাদের খাদ্যের সন্ধানে সাগরের বেশি দূরে যাওয়া সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। অবশ্য তারা কি খায় এবং কোথায় সেই খাদ্য পাওয়া যায়, সে ব্যাপারে কালক্রমে কিছু মৌলিক পার্থক্য সম্ভবত দেখা দিয়েছিল। যে কারণে উভয়ের মধ্যে প্রতিযোগিতা যেমন কমে আসে, তেমনি জেন্টু ও চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইন সহাবস্থান করতেও সক্ষম হয়।

গত ৫০ বছরে এন্টার্কটিকা নাটকীয়ভাবে উষ্ণ হয়ে উঠেছে। বার্ষিক তাপমাত্রা প্রায় ৫ ডিগ্রী ফারেনহাইট বা ২.৮ ডিগ্রী সেলসিয়াস বেড়েছে। যে কারণে এন্টার্কটিকা হয়ে দাঁড়িয়েছে দক্ষিণ গোলার্ধের সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণায়িত হয়ে ওঠা অঞ্চল। সে অঞ্চলে তাপমাত্রা বছরের বেশিরভাগ সময় প্রায় শূন্য ডিগ্রীর আশপাশে থাকেও সেখানে কয়েক ডিগ্রী তাপমাত্রা বাড়া বা কমার পার্থক্য অনেক। এতে সাগরের পানি ঠা-ায় জমে বরফ হয়ে যাবে, নয়ত সাগরের বরফ গলে পানি হয়ে যাবে। সাগরের পানি ঠা-ায় বরফ হয়ে যাওয়া অথবা বরফ গলে পানি হয়ে যাওয়ার তাৎপর্য অনেক। অন্তত পেঙ্গুইনদের কাছে তো বটেই। পেঙ্গুইনদের প্রধান শিকারের প্রাণী এন্টার্কটিকার ক্রিল। এই ক্রিল সাগরের বরফের ওপর নির্ভর করে। বিশেষ করে বাচ্চা ক্রিলরা শিকারী প্রাণীর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সাগরের বরফকে কাজে লাগায় এবং এই বরফের নিচে যে এ্যালজি জন্মে, তা খেয়ে থাকে। তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় এখন সাগরের বরফ কমে যাচ্ছে। কাজেই পেঙ্গুইনদের খাদ্য ক্রিলের সংখ্যাও কমে আসছে। আগে চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইনদের স্ট্র্যাটেজি ছিল, উপকূলে বিশাল বিশাল ক্রিলের ঝাঁকে হানা দেয়া। এজন্য একটু দূরে যেতেও তাদের আপত্তি ছিল না। কিন্তু ক্রিলের সংখ্যা কমে আসায় এই কৌশল আজকের অবস্থায় উপযোগী নয়। অথচ এককভাবে ক্রিলের ওপর নির্ভরশীল থাকায় চিনস্ট্র্যাপকে দূর সাগরে যেতেই হচ্ছে। কারণ, ক্রিলের সংখ্যা কমে আসায় তাদের আজ আগের মতো ধারে কাছে পাওয়ার উপায় নেই। খাদ্যের সন্ধানে এমনিভাবে সুদূরে চলে যাওয়ার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে চিনস্ট্র্যাপ সমাজে। ওদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে।

অন্যদিকে জেন্টু পেঙ্গুইন পরিবর্তনশীল পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে অধিকতর সক্ষম। খাদ্যের ব্যাপারে কোন বাছবিচার না থাকা ছাড়াও, কখন কোথায় প্রজনন করতে হবে সে ব্যাপারে তারা যথেষ্ট নমনীয়। তারা ছানাদের দীর্ঘসময় ধরে খাইয়ে তাদের সাবালকত্বে উত্তরণ সহজতর করে তোলে। এসব কারণে এন্টার্কটিকা উপদ্বীপের জেন্টু পেঙ্গুইনরা জলবায়ু পরিবর্তন থেকে লাভবান হচ্ছে এবং তাদের সংখ্যা বাড়ছে।

একই ধরনের এই দুই পেঙ্গুইন প্রজাতির আচরণ ও খাদ্যাভ্যাস যে আলাদা, তার সত্যতা নিরূপণে গবেষকরা দীর্ঘসময় ধরে এক গবেষণা চালান। তারা প্রজননরত পেঙ্গুইনদের পাকস্থলীর উপাদানগুলো পরীক্ষা করে দেখেন। তা থেকে ধারণা পাওয়া যায়, মা অথবা বাবা পেঙ্গুইন তাদের ছানাদের কি খাওয়াচ্ছে। তাছাড়া, পেঙ্গুইনদের খাওয়া মাছের কানের হাড় কিংবা অটোলিথ শনাক্ত করে তারা নির্ণয় করতে পেরেছেন, সেই পেঙ্গুইন উপকূলের কাছে নাকি উপকূল থেকে দূরে মাছ শিকার করেছিল। এছাড়াও, গবেষকরা পুরোপুরি বেড়ে ওঠা পেঙ্গুইন ছানার বুকের পালক সংগ্রহ করে আইসোটোপ পরীক্ষা বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, বাবা-মা পেঙ্গুইন এই ছানাদের কতখানি ক্রিল খাইয়েছে এবং সেই তুলনায় মাছই বা খাইয়েছে কি পরিমাণে। এর সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছেন বাবা-মা পেঙ্গুইনের পাকস্থলীর উপাদান ও মাছের অটোলিথ বিশ্লেষণের ফলাফল। আর তা থেকেই তারা উপসংহার টানতে পেরেছেন যে, চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইনের সংখ্যা কেন কমছে এবং জেন্টুর সংখ্যাই বা কেন বাড়ছে! গবেষকরা এখন নির্ণয় করার চেষ্টা করছেন যে, সব জেন্টু পেঙ্গুইনই কি নানা ধরনের খাদ্যবস্তু গ্রহণ করে; নাকি তাদের মধ্যে কিছু কিছু অংশ বৈচিত্র্যপূর্ণ খাবার খেতে অভ্যস্ত। সেইসঙ্গে জানার চেষ্টা করছেন, সমস্ত জেন্টু পেঙ্গুইন কি জলবায়ু পরিবর্তন থেকে সমভাবে লাভবান হচ্ছে, নাকি তাদের মধ্যে কিছু অংশ লাভবান হচ্ছে।

প্রকাশিত : ৬ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

০৬/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: