কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

‘অন্তরালে থেকে দেখতে চেয়েছি মৃত্যুর পর বেঁচে থাকবো কিনা’

প্রকাশিত : ৬ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

কয়েকদিন আগে থেকেই কথা হচ্ছিল মোবাইল ফোনে। একটু সময় চাই সাক্ষাতকার নেয়ার জন্য। কিন্তু সাক্ষাতকার দিতে কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না কবি হেলাল হাফিজ। তবে যখন বললাম, আপনার সঙ্গে একটু কথা বলার সময় চাই, আড্ডাবাজ এ মানুষটি তখন সময় দিলেন। শীতের এক সকালে আসতে বললেন জাতীয় প্রেসক্লাবে। আসতে হবে ঠিক সকাল ঠিক ১০টায়। আমাকে বড়জোর সময় দেবেন ২০ থেকে ২৫ মিনিট। আমি বললাম, তাতেই হবে। যথারীতি নিজেকে গুছিয়ে নিই। অফিসের নিজস্ব ফটোগ্রাফার আরিফকে জানিয়ে দিই সময় ও জায়গার নাম। রাজধানীর যানজট কিংবা হরতাল-অবরোধকে মাথায় রেখেই সময় ধরে বাসা থেকে রওয়ানা হই আমি। প্রেসক্লাবে যখন পৌঁছাই, ঘড়িতে তখন ১০টা বাজতে ৫ মিনিট বাকি। সেখানে পৌঁছেই আবারও তাঁর মোবাইলে ফোন দিই। শান্ত-শুভ্র পায়ে এগিয়ে আসেন আমার কাছে। আহ্বান করেন প্রেসক্লাবের ভেতরে আসার। সময়ের আগেই উপস্থিত হওয়ায় শুরুতেই আমাকে ধন্যবাদ জানান তিনি। উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়ে তিনি নিয়ে গেলেন আমাকে প্রেসক্লাবের ভেতর। শীতের নরম রোদের পাশে লবিতে মুখোমুখি বসি আমরা দু’জন। আমি ও হেলাল হাফিজ, হেলাল হাফিজ ও আমি। সামান্য কিছু সৌজন্যমূলক কথপোকথন সেরে নিই। সুযোগে থাকি উনার স্মৃতির ঘরে ঢোকার। অল্প-স্বল্প-গল্পের পর উনি নিজেই নিয়ে যান আমায় তাঁর ফেলে আসা যাপিত জীবনে। স্মৃতির ডালি সাজিয়ে বসেন কবি। শৈশবের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন- ‘শৈশব জীবনে আমি ছিলাম মূলত খেলাধুলার মানুষ। ফুটবল, ব্যাটমিন্টন, ভলিবল, হাই জাম্প, লংজাম্প- এমন কত খেলাই না খেলতাম সারাদিন। এমনকি নেত্রকোনার মতো মফস্বল শহরে থেকেও আমি স্কুলজীবনে লনটেনিস খেলা শিখেছি। যদিও সেই সুযোগটা পেয়েছিলাম মূলত আমার আব্বার সুবাদে। আমার আব্বা খোরশেদ আলী তালুকদার ছিলেন সেখানকার ঐতিহ্যবাহী দত্ত হাই স্কুলের খুব নামকরা একজন শিক্ষক। স্কুলে তিনি বাংলা-ইংরেজী-অঙ্ক সবকিছুই পড়াতেন। তবে প্রকৃত অর্থে তিনি ছিলেন সাহিত্যের শিক্ষক। আব্বাকে সকলেই খুব মান্য করতেন। তো, সেই খেলাধুলা করে জীবনে অনেক পুরস্কার পেয়েছি আমি। এদিকে ৩ বছর বয়সে আমি মাতৃহারা হই (মায়ের নাম কোকিলা বেগম)। সেই বয়সে মা হারানোর বিষয়টি অনুধাবন করতে পারিনি। তবে যতই দিন যেতে লাগল, যতই বড় হতে লাগলাম, সেই বেদনাটি ফুলে ফলে সুশোভিত হতে লাগল। একসময় গিয়ে দেখলাম খেলাধুলার মধ্য দিয়ে আমার এ বেদনা প্রশমিত হচ্ছে না কিছুতেই। এমনকি বেদনা প্রকাশের কোন মাধ্যম পাচ্ছি না। তখন কবিতার আশ্রয় নিই আমি।’ তবে এর জন্য নিশ্চয়ই একটা প্রস্তুতি পর্ব ছিল। শিশুকাল থেকে কিভাবে গড়ে ওঠে আপনার সেই নিজস্ব পরিবেশ? উত্তরে তিনি বলেন- ‘বাল্যকাল থেকেই বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রতিযোগিতা করে নানা পুরস্কার পেয়েছি আমি। স্কুলের বার্ষিক সভায় বাংলা বা ইংরেজি কবিতা আবৃত্তি করে পুরস্কার পেয়েছি অনেক বই। গানও গাইতে পারতাম ভালো। এছাড়া উপস্থিত বক্তৃতা, গল্পবলা আমার স্কুলজীবন থেকে শুরু করে চলে কলেজ জীবন পর্যন্ত। ১৯৬৫ সালে এসএসসি পাস করে ভর্তি হই নেত্রকোনা কলেজে। ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছে ছিল বলে কলেজে আমি বিজ্ঞান বিভাগে পড়েছিলাম। তবে ১৯৬৭ সালে এইচএসসি পাস করার আগেই কবিতার পোকা ঢুকে যায় মাথায়। বেদনা প্রশমিত করার জন্য আমি কবিতাকে অবলম্বন করলাম। শিল্প-সাহিত্যের সঙ্গে যেহেতু আগে থেকেই যোগাযোগ ছিল, সেহেতু কবিতার দিকেই ঝুঁকে পড়লাম।’ তারপর? ‘এইচএসসি পাস করার পর চলে এলাম ঢাকায়। মেডিক্যালে প্রচুর পড়াশোনোর চাপ থাকে। যাতে করে আর কবিতাই হবে না আমার। তাই সেখানে ভর্তি পরীক্ষাই দিলাম না, মাথা থেকে ঝেড়ে ফেললাম ডাক্তার হওয়ার ভূত। ভর্তি হলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলায় অনার্স করতে। ভর্তি হওয়ার প্রথম বছরেই বিরতি দিলাম। বাড়িতে আব্বার সঙ্গে মনোমালিন্য হলো। সেসময় কাগজে বিজ্ঞাপন দেখলাম মুন্সীগঞ্জের একটি স্কুলে আইএসসি পাস শিক্ষক নেবে। সেই সঙ্গে স্কাউট শিক্ষাও থাকতে হবে। স্কুলে আমার সেই অভিজ্ঞতা ছিল। সেই বিজ্ঞপ্তি দেখে ইন্টারভিউ দিলাম সেখানে। চাকরি হয়ে গেল। সেই স্কুলে শিক্ষকতা করলাম এক বছর। তারপর আবার ফিরে এলাম ঢাকায়। ভর্তি হলাম আবারও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একই বিভাগে’Ñ বলেন হেলাল হাফিজ। এই ফাঁকে ভাইবোন, পরিবার সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা আপন দুই ভাই। আম্মার মৃত্যুর পর আব্বা আবার বিয়ে করেন। সেই ঘরে দুই ভাই ও তিন বোন। অর্থাৎ আমরা সব মিলিয়ে চার ভাই, তিন বোন।’ সেইসব উত্তাল সময়ের কথা শুনতে চাই আপনার কাছে- ‘সেই সময় আন্দোলনের জন্য দানা বাঁধছে। ঊনসত্তরে এসে তা ব্যাপক বিস্ফোরণ ঘটে। আজকের দিনের মানুষ, যারা গণঅভ্যুত্থান দেখেনি, তারা তা বুঝতেই পারবেন না সেই সময়টা কেমন ছিল। এখন তো আন্দোলন হয় কলাটা-মুলাটা পাওয়ার আশায় কিংবা টাকা দিয়ে ভাড়া করে লোক দিয়ে। কিন্তু তখন ছিল একেবারে নৈতিকতা, আদর্শের ওপর দাঁড়িয়ে আন্দোলন। আমার ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কবিতাটি লিখি ঊনসত্তরের পহেলা ফেব্রুয়ারি। তবে লেখাটি কয়েক দিন আগে থেকেই জমাট বাঁধছিল মাথার ভেতর। লেখা পূর্ণ হয় পহেলা ফেব্রুয়ারি। কথাশিল্পী আহমদ ছফা ও কবি হুমায়ূন কবীর আমাকে অসম্ভব স্নেহ করতেন। মূলত তাঁদের নেতৃত্বে ওই কবিতার প্রথম দুটি পঙ্্ক্তি ছড়িয়ে পড়ে পুরো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব জায়গায়। এক রাতে সেখানকার দেয়ালে দেয়ালে লিখিত হয়- ‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়/ এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’। আর রাতারাতিই আমি তারকা বনে গেলাম।’ হাসতে হাসতে তিনি বললেন, ‘সে এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা, তোমাকে বলে বোঝানো যাবে না। এমন একটা অবস্থা হলো, যেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির পরেই আমার অবস্থান!’ এরপর ১৯৮৬ সালে বইমেলায় আপনার একমাত্র কাব্যগ্রন্থ ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ প্রকাশিত হয়। সেই সময়টা জানান আগ্রহ প্রকাশ করলে তিনি বলেন- ‘কবিতা বইটি প্রকাশের ১৭ বছর আগে থেকেই আমি লেখালেখি করে আসছিলাম। বই প্রকাশের আগেই আমি তারকাখ্যাতি পেয়ে যাই- যার কথা কিছুক্ষণ আগেই বললাম। ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ কাব্যগ্রন্থটির পাণ্ডুলিপি তৈরি করতে গিয়ে আমার লেখা প্রায় দেড় শ’ কবিতা নিয়ে বসি। দীর্ঘ ৬ মাস সময় ব্যয় করে সেখান থেকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করি ৫৬টি কবিতা। কবিতার ক্রম সাজাতে অন্তত এক শ’টি তালিকা করেছিলাম। সকালে একটা করি, তো বিকেলে আরেকটা, রাতে সব বাদ দিয়ে অন্য একটা। এভাবে অক্লান্ত পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে বইটি প্রকাশ করি আমি। এমনকি প্রেসে ছাপানোর পর মনে হয়েছে আমার ‘ঘরোয়া রাজনীতি’ কবিতাটি বাদ পড়ে গেছে, সেটি সংযুক্ত করি। ‘অনিন্দ্য প্রকাশ’ নামে একটি প্রকাশনী থেকে বের হয় কাব্যগ্রন্থটি, যার অস্তিত্ব এখন আর নেই। এই নামে এখন একটি প্রকাশনী আছে। তবে এটি সেই প্রকাশনী নয়। প্রকৃত অর্থে বলতে গেলে, আমার কাব্যগ্রন্থটির প্রতিটি পৃষ্ঠা বড় মমতায় ছোঁয়া।’ এ বইটি কি সে সময়ই এত জনপ্রিয়তা পায়?- প্রশ্ন করি আমি। হেলাল হাফিজ বলেন- বইটির প্রকাশের পরপরই দারুণ সাড়া পড়ে যায়। বইমেলাতে কাব্যগ্রন্থটির ৩টি সংস্করণ প্রকাশিত হয়। এরপর বহু সংস্করণ হয় সেটির।’ বইটিতে দেখা গেছে দ্রোহ ও প্রেমের সম্মিলন। এটা কি ইচ্ছাকৃত? আমার এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন- দ্রোহ ও প্রেম আমার জীবনে তখন সমান্তরালে চলছিল। যেগুলো দ্রোহের কবিতা, এক অর্থে সেগুলো প্রেমের কবিতাও। আর যেগুলো প্রেমের কবিতা বলে মনে করো তোমরা, ভিন্ন অর্থে সেগুলো দ্রোহের কবিতাও বলা যায়।’ তারপরেই কী অন্তরালে চলে যান আপনি? কবি জানান, সে সময় এক উন্মত্ত সময় ছিল তাঁর। বাউ-েলে জীবনে তখন চরম উচ্ছৃঙ্খলতা। আজকের এই পরিপাটি মানুষটি এখনও ভেতরে ভেতরে বড় অগোছালো। নারী ও নেশার মাদকতায় দিকভ্রান্ত হন বারবার। জীবনে আসেন বহু নারীর সান্নিধ্য। তবে কেউ শেষাবধি স্থির থাকেনি। তার ছাপ পড়ে কবিতায়। ‘এখন তুমি কোথায় আছো কেমন আছো, পত্র দিয়ো/ এক বিকেলে মেলায় কেনা খামখেয়ালী তাল পাখাটা/ খুব নিশীথে তোমার হাতে কেমন আছে, পত্র দিয়ো।/ ক্যালেন্ডারের কোন পাতাটা আমার মতো খুব ব্যথিত/ ডাগর চোখে তাকিয়ে থাকে তোমার দিকে, পত্র দিয়ো। কোন কথাটা অষ্টপ্রহর কেবল বাজে মনের কানে/ কোন স্মৃতিটা উস্কানি দেয় ভাসতে বলে প্রেমের বানে/ পত্র দিয়ো, পত্র দিয়ো।’ (প্রস্থান) অথবা লেখেন- ‘নষ্ট রাখীর কষ্ট নিয়ে অতোটা পথ একলা এলাম/ পেচন থেকে কেউ বলেনি, করুণ পথিক/ দুপুর রোদে গাছে নিচে একটু বসে জিরিয়ে নিও,/ কেউ বলেনি ভালো থেকো সুখেই থেকো/ যুগল চোখে জলের ভাষায় আসার সময় কেউ বলেনি/ মাথার কসম আবার এসো। (যাতায়াত) কষ্টের ভার সহ্য করতে না পেরে তিনি লিখছেন- ‘কষ্ট নেবে কষ্ট/ হরেক রকম কষ্ট আছে/ কষ্ট নেবে কষ্ট।/ লাল কষ্ট নীল কষ্ট কাঁচা হলুদ রঙের কষ্ট/ পাথর চাপা সবুজ ঘাসের সাদা কষ্ট,/ আলোর মাঝে কালোর কষ্ট/ ‘মাল্টি-কালার’ কষ্ট আছে/ কষ্ট নেবে কষ্ট। (ফেরীঅলা) কিংবা লিখছেন- ‘ইচ্ছে ছিল রাজা হবো/ তোমাকে সম্রাজ্ঞী করে সাম্রাজ্য বাড়াবো,/ আজ দেখি রাজ্য আছে/ রাজা আছে/ ইচ্ছে আছে/ শুধু তুমি অন্য ঘরে।’ (ইচ্ছে ছিল)

এইসব ব্যক্তিগত রাগ-অনুরাগ থেকেই ১৯৮৮ সালের শেষের দিকে একসময় লোকচক্ষুর বাইরে চলে যান তিনি। দীর্ঘ ২৫-২৬ বছর তিনি কাটান এক অজ্ঞাতবাস। কেন এমনটা করেছিলেন?-এ প্রশ্ন রাখা হলে হেলাল হাফিজ উত্তর দেন- ‘বলতে পারো এটা আমার জীবনকে নিয়ে এক ধরনের জুয়া খেলা। আমি আসলে দেখতে চেয়েছিলাম- এই যে আমি এত জনপ্রিয়, সেই আমার মৃত্যুর পর আমি বেঁচে থাকবো কিনা। অন্তরাল থেকে দেখেছি, উপভোগ করেছি আমার জনপ্রিয়তাকে। অধিকাংশ মানুষই মনে করেছেন, আমি মরে গেছি। কেউ কেউ অনুমান করেছেন, আমি বিদেশে আছি। আর যারা আমার সহকর্মী, প্রেসক্লাবের আমার প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গী- তাঁরা জেনেছেন আমার প্রকৃত অবস্থান।’ আপনার কর্মজীবন সম্পর্কে কিছু জানা হলো না। একটু বলবেন প্লিজ? তিনি বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া চলাকালেই আমি সেসময়ের জাতীয় সংবাদপত্র দৈনিক ‘পূর্বদেশ’-এ যোগ দিই। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত সেই পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে কাজ করি আমি। একসময় সরকারের তরফ থেকে পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে গেলে আমাকে তথ্য মন্ত্রণালয়ে যোগ দেয়ার আহ্বান করা হয়। কিন্তু সেই চাকরি আমি প্রত্যাখ্যান করি। ১৯৭৬ সালের শেষের দিকে দৈনিক ‘দেশ’ পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে আবার কাজ শুরু করি। সেই পত্রিকাটিও এরশাদ এসে বন্ধ করে দিল। সবশেষে দৈনিক ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় কাজ করেছি। বর্তমানে কোথাও নেই।’ সরকারী চাকরি মানুষের কাছে আরাধ্য- সেই চাকরি আপনি প্রত্যাখ্যান করলেন? আমার এ বিস্ময়সূচক প্রশ্ন শুনে তিনি মুচকি হেসে বলেন, ‘সে সময় আমি আমার জীবনের চারটি লক্ষ্য স্থির করে ফেলি। প্রথমটি প্রকৃতি প্রদত্ত, মানে অক্সিজেন; দ্বিতীয়টি শস্যদানা, মানে খাবার; তৃতীয়টি প্রেম এবং চতুর্থত কবিতা। যেহেতু অক্সিজেন ও খাদ্য ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না, তাই এ দুটিকেই প্রথমে রেখেছি। না হলে প্রেমকেই প্রথম স্থানে রাখতাম। সেই প্রেম ও কবিতার টানে আমি মনে করেছি, জীবিকার জন্য আমার খুব বেশি কিছু লাগবে না। একটা কিছু হলেই চলবে। আর সরকারী চাকরিতে কতরকম সীমাবদ্ধতা থাকে। আমার মতো এমন উড়নচ-ী মানুষের পক্ষে তেমন চাকরি করা সম্ভব ছিল না।’ জীবিকার প্রয়োজনে একসময় আপনাকে জুয়া খেলতে হয়েছিল- কথাটি কতখানি সত্য? ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে হেলাল হাফিজ বলেন, ‘জুয়া খেলে আমি প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছি। সত্যিকার অর্থে, আমার জুয়ার ভাগ্য ছিল বেশ ভালো। দুই হাতে টাকা কামিয়েছি। তাছাড়া মিরপুরের সাংবাদিক কলোনিতে আমার একটি প্লট ছিল। সেটি বিক্রি করে তার টাকা ব্যাংকে জমা রাখি। দীর্ঘদিন সেই টাকায় চলেছি, পাশাপাশি কাজ করেছি।’ কবে থেকে আবার জনসম্মুখে এলেন? উত্তরে বলেন- ২০১২ সালে বিভাস প্রকাশনী থেকে আমার একটি বই প্রকাশিত হয় ‘কবিতা ৭১’ নামে। অনেকেই মনে করেন, এটা আমার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ। বিষয়টি ভুল। এটি হচ্ছে ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ কাব্যগ্রন্থটির ইংরেজী অনুবাদ ও নতুন ১০-১২টি কবিতার সঙ্কলন মাত্র। সেই বইয়ের সুবাদে আবার আমি প্রকাশ্যে আসি। পত্রপত্রিকায় লেখা হয় আমাকে নিয়ে। টেলিভিশনে আমাকে নিয়ে অনুষ্ঠান করা হয়। আবার আমি সবার মাঝে আসি। একটা কথা তোমার সঙ্গে শেয়ার করতে চাই। আমি যখন অন্তরালে ছিলাম, তখন একাকিত্ব আমাকে এমনভাবে গ্রাস করতে থাকে যে, তিন-তিনবার আমি আত্মহননের পথ বেছে নিই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমি পারিনি। একসময় মনে হয়, এত এত মানুষের ভালোবাসা ফেলে আমি কোথায় যাবো? সামষ্টিক মানুষের ভালোবাসায় ফিরে এলাম আবার জীবনের মাঝে।’ ২০১৪ সালে কবিতার জন্য আপনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছেন। কবির উত্তর- ‘আমার যাবতীয় পুরস্কার-সম্মাননা থেকে শুরু করে মানুষের ভালোবাসা, সবই আমার ‘যে জলে আগুন জ্বলে’র জন্যই পাওয়া। ১৯৮৫ সালেই এ বইয়ের জন্যই নারায়ণগঞ্জ বৈশাখী মেলা উদ্্যাপন কমিটির ‘কবি সংবর্ধনা’ পেয়েছি, ১৯৮৬ সালে পেয়েছি যশোর সাহিত্য পরিষদ পুরস্কার। আর কবি খালেদদাদ চৌধুরী পুরস্কার পেলাম ১৯৮৭ সালে। সবশেষ বাংলা একাডেমি পুরস্কার। তবে মানুষের ভালোবাসার কাছে কোনো কিছুই তুলনীয় নয় আমার কাছে। আমার এই বইটিকে আমার আত্মজীবনীমূলক কাব্যগ্রন্থ বলা যায়।’

‘অস্ত্র সমর্পণ’ কবিতা তিনি লিখছেন- ‘মারণাস্ত্র মনে রেখো ভালোবাসা তোমার আমার।/ নয় মাস বন্ধু বলে জেনেছি তোমাকে, কেবল তোমাকে।/ বিরোধী নিধন শেষে কতোদিন অকারণে/ তাঁবুর ভেতরে ঢুকে দেখেছি তোমাকে বারবার কতোবার।/ মনে আছে, আমার জ্বালার বুক/ তোমার কঠিন বুকে লাগাতেই গর্জে উঠে তুমি/ বিস্ফোরণে প্রকম্পিত করতে আকাশ, আমাদের ভালোবাসা/ মুহূর্তেই লুফে নিত অত্যাচারী শত্রুর নিঃশ্বাস।/ ...অথচ তোমাকে আজ সেই আমি কারাগারে

সমর্পণ করে, ফিরে যাচ্ছি ঘরে/ মানুষকে ভালোবাসা ভালোবাসি বলে।/ যদি কোনোদিন আসে আবার দুর্দিন,/ যেদিন ফুরাবে প্রেম অথবা হবে না প্রেম মানুষে মানুষে/ ভেঙে সেই কালো কারাগার/ আবার প্রণয় হবে মারণাস্ত্র তোমার আমার।’

ছেষট্টি উর্ধ তরুণ এ অকৃতদার কবির ঘরসংসার একমাত্র কবিতা। আর নিজের জীবনের মতো প্রেম ও রহস্যময়তাই তাঁর কবিতার অন্তরাত্মা। তোপখানা রোডের জাতীয় প্রেসক্লাব ভবনে সারাদিন কাটে নিভৃতচারী হেলাল হাফিজের। ক্লাবের মিডিয়া সেন্টার আর লাইব্রেরিতেই অধিকাংশ সময় কাটে তাঁর। রাতের নিদ্রা ক্লাবের উল্টো দিকে কর্ণফুলী হোটেলের একচিলতে ঘরে। সেখানে বসেই তৈরি হচ্ছে কবির নতুন কবিতার বইয়ের পা-ুলিপি। ২০১৬ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হবে সেই কাব্যগ্রন্থ। অতঃপর আমি ও আমরা সেই কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশের প্রতীক্ষায় দিন গুনতে থাকি।

প্রকাশিত : ৬ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

০৬/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: