মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

র‌্যাংকিংয়ে দ্রুত উন্নতি চাই

প্রকাশিত : ৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • সাবেক তারকা আমিনুল ইসলাম বুলবুল

নানা প্রতিবন্ধকতা ও সীমাবদ্ধতার মাঝেও খেলোয়াড় হিসেবে যারা বাংলাদেশের ক্রিকেটকে বিশ্ব দরবারে পৌঁছে দিয়েছেন তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। চাইলে নানা বিশেষণে বিষেশিত করা যায় তাকে। তার নামটি উচ্চারিত হলেই সবার আগে সামনে চলে আসে বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টে তার ইতিহাস গড়া সেঞ্চুরিটি। তার নেতৃত্বেই প্রথম বিশ্বকাপে খেলেছিল বাংলাদেশ। বলা হচ্ছিল আমিনুল ইসলাম বুলবুলের কথা। ক্রিকেট ছাড়ার পর যিনি কোচিং পেশায় নিয়োজিত করেছেন নিজেকে। খেলোয়াড়ি জীবনের মতো এখানেও বাংলাদেশের পতাকাকে বিশ্ব দরবারে সমুজ্জ্বল করে চলেছেন তিনি। কাজ করছেন এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের ক্রিকেট ডেভেলপমেন্ট অফিসার হিসেবে। সম্প্রতি ছুটি কাটাতে দেশে এসেছিলেন বাংলাদেশের সাবেক এ অধিনায়ক। মুখোমুখি হয়েছিলেন জনকণ্ঠের। বললেন নিজের বর্তমান জীবন নিয়ে। বাংলাদেশের ক্রিকেট প্রসঙ্গ আসতেই ওঠে এলো গুরুত্বপূর্ণ সব বিষয়। সাক্ষাতকার Ñ তোফায়েল আহমেদ

জনকণ্ঠ : ক্রিকেট ছাড়ার পর কোচিংকেই পেশা হিসেবে নিয়েছেন। কেমন উপভোগ করছেন এই জীবন?

আমিনুল ইসলাম বুলবুল : নিজেকে কোচিংয়ে জড়ানোর জন্য যে সব কোর্স করা দরকার যেমন- লেভেল ওয়ান, লেভেল টু, লেভেল থ্রি, তার সবই আমি করেছি। পাশাপাশি ছয় মাসের একটা স্পেশাল কোর্স করেছি যেটা প্রিন্সিপাল কোর্স আফ কোচিং। সব কিছু করে এখন কোচিং পেশাটাকে শুধু উপভোগই করছি না; বরং এর বিস্তৃতি ঘটাচ্ছি। নতুন কোচ তৈরি করছি। সব কিছু মিলিয়ে আল্লার রহমতে উপভোগ করছি।

জনকণ্ঠ : দুই জীবনের মধ্যে কোনটাকে বেশি উপভোগ্য মনে হয়?

আমিনুল : অবশ্যই খেলোয়াড়ি জীবনটাই বেশি উপভোগ্য ছিল। তবে এখনকার যে জীবন সেটার সঙ্গে খেলোয়াড়ি জীবনের সম্পৃক্ততা অনেক বেশি। এবং সেই অভিজ্ঞতা এখন কাজে লাগাচ্ছি। সবকিছু মিলিয়ে খেলোয়াড়ি জীবনও উপভোগ্য ছিল। বর্তমান জীবনটাও অনেক উপভোগ করছি।

জনকণ্ঠ : এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের হয়ে ক্রিকেটে এ অঞ্চলের পিছিয়ে থাকা দলগুলোকে নিয়ে কাজ করছেন আপনি। অভিজ্ঞতার কথা যদি বলতেন।

আমিনুল : এখানে আট বছর ধরে কাজ করছি আমি। আমার কাজের মূল ক্ষেত্র হচ্ছে চীন। ওখানকার ওভার অল ক্রিকেট উন্নয়ন নিয়ে কাজ করছি আমি। চীনের সঙ্গে তাইওয়ান, হংকং, সিঙ্গাপুর এবং কুয়েতসহ মোট পাঁচটা দেশের ক্রিকেটের যাবতীয় উন্নয়নের কাজ করছি গত আট বছর ধরে। অভিজ্ঞতার কথা বললে বলব কিছু কিছু দেশ আছে যারা একেবারেই নতুন। যেমন চাইনা, তাইওয়ান, ব্রুনাই, মিয়ানমার। আবার মিডল র‌্যাঙ্কে আছে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ার মতো দেশ। একেবারে টপ পর্যায়ে আছে ইউএই, হংকং, আফগানিস্তান যারা ইতিমধ্যে ওয়ানডে স্বীকৃতি পেয়েছে। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রকমের কাজ হয়ে থাকে। কিছু কিছু দেশে একেবারে বেসিক ক্রিকেট শেখানো হচ্ছে। আবার কিছু কিছু দেশে হায়ার লেভেলের ক্রিকেট শেখানো হচ্ছে। সব কিছু মিলিয়ে একেক দেশে একেক ধরনের কাজ আমরা করছি।

জনকণ্ঠ : বাংলাদেশর ক্রিকেটকে তারা কিভাবে দেখে?

আমিনুল : বাংলাদেশ একটি টেস্ট প্লেয়িং কান্ট্রি। বাংলাদেশের অন্য রকম একটা সুনাম সারা পৃথিবীতে আছে। সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে আমরা অনেক বেশি করে প্রচার করি। বাংলাদেশের ক্রিকেটের অনেক গল্প তাদের বলি। বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রতি প্রত্যেকটা দেশের অনেক সম্মান আছে এবং তারা বাংলাদেশের ক্রিকেটকে শ্রদ্ধার পাশাপাশি অনুসরণও করে।

জনকণ্ঠ : আমিনুল ইসলাম বুলবুল বাংলাদেশের ক্রিকেটে অনেক বড় একটি নাম। সে তুলনায় কোচ আমিনুল কেমন?

আমিনুল : এটা তো আমি বলতে পারব না ভাই...। তবে এখনও পর্যন্ত যে সব দেশে কোচিং করাতে গিয়েছি সেই দেশগুলোর সবাই আমাকে খুব পছন্দ করে। কোচ এবং খেলোয়াড়রাও আমাকে অনেক পছন্দ করে এবং ভালবাসে। এটাই আমার অনেক বড় সাফল্য। তবে দুঃখের বিষয় কখনই বাংলাদেশের ক্রিকেটে ব্যবহৃত হয়নি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের মাধ্যমে।

জনকণ্ঠ : ক্রিকেট খেলে দেশকে যা দেয়ার তার সবই দিয়েছেন আপনি। কোচ হিসেবেও নিশ্চয়ই দর্শকদের কাছে নিজেকে স্মরণীয় করতে চাইবেন?

আমিনুল : একটা মানুষের জীবনে খুব বেশি চাওয়ার থাকে না। আমি আল্লাহর কাছে শুকরিয়া করি কারণ চাওয়ার থেকে অনেক বেশি পেয়েছি আমি। জাতীয় দলে খেলেছি, অধিনায়কত্ব করেছি, টেস্ট ম্যাচ খেলেছি। সে জন্য নিজেকে ভাগ্যমান মনে করি সবসময়। এবং আমি মনে করি দেশকে অনেক কিছু দেয়ার আছে আমার। নেয়ার কিছু নেই। আমার ইচ্ছা; যে অভিজ্ঞতাগুলো এ পর্যন্ত অর্জন করেছি আমি সেগুলো নতুনদের সঙ্গে শেয়ার করে দেশের ক্রিকেট উন্নয়নে ভূমিকা রাখা। এটাই আমার আপাতত লক্ষ্য।

জনকণ্ঠ : সে ক্ষেত্রে দেশের ক্রিকেট নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কি?

আমিনুল : আমার ব্যক্তিগত পরিকল্পনা দিয়ে আসলে কিছু হবে না। তবে আমি আশা করব দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ক্রিকেটারকে আমরা ছড়িয়ে দিতে পারব। খেলতে আগ্রহী সকলকে খেলার ব্যবস্থা করে দিতে পারব। এসব কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখার এবং সুযোগ পেলে জাতীয় দলের সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছাও আমার আছে। কিন্তু আমার ইচ্ছাই তো আর সব কিছু না। হয়ত সেই সুযোগ একদিন আসবে। সেটার দিকেই তাকিয়ে আছি।

জনকণ্ঠ : জাতীয় দলে কোচ প্রসঙ্গ এলেই আপনার নামটি সামনে চলে আসে। এবারও তো অনেকেই চাচ্ছিল...

জনকণ্ঠ : নতুন কোচ নিয়োগের সময় দেশের সাংবাদিক থেকে শুরু করে ক্রিকেট অনুরাগীদের অনেকেই আমাকে অফার করেছিল। শুধুমাত্র যে পাঁচ জনকে কোচ নিয়োগের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল তারা ছাড়া। দুর্ভাগ্যবসত তারা আমার সঙ্গে এ প্রসঙ্গে কোন প্রকার কথা বলেনি। এর বাইরে আমি কিছু বলতে চাই না।

জনকণ্ঠ : অনেকে দেশীয় কোচদের জাতীয় দলের জন্য অযোগ্য মনে করেন। এটাই হয়ত কারণ হবে...

আমিনুল : যারা অযোগ্য মনে করে তাদের যোগ্যতা নিয়ে আমার প্রশ্ন আছে। কারণ এ পর্যন্ত যে কাজগুলো তারা করে এসেছে তার সবগুলোতেই কিন্তু তারা ফেল করেছে। লক্ষ্য করে দেখবেন কোন কোচই তার পুরোপুরি মেয়াদ শেষ করে যেতে পারছে না। তারা আসার কিছুদিনের মধ্যেই বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ করে থাকে। তাই যারা এই যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন করে তাদের যোগ্যতা নিয়ে আমার প্রশ্ন আছে।

জনকণ্ঠ : দেশের ক্রিকেট প্রসঙ্গে আসি। ৯৭ সালে ওয়ানডে এবং ২০০০ সালে টেস্ট মর্যাদা পাবার পর বাংলাদেশের ক্রিকেট আজ যে যায়গাটায় দাঁড়িয়ে তা নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কি?

আমিনুল : ওয়ানডে এবং টেস্ট মর্যাদা প্রাপ্তির পর বাংলাদেশের ক্রিকেট এগোয়নি একথা কিন্তু বলা যাবে না। বাংলাদেশের ক্রিকেট অবশ্যই এগিয়েছে। তবে সঙ্গে সঙ্গে অন্য দেশগুলো এত বেশি এগিয়ে গেছে যার জন্য বাংলাদেশের ক্রিকেটের এগিয়ে যাওয়া খুব একটা চোখে পড়ে না। অবকাঠামোর দিক থেকে যদি বলি তাহলে দেখবেন বাংলাদেশে অনেক নতুন নতুন স্টেডিয়াম হয়েছে। তবে আমরা কিন্তু খুব বেশি খেলার মাঠ তৈরি করতে পারিনি। খেলার মাঠ বলতে আমি সবার জন্য উন্মুক্ত পিচ এবং উন্মুক্ত মাঠকে বুঝাচ্ছি। আমরা স্টেডিয়াম বানাতে পেরেছি কিন্তু বড় বড় মাঠ বানাতে পারিনি। দু’দুটি বিশ্বকাপ হয়ে গেল দেশে অথচ সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আমরা নিজস্ব কোন মাঠ তৈরি করতে পারিনি। পারফরম্যান্সের দিকে তাকালে দেখবেন টেস্ট ম্যাচে আমরা সেই জিম্বাবুয়ের সঙ্গেই ওঠা নামা করছি। ওয়ানডেতে কখনও কখনও ভাল করছি কিন্তু ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারছি না। পারফরম্যান্স বারবার ওঠানামা করছে। যার কারণ হলো আমাদের যে স্ট্যাটেজিগুলো থাকে সেগুলোর সঠিক বাস্তবায়ন কখনও হয় না। বোর্ড চেঞ্জ হলেই পরিকল্পনাও চেঞ্জ হয়ে যায়। তখন দেখা যায় আবার নতুন নতুন পরিকল্পনা নিয়ে আমরা আগাই। আমাদের স্পেসেফিক কোন লক্ষ্য থাকে না। সব কিছু মিলিয়ে টেস্ট মর্যাদা প্রাপ্তির ১৫ বছর পর যে যায়গাটায় আমাদের যাওয়া উচিত ছিল, মনে হয় সেই যায়গাটায় আমরা যেতে পারিনি। তবে এটা ঠিক এই সময়ে মাশরাফি, সাকিব, তামিম, মুশফিক কিংবা নাসিরের মতো বেশ কিছু ভাল প্লেয়ার আমরা পেয়েছি। এটা আমাদের জন্য অনেক বড় প্রাপ্তি।

জনকণ্ঠ : দশ বছর পর কোথায় দেখতে চান বাংলাদেশ কে?

আমিনুল : সত্যি কথা বলতে বিশ্ব ক্রিকেটে এখন খুবই কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি। কারণ ক্রিকেটের বিশ্বায়ন বলতে যে জিনিসটা ছিল সেই যায়গা থেকে ক্রিকেট এখন অনেকটাই সরে এসেছে। তাই সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বলব বাংলাদেশের জন্য খুব কঠিন সময় আসছে এখন। এবং এই কঠিন সময়ের জন্য বাংলাদেশকে অবশ্যই প্রস্তুত থাকতে হবে। যে কোনভাবে র‌্যাংকিংয়ে আট নম্বরে আমাদের ওঠে আসতে হবে। অন্যথায় পরের বিশ্বকাপে খেলতে হলে আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্সশিপের মতো একটা টুর্নামেন্ট খেলে তার পর মূল পর্বে যেতে হবে। তাই এখনও সময় আছে, আট নম্বরে কিভাবে পৌঁছানো যায় সে ব্যাপারে কাজ করার।

জনকণ্ঠ : এবারের বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সম্ভাবনা কেমন দেখছেন?

আমিনুল : অবশ্যই ভাল সম্ভাবনা আছে এবার। কারণ দল হিসেবে বাংলাদেশ এখন খুবই পরিণীত একটি দল। ভিন্ন কন্ডিশনে কিছু প্রতিবন্ধকতা হয়ত থাকবে। তবে পার্টিকুলার ডেতে যদি আমরা ভাল করি তবে অবশ্যই আমরা দ্বিতীয় রাউন্ডে যাব। সেক্ষেত্রে স্কটল্যান্ড, আফগানিস্তানকে হারানোর পাশাপাশি শ্রীলঙ্কা, ইংল্যান্ড বা নিউজিল্যান্ডের মধ্যে কাউকে হারাতে হবে। এবং সেটির ভাল সম্ভাবনাই আছে। তবে সেজন্য অবশ্যই আমাদের ভাল ক্রিকেট খেলতে হবে এবং সামর্থ্য উজাড় করে দিতে হবে।

জনকণ্ঠ : বিশ্বকাপে টাইগারদের কাছে আপনার ব্যক্তিগত চাওয়া কি?

আমিনুল : ব্যক্তিগত চাওয়া অবশ্যই স্কটল্যান্ড এবং আফগানিস্তানের সঙ্গে ম্যাচ দুটি জেতা। এবং অন্যান্য ম্যাচেও ভাল ক্রিকেট উপহার দিয়ে বাংলাদেশকে দ্বিতীয় রাউন্ডে নিয়ে যাওয়া।

প্রকাশিত : ৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

০৪/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: