আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বুলবুলি ও কালোবিড়াল

প্রকাশিত : ৩১ জানুয়ারী ২০১৫
  • শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল

শীতের সকালে ঘুম ভাঙ্গে না বলে আমাদের বাবলি মণিকে তার মায়ের বকা শুনতে হয়। মা যে তাকে এত বকা দেন, তবুও ওর অভ্যাসের পরিবর্তন হয় না। মা তাকে জাগাবার জন্য যতই ঠেলতে থাকেন, সে ততই নিবিড় হয়ে শরীরের কম্বলটাকে আর-ও গভীরভাবে শরীরে জড়িয়ে বিছানার এক কোনে পড়ে থাকে। মা বলেন, বাবলি ভাল হবে না কিন্তু। এবার ওঠ, তা না হলে শরীরে জল ঢেলে দেব। তখন আমাকে কিছু বলতে পারবে না। মার কথা শুনে আমাদের বাবলি সোনা মুখ থেকে কম্বলটা সরিয়ে বলে, মা তুমি এমন কর কেন? এখন পরীক্ষা শেষ, এত ভোরে ঘুম থেকে উঠে কী করব? মা-ও কম যান না, তিনি মুখে মিথ্যে রাগের প্রলেপ এঁকে বলেন, পরীক্ষা শেষ হয়েছে তো কী হয়েছে? তাই বলে কি তুমি সারাদিনই ঘুমাবে? মার কথা শুনে বাবলি মাকে জোড়হাত করে বলে, প্লিজ মা, এবার যাও। আমাকে একটু ঘুমাতে দাও। মা মেয়ের কথার ধরন দেখে চলে যান। যাবার আগে বলেন, বাপরে এই মেয়ের সঙ্গে কথা বলে পারা যাবে না।

বাবলির ভাই অঙ্কুর কোথা থেকে একটা বুলবুলির বাচ্চা ধরে নিয়ে এসেছে। এই নিয়ে বাসায় সর্বক্ষণ মহাকীর্তন চলছে। ভাইবোন দুজন মিলে সকল সময় এই পাখির পিছনেই লেগে থাকে। পাখির বাচ্চাটাকে কী খাওয়াবে তা নিয়েই ভাইবোন ব্যস্ত। বাবলি পাখির বাচ্চাটার জন্য এক বাটি দুধ নিয়ে আসে। তা দেখে অঙ্কুর বলে এই গাধী, পাখির বাচ্চা কী দুধ খায়? তুই যে দুধ নিয়ে এসেছিস। বাবলি অঙ্কুরের মুখের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, তাহলে ওটাকে খাওয়াব কী? পাখির বাচ্চাটা যে না খেতে খেতে মরে যাবে। তাতে আমাদের পাপ হবে না? বাবলির কথার পিঠে অঙ্কুর বলে, ভাবিস না। আমি আমাদের ফুলের বাগান থেকে পোকামাকড় ধরে আনব। দেখবি পাখিটা পোকামাকড় খেয়ে দিব্বি বেঁচে থাকবে। অঙ্কুরের কথায় বাবলি কিছুটা আশ্বস্ত হয়। ভাবে, আর যাই হোক পাখিটা না খেয়ে মরবে না। মা লক্ষ্য করলেন যেদিন থেকে অঙ্কুর এই পাখির বাচ্চাটাকে বাসায় নিয়ে এসেছে, সেদিন থেকেই বাবলি মণি খুব সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠছে। তাকে জাগাতে হচ্ছে না, এই যে এত সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠছে, তাতে তার মনে শীত সকালের কোন কষ্টের চিহ্ন আছে বলে মনে হয় না। সে আপন মনেই অঙ্কুরকে নিয়ে খেলা করছে। মা বলেন, বাবলি তুমি যে শীতের ভোরে ঘুম থেকে উঠ, তোমার কষ্ট হয় না? আগে তো তোমাকে জাগানো যেত না, এখন বুলবুলি পাখিটা বাসায় আসার পর থেকে প্রচ- শৈত্যপ্রবাহের মাঝেও সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে পড়। পাখির বাচ্চাটাই তোমাকে এত ভোরে বিছানা ছাড়তে বাধ্য করেছে। মার কথা শুনে বাবলি লজ্জা পায়। সেজন্য মায়ের আঁচলের তলে মুখ লুকাতে চায়। মা তা বুঝতে পেরে বলেন, হয়েছে আর লজ্জা পেতে হেবে না। পাখির বাচ্চাটাকে অঙ্কুর বাসায় নিয়ে এসেছে, ভালই হয়েছে। তোমরা দুই ভাইবোন মিলে সকল ঝগড়া-বিবাদ ভুলে একসঙ্গে খেলা করছ। তা দেখতে এখন খুবই ভাল লাগে। মার কথা শুনে এবার শুধু বাবলি নয়, অঙ্কুরও যেন লজ্জা পায়।

সে-ও যেন মায়ের আঁচলের তলায় লুকাতে চায়। অঙ্কুর বুলবুলি পাখিটাকে বাসায় নিয়ে আসার পর থেকে বাসার সবাই খুশি হলেও শুধু একজন যে খুব অসুখী হয়েছে, তা তার চালচলন দেখলেই বুঝা যায়। সেটা হলো অঙ্কুর ও বাবলীদের পাশের বাড়ির কালোবিড়ালটা। এই কালোবিড়ালটার ভাবটা এমনÑ যেন সুযোগ পেলেই পাখির বাচ্চাটাকে ঘাড় মটকে খেয়ে ফেলবে। অঙ্কুর আর বাবলি তাই পাশের বাসার কালোবিড়ালকে দেখলেই তাড়িয়ে দেয়, তবুও বিড়ালটা সুযোগ পেলেই ছুটে আসে বাবলিদের বাসায়। বিড়ালটা যেন প্রতিজ্ঞা করেছে, যেভাবেই হোক পাখির বাচ্চাটার মাথা-বুক অর্থাৎ পালকসহ সমস্ত শরীর চিবিয়ে চিবিয়ে খাবে।

একদিন খুব ভোরবেলা মার ডাকে বাবলি ও অঙ্কুর ঘুম থেকে জেগে জানতে পারে তাদের পাখির বাচ্চাটা খাঁচার ভেতর নেই, কথাটা শুনেই দুই-ভাইবোনের বুকের ভেতরটা যেন অজানা আশঙ্কায় ভেঙ্গেচুরে চৌচির হয়ে যায়। ওরা দুজনেই সারা বাসা খুঁজতে থাকে বুলবুলি পাখিটার বাচ্চাটাকে। বাবলি ও অঙ্কুর ফুলের বাগান থেকে শুরু করে সমস্ত বাসা তন্নতন্ন করে অসহায়ের মতো খুঁজতে থাকে। এক সময় অঙ্কুর দেখতে পায় তাদের ফুল বাগানের এক কোনায় যেখানে সন্ধ্যামালতী গাছটা রয়েছে, সেখানে পাশের বাসার কালোবিড়ালটা কী যেন চিবিয়ে চিবিয়ে খাচ্ছে।

কালোবিড়ালটাকে বাগানের কোনায় সন্ধ্যামালতী গাছটার কাছে বসে বসে কিছু একটা চিবিয়ে চিবিয়ে খেতে দেখে অঙ্কুরের ভিতরটা ভয়ার্ত বেদনায় কেঁপে উঠে। সে গলা ছেড়ে যত জোরে পারে বাবলিকে ডাক দিয়ে বলে, বাবলি তুই একটা লাঠি নিয়ে আয়, মনে হয় রুনুদের বাসার বিড়ালটা আমাদের বুলবুলি পাখিটার বাচ্চাটাকে খেয়ে ফেলেছে। বাবলি অঙ্কুরের অসহায় ডাক শুনে তাদের দাদুর লাঠিটা সঙ্গে নিয়ে দৌড়ে এসে দেখে অঙ্কুর ঠিকই বলেছে।

তাদের পাশের বাসার অর্থাৎ রুনুদের বাসার কালোবিড়ালটা সন্ধ্যামালতী গাছটার কাছে বসে কী যেন চিবিয়ে চিবিয়ে খাচ্ছে। অঙ্কুর ও বাবলি দুই ভাইবোন মিলে কালোবিড়ালটাকে লাঠি নিয়ে মারতে এগিয়ে যেতেই বিড়ালটা মুখে কী একটা নিয়ে যেন পালিয়ে যায়।

ওরা দুই ভাইবোন গিয়ে দেখে সন্ধ্যামালতী গাছটার নিচে পাখির পালক ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। সন্ধ্যামালতী গাছটার কাছে ছড়ানো ছিটানো পাখির পালক দেখে বাবলি ও অঙ্কুরের বুঝতে বাকি রইল না যে, রুনুদের বাসার কালোবিড়ালটা এখানে মজা করে কী খাচ্ছিল। তারপর দুই ভাইবোন অর্থাৎ অঙ্কুর আর বাবলি কেবল চিৎকার করে কাঁদল। ওদের কান্না শুনে মা-বাবা, বাসার সবাই, এমনকি রুনুদের বাসার লোকজনও ছুটে এলো।

সবাই তাদের বুঝাতে লাগল- এখন আর কেঁদে কী হবে, যা হবার হয়ে গেছে। কিন্তু অঙ্কুর আর বাবলি কারও সান্ত¡নার বাণীই শুনতে চায় না। অন্যরা যতই তাদের বোঝাতে চায়, ততই তারা পাখিটার জন্য কাঁদতে থাকে। শেষে রুনু বলল, আমি আজ থেকে আমাদের কালো বিড়ালটাকে বাসায়

ঢুকতে দেব না।

প্রকাশিত : ৩১ জানুয়ারী ২০১৫

৩১/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: