আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

চিকিৎসক, পরোপকারী শিক্ষা বিস্তার এখন একমাত্র ব্রত

প্রকাশিত : ৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
চিকিৎসক, পরোপকারী শিক্ষা বিস্তার এখন একমাত্র ব্রত
  • নিভৃত পল্লীতে আলোর দিশারী বাবুল সরদার

মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে প্রত্যন্ত গ্রামে শিক্ষার আলো জ্বেলে যাচ্ছেন বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার বড়গুনি গ্রামের সাইফুল রহমান ও তার স্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিন। এ দম্পতির দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় এলাকায় গড়ে উঠেছে পাঠশালা। পেশায় তারা দুজনই পল্লী চিকিৎসক হলেও অজ পাড়াগাঁয়ের দরিদ্রদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারই এখন তাদের জীবনের একমাত্র ব্রত।

তাদের প্রচেষ্টার ফসল হিসাবে ছিন্নমূল অসহায় শিশুরা এখন প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে। অবহেলিত এই শিশুদের আদর্শ মানুষ হিসাবে গড়ে তোলাই এখন সাইফুল-সাবিনা দম্পতির একমাত্র লক্ষ্য। আনুষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণের পাশাপাশি শিশুদের মধ্যে যেন দেশপ্রেম, কর্মনিষ্ঠা, সততা ও পরোপকারের মতো গুণগুলো অর্জন করে সেদিকেও তারা সতর্ক দৃষ্টি রেখেছেন।

সাইফুল-সাবিনা দম্পতি চিতলমারী উপজেলার বড়গুনি গ্রামের আব্দুল মকিতের বাড়িতে এক যুগ ভাড়া ছিলেন। পেশায় তারা দু’জনই পল্লী চিকিৎসক। তাদের গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের গোবরা ইউনিয়নের ভাটিয়াপাড়া গ্রামে। চিকিৎসা সেবা দিতে এসে এলাকার মানুষের ভালবাসা আটকে দেয় এই যুগলকে। ফলে নিজেদের গ্রামে আর ফিরে যেতে পারেননি। তাঁরা দেখতে পান সেখানে গরিব শিশুদের পড়ালেখার ভাল কোন ব্যবস্থা নেই। সাইফুল রহমান ২০১০ সালে আব্দুল মকিতের ভাড়া বাড়িতে থেকে মাত্র ৪ জন শিশুকে নিয়ে চালু করলেন ‘বড়গুনি আদর্শ শিশু বিদ্যানিকেতন’ নামে এক পাঠশালা। এরপর বাড়তে থাকে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা। তবে গত চার বছরের মধ্যে কয়েকবার তাদের ভাড়াবাসা বদলাতে হয়। এতে বাধাগ্রস্ত হয় শিশুদের শিক্ষাগ্রহণ। বর্তমানে গ্রামের আমুর হোসেন মিঠু নামে এক ব্যক্তি সাইফুল রহমানকে শিশুদের পড়ানোর জন্য অস্থায়ীভাবে নিজের বাড়িতে জায়গা দিয়েছেন। আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার যুগেও বিলুপ্তপ্রায় ঐতিহ্যবাহী পাঠশালা শিক্ষা ব্যবস্থা এখন এখানে চালু হয়েছে। এতে এখন শিশু শ্রেণী থেকে চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত মোট মোট ১২০ জন ছেলেমেয়ে লেখাপড়া করছে। এদের অবৈতনিক পাঠদান করানো হয়। তাদের মধ্যে যারা একটু সচ্ছল পরিবারের তাদের কাছ থেকে সাপ্তাহিক ও মাসিক পরীক্ষা এবং অন্যান্য খরচ বাবদ মাসে ৭৫ টাকা নেয়া হয়। অনেককে রাতে বাড়িতে রেখে পড়ানো হয়। থাকা খাওয়ার নানা ঝামেলা থাকা সত্ত্বেও লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সাইফুল ও সাবিনার চেষ্টার একটুও কমতি নেই। তবে এর জন্য শুধু সরকার ও বিত্তবানদের একটু সুদৃষ্টি কামনা করেন ।

পাঠশালার শিশু শ্রেণীর পড়ুয়া অথৈ মৃধার অভিভাবক পৃথী মৃধা জানান, পাঠশালাটি চালু না থাকলে তাদের ছেলে-মেয়েদের পড়াশুনা করানো অসাধ্য হয়ে পড়ত। শিশুদের শিক্ষার জন্য পাঠশালাটির বিরাট সুনাম রয়েছে। প্রতিটি শিশুকে নিজ সন্তানের মতো ভালবাসেন সাইফুল ভাই ও সাবিনা আপা। তারা শিক্ষার্থীদের নিজেদের জীবন নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন। সেখানকার ছাত্রছাত্রীদের কয়েকজন দিপা বিশ্বাস, মানিক হীরা, আনিক হীরা, আতিকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বড় ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার আশা করছে। এখানে পড়তে তাদের খুব ভাল লাগে।

একজন শিশু প্রকৃত একজন মানুষ হতে যে সকল শিক্ষার প্রয়োজন তার সব প্রকার ব্যবস্থা রয়েছে এখানে। শিশুদের মাঝে এখনও রাম সুন্দর বসাকের আদি বাল্যশিক্ষা ও আদর্শলিপি পড়ানো হয়। পড়ালেখার পাশাপাশি শিশুদের কবিতা আবৃত্তি, চিত্রাঙ্কন, দেশের গান, অভিনয়, বক্তৃতা ও শরীর চর্চারও শিখানো হয়ে থাকে। এছাড়া সামাজিক-সাংস্কৃতিক এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বিভিন্ন বিষয়েও তাদের সচেতন করে তোলা হচ্ছে। উপজেলা পর্যায়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির পারফর্মেন্স বেশ ভাল। শিক্ষা ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখার জন্য শেরেবাংলা পদক ও এশিয়া ছিন্নমূল মানবাধিকার পদকসহ অসংখ্য পদক লাভ করেছেন এই দম্পতি। তাদের স্কুলের শিক্ষা ব্যবস্থা পার্শ্ববর্তী উপজেলার মানুষকেও তাক লাগিয়ে দিয়েছে। পাশের গ্রামের অভিভাবকরাও তাদের ছেলে-মেয়েদের এই স্কুলে এনে ভর্তি করছেন। শিশু শিক্ষায় তাদের এ অগ্রগতির কারণে এলাকাবাসীর হৃদয়ের মণিকোঠায় ঠাঁই করে নিয়েছেন। এখান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে একদিন দেশের উচ্চপদে এসব ছেলে-মেয়েরা আসীন হবে এমনই আশার বাণী শোনালেন, সাইফুল ও সাবিনা। ‘ওরা একদিন অনেক বড় হবে। নিজের সন্তানের চেয়ে ওদের আমরা বেশি ভালবাসি। আমাদের সমস্ত স্বপ্ন ওদের ঘিরে। যত কষ্ট হোক আর যত বাধা আসুক ওদের মানুষের মতো মানুষ করে তুলব’। শিশুদের নিয়ে নিজেদের ভাবনা ও পরিকল্পনার কথা জানালেন সাইফুল দম্পতি। শিশুদের জন্য একটি স্থায়ী ঠিকানা খুঁজছেন। অর্থনৈতিক টানাপড়েনের কারণে এখনও কোন স্থায়ী আশ্রয় গড়তে পারেননি। ভাড়া বাড়িতে থেকে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালিয়ে আসছেন বলে জানালেন । নিজস্ব কোন ভাল ঘর না থাকায় খোলা আকাশের নিচে বসে এসব শিশুদের পাঠদান করানো হয়। মেঘ-বৃষ্টি এলেই তাদের ছুটি দেয়া ছাড়া কোন উপায় থাকে না। বর্তমানে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় জরুরীভাবে একটি ভাল ঘর এবং কিছু আসবাবপত্রের প্রয়োজন রয়েছে বলে তারা জানালেন। স্থানীয় বাসিন্দা আমুর হোসেন মিঠু বলেন, ‘সাইফুল ভাইয়ের কাছে আমরা ঋণী। এলাকায় চিকিৎসাসেবাসহ মানুষের যে কোন কাজে রাতে বিরাতে সাইফুল ভাই ছুটে যান। পাঠশালাটি চালু করে শিশুদের পড়াশুনার জন্য যে মহৎ কাজটি করেছেন তার তুলনা চলে না। আশপাশের লোকজনও এটি চালু রাখার জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।

প্রকাশিত : ৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

০৩/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



ব্রেকিং নিউজ: