কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বিদেশী সংস্কৃতির আগ্রাসনে ॥ বিদেশী সংস্কৃতির আগ্রাসনে

প্রকাশিত : ৩১ জানুয়ারী ২০১৫
  • আর বাকিটুকু গ্রাস করেছে মৌলবাদ নামের বিষবৃক্ষ

সঞ্জয় সরকার, নেত্রকোনা থেকে ॥ বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার মহান অধিপতি, তোমার শেষ উপদেশ আমি ভুলিনি জনাব। তুমি বলেছিলে- ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীকে কিছুতেই প্রশ্রয় দিও না...। এটি বহুল জনপ্রিয় ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ যাত্রাপালার একটি সংলাপ। কিংবদন্তির নায়ক নবাব সিরাজের পতন হয়েছিল পলাশীর যুদ্ধে। কিন্তু যাত্রাশিল্পীদের অভিনয়শৈলীতে আজও তিনি সাধারণের কাছে জীবন্ত হয়ে ওঠেন। জনতার মঞ্চে দাঁড়িয়ে এখনও তিনি বলে ওঠেনÑ ‘বাংলার ভাগ্যাকাশে আজ দুর্যোগের ঘনঘটা...’। শুধু কি সিরাজ? সূর্য সেন, ক্ষুদিরাম, নেতাজী, গান্ধীজী, টিপু সুলতান, দস্যুরানীর মতো ইতিহাসের অনেক নায়ক-খলনায়কই হাজির হন যাত্রামঞ্চে। ঐতিহাসিক নানা চরিত্র-কাহিনীর পাশাপাশি যাত্রাশিল্পীরা উপস্থাপন করেন সমাজ জীবনের হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ, বিরহ-বেদনার প্রতিচ্ছবি। এ জন্য যাত্রাকে বলা হয়- ‘সমাজ জীবনের দর্পণ’। কিন্তু যাদের কল্যাণে যাত্রা শিল্পের এই গৌরবময় ঐতিহ্য, এখনও যাঁরা গভীর রাত অবধি আন্দোলিত করেন হাজারো দর্শকমনÑ কেমন আছেন মঞ্চের সেই সিরাজ, আলেয়া, নটি বিনোদিনী আর দেবী সুলতানারা?

বিশ্বখ্যাত মহুয়া-মলুয়ার কাহিনী বিজড়িত নেত্রকোনা জেলায় এক সময় যাত্রাশিল্পের ব্যাপক কদর ছিল। বিশ শতকের শুরু থেকে আশির দশক পর্যন্ত যাত্রাশিল্প চরম উৎকর্ষ লাভ করেছিল এ জেলায়। গড়ে ওঠেছিল বেশ কিছু পেশাদার যাত্রাদল। উল্লেখযোগ্য যাত্রাদলের মধ্যে ছিলÑ মোহনগঞ্জের নিউ গণেশ অপেরা, নবযুগ অপেরা, নেত্রকোনা সদরের কৃষ্ণাকলি অপেরা, মহুয়া নাট্য সংস্থা, লক্ষ্মীপুর যাত্রা ইউনিট, শ্যামগঞ্জের সবুজ অপেরা, কলমাকান্দার পলাশ অপেরা, রংছতির রিপন যাত্রা ইউনিট, বারহাট্টার রকি অপেরা ও বন্ধন অপেরা। শুধু নেত্রকোনাতেই নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় সারা বছর পালা করে বেড়িয়েছে এ দলগুলো। এছাড়াও জেলার প্রায় প্রতিটি গ্রামেই ছিল শৌখিন যাত্রা দল। এ জেলায় এমন কোন গ্রাম নেইÑ যেখানে বছরে অন্তত দু-একটি যাত্রাপালা মঞ্চস্থ হয়নি। জেলার ডাকসাইটে যাত্রাভিনেতা আশ্রব আলী, যাত্রা সম্রাট নয়ন মিয়া, মুখলেছ উদ্দিন, খমির উদ্দিন, হরেন সরকার, রমেশ আদিত্য, শরীফ এ মুখলেছ, পঞ্চানন বিশ্বাস, হরিপদ সরকার, অমূল্য শর্মা, আবদুর রহিম, মোসলেম উদ্দিন, আবদুর রব, আফাজ উদ্দিন, আবদুল হাই প্রমুখের নাম এখনও মানুষের মুখে মুখে। বিবেক চরিত্রের গান ও অভিনয়ের জন্য গৌরাঙ্গ আদিত্যের নাম এখনও ছড়িয়ে আছে সারাদেশে। এছাড়া বিবেকের অভিনয় করে খ্যাতি কুড়িয়েছিলেন অশ্বিনী সরকার, মদন সরকার, গোপাল দত্ত প্রমুখ।

স্বাধীনতার আগ পর্যন্তও যাত্রাগানে নারী চরিত্রে অভিনয় করতেন পুরুষ শিল্পীরা। বিনোদ দাস (বিনোদ রানী), পিয়ারী মোহন সাহা (পিয়ারী রানী), সতু ভৌমিকসহ (সতু রানী) ক’জন পুরুষ যাত্রাশিল্পী তখন নারী চরিত্রে অভিনয় করে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। স্বাধীনতার পর যাত্রাশিল্পে নারী শিল্পীদের অনুপ্রবেশ ঘটলে শিল্পটি আরও জনপ্রিয় এবং প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। এ সময় যাত্রাশিল্পের বাণিজ্যিক প্রসারের কারণে নেত্রকোনা শহরের সাতপাই রেলক্রসিং এলাকায় গড়ে ওঠে একটি যাত্রাপল্লী। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মহিলা শিল্পীরা এখানে এসে বসতি গড়ে তোলেন। এছাড়া যাত্রাশিল্পকে কেন্দ্র করে এখানে গড়ে উঠেছিল বেশ কিছু ‘সাজঘর’। আগের মতো বাণিজ্যিক প্রসার না থাকলেও কৃষ্ণা ড্রেস হাউস, দ্বীনা ড্রেস হাউস, একতা ড্রেস হাউস, বিউটি ড্রেস হাউস, শিল্পী সাজঘর, পলাশ পোশাকঘর, লাকি সাজঘরসহ বেশ কয়টি সাজঘর এখনও টিকে আছে। এছাড়া কেন্দুয়া এবং মোহনগঞ্জেও আরও কয়েকটি সাজঘর আছে। যারা যাত্রার আয়োজন করেন তারা এসব সাজঘর থেকে টাকার বিনিময়ে মহিলা শিল্পী, বাদ্যযন্ত্রী, বাদ্যযন্ত্র, মেকাপ ম্যান, পোশাক প্রভৃতি ভাড়া করেন।

বলাবাহুল্য, যাত্রার ঐতিহ্য আজ আর নেই। নানা বাস্তবতায় শিল্পটি দিন দিনই তার ঐতিহ্য হারাচ্ছে। যাত্রার মঞ্চ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে সচেতন দর্শকরা। গ্রামগঞ্জে এখন খুব কমই যাত্রার আয়োজন দেখা যায়। এর কারণ ব্যাখ্যা করে স্থানীয় পেশাদার যাত্রাশিল্পী দ্বীন ইসলাম বলেন, রমরমা বাণিজ্যের কারণে যাত্রাশিল্পে এক সময় অপ-সংস্কৃতির ‘আছর’ পড়ে। বিশেষ করে আশি ও নব্বইয়ের দশকে এক শ্রেণীর প্রভাবশালী ব্যক্তি রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় যাত্রার সঙ্গে জুয়া, হাউজি ও অশ্লীল নৃত্যসহ নানা অপসংস্কৃতিকে যুক্ত করে। তখন থেকেই সুধী সমাজ যাত্রার আসর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করে। এছাড়াও আইনী বাধ্যবাধকতা, নিষেধাজ্ঞা, প্রশাসনিক বেড়াজাল ও মৌলবাদীদের রক্তচক্ষুর কারণে শিল্পটি আজ মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন। এ কারণে অনেকে পেশা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। নেত্রকোনার প্রখ্যাত নারী যাত্রাশিল্পী কৃষ্ণা চক্রবর্তী বলেন, মূলত যাত্রাপালার সঙ্গে জুয়া, হাউজি ও অশ্লীল নৃত্যের সম্পর্ক নেই। আয়োজকরা ব্যবসায়িক দিক বিবেচনা করে এসব সম্পৃক্ত করেন। আর যখনই জুয়া-হাউজি বন্ধের কথা ওঠে, তখন এসবের সঙ্গে যাত্রা প্রদর্শনীও বন্ধ করে দেয়া হয়। ফলে যাত্রা একটি অপসাংস্কৃতিক কর্মকা- বলে বিবেচিত হয়। কিন্তু জুয়া-হাউজি বন্ধ হলে কেউ না খেয়ে মরবে না। পক্ষান্তরে যাত্রা বন্ধ হলে হাজার হাজার শিল্পী-কলা-কুশলী ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তাই সব অসামাজিক কর্মকা- বন্ধ করে যাত্রাশিল্পের বিকাশে সরকারের সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ প্রয়োজন।

লোক ঐতিহ্য সংগ্রাহক ও গবেষক গোলাম এরশাদুর রহমান বলেন, নেত্রকোনায় এমন কোন প্রাচীন লোক খুঁজে পাওয়া যাবে নাÑ যিনি জীবনে অন্তত দু-চারবার গুনাই বিবি, একটি পয়সা, সিঁদুর নিও না মুছে, কোহিনূর, মন্দির থেকে মসজিদ, টিপু সুলতান, সিরাজউদ্দৌলা, দেবী সুলতানা, বাগদত্তা, অশ্রু দিয়ে লেখা, ভক্ত রামপ্রসাদ ও ক্রীতদাস প্রভৃতি যাত্রাপালা দেখেননি। রাতভর মুগ্ধ হয়ে মানুষ এসব পালা দেখেছেন এবং জীবনের মিল খুঁজে পেয়ে কেঁদেছেনও। এটি গ্রামবাংলার মানুষের কাছে একটি শিক্ষণীয় মাধ্যম হিসেবে ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু বাঙালীর সেই চিরকালের নাটক যাত্রা আজ বিলুপ্তির পথে। এর কিছুটা গ্রাস করেছে বিদেশী সংস্কৃতির আগ্রাসন ও সরকারের উদাসীনতা। আর বাকিটুকু গ্রাস করেছে মৌলবাদ নামের বিষবৃক্ষ। তাই বর্তমান সরকারের উচিত দেশের লোকজ ও মৌলিক সংস্কৃতির এ ঐতিহ্যবাহী উপাদানটিকে রক্ষা করা।

প্রকাশিত : ৩১ জানুয়ারী ২০১৫

৩১/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: