মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

‘বাচ্চাকে মারছ কেন? পারলে আমাকে মেরে দেখাও!’

প্রকাশিত : ৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • বলেছিলেন পাকিস্তানের আবদুল কাদির
  • মোঃ মামুন রশীদ

দক্ষতা থাকলে বয়স কোন বাধা নয়। একজন কম বয়সী ব্যাটসম্যান অভিজ্ঞ এবং বেশি বয়সী কোন বোলারকে বেদম প্রহারে বার বার বল সীমানা ছাড়া করতেই পারেন। আবার তরুণ একজন বোলারও পারেন একজন অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যানকে তাঁর বোলিং দক্ষতায় বিপর্যস্ত করতে। ক্রিকেট বয়স এবং শারীরিক সক্ষমতার চাইতেও মূলত মানসিক দৃঢ়তা ও দক্ষতার খেলা। পাকিস্তান সফরে মাত্র ১৬ বছর বয়সে ক্রিকেট ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন লিটল মাস্টার শচীন টেন্ডুলকর। তবে অভিষেক টেস্টেই তাঁকে শুনতে হয়েছিল বিরূপ কিছু মন্তব্য। পাকিস্তানী দর্শকরা তাঁকে উদ্দেশ্য করে কথা ছুড়ে দিয়েছিলেন, ‘যাও বাচ্চাদের সঙ্গে খেলো।’ পুরো সফরেই যখন কিছুটা ব্যাটিংয়ের সময় সমস্যায় পড়েছেন শুনতে হয়েছে সেসব কটূক্তি। তবে নিজের সামর্থ্য ও যোগ্যতার প্রমাণ ঠিকই দিয়েছিলেন কিশোর শচীন। ওয়াসিম আকরাম, ইমরান খান, ওয়াকার ইউনুস, মুশতাক আহমেদ আর আবদুল কাদিরদের মতো বিশ্ব কাঁপানো ও আতঙ্ক ছড়ানো বোলারদের বিরুদ্ধে ব্যাট চালিয়ে মেলে ধরেছিলেন নিজেকে। দ্বিতীয় টেস্টেই পেয়ে গিয়েছিলেন ক্যারিয়ারের প্রথম অর্ধশতক। তবে টেস্ট সিরিজের পর পাঁচ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজেও ওই মন্তব্যগুলো উপযুক্ত জবাব দেয়া যায়নি। সেবার বৃষ্টির দাপটে দুটি ওয়ানডেই পরিত্যক্ত হওয়ায় প্রদর্শনী ম্যাচ খেলে উভয় দল। সেই ম্যাচে ব্যাট হাতে উপযুক্ত জবাবই দিয়েছিলেন শচীন। ভয়ঙ্কর লেগস্পিনার মুশতাকের ওপর শচীনের বিধ্বংসী মনোভাব দেখে বলেছিলেন, ‘বাচ্চাকে এত মারছ কেন? যদি ক্ষমতা থাকে তো আমাকে মেরে দেখাও।’ চমৎকার এ ঘটনাটি নিজের আত্মজীবনী ‘প্লেয়িং ইট মাই ওয়ে’-তে ব্যাখ্যা করেছেন শচীন।

কয়েকদিন আগেই টেস্ট সিরিজ শেষ হয়েছে। তবে শিয়ালকোটে সিরিজের চতুর্থ ও শেষ টেস্টটা কিছু যন্ত্রণা নিয়েই শেষ করেছেন শচীন। অস্বস্তিতে ছিলেন তাই বেশ। যদিও সেই ম্যাচের দ্বিতীয় ইনিংসেই ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় অর্ধশতক হাঁকিয়ে উত্তরটা দিয়ে দিয়েছিলেন ভালভাবেই, কিন্তু পুরো সিরিজে ‘যাও বাচ্চাদের সঙ্গে খেলো’ এমন মন্তব্য এবং পাক দর্শকদের বিদ্রƒপ কোনভাবেই যেন ভুলতে পারছিলেন না শচীন। শিয়ালকোটেও প্রথম ইনিংসে ব্যাটিংয়ের সময় একই ধরনের কথা শুনেছিলেন। ব্যাট করতে নামা শচীন ওয়াকারের একটি বাউন্সারে নাকে আঘাত পেয়েছিলেন। সে সময় অধিনায়ক কৃষ্ণমাচারী শ্রীকান্ত আর শচীনের হেলমেটের সামনের অংশে ইস্পাতের গ্রিল ছিল না। আর সেটাই যেন কাল হলো। ওয়াকারের একটি বলে হুট করেই বাড়তি বাউন্স আসার পর সেটা বুঝতে না পেরে আঘাত পান শচীন। নাক দিয়ে রক্ত ঝরতে শুরু করে। তখন পাক দর্শকরা প্ল্যাকার্ডে লিখে প্রদর্শন করছিলেন, ‘ওহে পুঁচকে, ঘরে ফিরে যাও এবং কিছু দুধ খেয়ে আসো!’। পাক ব্যাটসম্যান জাভেদ মিয়াঁদাদও এসে বলেন, ‘তোমার তো এখনই হাসপাতালে যাওয়া উচিত, তোমার নাক ভেঙ্গে গেছে।’ তবে কোনটাই করেননি শচীন। শেষ পর্যন্ত ৩৫ রান করেন প্রথম ইনিংসে। দ্বিতীয় ইনিংসে সবার কথার জবাব দিয়ে ৫৭ রান করেন।

টেস্ট সিরিজ শেষ হয়ে গেলেও শচীনের মনের মধ্যে এই কথাগুলো যেন ঘুরপাক খাচ্ছিল। মনের কোণে একটা আক্ষেপ ছিল। ওয়ানডে সিরিজে অভিষেক হবে কিনা সেটা নিশ্চিত ছিলনা। প্রথম ওয়ানডে বৃষ্টিতে ভেসে যাওয়ার পর গুজরানওয়ালায় দ্বিতীয় ওয়ানডেতে অভিষেক হওয় শচীনের। সে ম্যাচেও জবাব দেয়া হলো না। ওয়াকারের বলে আউট হয়ে যান ০ রানে। তৃতীয় ওয়ানডেও বৃষ্টিতে পরত্যিক্ত এবং চতুর্থ ওয়ানডেতে সুযোগ পাননি শচীন। প্রথম ওয়ানডে পরিত্যক্ত হওয়ায় পরে উভয় দল ২০ ওভারের একটি প্রদর্শনী ম্যাচ খেলতে সম্মত হয়। শচীন তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন- ‘এটাই সম্ভবত ক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম টি২০ ম্যাচ।’ সেই ম্যাচে শচীন যেন কিছুটা প্রশান্তি পেলেন। পেশোয়ারে অনুষ্ঠিত সে ম্যাচে পাকরা প্রথম ব্যাট করে ১৫৭ রান তোলে। শুরুতেই তিন উইকেট হারিয়ে বিপদে পড়ে ভারতীয় দল। এরপর শ্রীকান্তের সঙ্গে জুটি বেঁধে ওভারপ্রতি ১১ রান করে তোলার মতো কঠিন সময়ে বিধ্বংসী রূপ ধারণ করেন শচীন। তখন পাক ওয়ানডে দলে যাওয়া আসার মধ্যে ছিলেন মুশতাক। ১৯ বছর বয়সী তরুণ মুশতাকের এক ওভার দুটি বিশাল ছক্কা হাঁকান শচীন। এর মধ্যে একটি ড্রেসিং রুমের জানালায় গিয়ে লাগার পর তা ভেঙ্গে যায়। দর্শকরা আশ্চর্য হয়েছিলেন কিশোর শচীনের মাঠ পার করে এতদূর বল মারা দেখে। তখন কিংবদন্তি কাদির শচীনের কাছে এসে বলেন, ‘বাচ্চাকে এত মারছো কেন? যদি ক্ষমতা থাকে তো আমাকে মেরে দেখাও।’ তবে শচীন কাদিরের কথায় বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি এবং রেগেও যাননি। ভদ্রতার সঙ্গেই উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আপনি অনেক বড় একজন বোলার। আমি নিশ্চিত আপনি আমাকে এভাবে মারার কোন সুযোগই দেবেন না।’

শেষ দুই ওভারে ভারতের প্রয়োজন ছিল ৪২ রানের। শচীন মনস্থির করেছিলেন বোলার যেই হোক, যদি কায়দামতো পেয়ে যান তাহলে সেটাকে যত জোরে সম্ভব মারবেন। কিন্তু তখনই বোলিংয়ে আসলেন কাদির। কিছুক্ষণ আগেই যার সঙ্গে কিছু কথা বিনিময় হয়েছে শচীনের। আন্তর্জাতিক কোন ম্যাচ হলে স্মরণীয় একটি ওভার হয়ে লিপিবদ্ধ থাকতো রেকর্ডের পাতায়। কারণ ওই ওভারে শচীন তুলে নিয়েছিলেন ২৮ রান! প্রথম বলেই ছক্কা হাঁকিয়ে দেন শচীন। সেটাও ছিল আবার লং অন অঞ্চল দিয়ে। তৃতীয় বলে চার। চতুর্থ বলে আবার ছক্কা, সেটিও কাদিরের মাথার ওপর দিয়ে। এরপর সতর্ক হয়ে যান কাদির। স্টাম্প থেকে একটু দূরে গিয়ে বোলিং করেন পঞ্চমটা। লক্ষ্য ছিল অফস্পিন দিয়ে শচীনকে পরাস্ত করে স্টাম্পিংয়ের ফাঁদে ফেলবেন। কিন্তু আগেভাগেই সেটা বুঝতে পেরে লং অফের ওপর দিয়ে উড়িয়ে মেরে কাদিরকে আরেকবার বিমূঢ় করে দেন। ওভারের তৃতীয় ছক্কা! ষষ্ঠ বলটা স্টাম্প থেকে আরও দূরে গিয়ে ছুড়লেন কাদির। কিন্তু শচীন তখন পেয়ে বসেছেন তাঁকে। দেয়ালে ঠেকলে পিঠ লড়াই জীবন। আর হারানোর কিছু ছিল না। তাই ষষ্ঠ বলও লং অফ দিয়ে উড়েই গেল! ওভারের চতুর্থ ছক্কা হাঁকালেন শচীন। ওভারটি শুরুর আগে পাকিস্তানী দর্শকরা এবং ক্রিকেটাররা প্রায় নিশ্চিত ছিলেন জয়ের ব্যাপারে। কিন্তু কাদিরের ওভার থেকে ২৮ রান আসার পর মাঠে ব্যাপক শোরগোল ও চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু হয়। হোক না প্রদর্শনী ম্যাচ। কিন্তু দুই চিরশত্রু পাকিস্তান্-ভারতের ম্যাচ বলে কথা। সে কারণে জয়-পরাজয় অনেক বড় একটি বিষয়। আসল ম্যাচের উত্তেজনা, উত্তাপ ও স্নায়ুচাপ এসে ভর করে শেষ ওভারে। ওয়াসিমের শেষ ওভারে প্রয়োজন আরও ১৪ রানের। শেষ পর্যন্ত অবশ্য তিন রানে হেরে যায় ভারতীয় দল। ১৮ বলে ৫৩ রানের বিস্ফোরক ইনিংস খেলেছিলেন শচীন। সবচেয়ে মানসিক প্রশান্তিদায়ক কথাটা এ ম্যাচ শেষেই শুনেছেন শচীন। ক্যারিয়ারের শুরুতে যা শোনাটা ছিল অমূল্য বাণী। ভদ্রলোকের খেলা ক্রিকেট। আর আরও ভদ্র কাদির কাছে এসে বলেছিলেন, ‘দুর্দান্ত ব্যাটিং করেছো!’

তথ্যসূত্র- শচীন টেন্ডুলকরের আত্মজীবনী ‘প্লেয়িং ইট মাই ওয়ে’

প্রকাশিত : ৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

০৪/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: