হালকা কুয়াশা, তাপমাত্রা ১৮.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

অভিমত ॥ এভাবে পতন হবে না

প্রকাশিত : ২ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • এম নজরুল ইসলাম

দৃশ্যপট-১ : সবজি বিক্রেতা বাবার আয়ে সংসার চালানোই দায়, তিনটি টিউশনি করে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া কবি নজরুল কলেজের ছাত্র সানজিদ ইসলাম অভির সেই সংগ্রামের অবসান হলো অবরোধের বোমায়। বিএনপির অবরোধের মধ্যে গত ১৪ জানুয়ারি সন্ধ্যায় ঢাকার বঙ্গবাজার এলাকায় রাস্তা পার হওয়ার সময় হঠাৎ হাতবোমা বিস্ফোরণে চোখ ও মাথায় আঘাত পেয়েছিলেন অভি। এক সপ্তাহের বেশি সময় সেই ক্ষতের যন্ত্রণা সয়ে চলে গেলেন এই জীবন সংগ্রামী। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অভির মৃত্যু হয়।

দৃশ্যপট-২ : ‘যখনই চোখ বন্ধ করি, শুধু মনে হয় দাউ দাউ করে সব জ্বলছে। ওই দিন সন্ধ্যায় মিরপুরে যাওয়ার পথে আমাদের সিএনজিটা যানজটে আটকা পড়েছিল শেওড়াপাড়ায়। হঠাৎ দেখি একদল ছেলে, কতই বা বয়স হবে, ১৭-১৮; সিএনজিতে ওরা যেন কি ঢালতে শুরু করল। আমি ছেলেকে শুধু জিজ্ঞেস করেছি, সিএনজিতে পানি ঢালছে কেন? আমার মুখের কথা শেষ হতে না হতেই দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল পুরো সিএনজি। এ কেমন বর্বরতা? মানুষ দেখেও ওদের সিএনজিতে আগুন ধরাতে বুক কাঁপেনি? কখনও ভাবিনি, মা-ছেলে বার্ন ইউনিটে পাশাপাশি বিছানায় শুয়ে এভাবে যন্ত্রণায় কাতরাব। আমি একবার নিজের দিকে তাকাই, একবার ছেলের দিকে। নিজের কথা যতটা না ভাবি, তার চেয়ে বেশি ভাবি ছেলের কথা। ও সুস্থ হবে তো? হলে কবে? কবে আবার ফিরবে বিশ্ববিদ্যালয়ে?’ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে শুয়ে কথাগুলো বলেছেন যন্ত্রণাকাতর শামসুন্নাহার বেগম। ঢাকায় মেয়েকে ডাক্তার দেখাতে এসে এই শিক্ষিকার আশ্রয় এখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিট। অবরোধের নামে ৫ জানুয়ারির পর এরকম অসংখ্য অমানবিক নির্মম ঘটনা ঘটে চলেছে দেশে।

আন্দোলনের নামে, অবরোধের নামে বাংলাদেশে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে বিএনপি। বলার অপেক্ষা রাখে না, বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া ও তাঁর ছেলে তারেক রহমানের ক্ষমতাপ্রীতি এই সন্ত্রাসের মূল কারণ। যে কোন মূল্যে ক্ষমতা পেতে মরিয়া মা ও ছেলে। কিন্তু এর নাম কি আন্দোলন?

অবরোধের নামে দেশব্যাপী চলছে চরম নিষ্ঠুরতা, চলছে লাগামহীন সহিংসতা। প্রতিদিন যানবাহনে আগুন দেয়া হচ্ছে, পুড়িয়ে মানুষ মারা হচ্ছে। আগুনে পোড়া মানুষের যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখ, বুকফাটা আর্তনাদ কিংবা বেঁচে থাকার করুণ আকুতি কিছুই স্পর্শ করছে না ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে যাওয়া তথাকথিত রাজনীতিবিদদের। এখনও তাদের মানবিক মূল্যবোধ বিবর্জিত অনুসারীরা পেট্রোলবোমা, গানপাউডার নিয়ে ঘুরে বেড়ায় রাতের অন্ধকারে, লোকচক্ষুর আড়ালে। যাত্রীসমেত বাস পোড়াতে পারলে ওরা মেতে উঠে পৈশাচিক উল্লাসে। এর নাম কি রাজনীতি! এসব হরতাল ও অবরোধ আর কতদিন চলবে? এই অবস্থায় সাধারণ মানুষ কী করবে? যে কৃষক ঋণ নিয়ে সবজি উৎপাদন করে সর্বস্বান্ত হয়েছে তার আগামী দিনগুলো কিভাবে চলবে? প্রায় প্রত্যেকেরই মাথায় রয়েছে বিরাট ঋণের বোঝা। সারাদেশে কৃষকরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যেসব ফসল বা শাক-সবজি উৎপাদন করেছিলেন অবরোধের কারণে সেগুলো বিক্রি করতে পারছেন না, জমিতেই নষ্ট হচ্ছে। অন্যদিকে শহর এলাকার বাসিন্দাদের দ্বিগুণ, তিনগুণ মূল্যে সেসব সবজি কিনতে হচ্ছে। দৈনিক উপার্জনের ভিত্তিতে চলা অসংখ্য পরিবার দিনের পর দিন অভুক্ত থাকছে।

সাম্প্রতিক সময়ের বিএনপি তথা ২০ দলীয় জোটের রাজনীতির চেহারা দেখে খুব কম মানুষই এখন বিশ্বাস করেন, তারা এ দেশে জনগণের স্বার্থে রাজনীতি করে। বরং সিংহভাগ মানুষের মনে এই ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে যে, বিএনপি-জামায়াত জোটের বর্তমান রাজনীতির একটিই মাত্র লক্ষ্য, আর তা হলো যে কোন উপায়ে ক্ষমতায় যাওয়া। এর পর ক্ষমতায় টিকে থাকা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট করে নিজেদের উদরপূর্তি করা। জামায়াত-বিএনপির এই অন্যায় রাজনীতির মধ্যেও মানুষ কোন রকমে নিজের মতো করে বেঁচে থাকতে চায়। কিন্তু হরতাল-অবরোধ দিয়ে মানুষের বেঁচে থাকার সেই অধিকারটিও কেড়ে নেয়া হচ্ছে কেন? হরতাল-অবরোধকে যাঁরা গণতান্ত্রিক অধিকার বলছেন, তাঁরা দয়া করে বলবেন কী, অন্যের অধিকার কেড়ে নিতে যানবাহনে অগ্নিসংযোগ করা, পুড়িয়ে মানুষ মারা কোন ধরনের অধিকার?

২০১৩ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে পরবর্তী এক বছরে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে গড়ে ওঠা আন্দোলনের সময় বাসে আগুন ও পেট্রোলবোমায় ২২২ যাত্রী, ৭৩ চালক ও তার সহকারী দগ্ধ হয়ে মারা গেছেন। এ সময়ের মধ্যে ২৬ হাজার ৩৭৪টি যানবাহন ভাংচুর, এক হাজার ১৬২টি গাড়িতে আংশিক অগ্নিসংযোগ করা হয়। সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে ৭৮১টি গাড়ি। ২১ বার রেললাইনের ফিশপ্লেট খুলে নাশকতা চালানো হয়েছে। নৌপথে নাশকতার চেষ্টা করা হয় তিনবার। এসব নাশকতায় সারা দেশে আহত হন ৩ লাখ ৭৩ হাজার ৪২৫ যাত্রী। এ ছাড়া জানুয়ারি মাসের ৫ তারিখ থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৩০ জন নিহত হয়েছেন। এই সময়ের মধ্যে ৫৭২টি যানবাহনে আংশিক অগ্নিসংযোগ, ৬৫টি সম্পূর্ণ পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে, ভাংচুর করা হয়েছে ৩২৩১টি যানবাহন। সরকারী পরিবহন সংস্থা বিআরটিসির ৫০টি বাসে অগ্নিসংযোগ ও ৩১৭টি ভাংচুর করা হয়েছে। চার দফায় রেলে নাশকতা চালানো হয়েছে। আহত হয়েছেন ৫৫ হাজার ২১৭ যাত্রী।

দেশের এই অবস্থায় আন্তর্জাতিক মহলও উদ্বিগ্ন। বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সংগঠনটির এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিরোধী দলের অবরোধ কর্মসূচীর কারণে রাজপথের সহিংসতায় জীবনহানি ঘটছে, এসব ঘটনায় মানুষ আহতও হচ্ছে। বাংলাদেশে চলমান রাজনৈতিক সহিংসতায় উদ্বেগ প্রকাশ করে সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম দেখানোর আহ্বান জানিয়েছে দক্ষিণ এশিয়ায় ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রতিনিধি দল। প্রতিনিধি দলের প্রধান জ্যঁ ল্যাম্বার্ট এক বিবৃতিতে বলেছেন, বর্তমানে বাংলাদেশে যে পরিস্থিতি চলছে তা গভীরভাবে উদ্বেগজনক। বাংলাদেশের এই পরিস্থিতিতে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা উদ্বেগ জানালেও খালেদা জিয়া অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে বসে আছেন।

অন্যদিকে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ‘পলিটিক্যাল ক্রাইসিস ইন বাংলাদেশ : জানুয়ারি টু থাউজেন্ড ফিফটিন আপডেট কমন্স লাইব্রেরি স্ট্যান্ডার্ড নোট’ শীর্ষক প্রতিবেদনের শেষাংশে বলা হয়েছে, ‘অব্যাহত রাজনৈতিক টালমাটাল পরিস্থিতি সত্ত্বেও বাংলাদেশের অর্থনীতি অত্যন্ত ভাল করছে। অনেক চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভাল অগ্রগতি করছে।’ প্রতিবেদনে ২০১৩ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পর থেকে বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরে চলমান রাজনৈতিক সহিংসতায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের উদ্বেগের কথা স্থান পেয়েছে।

দেশে বর্তমানে জামায়াত-বিএনপি জোটের রাজনীতি আর সন্ত্রাস-নাশকতা একাকার হয়ে গেছে। রাজনীতির নামে তাদের ভাড়াটে বাহিনীর সন্ত্রাস, নাশকতার বিভীষিকাময় চেহারা মানুষ দেখছে। জামায়াত-বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের অবরোধ ডাকাকে কেন্দ্র করেই সহিংসতা ছড়িয়েছে, তাই এর দায় তাদেরই নিতে হবে। সামরিক উর্দির পকেট থেকে জন্ম নেয়া বিএনপি গণতান্ত্রিক আন্দোলন বোঝে না। জানে না, কিভাবে আন্দোলনের সঙ্গে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হয়। গণবিচ্ছিন্ন সন্ত্রাস-নাশকতা করে সাময়িক বিশৃঙ্খলা ও জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করা যায়, মানুষের মন জয় করা যায় না। কাজেই আন্দোলনের নামে এই সন্ত্রাসী কর্মকা- পরিচালনা করে যে ক্ষমতায় যাওয়া যাবে না, তা বলাই বাহুল্য। সন্ত্রাস-নাশকতা করে বিশ্বে কোথাও কোনদিন জনগণের আস্থাভাজন সরকারের পতন ঘটানো যায়নি। বাংলাদেশেও এভাবে সরকার পতন হবে না। জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় আসা বর্তমান সরকার ঠিকই বর্তমান সংকট কাটিয়ে সঠিক পথে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

লেখক : অস্ট্রিয়া প্রবাসী লেখক ও সাংবাদিক

হধুৎঁষ@মসী.ধঃ

প্রকাশিত : ২ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

০২/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: