হালকা কুয়াশা, তাপমাত্রা ১৮.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

জাতীয় উন্নয়নে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত

প্রকাশিত : ১ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
জাতীয় উন্নয়নে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত
  • মো. মেফতাউল ইসলাম

কক্সবাজার বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত। বিশ্বের দীর্ঘতম এ সৈকত বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পে রাখছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। পর্যটন খাত থেকে বাংলাদেশ যা আয় করে, তার অধিকাংশই আসে পর্যটননগরী কক্সবাজার থেকে। বিদেশী কোন পর্যটক বাংলাদেশে ভ্রমণ করতে এলে দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে কক্সবাজারকে রাখে সবার শীর্ষে। শুধু বিদেশীদের নিকট নয়, বাংলাদেশীদের কাছেও এ পর্যটননগরী ব্যাপকভাবে সমাদৃত। তাই কক্সবাজারের এই পর্যটন খাত থেকে বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রচুর পরিমাণ অর্থ উপার্জন করতে পারে। এছাড়া কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু খনিজসম্পদ যা উত্তোলনে বাংলাদেশ ব্যাপকভাবে লাভবান হতে পারে।

সমুদ্রসৈকত, সেন্টমার্টিন দ্বীপ, হিমছড়ি, ইনানী বিচ, লাবণী বিচ ছাড়াও জেলার অন্যতম আকর্ষণীয় স্থানের মধ্যে কক্সবাজার শহরের ঐতিহ্যবাহী বৌদ্ধ মন্দির, ডুলাহাজরার বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক, টেকনাফের মাথিনের কূপ, মেরিন ড্রাইভ সড়ক, রামুর রামকোট ও নারিকেল বাগান, রবার বাগান, মহেশখালীর আদিনাথ মন্দির, কুতুবদিয়ার বাতিঘর, রামু উপজেলার নাইক্ষ্যংছড়ি লেক অন্যতম। বাংলাদেশের এ বিশাল সমুদ্রসৈকত শুধু দেশেই নয়, পৃথিবীব্যাপী বিখ্যাত। তাই সব সময় পর্যটকে মুখরিত থাকে এ সৈকত।

বাংলাদেশে কক্সবাজার পর্যটন শিল্পের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এর জন্য চাই কক্সবাজারকে ঘিরে বিশেষ ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন। কিন্তু এর বিকাশে কিছু সমস্যা রয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম হলো, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থার বেহাল দশা, পর্যটকদের নিরাপত্তার অভাব, পর্যটনস্থানগুলোতে উন্নতমানের হোটেল-মোটেল এবং রেস্টুরেন্টের অভাব, পর্যাপ্ত পর্যটক গাইডের অভাব, রাজনৈতিক অস্থিরতা। এসব অন্তরায় থাকলেও এর মধ্য দিয়েই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। নিতে হবে কিছু উদ্যোগ। কক্সবাজারকে স্বয়ংসম্পূর্ণ পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য অবশ্যই সেখানকার বিমানবন্দরটি আন্তর্জাতিক মানের করতে হবে। কক্সবাজারে গিয়ে পর্যটকদের যাতে নিরাপত্তাজনিত সমস্যায় ভুগতে না হয়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। কক্সবাজারে পর্যাপ্ত পরিমাণে উন্নতমানের পর্যটন মোটেল ও রেস্টুরেন্ট নির্মাণ করতে হবে এবং পর্যটন গাইডের ব্যবস্থা করতে হবে। পর্যটননগরী কক্সবাজারকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে বাড়াতে হবে সরকারী-বেসরকারী বিনিয়োগ।

কক্সবাজারের অর্থনৈতিক গুরুত্ব শুধু পর্যটনগত দিক থেকেই নয়, বরং এই সমুদ্রসৈকতে বিভিন্ন প্রাকৃতিক এবং খনিজ সম্পদও রয়েছে। কক্সবাজারের ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্রসৈকতে প্রায় ২ কোটি ৪৯ লাখ ৬০ হাজার ৯৮ টন খনিজ পদার্থ অপরিশোধিত অবস্থায় আছে। ইলমেনাইট, রুটাইল, ম্যাগনেটাইল, জিরকন, কায়ানাইট, গারনেট, ম্যাগনেট্রাস্ট, মোনাজাইট, লিউকপ্রিনসহ সমুদ্রসৈকতের বালুতে প্রাপ্ত খনিজ সম্পদ দেশ-বিদেশের বহু শিল্প কারখানায় ব্যবহারের জন্য বিপুল চাহিদা রয়েছে। বাদামি রঙের মোনাজাইট অতি মূল্যবান পদার্থ। এই তেজস্ক্রিয় পদার্থ পারমাণবিক বোমা তৈরিতে এবং পারমাণবিক চুুল্লিতে শক্তি উৎপাদক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ১৭টি মূল্যবান ভারি খনিজসম্পদের স্তূপ আছে। এর মধ্যে আটটি অতি মূল্যবান খনিজ সম্পদ।

উপকূলের বদরমোকাম, সাবরাং, টেকনাফ ও সিটখালিতে ইলমেনাইট আছে ৪ লাখ ৫০ হাজার ৯৪৪ টন, গারনেট ৬৪ হাজার ৮৬৪ টন, জিরকন ৭০ হাজার ৭২২ টন, রুটাইল ১৮ হাজার ৬৬৪ টন, ম্যাগনেটাইল ২১ হাজার ৫৬৯ টন, লিউকপ্রিন ৫১ হাজার ৮৩৬ টন, কায়ানাইট ১৯ হাজার ৮৬২ টন এবং মোনাজাইট ১২ হাজার ১০১ টন। সৈকতে কাঁচাবালু আছে দুই কোটি পাঁচ লাখ টন। ভারি খনিজ পদার্থ আছে ৪৩ লাখ টন। গবেষকদের মতে, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতসহ উপকূলীয় এলাকায় খনিজ পদার্থের মোট ১৭টি পয়েন্ট আছে। এগুলো হচ্ছেÑ টেকনাফ, শাহপরীর দ্বীপ, বদরমোকাম, সাবরাং, ইনানী, কলাতলী, শীলখালী, কুতোবজোম, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, ফকিরাহাটসহ কয়েকটি পয়েন্ট। প্রত্যেকটি পয়েন্ট থেকেই স্বতন্ত্রভাবে খনিজ পদার্থ উত্তোলন সম্ভব।

এসব খনিজ পদার্থ যদি যথাযথভাবে উত্তোলন করা সম্ভব হয়, তাহলে বাংলাদেশ অনেক লাভবান হবে। ধারণা করা হচ্ছে, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত থেকে প্রায় দুই হাজার ২০০ কোটি টাকার শুধু খনিজ বালু উত্তোলন করা সম্ভব। কিন্তু সঠিক সমীক্ষা এবং পরিকল্পনার অভাবে আমরা এসব সম্পদ আহরণ করতে ব্যর্থ হচ্ছি। তাছাড়া আমাদের অর্থনৈতিক এবং কারিগরি সীমাবদ্ধতাও আছে। অবশ্য বিভিন্ন দেশ এসব সম্পদ উত্তোলনে বাংলাদেশকে সহায়তা দিতে আগ্রহ প্রকাশ করছে। তাদের কাছ থেকে কারিগরি সহায়তা নিয়ে আমাদের এসব সম্পদ উত্তোলনে তৎপর হওয়া উচিত। কেননা, এই মহামূল্যবান সম্পদ সংরক্ষণ বা আহরণের অভাবে ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এসব সম্পদ সংগ্রহ করা সম্ভব হলে একদিকে যেমন দেশের চাহিদা মেটানো সম্ভব, তেমনি বিদেশে রফতানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন সম্ভব।

পর্যটন এবং খনিজ উভয় সম্পদে সমৃদ্ধ এ অঞ্চলটি বাংলাদেশের ভাগ্য পরিবর্তনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। তাই এ অপার সম্ভাবনাময় এলাকাকে আমাদের যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে। এ অঞ্চলের পর্যটন শিল্প বিকাশের ক্ষেত্রে যেসব অন্তরায় রয়েছে, তা চিহ্নিত করে নিরসনকল্পে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

প্রকাশিত : ১ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

০১/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: