আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

যাত্রা নিয়ে গ্রামবাংলায় এখন আর তোলপাড় হয় না

প্রকাশিত : ৩১ জানুয়ারী ২০১৫
  • বয়সের ভারে ন্যুব্জ কেউ কেউ দিন কাটাচ্ছে চরম হতাশায়

বাবু ইসলাম, সিরাজগঞ্জ থেকে ॥ যাত্রা! যাত্রা! যাত্রা! বিনোদনের এই মাধ্যম নিয়ে এখন আর গ্রামবাংলায় তোলপাড় নেই। নেই নটরাজের অভিনয় কিংবা নাচনেওয়ালীর ক্লাসিক নৃত্য নিয়ে সরব আলোচনা। নানা প্রতিবন্ধকতা এবং আকাশ সংস্কৃতির বেপরোয়া আগ্রাসনে গ্রামের বিনোদনের যাত্রাশিল্পের এই মাধ্যমটি এখন বিলুপ্তির পথে। এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত শিল্পী ও কলাকুশলীরা অনেকেই তাদের পেশা পরিবর্তন করেছেন। বয়সের ভারে ন্যুব্জ কেউ কেউ চরম হতাশায় কালাতিপাত করছেন।

সিরাজগঞ্জের প্রবীণ যাত্রা শিল্পীরা জানান, প্রাচীন এই শিল্প মাধ্যমের দিন এখন শেষ। বর্তমানে যাত্রাশিল্পে চরম দুর্দিন চলছে। আগের মতো এখন আর যাত্রানুষ্ঠান হচ্ছে না। যে কারণে বছরের বেশিরভাগ সময়ই শিল্পীদের বেকার জীবন কাটাতে হয়। অনেকেই এই পেশা ছেড়ে ভিন্ন পেশায় চলে গেছে। এক সময় গ্রামাঞ্চলে যাত্রানুষ্ঠান, জারি-সারি-কবিগান ছাড়া বিনোদনের অন্য কোন মাধ্যম ছিল না। একমাত্র এই বিনোদনই সাধারণ মানুষকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছে। এক সময়ের সুস্থ বিনোদনের যাত্রাশিল্প এখন উচ্ছৃঙ্খল অপসংস্কৃতির উত্তাল ঢেউয়ে ভেসে গেছে। ক্লাসিক শিল্পী ও কুশলীদের কোন কদর নেই। যাত্রায় যে সকল নর্তকিরা নৃত্য পরিবেশন করতেন তারা ক্লাসিক ও উচ্চাঙ্গ রাগাশ্রয়ী তালে শালীনতাপূর্ণ নৃত্য করতেন। রাতভর উন্মুক্ত প্যান্ডেলে নারী-পুরুষ এসব যাত্রাপালা উপভোগ করতেন। কোন অশালীনতা তখনকার যাত্রাকে স্পর্শ করতে পারেনি। যাত্রা ছিল নিটোল বিনোদনের উৎকৃষ্ট মাধ্যম।

গত দুই দশকে এ শিল্পের ওপর লাগাতার নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে। ফলে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে বাংলা সংস্কৃতির প্রাচীন এই শিল্প মাধ্যম ও এর সঙ্গে জড়িত শিল্পীদের জীবন-জীবিকা। অযোগ্যরা লম্ফঝম্প করে সাময়িক লোকজনকে মাতাবে এটাই স্বাভাবিক। তবে রুচিশীল কোন ব্যক্তিকে নয়।

প্রকৃতপক্ষে যোগ্য শিল্পী, কুশলী ও অভিনেতা অভিনেত্রীদের সঠিক মূল্যায়ন করার পাশাপাশি অশালীনতার বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন ও রাষ্ট্রীয় কঠোর ব্যবস্থাপনাই এই অধঃপতন থেকে যাত্রাশিল্পকে আগের গৌরব ফিরিয়ে আনতে পারে বলে শিল্পীরা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

সিরাজগঞ্জের যাত্রাশিল্প সংকটের মুখে পড়ে মূলত ’৭০-এর দশকে। এর পর নেমে আসতে থাকে বিভিন্ন সংকট। একে একে সব যাত্রাদলই ভেঙ্গে যায়। হারিয়ে যায় সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী যাত্রা। যাত্রাশিল্পের এই নাজুক অবস্থার উত্তরণে সংশিষ্টরা সরকারী পৃষ্ঠপোষকতার দাবি তুলেছেন। জানা যায়, যাত্রাশিল্প উন্নয়ন নীতিমালা-২০১২-এর আওতায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ইতোমধ্যে পাঁচটি পর্যায়ে মাত্র ৬১টি যাত্রাদলকে নিবন্ধন দিয়েছে। তবে উপযুক্ত ব্যবস্থাপনা ও পরিচর্যার অভাবে এর সংখ্যা আগামী দিনে হয়ত কমে যেতে পারে বলে ভুক্তভোগীদের ধারণা।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সিরাজগঞ্জ জেলায় যাত্রাদলের সংখ্যা ছিল ১৮টি। প্রতিটি যাত্রাদলের সদস্য ছিল সংখ্যা ৬০ থেকে ৭০ জন। এরমধ্যে শিল্পী ৪০-৫২ জন, পুরুষের সংখ্যা ২৫-৩৫ জন, নারী ১২-১৫ জন। শিশু শিল্পী কমপক্ষে ২-৩ জন। অবশিষ্টরা দলের বিভিন্ন দায়িত্বে সাংগঠনিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী। যাত্রাপালা একটি মৌসুমী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সারা বছর ধরে এটি অনুষ্ঠিত হয় না। পেশাদার যাত্রাপালা আয়োজনের সময়সীমা ছয় থেকে সাত মাস।

১৯২২ খৃস্টাব্দের প্রারম্ভে তদানিন্তন সিরাজগঞ্জ মহকুমার বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে আনুষ্ঠানিকভাবে কয়েকটি যাত্রা দলের সৃষ্টি হয়। ষাটের দশক পর্যন্ত এর অধিকাংশ যাত্রা দল হিসেবে পরিচিত ছিল। শৌখিন দলগুলো স্থানীয়ভাবে যাত্রা অনুষ্ঠান করে বেড়াত।

প্রকাশিত : ৩১ জানুয়ারী ২০১৫

৩১/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: