কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

হরতাল-অবরোধে চাল পরিবহনে গতি শ্লথ

প্রকাশিত : ৬ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

অর্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ ২০ দলীয় জোটের ডাকা টানা অবরোধের সঙ্গে যোগ হয়েছে হরতাল। এতে টানা ৩০ দিন ধরে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে দেশের অন্যান্য জেলার যোগাযোগ অনেকটা বন্ধই বলা চলে। ফলে যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি পণ্য পরিবহনেও নেমে এসেছে স্থবিরতা। আর এর প্রভাব পড়েছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তর চালের মোকাম কুষ্টিয়ার খাজানগরে। এখানে অন্যান্য সময়ের চেয়ে উৎপাদন ও সরবরাহ অর্ধেকে নেমে এসেছে। বাইরের জেলা থেকে ধান আসা বন্ধ থাকায় বেশিরভাগ মিল বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে বেকার হয়ে আছেন শ্রমিকরা। প্রতিদিন ক্ষতি হচ্ছে প্রায় কোটি টাকা।

মোকাম সূত্র জানায়, হরতাল-অবরোধ ছাড়া স্বাভাবিক সময়ে যেখানে সারা দিনে ১০০ ট্রাক চাল সরবরাহ করা হতো সেখানে এখন গড়ে ৪০ থেকে ৪৫ ট্রাক চাল ঢাকাসহ অন্যান্য জেলায় পাঠানো হচ্ছে। ভাড়াও বেড়েছে গাড়ি প্রতি ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা। এ অবস্থায় প্রতিদিন কোটি টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে মালিকদের।

খাজানগর চাল মোকাম এলাকায় ট্রাক ও ট্যাঙ্কলরির দু’টি অফিস রয়েছে। এর একটি আইলচারা বাজারে আর অপরটি দোস্তপাড়ায়। যে সব ট্রাকে দেশের বিভিন্ন জেলায় চাল পাঠানো হয় তার একটি হিসাব এ দু’টি অফিসে থাকে।

আইলচারা অফিসের দফতর সম্পাদক ইকরামুল হক জানান, ‘৫ জানুয়ারির আগে প্রতিদিন ৩০ ট্রাকের ওপরে চাল পাঠানো হতো ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। অবরোধ শুরু হওয়ার পর এখন প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ ট্রাক চাল বাইরের জেলায় যাচ্ছে। তারপরেও ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে।

তিনি জানান, স্বাভাবিক সময়ে কুষ্টিয়া থেকে ঢাকার ভাড়া ১৬ হাজার টাকা। এখন ট্রাক ভাড়া ৪ হাজার বেড়ে ২০ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে।

ট্রাক চালক জালাল উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘রাস্তায় ঝুঁকি নিয়ে গাড়ি চালাতে হয়। মাসের পর মাস উনারা (হরতাল-অবরোধ আহ্বানকারীরা) অবরোধ ডেকে রাখবেন আর আমরা ঘরে বসে থাকব তাতো হয় না। অবরোধের মধ্যেও চাল বোঝাই ট্রাক নিয়ে ঢাকায় যাচ্ছি। আতঙ্ক নিয়ে রাস্তায় নামতে বাধ্য হচ্ছি।’

দোস্তপাড়া ট্রাক ও ট্যাঙ্কলরি কার্যালয়ের অফিস সেক্রেটারি আইয়ুব আলী জানান, তাদের অফিসের আওতায় প্রায় ২ শতাধিক ট্রাক ড্রাইভার রয়েছে। অবরোধের আগে তাদের অফিসের মাধ্যমে প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০ ট্রাক চাল বাইরে যেত। রেজিস্ট্রার খাতা ঘেঁটে দেখা গেছে, ৫ জানুয়ারি বিএনপি জোট অবরোধ ডাকার পর কিছুটা প্রভাব পড়েছে। এখন গড়ে প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩৫ ট্রাক চাল ঢাকায় যাচ্ছে। তবে দিন দিন সরবরাহ বাড়ছে। গত রবিবার হরতালের প্রথম দিনেও ২০টি ট্রাক চাল নিয়ে ঢাকায় গেছে।

ট্রাক চালক আবুল বাশার জানান, গোয়ালন্দ ঘাট হয়ে ঢাকায় যাতায়াত করছে খাজানগরের চাল বোঝাই ট্রাকগুলো। এ সড়কটি কিছুটা নিরাপদ। আগের চেয়ে ভাড়া ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা বেশি।

হরতালে ঝুঁকি নিয়েই গাড়ি চালাতে হয় জানিয়ে তিনি বলেন, অবরোধ শুরু হওয়ার পর তিনি ৫দিন ঢাকায় গেছেন টিপ নিয়ে। তবে অনেক ড্রাইভার ও হেলপার বসে অলস সময় কাটাচ্ছে। আমিও অলস সময় কাটিয়েছি। কিন্তু বসে থাকলে তো আর পেট চলবে না তাই জীবনের ঝুঁকি নিয়েই ঢাকা গেছি।’

মেসার্স মা রাইস ভা-ারের পরিচালক আসাদুল হক জানান, টানা অবরোধে তাদের ব্যবসায় ধস নেমেছে। মিলের উৎপাদন এক প্রকার বন্ধ রয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে তাদের মিলে প্রতিদিন ৩ হাজার টন ধানের প্রয়োজন পড়ে। অবরোধের পর বাইরের জেলা থেকে ধান না আসায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। স্থানীয় বাজার থেকে যে ধান পাওয়া যাচ্ছে তা দিয়ে সপ্তাহে দুই দিন কোন রকমে চাল উৎপাদন করা হচ্ছে। অবরোধের মধ্যেও প্রতিটি চাতালই কমবেশি সচল রয়েছে।

তিনি আরও জানান, অবরোধ শুরু হওয়ার পর মাত্র ১০ ট্রাক চাল ঢাকায় পাঠিয়েছেন। তাও দুটি ট্রাকে হামলা হয়েছে। অর্ডার থাকলেও ভয়ে পাঠাতে পারছি না। উৎপাদন ব্যাহত হলেও শতাধিক কর্মচারীর বেতন দিতে হচ্ছে প্রতিদিন। এতে তার লাখ লাখ টাকা লোকসান হচ্ছে।

চালকল মালিক সমিতির কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, স্বাভাবিক সময়ে খাজানগর মোকাম থেকে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ অন্যান্য জেলায় প্রতিদিন শতাধিক ট্রাক চাল যায়। এখন তার পরিমাণ অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। বেকার অবস্থায় বসে আছে কয়েক হাজার পুরুষ ও মহিলা শ্রমিক। বাইরের জেলা থেকে ধান আসা বন্ধ থাকায় স্থানীয় বাজার থেকে ধান কিনে কোনরকমে মিলের চাকা সচল রাখা হয়েছে। খাজানগরের প্রতিটি মিলেই প্রচুর চাল মজুদ রয়েছে।

জেলা চালকল মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুল মজিদ বাবুল জানান, উচ্চহারে ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করলেও হরতাল অবরোধে পুঁজি হারানোর অবস্থা দেখা দিয়েছে। অনেক মিল এমনিতেই বন্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। অবরোধে প্রায় ৩০০ চালকলে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে। এ অবস্থার দ্রুত অবসান হওয়া দরকার বলে মনে করেন তিনি।

এদিকে অবরোধের কারণে চালের দাম কেজিতে ২-৫ টাকা বেড়েছে। চালের দাম বৃদ্ধি প্রসঙ্গে জেলা চালকল মালিক সমিতির সভাপতি জানান, মিনিকেট চাল গত এক মাস আগে ৫০ কেজির বস্তা ২ হাজার ১৫০ টাকা ছিল। এখন প্রতি বস্তায় ৫০ টাকা বেড়ে ২ হাজার ২০০ টাকা হয়েছে। আপাতত চালের দাম বাড়ার কোন সম্ভাবনা নেই। তবে অবরোধ অব্যাহত থাকলে বাজার বাড়তে পারে।

প্রকাশিত : ৬ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

০৬/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: