আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ওবামার ভারত সফর উপমহাদেশে নতুন বলয়

প্রকাশিত : ৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
ওবামার ভারত সফর উপমহাদেশে নতুন বলয়
  • আতাউর রহমান রাইহান

ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসের প্যারেডে যোগ দিতে তিন দিনের সফরে আসেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী মিশেল ওবামা। ওবামার সফর উপলক্ষে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লীকে নিরাপত্তা চাঁদরে মুড়ে ফেলা হয়। হাজার হাজার নিরাপত্তা রক্ষী মোতায়েন করা ছাড়াও রাজধানীতে বসানো হয় ১৫,০০০ নিরাপত্তা ক্যামেরা। বিভিন্ন রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে সেখানে বালির বস্তা দিয়ে নিরাপত্তা দেয়াল গড়ে তোলা হয়। ছাব্বিশ জানুয়ারি সোমবার ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস উদযাপন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন তিনি। অনুষ্ঠানটিতে যোগ দেয়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্টও ওবামা।

হিন্দী ভাষায় ‘চলে সাথ সাথ’ (আসুন একসাথে চলি) বলার মধ্য দিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলন শেষ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। দু’জনের এ একসঙ্গে চলা সম্পর্কে মোদি বলেন, ‘বারাক এবং আমি বন্ধু। আমরা ফোনে কথা বলি, কৌতুক করি। আমাদের বন্ধুত্বই আমাদের দেশ ও জনগণকে একে অপরের কাছে নিয়ে এসেছে।’ আলোচনায় পরমাণু চুক্তির পথে বাধা দূর করে বেসামরিক পরমাণু বাণিজ্য চুক্তি সই করতে পেরেছেন দুই নেতা। পরমাণু উপকরণ সরবরাহ এবং পরমাণু দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে সরবরাহকারীদের দায়বদ্ধতার বিষয়টি নিয়ে দু’পক্ষে মতপার্থক্য দূর হয়েছে বলে জানিয়েছে এনডিটিভি। বিনিয়োগ এবং ঋণ বাবদ ভারতকে ৪শ’ কোটি ডলার দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা।

অন্যদিকে বড় ধরনের সামরিক কুচকাওয়াজের আয়োজন করার পরিকল্পনা নিয়েছে চীন। আর তাতে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হবে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনকে। চীনা কর্তৃপক্ষ গত মঙ্গলবার এ পরিকল্পনার ঘোষণা দিয়েছে।

প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে প্রধান অতিথি করে আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে একহাত দেখিয়ে দেয়ার পাশাপাশি দুই দেশের সম্পর্ককে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে ভারত। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে ওবামার তিন দিনের এ সফরে দুই দেশের সম্পর্কে সূচিত হয় নতুন এক অধ্যায়ের। কিন্তু এই অঞ্চলে ভারতের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ চীন ওবামার ওই সফর নিয়ে অনেকখানিই বিদ্রুপ করে বলে এই সফর শেষমেশ ‘লোক দখানো’ সফর হিসেবে প্রতিপন্ন হবে। দুই দেশের সম্পর্ক কেবল ‘ওপরে ওপরে’। ভারতকে সতর্ক করে দিয়ে তারা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা দেশগুলো এশিয়ার বৃহত্তম দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে বিবাদ বাধানোর জন্য উস্কানি দিচ্ছে। আর এ বিবাদ বাধলে তাতে কেবল যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থই হাসিল হবে। তারা চীন-ভারত সম্পর্ক উন্নয়নের ওপর জোর দেয়।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেছেন, চীন ও ভারত দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্র বাড়াতে ‘কার্যকর ব্যবস্থা’ নিয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তাঁর স্বাক্ষরিত চুক্তি বাস্তবায়নেও ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। গত সোমবার চীন সফররত ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় এ কথা বলেন তিনি। খবর সিনহুয়া ও টাইমস অব ইন্ডিয়ার।

গতকাল বেইজিংয়ে চীনা পার্লামেন্টে সুষমা দেখা করেন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে। এ সময় শি জিনপিং আরও বলেন, ‘চীন ও ভারতের সম্পর্কের ভবিষ্যতের ওপর আমার পূর্ণ আস্থা আছে। এ বছর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরও উন্নতির সম্ভাবনা আছে।’

চীনের প্রেসিডেন্ট মন্তব্য করেন, গত বছর তাঁর ভারত সফরের পর থেকে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘নতুন অধ্যায়ের’ সূচনা হয়েছে।

বেইজিংয়ে প্রথা ভেঙে সুষমার সঙ্গে দেখা করেন চীনের প্রেসিডেন্ট। শি জিনপিং খুব কমই বিদেশি পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সাক্ষাৎ দেন।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আসন্ন চীন সফরের প্রস্তুতি নিতে সুষমা স্বরাজ গত শনিবার চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে সে দেশে গেছেন। আগামী মে মাসে মোদি চীন সফর করবেন।

এর আগে সুষমা স্বরাজ রোববার সন্ধ্যায় চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। এ সময় চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন তাঁদের প্রধান অগ্রাধিকারের তালিকায়। দুটি বৃহৎ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে চীন ও ভারত উভয়েই একটি স্বতন্ত্র, শান্তিপূর্ণ বৈদেশিক নীতির পক্ষে। প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন চীনের প্রধান অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে।

চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দুই দেশের মধ্যে ভাল বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকা দরকার। নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ও কৌশলগত যোগাযোগ বাড়ানো এবং সীমান্ত বিরোধ নিরসন করে এ অঞ্চলে শান্তি অব্যাহত রাখার পক্ষে চীনা মন্ত্রী মত দেন।

তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ভারত সফর সেরে যাওয়ার পরেই চীন সফরে এসেছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ। তিনি জানান, মে মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও চীনে যাবেন।

সুষমা স্বরাজের চীন সফরে সীমান্ত উত্তেজনা দ্রুত কমানোর ব্যাপারেও দ্বিপাক্ষিক দায়বদ্ধতা স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর মোদি চীনের মাটিতে পা রাখার আগে এই ভাবেই জমি তৈরির কাজটা সেরে রাখছেন সুষমা।

মোদির ‘মেক ইন ইন্ডিয়ার’ স্বপ্ন সফল করতে ভারতের দুটি রাজ্যে শিল্প-পার্ক গড়ে তোলার ব্যাপারে চীন ইতিমধ্যেই বিনিয়োগ করতে রাজি হয়ে গিয়েছে। মঙ্গলবার চীন-ভারত-রাশিয়ার বৈঠক হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে অবশ্য চীন নিয়ে খুবই আক্রমণাত্মক ছিলেন মোদি। অরুণাচল প্রদেশে গিয়ে তাঁর কড়া মন্তব্য শুনে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমান খুরশিদ রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠেছিলেন। মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরও চীন-ভারত সীমান্ত উত্তেজনা বেড়েছে বই কমেনি। লাদাখে চীনা অনুপ্রবেশের অভিযোগ ওঠায় ভারতীয় সাংবাদিকদের বেজিং সফর বাতিল করে দেন তিনি। ক্ষমতায় এসে সবার আগে জাপান সফরে যান গত সেপ্টেম্বরে। তাতেও চীনের রক্তচাপ বাড়ে। অতঃপর সেপ্টেম্বরেই চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ভারত সফর।

চীন-পাকিস্তান অক্ষের সক্রিয়তা কিন্তু বেড়েছে। চীনের কর্তারা ঘন ঘন মিয়ানমারও যাচ্ছেন। ওবামা-মোদির বৈঠক নিয়েও চীনের প্রতিক্রিয়া খুবই তীব্র। বৃহৎ শক্তির মধ্যে মোদি প্রথম পর্বে জাপান আর আমেরিকা এই দুটি দেশের সঙ্গে জটিলতার নিরসন করেছেন। মোদির সঙ্গে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের সম্পর্ক বরাবরই মধুর। মোদি নিজেই আনন্দবাজার পত্রিকাকে বলেছেন, সিঙ্গাপুরের সাবেক প্রধানমন্ত্রীই তাঁর সঙ্গে শিনজোর আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন। যখন মোদি মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, গুজরাতেও এসেছেন শিনজো। ফলে জাপানের সঙ্গে সম্পর্ক সহজ করাটা মোদির পক্ষে খুব কঠিন হয়নি।

মোদিকে যখন আমেরিকা ভিসা দেবে না বলে আগাম হুমকি দিয়েছিল, তখন চীনই তাঁকে বেজিংয়ে নিয়ে যায় সসম্মানে।

ভারত-চীন সম্পর্কে জটিলতা আছে, নিরাপত্তার অভাব আছে। কিন্তু কূটনীতি কখনওই সম্পর্ককে এমন চরম বিন্দুতে নিয়ে যেতে চায় না, যেখানে ফেরার রাস্তা থাকবে না। যেভাবে একদা চীনা বরফ গলিয়েছিলেন রাজীব গান্ধী, যে যুক্তিতে চীন সফর করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন, সেই মনোভাব নিয়েই চীন যাবেন মোদি। কূটনীতিকরা একে বলে থাকেন, ‘এনগেজমেন্ট’। কারণ, দু’দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিশেষ জরুরী। জরুরী দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। মোদি সে কথা সম্যক জানেন।

মার্কিন-ভারত পরমাণু চুক্তিতে অনেক বিষয়েই যুক্তরাষ্ট্র প্রভাব বিস্তার করতে পারবে। ওই চুক্তি নিয়ে পাকিস্তানের উদ্বেগের প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র জেন সাকি শনিবার ওয়াশিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘এ ধরনের চুক্তিতে অনেক ধরনের শর্তের বিষয় থাকে। অবশ্যই আমরা চুক্তির সময় অনেক নিয়ামক যুক্ত করে থাকি। এ বিষয়ে আর কিছু বলার নেই।’

যুক্তরাষ্ট্রে গত সপ্তাহে ভারতের সঙ্গে পরমাণু সহযোগিতা বিষয়ে একটি ‘যুগান্তকারী সমঝোতায়’ পৌঁছায়। এর ফলে মার্কিন কোম্পানিগুলো ভারতে পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণ করতে পারবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার নয়াদিল্লী­সফরের সময় ওই চুক্তির ঘোষণা দেয়া হয়।

পাকিস্তান সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, এ চুক্তিটি এরই মধ্যে নাজুক আঞ্চলিক কৌশলগত স্থিতিশীলতাকে আবারও সঙ্কটে ফেলবে। পাকিস্তান এ চুক্তিকে ‘পরমাণু সরবরাহকারী গ্রুপের (এনএসজি) নীতিমালা থেকে একটি দেশের সুনির্দিষ্ট দায়মুক্তি’ বলে বর্ণনা করেছে। দেশটির মূল্যায়ন এ ধরনের চুক্তি এনএসজির নীতিমালাকে দুর্বল করবে।

বেশ কয়েকটি দেশের সমন্বয়ে গঠিত এনএসজি পরমাণু উপাদান রফতানি ও পুনঃহস্তান্তর নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে এর বিস্তার রোধ নিয়ে কাজ করে থাকে।

যুক্তরাষ্ট্র-ভারত চুক্তির ব্যাপারে সমালোচকরা বলছেন, পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিতে স্বাক্ষর না করেই কোন দেশকে জ্বালানি এবং প্রযুক্তি দেয়ার সুযোগ সৃষ্টি করার মাধ্যমে এ চুক্তি বিপজ্জনক নজির স্থাপন করেছে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর এই সমালোচনাকে নাকচ করে দিয়েছে। মুখপাত্র জেন সাকি বলেন, ‘এই চুক্তি হলো মার্কিন-ভারত বেসামরিক পরমাণু সহযোগিতা চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার বিষয়ে একটি বোঝাপড়া।’ পাকিস্তানের উদ্বেগের ব্যাপারে মন্তব্য জানতে চাইলে জেন সাকি বলেন, ‘আপনাদের কাছে প্রকাশ্যে বলার মতো আর বিস্তারিত কিছু আমার কাছে নেই।...যুক্তরাষ্ট্র উভয় দেশকেই নিশ্চয়তা দিয়েছে যে দুইয়ের সঙ্গেই এর দৃঢ় সম্পর্ক রয়েছে।’

জেন সাকি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যেমন বেশ কিছু ইস্যুতে পাকিস্তানের সঙ্গে কাজ করছে, তেমনি বেশ কিছু ইস্যুতে ভারতের সঙ্গেও কাজ করছে। পরমাণু চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত কিছুদিন ধরেই কাজ করছিল এবং গত সপ্তাহে এটি চূড়ান্ত করা হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের সঙ্গে তার কৌশলগত সম্পর্কের বিষয়ে দৃঢ় প্রতিশ্রুতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে। তিনি বলেন, পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াই করছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে বেসামরিক পরমাণু চুক্তি করল।

প্রকাশিত : ৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

০৪/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: