রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

বাঙালীর প্রাণের উৎসব অমর একুশে বইমেলা রেজাউল করিম খোকন

প্রকাশিত : ২ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
বাঙালীর প্রাণের উৎসব অমর একুশে বইমেলা রেজাউল করিম খোকন

কয়েকদিন আগে আলাপচারিতায় দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী আমাকে প্রশ্ন কয়েছিলেন, আচ্ছা ভাই, এবারের বইমেলা কেমন হবে বলে মনে হয় আপনার। দেশের যা অবস্থা ভীষণ দুশ্চিন্তায় আছি, গতবারও রাজনৈতিক অস্থিরতায় তেমন ভাল জমতে পারেনি বইমেলা। তার কথার জবাবে বলেছি, এবার বইমেলা অবশ্যই ভাল হবে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক অবস্থা যেমন হোক বইপ্রেমী মানুষ অবশ্যই একুশের বইমেলায় আসবে। তাদের ঠেকিয়ে রাখা যায় না। তাছাড়া দীর্ঘ কয়েকমাসের রাজনৈতিক অস্থিরতা, হরতাল, অবরোধের পর শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থার অবসান হয়েছে, জনমনে স্বস্তি, শান্তি ফিরে এসেছে। এখন মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে, নির্বিঘেœ চলাফেরা করছে। এবার বইমেলায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে বইপ্রেমী নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীরা ভিড় জমাবে, ছন্দের প্রিয় লেখকের কাক্সিক্ষত বইয়ের খোঁজ করবে, সাধ্যমতো বই কিনবে। অতএব, আমি আশাবাদী। এবারের অমর একুশে বইমেলা নিয়ে আমি হতাশা, অনিশ্চয়তার কিছু দেখছি না। আমার কথায় ভদ্রলোক আশ্বস্ত হলেও তার চোখ-মুখের অনিশ্চয়তাভাব পুরোপুরি কাটেনি লক্ষ্য করলাম।

সভ্যতার অমূল্য সম্পদ বই। প্রতিবছর রাজধানী ঢাকা শহরের বাংলা একাডেমী চত্বরে বইমেলার আয়োজনটি জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে সন্দেহ নেই। ফেব্রুয়ারির প্রথম দিন থেকে শুরু করে মাসজুড়ে চলে বইমেলা। দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রকাশনা সংস্থা থেকে শুরু করে অসংখ্য প্রকাশক বইমেলায় স্টল সাজান। পুরনো প্রকাশনার পাশাপাশি নতুন নতুন বই নিয়ে আসেন। পাঠক-পাঠিকা বইপ্রেমীরা নতুন-পুরনো বইয়ের খোঁজে প্রতিদিন ভিড় করেন বইমেলার অঙ্গনে। উপচেপড়া নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীর পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে অমর একুশে বইমেলা। লেখক, কবি, সাহিত্যিক সংস্কৃতিকর্মী, প্রকাশক, সমালোচকদের আড্ডা জমে ওঠে এখানে। প্রিয় লেখকের সান্নিধ্য পেতে, অটোগ্রাফ সংবলিত বইয়ের জন্য লাইন দেন ভক্ত-অনুরাগী পাঠক-পাঠিকারা।

অমর একুশে বইমেলার আয়োজন নিয়ে সরকারও প্রতিবছর যথেষ্ট সজাগ থাকে। যথাসম্ভব নিরাপদ পরিবেশ বজায় রেখে সুন্দর-সুষ্ঠুভাবে বইমেলা সম্পন্ন করতে সরকারী উদ্যোগের কমতি থাকে না কোন বছরই। এ বিষয়ে খোদ সরকারপ্রধান বিশেষ মনোযোগ দিয়ে থাকে। প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম দিন বাংলা একাডেমী চত্বরে অমর একুশে বইমেলার উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।

অমর একুশে বইমেলাকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যাগে নিয়ে যাওয়ার জন্য অনেকদিন থেকে দাবি তুলেছেন বিভিন্ন মহল। কিন্তু তা আপাতত সম্ভব হচ্ছে না বলে জানা গেছে। বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তাজনিত কারণে মেলার পরিসর ওই পর্যন্ত বাড়ানোর কোন পরিকল্পনা গ্রহণ করেনি বাংলা একাডেমী। গত বছর বইমেলা উদ্বোধনের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও মেলাকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নিয়ে যাওয়ার জন্য একাডেমী কর্তৃপক্ষকে বলেছিলেন। এ সবের প্রেক্ষাপটে এবারের বইমেলার মধ্য দিয়ে একাডেমীর বাইরে মেলা নিয়ে যাওয়ার সূচনা ঘটেছে। তবে তা পূর্ণাঙ্গভাবে নয়। প্রকাশকদের দাবি ছিল, একাডেমী প্রাঙ্গণ সংলগ্ন রাস্তায় বইয়ের স্টল দেয়ার। তাদের এ দাবির সঙ্গে একমত প্রকাশ করেছেন বাংলা একাডেমী কর্তৃপক্ষ। একটা বিষয় বিবেচনা করতে হবে সবাইকে। বিষয়টি হলো, সময় যতই এগিয়ে যাচ্ছে ততই প্রকাশকের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছে বাংলা একাডেমীর চত্বর। এ পর্যায়ে বইমেলাকে একাডেমী প্রাঙ্গণের বাইরে নিয়ে যাওয়াটা সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ক্ষেত্রে একাডেমী মূল অঙ্গনের বাইরে মেলা আয়োজন প্রকাশকদেরও তেমন আপত্তি নেই বলে জানা গেছে। আগামী পহেলা ফেব্রুয়ারি বিকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাসব্যাপী অমর একুশে বইমেলা উদ্বোধন করবেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হেনরি গ্লাসিকে আনার বিষয়ে কথা চলছে বলে বাংলা একাডেমী সূত্রে জানা গেছে। বইমেলায় অংশগ্রহণের জন্য এবার ৩২০টি প্রকাশনা সংস্থা আবেদন জমা দিয়েছে। সেখান থেকে নির্বাচন করা হবে তালিকা। পরবর্তীতে স্টল বরাদ্দের জন্য লটারী অনুষ্ঠিত হবে। বইমেলায় যোগ্য প্রকাশকদের মধ্যে স্টল বরাদ্দ নিয়ে নানা অনিয়ম, দুর্নীতির অভিযোগ শোনা যায়। অনেক ক্ষেত্রে অযোগ্য প্রকাশকরা স্টল বরাদ্দ পান, পক্ষান্তরে ভাল বইয়ের যোগ্য প্রকাশকদের ঠাঁই হয় না বইমেলায়-এটা মিথ্যা নয়। অমর একুশে বইমেলায় প্রতিবছর কয়েক হাজার নতুন বই প্রকাশিত হয়। প্রতিষ্ঠিত জনপ্রিয় প্রখ্যাত লেখক-কবি-সাহিত্যিকদের পাশাপশি নবীন প্রতিশ্রুতিশীল লেখকদের বই প্রকাশিত হয় বইমেলা উপলক্ষে। লেখকদের জন্য ঈদ উৎসবের মতো বিবেচিত হয় অমর একুশে বইমেলা। এবারও অনেক নতুন বই প্রকাশের আয়োজন চলছে। প্রকাশনা শিল্পের সঙ্গে জড়িত লোকজনের ব্যস্ততা বেড়ে গেছে বইমেলাকে কেন্দ্র করে। ছাপাখানায় চলছে বইছাপার কাজ, বাঁধাইকারীরা ব্যস্ত বই বাঁধাইয়ের কাজে। আবার অনেক বই প্রকাশনার প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। কম্পিউটারে বইয়ের পা-ুলিপি অনুযায়ী কম্পোজের কাজ চলছে। প্রচ্ছদশিল্পীরা নিপুণ হাতে শিল্প সুষমা ছড়িয়ে বইয়ের প্রচ্ছদ ডিজাইন করছেন। অনেক পরিশ্রম আর ঘাম ঝড়ানোর পর পাঠক-পাঠিকার হাতে নতুন বইটি আসে। অনেক সময় অমনোযোগিতা, অযতœ অবহেলার কারণে ভুলভ্রান্তিতে পরিপূর্ণ বই প্রকাশিত হয়। এ ব্যাপারে লেখক-প্রকাশক-সম্প্রাদকদের বিশেষভাবে মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। আমাদের দেশে বই প্রকাশনার ক্ষেত্রে উপযুক্ত সম্পাদনার বিষয়টি তেমন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন না বেশিরভাগ প্রকাশক। যে কোন বইয়ের পা-ুলিপি প্রকাশের আগে যথাযথ সম্পাদনার প্রয়োজন রয়েছে। বিভিন্ন দেশে একটি বই প্রকাশের আগে দক্ষযোগ্য-অভিজ্ঞজনদের দিয়ে সম্পাদনা করার রীতি চালু রয়েছে। বাংলাদেশে সম্পাদনার ব্যাপারটিকে অনেক লেখক, প্রকাশক বাহুল্য বলে মনে করেন। সম্পাদনার মাধ্যমে একটি ত্রুটিপূর্ণ, দুর্বল পা-ুলিপি বেশ চমৎকার সুখপাঠ্য বই হয়ে উঠতে পারে-এ বিষয়টি আমাদের প্রকাশক মহলে ব্যাপকভাবে চলু হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করি।

মহান ভাষা আন্দোলনের মাস ফেব্রুয়ারি। এ মাসের অন্যতম প্রধান আয়োজন একুশের বইমেলাকে সব রাজনৈতিক কর্মসূচীর আওতামুক্ত রাক্তা প্রয়োজন বলে মনে করি আমরা। গত বছর দেখেছি রাজনৈতিক কর্মসূচীর কারণে বইমেলা অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হরতাল-অবরোধের মতো রাজনৈতিক কর্মসূচীর কারণে বইমেলায় স্বাভাবিকভাবে লোক সমাগম কম হয়। যার প্রভাবে বই বিক্রির পরিমাণ কমে যায়। সবাইকে মনে রাখতে হবে অমর একুশে বইমেলা কেবল একটি বাণিজ্যিক মেলা নয়। এটি দেশের প্রধান সৃজনশীল ও সাংস্কৃতিক কর্মযজ্ঞ।

প্রকাশিত : ২ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

০২/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: