হালকা কুয়াশা, তাপমাত্রা ১৮.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্র ॥ মানব সভ্যতার সৎ চিত্রায়ন

প্রকাশিত : ৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • রাজীদ সিজন

দেশভাগের পর স্বাধীন ভারতের চলচ্চিত্র শিল্পে নব বিপ্লব সূচিত হতে থাকে। প্রথাগত চলচ্চিত্রের বিপরীতে জীবন ঘনিষ্ঠ, সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার উপাখ্যান রচিত হতে থাকে সেলুলয়েডে। সমগ্র ভারতে নির্মাতাগণ যখন মসলাদারযুক্ত চলচ্চিত্র নির্মাণের ফ্যান্টাসিতে বুঁদ হয়ে ছিলেন ঠিক তখন পশ্চিম বাংলা থেকেই এই প্রথাগত চলচ্চিত্রের বিপরীতে চলচ্চিত্র নির্মাণের যাত্রা শুরু হয়। এই প্যারালাল সিনেমা নির্মাণ আন্দোলনের মধ্যে যে ক’জন অগ্রদূত ছিলেন তার মধ্যে ঋত্বিক কুমার ঘটক অন্যতম। যার জন্ম ৪ নভেম্বর, ১৯২৫ সাল, ঢাকা। তিনি তাঁর চলচ্চিত্র নির্মাণ পেশায় সর্বমোট ৮টি পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনীচিত্র নির্মাণ করেন এবং ১১টি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেন। তাঁর চলচ্চিত্রে মূলত দেশভাগ, দেশত্যাগ, উত্তর উপনিবেশ আমলে স্বাধীন দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি উঠে এসেছে। দেশভাগের ফলে সমাজবদ্ধ কিছু মানুষের ছিন্নমূল হওয়ার ঘটনা বার বার উঠে এসেছে তাঁর চলচ্চিত্রে। চলচ্চিত্র ভাষাতেই উপযুক্তভাবে তিনি রচনা করেছেন একটি জনগোষ্ঠীর জীবন বাস্তবতার চালচিত্র।

তাঁর নিজস্ব কিছু বক্তব্য ছিল বলেই তিনি চলচ্চিত্র মাধ্যমকেই বেঁছে নেন। কারণ গণযোগাযোগের অন্যান্য মাধ্যমসমূহের মধ্যে চলচ্চিত্র অন্যতম। তাঁর মতে, চলচ্চিত্রও হতে পারে প্রতিবাদের মোক্ষম হাতিয়ার। চলচ্চিত্রের মাধ্যমেই তিনি তার শৈল্পিক, নান্দনিক ও আদর্শগত অবস্থানের প্রকাশ ঘটিয়েছেন। চিত্রায়িত করেছেন মানুষ ও সভ্যতার সম্মিলিত যাত্রাকে। একটি সময় ও সেই সময়ের মানুষের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক রীতি-প্রথা এবং ঘটনাবলী তুলে ধরেছেন তাঁর চলচ্চিত্রে। চলচ্চিত্রে সমাজের বাস্তবতার সঙ্গে সেই সমাজের মানুষের মনোজগতের বাস্তবতাকেও চিত্রায়নের প্রয়াস দেখিয়েছেন তিনি। কারণ মনোজগতের বাস্তবতাও সামাজিক বাস্তবতার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

দেশভাগের ফলে ঋত্বিক ঘটককে নিজের জন্মভূমি ছাড়তে হয়। দেশভাগের কারণে অপ্রত্যাশিত অভিজ্ঞতা হয়ত তাঁর চলচ্চিত্রে বিভিন্নভাবে জায়গা করে নেয়। যার দরুন তাঁর প্রতিটি চলচ্চিত্রে দেশভাগ নানা আঙ্গিক ও মাত্রায় উঠে আসে। তবে স্মৃতি ও জীবনের অভিজ্ঞতা যে কোন চলচ্চিত্র নির্মাতার জন্য অমূল্য সম্পদ। কারণ আত্মজৈবনিক অভিজ্ঞতার ছোঁয়া যদি চলচ্চিত্রের গল্পে থাকে তাহলে সেই চলচ্চিত্রের বাস্তবতার পুনর্নির্মাণ যথাযথ ও বিশ্বাসযোগ্য করে উপস্থাপন করা সম্ভব হয়। তাই ঘুরেফিরে তাঁর চলচ্চিত্রে স্থান পেয়েছে বাঙালী মধ্যবিত্ত পরিবার, তাদের দুঃখ, হতাশা, বেকারত্ব, বেঁচে থাকার সংগ্রাম, শহুরে ও গ্রাম্য মানুষের বৈপরীত্য, পূর্ব বাংলা থেকে আগত উদ্বাস্তু কিংবা শরণপ্রার্থী এবং তাদের নতুন করে ঁেবচে থাকার স্বপ্ন, আদর্শের দ্বন্দ্ব, সময়ের ফিতায় পরিবর্তনশীল সভ্যতা কিংবা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আখ্যান, সমাজব্যবস্থা ও জীবন সংগ্রাম। চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে বক্তব্য প্রদানের ক্ষেত্রে তিনি আপোষ করেননি। সীমান্তরেখায় খ-িত বাংলার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তব কাঠামোকে সততার সঙ্গে চলচ্চিত্রে তুলে ধরেছেন সত্য সন্ধানী এই নির্মাতা। চলচ্চিত্রের মাধ্যমে নিছক বিনোদনের পরিবর্তে দর্শক মনে ভাবনা উদয়ের প্রচেষ্টা ছিল তাঁর মধ্যে, যে কারণে তাঁর প্রতিটি চলচ্চিত্র চিন্তাশীল আলোচনায় পরিপূর্ণ ছিল। জাপানের ইয়াশিজিরো ওযু’র মতো ঋত্বিক ঘটকও স্বতন্ত্র চলচ্চিত্র ভাষা সৃষ্টি করেন, যে ভাষায় তিনি সংগ্রাম করেছেন মানবতার পক্ষে, আপোষহীনভাবে লড়েছেন। শিল্প ও বাস্তবতা নিয়ে তাঁর আত্মচেতনা এবং অভিজ্ঞতা বস্তুত তাঁর প্রতিটি সৃষ্টিকে মহৎ শিল্পে পরিণত করেছে। এবং মহৎ সৃষ্টিকর্ম কখনও পুরনো হয় না। এই গুণী চলচ্চিত্র নির্মাতা ৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৬ সালে কলকাতায় পরলোকগমন করেন।

প্রকাশিত : ৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

০৫/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: